শিক্ষা সম্পর্কিত সমূদয় তথ্য, উপমা, প্রবাদ, প্রবচন ও ঘোষণা একত্রিত করে একটি উপসংহার টানা হলে পাওয়া যায় মূলত শিক্ষার মৌলিক উপাদান তিনটি। শিক্ষার-উদ্যেশ্য
– সত্য, সুন্দর, সাবলীল পন্থায় দুনিয়ার জীবনে বুৎপত্তি অর্জন।
– জগতের প্রাণীকুলের উপর মানবিকতাকে সর্বোচ্চে প্রতিষ্ঠিত করা।
– আত্মার বিকাশ সাধন ও স্রষ্টার সাথে সৃষ্টির সম্পর্ক গভীর করা।
শিক্ষা কি ও তার ধারণা কেমন এ নিয়ে পৃথিবীর তাবৎ গুণীজন, পণ্ডিত, কবি, সাহিত্যিক, দার্শনিক তাদের মূল্যায়ন দিয়ে গেছেন। প্রত্যেকেই নিজ জ্ঞান-দর্শনের আলোকে শিক্ষা সম্পর্কে যত কথা বলে গেছে সে গুলো একত্র করলে একটি বিরাট বিশ্বকোষ সৃষ্টি হবে।
শিক্ষা নিয়ে সবার উদ্ধৃতি আলোচনা করা আমার প্রতিপাদ্য বিষয় নয়। তারপরও বুঝার সুবিধার্থে পৃথিবী বিখ্যাত কয়েকজন দার্শনিকের উক্তির দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করছি। শিক্ষার-উদ্যেশ্য
বাংলা উইকিপিডিয়ায় শিক্ষার সংজ্ঞা হিসেবে বলা আছে, “সাধারণ অর্থে জ্ঞান বা দক্ষতা অর্জনই শিক্ষা। ব্যাপক অর্থে পদ্ধতিগত ভাবে জ্ঞানলাভের প্রক্রিয়াকেই শিক্ষা বলে।” বাংলা পিডিয়ার এই সংজ্ঞাটি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার প্রতিই অঙ্গুলি হেলন করেছে। এই শিক্ষা পদ্ধতি দ্বারা শিক্ষার তিনটি বৈশিষ্ট্যের প্রথম অংশের কিয়দংশ পূরণ করা যাবে। বাকী দুই অংশ নিয়ে এখানে কোন বক্তব্য নাই।
সক্রেটিসের মতে, “শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মিথ্যার বিনাশ আর সত্যের আবিষ্কার।” এটা শর্তের তৃতীয় ধাপ কিছুটা পূরণ করে কিন্তু প্রকৃতই সত্য ও মিথ্যা কি, সেটার পরিচয় আবিষ্কারেই তো মানুষ প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব সংঘাতে লিপ্ত। শিক্ষার-উদ্যেশ্য
প্লেটোর মতে শিক্ষা হল, “শরীর ও আত্মার পরিপূর্ণ বিকাশ ও উন্নতির জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তা সবই শিক্ষার উদ্দেশ্য অন্তর্ভুক্ত।” এখানে প্রথম ও তৃতীয় শর্ত নিয়ে কথা বলা হয়েছে কিন্তু মাঝের শর্তটি উপেক্ষিত হয়েছে। অধিকন্তু আত্মার পরিচয় কি, তা কিভাবে সুস্থ সুন্দর পরিছন্ন থাকতে পারে সে ব্যাপারে প্লেটোর ধারনা পরিষ্কার নয়।
এরিস্টটল বলেছেন: “শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যে হলো ধর্মীয় অনুশাসনের অনুমোদিত পবিত্র কার্যক্রমের মাধ্যমে সুখ লাভ করা।” এখানে এরিস্টটল সরাসরি ধর্মীয় অনুশাসনেই শিক্ষার মূল উপাদান খুঁজে পেয়েছেন। অন্য কিছুর অভাব বা প্রয়োজনীয়তা তিনি দেখেন নি।
