উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েও প্রাণীজ চর্বি ছিল ইউরোপের জন্য এক মহা যন্ত্রণাদায়ক বিষয়। প্রচুর শুকরের খামার থেকে আহরিত হচ্ছিল লাখো টন চর্বি। এসব চর্বি পচে না, সহজে মাটির সাথে মিশে না, আবার মাংসাশী প্রাণীরাও খায়না। ফসল ও জনজীবনে এটা মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করে। তাই চর্বিকে কিভাবে নষ্ট করা যায় তার পিছনে তারা যথেষ্ট অর্থকড়ি ব্যয় করে। আশানুরূপ ফল না পাওয়াতে তারা চর্বি নিয়ে ভিন্ন চিন্তা করতে থাকে। কিভাবে চর্বিকে কাজে লাগানো যায়, তার পিছনে গবেষণা করতেই খরচ করে ব্যাপক অর্থকড়ি। বিশেষজ্ঞ বিজ্ঞানীদের পিছনে অকাতরে খরচ করার পরে সফলতা আসে।
শুরুতে চর্বি দিয়ে সাবান বানানো হলেও কালক্রমে চর্বি প্রসাধন সামগ্রী, আইসক্রিম, বেকারি, ভোজ্য তৈল সহ হাজারো জিনিষ তৈরির অন্যতম উপাদান হিসেবে সমাদৃত হতে থাকে। এই পোষ্টে কয়েকটি পণ্যের নাম উল্লেখ করব, তাতেই পাঠক বুঝতে পারবে, নিজের অজান্তে, নিজের গ্যাঁটের টাকায় উন্নত, স্বাস্থ্যসম্মত ও দামী সামগ্রী মনে করে তা নিজের ঘরে গর্বের সহিত ব্যবহার করা হচ্ছে দিনের পর দিন।
চর্বির একটি বড় গুন হল, তা গরমে নরম হয়, আর সাধারণ তাপমাত্রায় শক্ত ও স্বাভাবিক থাকে। চর্বিতে উজ্জ্বলতা, মসৃণতা ও চিকচিকে ভাব থাকে। শুকরের চর্বি মুসলমানদের জন্য হারাম ও ঘৃণিত। হিন্দুরাও খায়না। আবার আল্লাহর নামে জবাই কৃত নয়, এমন প্রাণী তথা গরু-ছাগলের চর্বিও হারাম। যদিও ইউরোপে শুকরের চর্বি নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল অনেক আগেই কিন্তু বর্তমানে সারা দুনিয়ায় গৃহপালিত প্রাণীদের মাংসের চাহিদাও বেড়েছে প্রচুর। মনোপলি ব্যবসায়ীদের লোভ বেড়েছে। তারা আল্লাহর নামে জবাই করা তো দূরে থাক, উল্টো গরু থেকে রক্ত বের হয়ে যাতে ওজন কমে যেতে না পারে সে জন্য গরু জবাই না করে, হাতুড়ী দিয়ে পিঠিয়ে হত্যা করেই সে মাংস বাজারে বিক্রি করে! যদিও এসব গোশত গরু-ছাগলের মত হালাল প্রাণীর। কিন্তু যথাযথ পদ্ধতিতে জবাই হয়নি বলে, মুসলমানদের জন্য এই গরু-ছাগলের গোশত-চর্বি শুকরের মাংসের মতই হারাম।
ডানকিন ডুনাট: বিশ্বখ্যাত আমেরিকান কোম্পানি। গাড়ীর চাকার মত কেকের আইটেম তৈরিতে সারা দুনিয়ায় খ্যাতিমান। শিশুরা একবার খেলে এর স্বাদ সারাজীবনে ভুলতে পারেনা। এই ডুনাটের উপরে চিকচিক করা আকর্ষণীয় ভাব আনা ও কেকের ভিতরে মসৃণতা সৃষ্টির জন্য ব্যবহার করে এই হারাম চর্বি। আমাদের দেশেও চর্বি থেকে সৃষ্ট এর তৈল বেকারিতে ব্যাপক ব্যবহার হয়। ব্রাশ দিয়ে কেক পাউরুটির উপরে এর চর্বি নিংড়ানো তৈল একটু মাখিয়ে রাখলে অসম্ভব লোভনীয় ভাব সৃষ্টি হয়। বৈদ্যুতিক আলো এর গায়ে পড়লে মনে হবে জিনিষটা একেবারেই ফ্রেশ। ক্রেতারা খুশীতে বেশী দামে কিনে খায়!
