সিএনজিতে চড়ে আসার সময় গাড়ীতে বসে চলমান অবস্থায় ছবিগুলো তুলেছি। তাই অনেকগুলোর ছবি ধারণ করতে পারিনি। মাত্র দশ কিলোমিটার এলাকায় এতগুলো ইটের ভাটা দেখে আশ্চর্য হলাম। জানিনা এগুলো সরকারী অনুদিত কিনা। ধরেই নিলাম সবগুলো অনুমোদিত ইটের ভাটা কিন্তু পরিবেশের কি সর্বনাশ করেছি তা কি নিজের অন্তঃচক্ষু বন্ধ করে কখনও ভেবে দেখেছি! ফটিকছড়ি উপজেলার ভুজপুর থানার বিশাল এলাকা হালদা নদীর পলিবাহিত ভূমি। একদা মাইলের পর মাইল রবি ও খরিফ শস্য জন্মাত এই এলাকায়। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ মূলার উৎপাদন এখানেই হয়। মাইজ ভাণ্ডারে ওরসের সময় মানুষে দরগাহে আসলে যাবার সময় সাথে করে এই মূলা নিয়ে যেত। যার কারণে বাংলাদেশের বৃহৎ এলাকায় এই মূলার পরিচিতি চলে যায়। আমি নিজেও একজন আলোচিত কৃষকের ছেলে। এক টুকরো অনাবাদী জায়গা হাওলাত করার জন্য মানুষ আমার বাবা-মায়ের দ্বারস্থ হত! সেদিন আর নাই! এখন জমি খালি পড়ে থাকে কিন্তু চাষা নাই তাই এই অঞ্চলে কোন চাষাবাদ হয়না। বিস্তীর্ণ ধানী জমি খালি পড়ে থাকতে দেখা যায়। যখন ছবি গুলো তোলা হয় তখন সারা বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্র কচি ধানের পাতার ঘ্রাণে পরিবেশে ভিন্নরূপ ধারণ করেছে কিন্তু এখানে বিশাল অঞ্চল ফাঁকা!
মানুষ যখন চুলায় ভাতের ডেকচি বসায় তখন পানি গুলো বাষ্প হয়ে যায় এবং তৈরি ভাত অবশিষ্ট থাকে মালিকের জন্য। কারো কাছে ডেকচি, চাউল, পানি সবই আছে কিন্তু চুলা আর লাকড়ি নাই। আবার লাকড়ি থাকলেও তা অপ্রতুল। তাহলে সে ব্যক্তি কোনদিন রান্না করে খাদ্য বানাতে পারবে না। পানি দিয়ে চিবিয়ে চাউল খেয়ে বেঁচে থাকতে পারলেও; স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকতে পারবে না। সন্তানাদি হবেনা হলেও রোগাক্রান্ত কিংবা ভিন্ন সমস্যায় আক্রান্ত হবে।
ঠিক এই ব্যাপারটি গাছের জীবন চক্রেও ঘটে থাকে। গাছ তার খাদ্য তৈরি করে পাতার মাধ্যমে। গাছের পাতায় রয়েছে লাখ কোটি ছোট ছোট ছিদ্র। এগুলো এক একটি চুলার মত কাজ করে। পাতার উপরে যখন সূর্যের আলো পড়ে তখন এসব ছিদ্র তাপ ধারণ করে এবং সালোক সংশ্লেষণ নামক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পাতায় খাদ্য তৈরি শুরু হয়। সোজা বাংলায় গাছ তার খাদ্য রন্ধন করে পাতার উপরি ভাগের ক্ষুদ্র ছিদ্রের মাধ্যমে আর বাষ্পীয় আকারে গ্যাস ছেড়ে দেয় পাতার নিচের অংশের ছিদ্র দিয়ে।
আমরা ইটের ভাটায় যে ধুঁয়া দেখি তা মূলতই কোন ধোঁয়া নয়। সবই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কার্বন কণা। কয়েক হাজার কার্বন কণা একটি থালায় রাখলেও তা নজরে পড়েনা। কিন্তু গাছের পাতার উপর বসে পড়লে তার ছিদ্রগুলো ঠিকই বন্ধ হয়ে যায়! ফলে তার জীবনে সমস্যা দেখা দেয়। গাছ তার সমস্যার কথা তো চিল্লায়ে বলতে পারেনা; সে তার অসুস্থতার জানান দেয় ফলন কমিয়ে কিংবা বন্ধ করে দেবার মাধ্যমে। একজন অশিক্ষিত কৃষক বুঝবে না এটা কেন ঘটছে কিন্তু শিক্ষিত হয়েও মানুষ করছে টা কি? এটাই প্রশ্ন। কৃষক বুঝে ফলন; সেটা কম হলে তার লোকসান হবে, পরবর্তী বছর থেকে এই মহৎ কর্ম বাদ দিয়ে নতুন কিছু নিয়ে ভাবতে বাধ্য হবে। দেশে বর্তমানে হচ্ছেও তাই। শুধুমাত্র শিল্পকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে পরিবেশের এই চরম ক্ষতি, যা সহজে পুষিয়ে তোলা যায়না।
একটি পরীক্ষার মাধ্যমে ব্যাপারটি বুঝতে পারি! খোলা আকাশের নীচে বাতাস মুক্ত একটি স্থানে সিরামিকের সাদা থালা রাখুন, সেটাতে গ্লিসারিনের প্রলেপ মাখুন। মাত্র দুই দিন কিংবা একদিন পরে সাদা থালার দৃশ্য দেখুন। তারপর বুঝা যাবে কোন পরিবেশে বসবাস করা হচ্ছে? মানুষের নাকে বালি-ছালি ঢুকলে সে ডাক্তারের কাছে যেতে পারে কিন্তু বৃক্ষ প্রতিবাদ স্বরূপ ফলন কমিয়ে দেয়, চরম প্রতিবাদে তা বন্ধই করে দেয়। পরিবেশ নিয়ে সবারই করণীয় আছে। সবাইকে সচেতন হতে হবে। তাই আসুন পরিবেশ নিয়ে সোচ্চার হই। কেননা সুস্থ পরিবেশ মানুষের জন্যই আগে দরকার। তার জীবন ধারণের জন্য অন্যতম হাতিয়ার।

Discussion about this post