ইংরেজ কবি জন মিল্টন বলেছেন, Education is the harmonious development of body, mind and soul. শরীর, মন এবং আত্মার সুসামঞ্জস্য উন্নয়নের নামই হল শিক্ষা। ষোড়শ শতাব্দীর এই কবির কথার মধ্যে উপরের তিনটি মৌলিক উপাদানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। বস্তুত পৃথিবীতে যত দার্শনিক শিক্ষা সম্পর্কে নিজেদের উপার্জিত জ্ঞান দ্বারা কথা বলেছেন তাদের মধ্যে কবি মিল্টনের কথায় শিক্ষার একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ অঙ্কন করা যায়।
পবিত্র কোরআনে শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গি আল্লাহ এভাবেই তুলে ধরেছেন, “তিনিই মহান সত্তা যিনি উম্মীদের মধ্যে তাদেরই একজনকে রাসুল করে পাঠিয়েছেন, যে তাদেরকে তাঁর আয়াত শুনায় (আত্মা বিশুদ্ধে সত্যের খবর পৌছায়), তাদের জীবনকে পবিত্র (মানবিক মূল্যবোধে সজ্জিত ও সুন্দর) করে এবং তাদেরকে কিতাব (পবিত্র গ্রন্থ) ও হিকমাত (আধুনিক তত্ত্বজ্ঞান) শিক্ষা দেয়।” সুরা জুময়া-২
উপরের পর্যালোচনা থেকে জানতে পারি পরিপূর্ণ শিক্ষার জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক উপাদান সম্পর্কে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে জানা ও তা অর্জন করা অপরিহার্য।
১. জীবনে বুৎপত্তি অর্জনের নিমিত্তে জ্ঞান, যোগ্যতা-দক্ষতা, ধৈর্য ও কষ্টসহিষ্ণুতা অর্জন।
২. মানবিক মূল্যবোধের প্রসার ঘটাতে নিজের মন ও বিবেককে মানবিক হিসেবে গড়ে তোলা।
৩. আত্মা তথা প্রাণের গুরুত্ব বুঝে স্রষ্টার সাথে সংযোগ এবং তার যথাযথ হেফাজত করা।
গভীর দৃষ্টিতে উপরের তালিকার দিকে একটু নজর দিন আর ভাবুন তো, বর্তমান যুগে আমরা যারা রাতদিন অবিরাম লিখা-পড়া করে খেটে মরছি, কাড়ি কাড়ি টাকা ঢালছি তাতে প্রকৃত শিক্ষা অর্জনের কত অংশ অর্জন করছি। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে, আমরা অভিভাবকেরা, শুধুমাত্র উপরের এক নম্বর আইটেম অর্জন করানোকেই সেরা জীবন হিসেবে ধারণা দিচ্ছি। এতে প্রতিবছর দলে দলে ডাক্তার বেরুচ্ছে কিন্তু তাদের অনেকেই রোগীদের গলা কাটছে। অগণিত ইঞ্জিনিয়ার সৃষ্টি হচ্ছে কিন্তু তারা লোহার বদলে বাঁশ, সিমেন্টের স্থলে পলি মাটি মিশিয়ে নির্মাণ কাজের আয়ু কমাচ্ছে। পাকা রাস্তার স্থলে ইটের গাঁথুনি দেওয়ায় ব্যস্ত হয়েছে। কত অর্থনীতিবিদের জন্ম হচ্ছে কিন্তু তাদের বুদ্ধিতে লুট হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ব্যাংকের টাকা। দক্ষ কূটনীতিবিদ জীবন কাটাচ্ছে তোষামোদ করে। উচ্চ-শিক্ষাবিদ পণ্ডিত বিদ্যালয়ের পাঠদানে ফাকি দিয়ে, করে যাচ্ছে কোচিং ব্যবসা। প্রতিষ্ঠানের বড় পদবী পাবার লোভে, কুর্নিশ করছে, তাদের চেয়েও হীন ব্যক্তিত্বকে। এই রোগ আজ জগত সংসার খেয়ে ফেলেছে। একজন ধান্ধা-বাজ ফড়িয়া অর্থনীতিবিদ এক কলমের আঁচড়ে যত টাকা আত্মসাৎ করে; একটি শহরের সকল ছিনতাই কারী, চোর, ছেঁচড় সারা বছরেই অত টাকা বানাতে পারেনা। আর বিচারকেরা এসব চোর ধরে তাদের শাসন করাকেই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার পরাকাষ্ঠা দেখাচ্ছেন।