বাসকিন রবিন: দুনিয়া বিখ্যাত আমেরিকার আইসক্রিম কোম্পানি! এদের আইসক্রিম সবার চেয়ে ভিন্ন প্রকৃতির। একটু তৈলাক্ত ভাব থাকে। খাওয়ার পরে সারা মুখে একটু পিচ্ছিলতা অনুভব হয়। শিশু-বুড়ো সবারই সমান পছন্দ। এই মিশ্রণটিও চর্বি-জাত উপাদান থেকে সৃষ্ট। কাঠির মধ্যে লাগানো বাজারে যে সমস্ত আইসক্রিম পাওয়া যায়। সেটার গায়েও লাগানো থাকে চর্বি যুক্ত উপাদান। ফ্রিজ থেকে বের কারার পরও দীর্ঘক্ষণ তার আকার-আকৃতি যাতে একই থাকে সে জন্যই এই ব্যবস্থা। চর্বি কোন আইসক্রিমের উপাদান নয়। তার আকৃতি ধরে রাখা ও কিছুটা উজ্জ্বলতা সৃষ্টি করাই এখানে মূল উদ্দেশ্য। দুনিয়ার বেশীর ভাগ চকলেট কোম্পানি তাদের পণ্যের সৌন্দর্য ও আকৃতি ঠিক রাখতে প্রাণীজ চর্বি ব্যবহার করেই থাকে।
হয়ত বলা হবে, এসব তো আমেরিকান কোম্পানি, আমাদের দেশে এসবের কোন শাখা নাই। কিন্তু দুনিয়ার ক্ষুদ্র কোম্পানি গুলো বিশ্বময় সেরা কোম্পানি গুলোর বাৎলে দেওয়া পদ্ধতি গ্রহণ করে থাকে। নিজেরা নকল বানিয়ে তাদের নামে চালিয়ে দিতে চেষ্টা করে। সেক্ষেত্রে তাদের বানানো মসল্লার কোন যোগসূত্র পেলে সেটা নির্দিধায় গ্রহণ করে। খাদ্যকে স্বু-সাধু ও লোভনীয় করতে কাপড়ের রং, এসিড থেকে শুরু করে কোন জিনিষটা না মাখিয়ে থাকছি? এগুলো হারাম ও ফৌজদারি অপরাধ! আর প্রাণীজ চর্বি শুধুমাত্র হারাম, এটার জন্য ওরা সামান্যই চিন্তা করে।
প্রসাধন সামগ্রীতে: ফেস পাউডার, ফাউন্ডেশন, লিপস্টিক ব্যবহারে বর্তমান সময়ের নারীরা অনেক এগিয়ে। বিয়ের আইটেম ও বিউটি সেলুন গুলোর গণ্ডি পেরিয়ে ঘরে ঘরে হানা দিয়েছে এই উপাদান। মহিলারা সৌন্দর্য প্রিয় এবং দীর্ঘক্ষণ যাতে এই ক্রিমের ছোঁয়া মুখে লেপটে থাকে সেটার জন্য তারা যথেষ্ট সচেতন থাকে। অনেকে এটাকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে, মুখে পানি লাগায় না, এমনকি যথাসময়ে নামাজও পড়েনা। ফাউন্ডেশন, লিপস্টিক মেখে বাহিরে গরম জায়গায় গেলে সেটা গলে যেতে পারে। মুখের ফাউন্ডেশনকে টিকিয়ে রাখার জন্য যাদের এত দুঃচিন্তা! সেটা লাঘবে চর্বি-জাত উপাদান হল উপযুক্ত মাধ্যম। আগেই বলেছি, চর্বিতে চিকচিক ভাব থাকে, এটা দিয়ে ম্যাক-আপ করলে চেহারায় ব্লাশিং দারুণ হয়। যেহেতু স্বাভাবিক তাপমাত্রাও এটি ঠিক থাকে, সেহেতু মহিলার মুখেও এটা দীর্ঘসময় স্থায়ী হয়। তাছাড়া মুখের চামড়ার মত স্পর্শকাতর স্থানে ক্যামিকেল লাগানোর চেয়ে চর্বি-জাত উপাদান প্রায় শতভাগ বিপদমুক্ত থাকে। এই গুনটির কারণে প্রসাধন সামগ্রীতে এটার ব্যবহার দিন দিন বাড়ছেই।
