আজকে শুনতে পেলাম। আমাদের এলাকায় বালা মুসিবত দূর হবার জন্য একটি দোয়া মাহফিল হবে। প্রত্যেক সমাজ থেকে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ও মর্যাদাবান আলেমেরা সেখানে দোয়ায় অংশগ্রহণ করবেন। ধারণা করি বাংলাদেশের গ্রাম গুলো এখনও নিরাপদ। তাই একজন রোগী যদি সেই দোয়ায় শরীক হয়, তাহলে সকল গ্রামেই এর ছোবল ছড়িয়ে পড়বে। (এ সংক্রান্ত নিচে ঐতিহাসিক ঘটনা উল্লেখ করেছি।) আমি সাথে সাথেই যথাসম্ভব বুঝাতে চেষ্টা করেছি যে, এই মুহূর্তে এ ধরণের মাহফিল করা উচিত নয়। আল্লাহ যে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন তাই বাস্তবায়িত হয়। মাহফিল উদ্যোগ যেন এখুনি থামিয়ে দেওয়া হয় সে ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে বলি। মূলত এই ঘটনার পিছনে মুরুব্বী শ্রেণীর আলেমেরা জড়িত এমতাবস্থায় আমার বাধা প্রদান তাদের কাছে খারাপ লাগতে পারে। তাছাড়া আমি কোন ইসলামী ব্যক্তি নই, আলেমও নই, কোনদিন মাদ্রাসায় পড়িনি। তাই এ ধরনের ভূমিকা রাখার কারণে আমার প্রতি অনেকেই ক্ষিপ্ত হতে পারেন।
অতঃপর লেগে গেলাম এ সম্পর্কিত তত্ত্ব তালাশে। আলহামদুলিল্লাহ! আল্লাহ আমায় সহযোগিতা করলেন। এ ব্যাপারে পড়তে গিয়ে খুঁজে পেলাম এক ঐতিহাসিক ডকুমেন্ট। যেটা পাওয়া গেছে বিশ্বখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ড. ইয়াসির কাদির (হা) পেইজ থেকে। অতীতে এভাবে দোয়া মাহফিল করতে গিয়ে কি ভয়ানক মুসিবতেই না পড়েছিলেন মুসলমানেরা। সে ঘটনাটির ব্যাখ্যায় পড়ে আসছি।
দুনিয়াতেই যারা জান্নাতে যাবার সু-সংবাদ পেয়েছিলেন, তারাও মহামারিতে মারা গিয়েছিলেন। আল্লাহর রাসুল (সা) এর সাহচর্যে গড়ে উঠা বহু সাহাবী এই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারান। আমরা যদি দেখতাম, এই বিপদ থেকে জনপদকে মুক্ত করতে, তাঁরা সম্মিলিত ভাবে দোয়া মাহফিল করেছিলেন। তাহলে না হয় একটা যুক্তি থাকত। বরং আবু উবায়দা বিন জাররাহ (রা) কে দেখেছি মৃত্যুর সময় ভিন্ন নসিহত করতে। নামাজ পড়তে, রোজা রাখতে, হজ্জ করতে, যা আমি আমার ইতি পূর্বেকার লিখায় তুলে ধরেছি।
মূল কথা হল, মহামারি মোকাবেলায় করণীয় কি, তা আমাদের জন্য রাসুল (সা) এর সরাসরি দিক নির্দেশনা রয়েছে। মেলামেশা ছেড়ে দিয়ে স্ব-স্ব এলাকায় অবস্থান করা। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানও এটা স্বীকার করে। রাসুল (সা) এর কাছে রোগী আসলে পরে তিনি বলতেন, তাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও। স্বয়ং রাসুল (সা) নিজেও ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণ করেছেন! তাই আমাদের কে এই মুহূর্তে চিকিৎসা বিজ্ঞান কি বলে সেটাকে আগে গুরুত্ব দিতে হবে।
