সামরিক ট্রাইব্যুনালের রায়ে, ফাঁসি কাষ্ঠে উঠার আগে মসজিদের ইমাম এসে অফিসারকে জানালেন, ‘আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে‘। তিনি ঈমামকে ধমক দিয়ে জানালেন, ‘আমি এমন কোন পাপ কিংবা অপরাধ করিনি যে, ক্ষমা চাইতে হবে‘! তিনি তার কর্মে হয়ত যথেষ্ট আত্মবিশ্বাসী ছিলেন যে, তিনি কখনও পাপ করেন নি, তাই ক্ষমা চাইবে কেন? এটা তার ব্যক্তি বিশ্বাস কিন্তু মানুষ নিজের অজান্তেই বহুবিধ পাপে লিপ্ত থাকে। রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ‘প্রত্যেক আদম সন্তানই অপরাধী আর উত্তম অপরাধী তারাই, যারা তওবা করে, ক্ষমা চায়’ (আবুদাউদ, মিশকাত২৩৪০)।
এক উচ্চশিক্ষিত, ধার্মিক, শিক্ষিত ও ধনী ব্যক্তিকে দেখতাম এশার নামাজের পরে দীর্ঘক্ষণ দোয়া করতে! কি সেই দোয়া! জানতে চেয়ে প্রশ্ন করেছিলাম। তিনি জানালেন, “কোম্পানির কাজের প্রয়োজনে কার্যক্ষেত্রে কখনও বাপের বয়সী মানুষদের সাথেও রূঢ় আচরণ করতে হয়! খারাপ কথাও বলতে হয়! কখনও সতীর্থদের সাথেও করে ফেলি। বুঝতে পারি তারা মনে দুঃখ পায়। সেটার জন্য যাতে গুনাহ না হয়, সে কারণে প্রতিদিন একটি সময়ে দীর্ঘক্ষণ বসে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নিই!”
তাকে বললাম, বান্দার হক নষ্ট করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইলে তো হবেনা! যার মনে কষ্ট দিয়েছেন তার কাছেই ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি জানালেন, এভাবে লোকের কাছে ক্ষমা চাইলে তো ব্যবসা লাটে উঠবে, ওরাও মাথায় বসবে! তাছাড়া আল্লাহ তো বলেছেন, বান্দার যে কোন ধরনের গুনাহ তিনি ক্ষমা করবেন! তার এই কথাটি সত্যের কাছাকাছি কিন্তু ভুল বুঝেছেন অথবা ইচ্ছাকৃত হঠাকারীতায় লিপ্ত হয়েছেন। তিনি শিক্ষিত, ধার্মিক; তাকে ধর্মীয় জ্ঞানশূন্য বলা যাবেনা। তারপরও তিনি বিরাট বিরাট ভুলের উপর আছেন, সেটা বুঝাতে গিয়ে উল্টো তিনি আমার উপরই অসন্তুষ্ট হয়ে দু‘কথা শুনিয়ে দিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করলেন! হয়তবা এতদিনে এটার জন্যও তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে রেখেছেন।
আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা পাবার উৎকৃষ্ট কাজটিকে উল্টোভাবে বুঝার মানুষও দুনিয়াতে কম নয় উপরের দুটো দৃষ্টান্ত থেকে আমরা দেখতে পাই। কাজের ফাঁকে অধীনস্থদের উৎপীড়ন আর রাতের আঁধারে আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়া, ক্ষমার মূল লক্ষ্য নয়। মানুষকে ফিরে আসার ওয়াদা করতে হবে। এটাই আল্লাহ চায়। বান্দার যে অপরাধ নিতান্ত আল্লাহর সাথে সম্পর্কিত সে সব অপরাধ তিনি ক্ষমা করবেন। কিন্তু দুনিয়ার জীবনে মানুষের সাথে সংঘটিত ভুল ও অপরাধের ক্ষমা দুনিয়া ত্যাগের আগেই মিটিয়ে যেতে হবে। হাশরের ময়দান বান্দার হক ক্ষমা করার স্থান নয়! এটা বিচারের চুলচেরা ফায়সালা ঘোষণার দিন। আত্মসাৎ কিংবা চাঁদাবাজি করে ছিনিয়ে নেওয়া একটি টাকাও সেদিন আদায় করে দেওয়া হবে। পৃথিবীর বুকে শক্তিশালী প্রাণী ছোট প্রাণীটিকে গুঁতো মেরে যে কষ্ট দিয়েছিল, অবিকল একটি গুঁতো ও সে পরিমাণ জ্বালাতন তাকেও পাইয়ে দেওয়া হবে।