আমি পাইকরি হারে দাবী করছিনা যে, দেশের সকল পণ্যই এভাবে বানানো হয়েছে! কিন্তু একটু চোখ খুললেই দেখা যাবে, ইউরোপের বিশ্বসেরা কোম্পানি গুলোর একটি লিপস্টিক কিংবা আই-ব্রু’র দাম কমপক্ষে ৫০-৭০ ডলার। মানুষ প্রতিযোগিতা দিয়েই এসব কিনে থাকে। তারা এটা বলার গরজ ও বোধ করেনা যে, আমরা চর্বি মেশাই না। কেননা এটা সেখানে নিষিদ্ধ নয়।
ভোজ্য তৈলে চর্বি: “গত ৩ আগস্ট ২০১৯ ঢাকার ধামরাই থেকে কেবিসির মহাব্যবস্থাপক তাপস দেবনাথ ও পরিচালক জাহিদুর রহমানের কাছ থেকে ২ লাখ ৯৮ হাজার ২শত ৬০ মেট্রিক টন শুকরের চর্বি, মাংস ও হাড় আমদানির চালান ফরম জব্দ করা হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারওয়ার আলম জানান: কেবিসি এগ্রো (প্রাঃ) লিমিটেড হেলথ কেয়ার নামের প্রতিষ্ঠানটি সয়াবিন তেল তৈরি করার জন্যে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে হংকং থেকে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ শুকরের চর্বি আমদানি করে।” কালের কণ্ঠ। আরেকটি পত্রিকা জানায় তারা ইতিমধ্যে তের হাজারের মত শুকরের চর্বি-জাত তৈল বাজারে ছেড়েও দিয়েছে!
কোন মন্তব্য ব্যতীত পত্রিকা থেকেই তথ্য উপস্থাপন করলাম। এভাবে প্রাণীজ চর্বি দ্বারা বানানো পণ্যের তালিকা বানানো শুরু করলে বিরাট একটি বই হয়ে যাবে। তাই এসব থেকে পরিত্রাণ কিংবা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টায় বেঁচে থাকতে হলে দরকার নিজেদের সচেতনতা। হয়ত কেউ বলে থাকতে পারে, এসব চর্বি তো আমরা খাই না, সুতরাং এত দুঃচিন্তার কারণ কি আছে? এর উত্তরে রাসুল (সা) এর একটি লম্বা হাদিসের কিছুটা উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করব।
“বান্দাহ যখন আল্লাহর কাছে স্বীয় অভাব পূরণের জন্য কামনা করে, তখন আল্লাহ তাদের অভাব পূরণ করার জন্য এগিয়ে এসে দেখে। তার পেটের ভিতরে যা রয়েছে তা হারাম, তার পরনে যা রয়েছে তাও হারাম…. তাই তার দোয়া কবুল করা হয়না।” আল্লাহ বান্দার ডাকে সাড়া দেবার পরও, নিজের চেহারা ফিরিয়ে নেন, শুধুমাত্র বান্দার পেটে-বসনে-বদনে হারাম থাকার কারণে। দোয়া কবুলের জন্য নিজের অঙ্গের ভিতরে-বাহিরে কিঞ্চিত হারাম না থাকাটাই অপরিহার্য। অথচ বর্তমান জমানায় আমরা দিন রাত ঢুবে আছি বিচিত্র সব হারামের মধ্যে। মসজিদ বেড়েছে, নামাজি বেড়েছে, দোয়া চাওয়ার মানুষও বেড়েছে কিন্তু কাজের কাজ হচ্ছেনা। সেটা এসব গোপনীয় কারণেই! অথচ এসব সামগ্রী ব্যবহার করাকে কেউ সামাজিক স্ট্যাটাস ভাবছে কেউ ব্যক্তিত্বের বিকাশ হিসেব গ্রহণ করছে। দোয়া কবুল, ভাল মানুষ হওয়া, ভাল সন্তান বানানোর একমাত্র উপায় নিজেদেরকে হারাম থেকে বাঁচিয়ে চলা। এটা রক্ষা করা প্রতিটি ব্যক্তির নিজ দায়িত্ব।

Discussion about this post