আল্লামা হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. (১৩৭২ – ১৪৪৯ খৃ) কায়রোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৫০ এর অধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের প্রণেতা। তিনি তার বিখ্যাত ‘বাজ্লুল-মাউন ফি ফাদলিত-তাউন’ গ্রন্থে দুটি করুণ ঘটনার উদ্ধৃতি দেন। যা আমাদের বর্তমান করোনা ভাইরাস সংক্রান্ত সমস্যার আলোকে গুরুত্বপূর্ণ এবং উপকারে আসতে পারে।
প্রথমে তিনি দামেস্কের একটি মহামারীর ঘটনা উল্লেখ করেন এভাবে।
“৭৪৯ হিজরিতে দামাস্কাস নগরী মহামারীতে ছেয়ে যায়। নগরের বেশিরভাগ বয়ো-জ্যৈষ্ঠ ব্যক্তিরা এই মর্মে সিদ্ধান্ত নেয় যে, নগরের বাইরে গিয়ে বিশেষ সালাত পড়ে দোয়া করবেন। পরবর্তীতে দেখা গেছে বিশেষ সেই সালাতের পর মহামারীর অবস্থা আরও নাজুক হয়ে উঠে এবং মৃত মানুষের সংখ্যা বহুগুণে বেড়ে যায়; অথচ দোয়া মাহফিলের আগে তাদের সবার অবস্থা অনেক ভালো ছিল।”
কায়রো শহরে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা আরেকটি মহামারির বীভৎস বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে,
“৮৩৩ হিজরি সনে কায়রোর এক মহামারীর করুন দৃশ্য তিনি নিজের চোখে দেখেছেন। সে সময়ে প্রতিদিন প্রায় ৪০ জন মানুষ মারা যেত। নগরবাসী ঠিক করল, নগরের বাইরের মরুভূমিতে গিয়ে বড় ধরণের সমাবেশের সহিত সালাত পড়বে। সিদ্ধান্ত মতে সবাই মিলে সালাত পড়ে ফিরে এলো। এক সপ্তাহের মধ্যে মৃত্যুর ভয়াবহতা সৃষ্টি হয় ফলে, দিনে হাজারের অধিক মানুষ প্রাণ হারাতে লাগল।”
তদানীন্তন সময়ে ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাস সম্পর্কিত জ্ঞান মানুষ অর্জন করেনি। তাই তারা রোগ সৃষ্টির পর্যায়গুলো সম্পর্কে জানতেন না। ফলে ব্যাপক হারে মানুষ মরেছে কিন্তু আমরা তো জানি কিভাবে এসব সংক্রমণ হয়। তাছাড়া আমাদের কাছে অতীত জীবনের ইতিহাস সামনে রয়েছে যা দিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত নিতে পারি। আমাদের কাছে উপরের দুটো ঘটনা তার বাস্তব সাক্ষী। রাসুলের (সা) শিক্ষা রোগ-বালাই শুরু হলে ডাক্তারের কাছে যেতে হবে এবং মহামারি শুরু হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ মত চলতে হবে।
এখানে দুটো কথা খুব গুরুত্বপূর্ণ। মহামারীতে সম্মিলিত দোয়া করা ইসলামে ফরজ, ওয়াজিব, সুন্নাত কোনটাই নয়। ফলে সেটা আদৌ জরুরী নয়। যদিও করা হয় সেটা তাদের মনপ্রসুত কিংবা পথহারা হতাশাগ্রস্ত মানুষের নিজের মনপ্রসুত চিন্তা থেকে সৃষ্ট। সে ক্ষেত্রে আমাদের কাণ্ডজ্ঞানকে কাজে লাগাতে হবে। আচ্ছা বলুন তো, চীন, কোরিয়া, জাপান কি এভাবে সম্মিলিত দোয়া করেছিল? নিশ্চয়ই করেনি! না করেও তারা সমস্যা মোকাবেলা করে উৎরে উঠতে পেরেছে। মূলত আমরা ইসলামের মৌলিক চিন্তা গুলোকে ভুল চিন্তার চাদরে পেঁচিয়ে গুলিয়ে ফেলেছি।


Discussion about this post