এক পেশাদার চোর নিজের কৃতকর্মের জন্য ক্ষমা চেয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করছিল এভাবে, “আল্লাহ সারা জীবন চুরি করেছি। কার কি মাল চুরি করেছি নিজেও জানিনা, কার জিনিস কবে চুরি করেছি সেটাও মনে নাই। যাদের অনেকে দুনিয়াতে বেঁচে নাই, তাদের মধ্যে কারো ওয়ারিশ নাই। জনে জনে গিয়ে এই বিশাল অপরাধের ক্ষমা চাওয়ার সাহস আমার নেই। কিন্তু মানুষ জানেনা আমি সেই ঘৃণিত চোর, যার সন্ধানে তারা ব্যস্ত। যদিও আমি তাদের মাঝেই ছিলাম কিন্তু তুমি দয়া ও অনুগ্রহ করে আমাকের চোর হিসেবে পরিচিত করিয়ে দেও নাই। তুমি যে গুন দিয়ে এই কঠিন ধৈর্য ধরেছ, সে একই গুন দিয়ে তুমি আমাকে ক্ষমা করো। আমার প্রতি রহম করো। দয়া করে হাশরের ময়দানে আমাকে চোর হিসেবে প্রকাশ করে দিওনা। তুমি তো অফুরন্ত সম্পদের মালিক! হাশরের ময়দানে আমার কাছে মানুষের প্রাপ্য গুলো তুমি তোমার ভাণ্ডার থেকে, আমার হয়ে পরিশোধ করো। আমি ওয়াদা করছি এখন থেকে আর চুরি করব না, ধোঁকা-প্রতারণায় অংশ নিবো না! সে ওয়াদা করেছে যে, পরক্ষণ থেকে সে চুরির পাপ আর করবে না। দৃশ্যত এই চোরের দোয়া গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করতে পারেন। এ ধরনের বহু নিদর্শন আছে।
সুরাকা বিন মালিক ছিল আরবের এক জঘন্য ডাকাত। সব অপকর্মে তার জুড়ি ছিল না। মক্কার চারিদিকে ছিল দিগন্ত বিস্তৃত দুর্গম পাহাড়ের সাড়ি। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে, গিরিপথ পাড়ি দিয়ে, মক্কায় পৌছার রাস্তা ছিল সীমিত। পথ দেখানোর মানুষ না থাকলে, পথ হারিয়ে মৃত্যু অবধারিত। সুরাকা ছিল তার ব্যতিক্রম! সাধারণে না জানা এ ধরনের অনেক পথের খবর তিনি জানতেন। ডাকাতি করে তিনি পাহাড়ের কোলে হারিয়ে যেতেন। কেউ আর তার সন্ধান পেত না। চুরি-ডাকাতির পেশা চালাতে গিয়ে, এভাবে সে অনেক অজানা-অচেনা রাস্তা সৃষ্টি করেন। রাসুল (সা) গোপনে মদিনায় হিজরত করেন। কোরাইশেরা অপমান আর ক্ষোভে ফেটে পড়ল। সারা রাত যার ঘর পাহারা দেয়া হল, সেই তিনি এত মানুষের চোখের ফাঁক গলে, কিভাবে বের হয়ে গেল! ধরার জন্য বিরাট পুরষ্কার ঘোষনা হল। সকল মানুষ সম্ভাব্য সকল পথে পাহারা বসাল আর সুরাকা বুঝলেন যে, মুহাম্মদ (সাঃ) বিচক্ষণ মানুষ। তিনি সাধারণের পথ ধরে কিংবা মহাসড়ক দিয়ে যাবেন না। সুরাকার চেনা-জানা কোন এক পথ ধরেই তিনি পথ চলবেন। ঘটনা তাই হয়েছিল, পুরষ্কারের লোভে উদ্ভ্রান্ত সুরাকা রাসুল (সাঃ) কে আক্রান্ত করতে গিয়েও বারবার ব্যর্থ হন। রাসুল (সা) হেঁসে বললেন, সুরাকা! এত কিছুর পরও কি তুমি বুঝতে পার নি আমি আল্লাহর নবী? তুমি পথ ছেড়ে দাও, আল্লাহ তোমাকে ক্ষমা করবেন। সুরাকা বুঝেছিলেন ইনি কোন সাধারণ মানুষ নন। পথ ছেড়ে দিতে বাজি হলেন সুরাকা। তার অতৃপ্ত হৃদয় কিছু বখশিশ আশা করেছিল? তিনি প্রশ্ন করেছিলেন আমি যখন তোমার সাম্রাজ্যে ফিরে যাব তখন আমাকে কিভাবে সম্মান জানানো হবে? রাসুল (সা) এর নির্দেশে আবুবকর (রা) একটি হাড়ের টুকরায় লিখিত ভাবে জানালেন যে, এর বিনিময়ে তোমাকে পারস্যের রাজার জন্য স্বর্ণে নির্মিত পোশাক তোমায় পড়ানো হবে! পারস্য বিজয় হলে রাসুলের (সা) দেয়া সেই প্রতিশ্রুতি ওমর (রা) পালন করেছিলেন। একজন মানুষের সীমাহীন অপরাধ আল্লাহ ক্ষমা করেন এমনকি দুনিয়াতে তাকে বিরল সম্মানের অধিকারীও করতে পারেন। যদি স্বচ্ছ অন্তঃকরণে আল্লাহর কাছে ফিরে আসার ওয়াদা দিয়ে, খারাপ কাজ থেকে মানুষ বিরত হয়।
হাদিস শরিফে আছে, মানুষ দোষ করে ক্ষমা চাইলে আল্লাহ খুব খুশী হয়েই তাকে ক্ষমা করে দেন। ক্ষমা করতেই আল্লাহ খুব পছন্দ করেন। আরেকটি হাদিসে তো আরো কড়া কথা ঘোষণা হয়েছে এভাবে যে, “রাসুল (সা) বলেছেন, ‘ঐ সত্ত্বার কসম, যার হাতে আমার প্রাণ! যদি তোমরা গুনাহ না করতে। তাহলে আল্লাহ তোমাদের সরিয়ে দিয়ে তদস্থলে এমন এক জাতিকে সৃষ্টি করতেন যারা গুনাহ করে আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত। আর আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করে দিতেন‘ (মুসলিম, মিশকাত হা/২৩২৮)


Discussion about this post