ব্যাপকভাবে চিনির ব্যবহার শুরু হয়েছে সত্তর এর দশকে। আমাদের ছোটকালে বাজারের রেস্টুরেন্ট গুলোতে দু’ধরনের ‘চা’ পাওয়া যেত। একটি গুড়ের চা, দাম পাঁচ পয়সা; অন্যটি চিনির চা, দাম দশ পয়সা। চায়ের মত এভাবে গুড় ও চিনির বহু জিনিষ পাওয়া যেত। বাজারে আলাদা করে গুড়ের দোকান বসত। মহিলাদের গৃহস্থালি ও মেহমান দারীর জন্য নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষ ছিল গুড়। সকল ধরনের পিঠা তৈরি হত গুড় দিয়ে। গুড় মিশ্রিত দই খেতে দারুণ উপাদেয়।
শিশুকালে ঈদের কয়েকদিন আগে খবর পাওয়া যায় যে, এক বন্ধুর নানী এবারের ঈদের দিনে চিনি দিয়ে সেমাই রান্না করবেন। এই চিনির সেমাই খেতে ঈদের দিনে-প্রথমে তাদের বাড়ীতে মেহমান হয়েছিলাম। চিনির সেমাই সবার জন্য নয়, তারপরও নিজেদের স্পেশাল মেহমান বানিয়ে সে বার চিনির সেমাই খেয়েছিলাম! পরবর্তী বছর পুরো গ্রামের প্রায় অর্ধেক মানুষের ঘরে চিনির সেমাই তৈরি হয়েছিল। প্রবীণেরা চিনির সেমাইয়ে গুড়ের মত প্রকৃত স্বাদ পাচ্ছিলেন না, তাই তাদের আগ্রহ তেমন না থাকলেও; বছর দুয়েকের মধ্যে গুড়ের স্থান দখল করে নিলো চিনি। ১৯৭৭ সালের ঈদের বাজারে এক সওদাগর বিশেষ অফার হিসেবে বাজারে ঢোল পিটিয়েছিলেন, সেমাই-চিনি ১১ টাকায় বিক্রি করবেন। সেমাই ৫ টাকা, চিনি ৬ টাকা।
মিঠাতে তেমন রোগ-বালাই ছিল না। শরীরের জন্য উপকারী উপাদান চিনির তুলনায় গুড়ে অনেক বেশী। বর্তমানে চিনি ব্যবহার বাড়ার সাথে অনেক ধরনের নাস্তার প্রচলন হয়েছে। মানুষ মুঠিয়ে যাচ্ছে, রোগাক্রান্ত হচ্ছে। চিনির নাস্তা দীর্ঘদিন রাখা যায় কিন্তু ঝাল জাতীয় নাস্তার ক্ষেত্রে এটা সম্ভব নয়। স্থায়িত্বের কারণেও চিনির কদর বেশী। এই চিনির বাজার বিস্তারের কারণে বর্তমানে শিশু-বুড়ো সবার রোগ-বালাইও বেড়েছে।
ধনীরা অন্য সাধারণ ব্যক্তিদের চেয়ে একটু ভিন্নতা চায়। চিনিও তার থেকে বাদ যায়নি। তাই বর্তমানের বাজারে বের হয়েছে ‘রিফাইন্ড সুগার’! না, এটা আহামরি তেমন কিছু নয়। রিফাইন্ড সুগারের দানাগুলো মিহি, ঝুরঝুর হয়ে আলাদা থাকে, চিকন ও চকচকে। পৃথিবীর বেশীরভাগ দেশেই চিনি কিংবা লবণ রিফাইন্ড করতে প্রাণীজ চর্বি ব্যবহার করা হয়। ব্যবসায়ীদের কাছে প্রাণীজ চর্বির মধ্যে শুকুরের চর্বি সহজলভ্য, সস্তা ও মাধ্যম হিসেবে উত্তম। ইসলাম ধর্মে শুকুরের চর্বিও হারাম। আল্লাহর নামে প্রাণী জবেহ না করলে গরু-ছাগলের চর্বিও হারাম। ব্যবসায়ীরা অর্থের পিছনে ব্যস্ত সময় ব্যয় করে। কার ঈমান কোথায় গিয়ে আটকে পড়ল, এটা তাদের চিন্তার বিষয় নয়। হারাম-হালাল নিয়ে মাথা ব্যথা করাও তাদের কাজ নয়। চিনির জন্য কথাগুলো রিফাইন্ড লবণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। বর্তমানের বাজার শুকরের চর্বির তৈলেও ভরপুর। নানা নামে ভেজিটেবল অয়েল বলে খাইয়ে দিচ্ছে চর্বি নিংড়ানো তৈল!
ইসলামী স্কলারেরা গবেষণার মাধ্যমে এই কথায় নিশ্চিত হয়েছে যে, শুকরের উপাদান শিশুদের শরীরে ঢুকে পড়ার কারণে, বর্তমান যুগের শিশুরা অনেক বেশী বদমেজাজি ও উগ্র। না জেনে হারাম খেলেও, তার ক্ষতিকর প্রভাব থেকে মানুষ মুক্ত নয়। চোখ বন্ধ করে আধুনিক উপাদানকে সেরা মনে করার কোন কারণ নেই। শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে, কোন জিনিষে অভ্যস্ত হওয়াও বিচক্ষণ মানুষের কাজ নয়। শিশুদের বদ-মেজাজের কারণ বাজারের লবণ-চিনি বলছিনা কিন্তু শিক্ষিত মানুষদেরকে হারাম থেকে বাঁচার জন্য অনেক বেশী সতর্ক হওয়া জরুরী। লবণ-চিনি তো সামান্য ব্যাপার! শুকরের চর্বি নিত্য ব্যবহার্য কত জিনিষে আমরা প্রতিনিয়ত ব্যবহার করে চলছি তা জানলে চোখ কপালে উঠবে।


Discussion about this post