ফজলুল কাদের সাহেবের শেষ কথা, সে যেই হউক না কেন, করোনা রোগীর মৃত দেহ তাদের কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হবেনা। এলাকার ছেলেদের পাঠিয়ে কড়া দমক দিয়ে রাখা হয়েছে। বাজারের সবজি বিক্রেতা হাছি মিয়া দশ দিনের সর্দি-কাশি-হাফানীতে মারা গিয়েছে। এলাকার মানুষের মুখে মুখে রটনা তিনি করোনার আক্রমণে মরেছে। বেঁচে থাকতে হাছি মিয়া সবার কাছে সজ্জন হিসেবে পরিচিত হলেও, মৃত্যুর পরেই তিনি সবার কাছে ঘৃণার পাত্র হয়ে উঠলেন! ফজলুল কাদের ক্ষমতাশালী মানুষ। শুরু থেকেই করোনাকে পাত্তা দিচ্ছিলেন না! কিন্তু হাছি মিয়ার মৃত্যুর পরে তার কার্যক্রম ব্যতিক্রমী হয়ে উঠল। লাশ দু’দিন বাড়ির উঠানে পরে থাকল। সবাই বাড়ি ঘর ফেলে পালিয়েছে। লাশ থেকে কিলবিল করে পোকা বেরুচ্ছে। পুলিশী ব্যবস্থায় ডোম এনে পোকায় খাওয়া অর্ধগলিত লাশ নদীর বালুচরে মাটি চাপার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
কয়েক দিন ধরে ফজলুল কাদেরের শারীরিক অবস্থা ভাল যাচ্ছিল না। গলার ব্যথাটা দিন দিন বাড়ছিল। করোনা নিয়ে তিনি বরাবরের মতই সতর্ক। স্ত্রী-পুত্র, নাতী-নাতনীদের ঘর থেকে বরে হতে দেন না। তিনি নিজেও ঘর থেকে বের হন না আবার বাড়িতে যাতে মেহমান না আসতে পারে তার বিহিত ব্যবস্থা করে রেখেছেন। গতরাতে তিনি ভয়ানক দুঃস্বপ্ন দেখেছেন। মৃত হাছি মিয়া গোস্বায় বড় বড়ো চোখ পাকিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে। গলার ব্যথার লক্ষণটা ভাল নয় আবার জ্বরও ছাড়ছে না। সকল কাজে সাবধানী ফজলুল কাদের সাহেব এবার অসাবধানতার খপ্পরে পরে যান। বাজার থেকে সর্দি-কাশির সিরাপ আনিয়েছিলেন। ঔষধের বোতলের সাথেই করোনা ভাইরাস ফজলু মেম্বারের ঘর চিনে ফেলে! তিনি ব্যবসায়িক সমিতির অন্যতম মেম্বার। অর্থকড়ি প্রভাব-প্রতিপত্তির অভাব নেই। সেই ফজলু মেম্বারকে আইসোলেশনে রাখা হয়েছে! প্রচণ্ড কষ্টের মাধ্যমে তার জীবনের শেষের দশটি দিন অতিবাহিত হচ্ছিল। তিনি একজন মৃত্যু-দণ্ডপ্রাপ্ত বন্ধীর মত একাকী আইসোলেশনের দিনগুলো কাটাচ্ছেন। সবাই বাহির থেকে দেখেই চলে যাচ্ছে।
ওদিকে মেম্বার ভাবছেন, এক ঘণ্টার জন্য যদি সুযোগ পাওয়া যায়, তাহলে বিভিন্ন ব্যাংকে নামে-বেনামের একাউন্টে যে কয়েক কোটি টাকা লুকানো আছে, সে সব স্ত্রী-পুত্রকে বলে যাবেন। কিন্তু এই কয়দিনে স্ত্রী-পুত্রের অবজ্ঞার ধরণ দেখে, তাদেরকে সাক্ষাৎ শত্রু বলে মনে হচ্ছিল। তিনি ভাবছেন, জীবনের শেষ মুহূর্তের সময়ে যে তাকে সাহায্য করবে সব টাকা তাকেই দিয়ে যাবেন। কিন্তু কোন নার্স-ডাক্তার কাছেও ভিড়তে চায় নি। ফজলু সাহেবের ভাবা-ভাবির দিন শেষ। সারাদিনে একটি পূর্ণ নিঃশ্বাস নিতে পারেন নি। বুক ফুলিয়ে বহুবার চেষ্টা