আমাদের সমাজের চরম দুর্গতির অন্যতম কারণ হল, শিক্ষা ব্যবস্থায় মানবিকতা ও আত্মার বিশুদ্ধতা অনুপস্থিত! মানবিক কাজ করা কি শুধু জাতি সংঘের দায়িত্ব? নাকি সামাজিক পুরষ্কার পাবার জন্যই মানবিক কাজ করতে হয়। মানব কেন মানবিক হবে, শিক্ষার মাঝে এই উপকরণের অভাব থাকলে শিক্ষার্থী কোনদিন ভাবুক হবেনা। তার উপলব্ধি জ্ঞান থাকবে না। মানুষ হয়েও সে যন্ত্রের মত চলতে থাকবে। কোন বড় ঘটনা, দুর্ঘটনায় তার বিবেকে কোন আছর পড়বে না। যতই উচ্চ শিক্ষিত হউক না কেন, বিবেক বলে যে একটি জিনিষ আছে, এমন ব্যক্তির আচরণে তা ছিটে ফোটাও থাকবে না। সে যদি রাষ্ট্রের উচ্চ পর্যায়ের কোন পদে আসীন হয়, তাহলে প্রতিটি সেক্টরে নতুন নূতন রাষ্ট্রপতির জন্ম হবে মাত্র। বিবেক ও মনুষ্যত্ব বলতে কোন কিছুর ছিটে ফোটাও থাকবে না। এমন ব্যক্তিরা নিজের সন্তানের আবদার মেটাতে, অন্যের সন্তানকে ভিকটিম বানিয়ে, নিষ্ঠুর নির্যাতন করে অর্থ সম্পদ আদায় করতেও কুণ্ঠিত হবে না। এটার নাম অমানবিকতা আর মানবিক মূল্যবোধ ও তার প্রয়োগ মানুষের মনকে তৃপ্তি দেয়।
আল্লাহ ও আত্মার সম্পর্কের বিষয় যদি পড়ানোই না হয় তাহলে কোন ব্যক্তিই জীবনে জবাবদিহিতা শিখবে না, মূল্যায়ন বুঝবে না। ভাল হলে লাভ কি, কেনই বা ভাল হতে হবে, দুনিয়াতে তার কি ফল রয়েছে? অন্যদিকে অসৎ হলে ক্ষতি কি? কেন সে উৎখুষের বিশাল টাকাটা না নিয়ে অবজ্ঞা করবে, এটা না নেয়াতেই বা লাভ কি! এসবের ভাল ও ক্ষতিকর দিক যদি শিক্ষার্থীদের কাছে পরিষ্কার না হয় তাহলে রাষ্ট্র ভঙ্গুর হবে, সমাজে শৃঙ্খলতা হারাবে। আত্মার সন্তুষ্টির নামই হল প্রশান্তি। এটা অর্থ-ক্ষমতা দিয়ে অর্জন করা যায়না। মনের অশান্তিই সকল নষ্টের মূল। পৃথিবীর সকল যুদ্ধ-বিগ্রহ তো কোন একজন ব্যক্তির অশান্ত মনের কারণেই ঘটেছিল। যতক্ষণ না মনের উপরে প্রাণ বিজয়ী না হবে, ততক্ষণ মানুষের হৃদয় ক্ষত হতে থাকে। মানুষের মন ও বিবেক তখনই শান্ত ও সুস্থির হয়, যখন তার আত্মা পরিতৃপ্ত হয়। তাই সকল শিক্ষার উপরে অন্যতম প্রধান শিক্ষাই হল আত্মার বিকাশ সাধন। যা সৃষ্টি ও স্রষ্টার মাঝে সংযোগ সৃষ্টি করে। মানবকে মানুষ বানিয়ে দেয় এবং তার উপলব্দি বোধকে উচ্চ মাত্রায় উন্নীত করে। এই মানুষ প্রকৌশলী হল কি চাষা হল কিছুই আসে যায় না। এমন মানুষ অন্যের যাঞ্ছার উপর নির্ভরশীল হলেও, তার দ্বারা সমাজ ও রাষ্ট্র উপকৃত হয়। আত্মার খোরাক আত্মীয়তার মাঝেই, সেই আত্মীয়তা করতে হয় আল্লার সাথেই। তখনই মানুষের আত্মা প্রশান্তি লাভ করে, এই ব্যতীত শান্তি লাভের অন্য কোন উপাদান দুনিয়াতে নেই।