করছেন বাতাস নিতে কিন্তু ব্যর্থ হচ্ছেন। বাঁচা-মরার এই কঠিন সময়ে আল্লাহকে ডাকার ফুসরতও পাচ্ছেন না। অথচ তিনি এখন জগত সংসার থেকে মুক্ত। পিপাসায় তার কলিজা ফেটে যেতে চাচ্ছে। চোখ মেলে টেবিলের দিকে তাকাতেই দেখেন সব বোতল খালি! কেউ এক গ্লাস পানি বাড়িয়ে দিবে কিনা তাই দাঁড়িয়ে উকি দিলেন। আশে পাশের সবাই ভয়ে পালাল। ফলে জীবনের শেষ সময় গুলো অতিবাহিত করার জন্য বাড়িতে চলে যেতে চাইলেন। কর্তৃপক্ষ এটাই প্রত্যাশা করেছিলেন। গ্রামের মানুষ রক্ষা পাবার লক্ষ্যে, তিনি আরো কড়া আইসোলেশনের মুখোমুখি হয়ে পড়েন। ক্ষুব্ধ যুবকেরা, বাজারে এটা নিয়ে প্রতিবাদ মিছিল করেছে। ফজলু সাহেবের পকেটের টাকায় এ সব ছেলেপুলে গত সপ্তাহে হাছি মিয়ার মৃত দেহ নিয়ে বিক্ষোভ করে। আজ এরা ফজলু সাহেবের জীবিত দেহ যেন এলাকায় না আসে সে জন্য মিছিল মিটিং করছে। ক্ষমতার চৌহদ্দির মধ্যে থাকা ফজলু সাহেবকে রাতের অন্ধকারেই তার বাড়িতে পৌছিয়ে দেওয়া হয়।
বাড়ির বাহিরের দহলিজে ফজলু সাহেবের ঠাঁই হয়েছে। সাহায্য কারী কেউ নেই। জিহ্বার পানি শুকিয়ে যাবার কারণে স্পষ্ট করে কথা বলছে পারছিল না। হাতে মগ নিয়ে তিনি একাই নলকূপের দিকে হাঁটলেন। উঠানের প্রান্তে অবস্থিত সেই নলকূপের দূরত্ব যেন তার কাছে দশ মাইলের বেশী বলে মনে হল। নাতিরা সমানে চিল্লাচ্ছে দাদু ওদিকে যেও না। ওটা ধরো না। তুমি ঘরে বসে থেকে। এই কয়দিনে তাদেরকে এভাবে শিখানো হয়েছে। কিন্তু ফজলূ সাহেব জানেন তার ভিতরে কিসের ঝড় চলছে। ভয়ঙ্কর মাথা ব্যথা, গায়ে জ্বর-কাঁপুনি, নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়, শক্তি হারানো, কাশিতে অতিষ্ঠ, পিপাসার্থ কলিজা, শুকনো জিহ্বা, চোখে ঝাপসা দেখা, মাথা ঘোরা, কানে ভয়ঙ্কর শো শো আওয়াজের আক্রমণে তিনি পর্যদুস্ত। সবাই ফজলু সাহেবকে উঠোনে হাটতে দেখে কিন্তু ভুক্তভোগী ফজলুল কাদের জানেন প্রতিটি সেকেন্ড তিনি কিভাবে পাড়ি দিচ্ছেন।
ফজলু সাহেবের কাছে একদা গ্রামের পাগলা কুকুরটি মারা যাবার দৃশ্য অন্তঃকরণে ভেসে উঠল। আজ এখন তো তার সন্তান, স্ত্রী, নাতিরা ঘরের কর্তার মৃত্যু-দশা উপভোগ করছে। তিনি অবর্ণনীয় জ্বালা নিয়ে মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ পার করছেন। পবিত্র কোরআনের একটি সুরা তেলাওয়াত করারর চিন্তা করছেন কিন্তু সেটা ভুলে গেছেন! গতকালও মনে ছিল! এত ভয়ঙ্কর শারীরিক বৈকল্যতা নিয়ে অনভ্যস্ত সুরা মনে আসার কথা নয়। এতদিন আপনজন তাকে অবহেলা করেছে এখন তার শরীরের প্রতিটি ইন্দ্রিয় অসহযোগিতা করা শুরু করেছে। ফলে আল্লাহর কথা স্মরণ করার চেষ্টা করছে কিন্তু তার নামটি কি ছিল সেটা বার বার চেষ্টা করেও মনে করতে পারলেন না! ইতিমধ্যে মৃত্যুর ফেরেশতারা