চলমান বাজারের চাহিদাপূর্ণ কোর্সটি সম্পন্ন করে, শর্টকাট লেখাপড়ার মাধ্যমে জলদি অর্থ-কড়ি কামিয়ে ধনী হয়ে ঘর-সংসার শুরু করার নাম, বুৎপত্তি অর্জন নয়। এভাবে অর্থকড়ি অর্জন করা যায় কিন্তু সুখী হওয়া যায়না। বহু ধনী ব্যক্তি এমন আছে যিনি সম্পদ কামানোর পরেও ভাবতে থাকে, যদি তিনি ঐ কাজটি করতেন তাহলে খুশী হতেন। এমনকি তার কাছে অনেক অর্থকড়ি থাকলেও পরিনত বয়সে নতুন করে কি করা যায়, সে ব্যাপারে বুদ্ধি হাওলাত করতে যায়। তারা বেশীর বেশী টাকা দিয়ে টাকা কামানোর পদ্ধতি রপ্ত করতে পারে কিংবা ব্যাংকে গচ্ছিত রেখে লভ্যাংশ খেতে পারে।
বুঝার জন্য ড. হুমায়ুন আহমদের উদাহরণ টানতে পারি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে নামকরা শিক্ষক হওয়া স্বত্ত্বেও তার মন পড়ে থাকে লিখালিখি ও নাটকের প্রতি। এই জগতে তিনি যেভাবে খ্যাতি অর্জন করেছেন আমেরিকা থেকে ডক্টর ডিগ্রী অর্জন করা হুমায়ুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে অব্যাহতি নিলে, সেটা করতে পারতেন কিনা সন্দেহ আছে। একই ভাবে বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবুল হায়াত, তৌকির আহমেদ, ড. এনামুল হক সহ বহু ব্যক্তি আছেন যারা প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতাকে কাজে না লাগিয়ে নাট্য জগতকে পছন্দ করে তাদের স্থানে খ্যাতি অর্জন করেছে।খ্যাতি মানুষকে সুখি-আনন্দিত করে, কখনও করে সম্বৃদ্ধশালী।
ঠিক এভাবে, প্রতিটি মানুষের একটি মন আছে, প্রত্যেকটি মানুষের মনে একটি ভিন্ন ইচ্ছা আনাগোনা করে, সে ইচ্ছাকে কেন্দ্র করে তার স্বপ্ন ও সখের সৃষ্টি হয়। এটাই তার ব্যক্তি সত্ত্বা। মানব জীবনের উন্নয়ন উত্তরণ যদি এই ইচ্ছে ও সখের সাথে খাপ-খেয়ে গড়ে উঠে, তাহলে সে ব্যক্তি খ্যাতির শিখরে পৌছবে, জাতি-সমাজ ও দশ জন উপকৃত হয়। সৃষ্টি সুলভ এই জ্ঞানের নামই বুৎপত্তি অর্জন। বুৎপত্তি অর্জন মানে শুধু অর্থশালী হওয়া নয়; চারিদিকে খ্যাতিমান হওয়া বুঝায়। আকর্ষনীয় সেই বুৎপত্তি অর্জন করার জন্য দরকার, জ্ঞান, যোগ্যতা-দক্ষতা, ধৈর্য ও কষ্ট-সহিষ্ণুতা অর্জন। এ সব ঘাট পেরিয়ে দুনিয়ার জীবনে কেউ সম্পদ অর্জন করতে পারলেই তিনি সুখী হয়।
উপরোক্ত আলোচনার মাধ্যমে যে জিনিষটি পরিষ্কার হল, “মানব জীবনে সুখ, শান্তি ও তৃপ্তি লাভ করাই হল শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য”।

Discussion about this post