চলে এসেছে। তারা যেমনি ভয়ঙ্কর তেমনি বিদঘুটে। দেখতে নির্দয় ও নিষ্ঠুরের মত অবলোকন। যে দশটি দিন এত কষ্টের মধ্যে গেল, রুক্ষ স্বভাবের ফেরেশতাদের দেখে মনে হচ্ছে সামনের দিনগুলো তার চেয়েও খারাপ যাবে। তিনি ভাবছিলেন তার পঞ্চ ইন্দ্রিয় বুঝি অকেজো হয়ে পড়েছিল কিন্তু ফেরেশতাদের উপস্থিতিতে যে ভয়ঙ্কর দুর্গন্ধের সৃষ্টি হল তার মোকাবেলা করা ইহজন্মে সম্ভব নয়। কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি বুঝতে পারলেন এটি তার ফুসফুসের পচা গন্ধ! যা পরবর্তীতে আজীবনের সাথী হয়ে থাকবে। সারা শরীরের প্রতিটি লোমকূপ যেন এক একটি চুলা, তার সারা শরীর জ্বলছে হাজারো জ্বালামুখের দহনে। ফেরেশতারা লেগে গেছে প্রাণ বায়ু বের করার কাজে। ভেজা তুলার বাণ্ডিলে করাত আটকে গেলে পর, সে করাত বের করতে গেলে তুলার যা দশা হয়, সব মৃত্যুপথ যাত্রীর দশাও তাই হয়।
ফজলুল কাদের সাহেব মাটিতে রুই মাছের মত তড়পাচ্ছে আর বাহিরে হাজারো কৌতূহলী মানুষের আত্বচিৎকার। তারা দেখতে এসেছে করোনা রোগী কিভাবে মরে! সবাই চিল্লাচ্ছে তিনি মরে গেলে কেউ জানাজা পড়াবে না। কেউ তার লাশ ধরবে না বলে ওয়াদা করছিল। তিনি মারা গেলে সময় থাকতেই হাছি মিয়ার লাশের সাথে সৎকার করতে হবে। কিন্তু এই লাশ বহন করবে কে? কোথায় পাওয়া যাবে সেই ডোম! না ফজলু সাহেব এখনও মরে নি, রূহ এত সোজা শরীর থেকে বের হয় না। কেউ বলেন কই মাছের প্রাণ! কেউ বলেন হাছি মিয়া সওদাগরের বদ দোয়ার ফল।
পুনশ্চ:
ভাইরাস জীবিত মানুষের দেহেই বসবাস করতে পারে। মানুষ মরে গেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভাইরাসও মরে যাবে। মৃত দেহ দাফন করে দিলে সে সব ভাইরাস মাটি ভেদ করে উঠতে পারে না। মৃতদেহের সাথে সবকিছুই ফেলে দিতে হয়। তাই করোনায় মারা গেলে তার জীবানু জনপদের ছড়িয়ে পড়বে এই ধারণা সঠিক নয়। মাটিতে দাফন করে ফেলা পর্যন্ত লাশের যত্মে একটু অতিরিক্ত সতর্কতা থাকতে হবে। কাউকে লাশ হবার আগেই করোনায় আক্রান্ত হয় সেটা কি লাশের মাধ্যমে এসেছিল। তাই লাশ নিয়ে কোন অবস্থাতেই হঠকারীতা নয়। সকল মৃত ব্যক্তির লাশ সম্মানিত। যে কোন ধর্মের মানুষের লাশ নিজের পাশ দিয়ে যাবার সময়, রাসুল (সা) বলেছেন দাঁড়িয়ে সম্মান জানাতে। নিজেদের কে পরিষ্কার পরিছন্ন থাকতে হবে। সর্বোচ্চ সতর্কতার সহিত মানবতার জন্য কাজ করে যেতে হবে। পরিপূর্ণ সতর্কতার মধ্যে থেকেও যদি রোগাক্রান্ত হই, তাহলে সেটার নামই তকদির। এই পরিস্থিতিকে হাসি চিত্তে মেনে নিয়ে মারা গেলেই তিনি শহীদ হিসেবে গণ্য হবেন। সর্বোপরি আমি-আপনি অন্যের নিকট থেকে যে ধরনের ব্যবহার প্রত্যাশা করি, আমারাও যেন অন্যের সাথে সে ধরণের ব্যবহার করি।

Discussion about this post