মুক্তিযোদ্ধা নিরাপদ বৈরাগীর কথা মনে আছে? ১০ বছর আগের কথা। ৯ অক্টোবর ২০০৯ সালে খুলনার ডুমুরিয়া থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পেশায় দর্জি, বদনাম চরমপন্থি হিসেবে। নিরাপদ-বৈরাগী
শেষ রাত্রের কথিত বন্দুক যুদ্ধে নিরাপদ বৈরাগী মাত্র ৫৮ বছর বয়সে নিহত হন। লাশ কাটা, লাশ সেলাই এবং যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করে নিরাপদ বৈরাগীর গরীব স্ত্রী কল্পনা রানী বৈরাগীর সারাদিন গত হয়। ঘন বরষার দিন ছিল ওদিকে লাশে পচন ধরেছিল; তাই রাত্রেই সৎকারের ব্যবস্থা হয়।
সন্ধ্যার একটু পরেই প্রশাসনের কাছে খবর আসে যে, নিহত বৈরাগী ছিলেন একজন দেশপ্রেমিক মুক্তিযোদ্ধা! সুতরাং গার্ড অব অনার ব্যতীত লাশ দাহ করা হলে তো মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করা হয়। তাছাড়া আইনেরও ব্যত্যয় ঘটে। প্রশাসনের হাতে সময় কম। একটি মিনিট দেরী করা মানেই কাজ লম্বা হওয়া। তারা ছুটছেন নিহত বৈরাগীর গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে।
ওদিক শ্মশানে লাশ, আগুন লাগানোর আগের মুহূর্ত। হয়ত আরো আগেই মৃতের মুখে আগুন দেওয়া যেত। কিন্তু বৃষ্টি বার বার বাধা হয়ে উঠেছিল। লাশ চিতায় রাখাও হয়েছে তখন লাশ সৎকার কারীরা চিৎকার হৈ হুল্লোড় শুনতে পায়। চিৎকার করে লাশে আগুন না দিতে বলা হচ্ছে। তারাও ভয়ে বিহ্বল।
অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে পুলিশ ধেয়ে আসছে শ্মশানের দিকে। এটা দেখে চিতার কাজে ব্যস্ত মানুষদের আতঙ্ক বেড়ে যায়। কেউ পালায়, কেউ বা লুকায়। অবশেষে প্রশাসনের কর্তা ব্যক্তিদের মাধ্যমে জানা যায়, তাকে রাষ্ট্রীয় সম্মানে দাহ করা হবে। সে জন্য গার্ড অব অনার দেওয়া হবে।
যে লাশ গত রাতে রাইফেলের গুলিতে নিহত হয়েছে, সে লাশ এই রাত্রিতে আবার সেই রাইফেলের মাধ্যমে সম্মানিত হবে! রাত তখন এগার টা ছুঁই ছুঁই করছে। গ্রামীণ জীবনে এটাকেই নিশি রাত বলে। গভীর রাত্রে রাইফেলের বিকট শব্দে বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের ঘুম কেড়ে নেয়।
তারা ভয়ার্ত হয়; পরদিন জানতে পারে, গভীর রাত্রে নিরাপদ বৈরাগীকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান জানিয়ে দুনিয়া থেকে বিদায় জানানো হয়েছে! অতঃপর নিকটাত্মীয়রা বৃষ্টি ভেজা পঁচা লাশে আগুন দিয়ে সারারাত তাড়া করেছে। দেশের সকল পত্রিকায় এই ঘটনা তোলপাড় হয়েছিল।
আইনের মানুষের হাতে বৈরাগী মরেছে, প্রশাসনের কাজ প্রশাসন করেছে। তাদের দায় বদ্ধতা থেকে তারা কাজটি করেছে। হয়ত নতুন কিছু করারও ছিলনা কিন্তু একজন মুক্তিযোদ্ধাকে সম্মান জানানোর এই যদি হয় দশা! পরবর্তী প্রজন্মের কাছে ভুল সংবাদ যাবে।
আমাদের প্রিয় কবি, বাংলাদেশের সেরা কবি, মুক্তিযুদ্ধকে হৃদয়ে ধারণ করা কবি, আল মাহমুদ আজ আমাদের মাঝে নেই। তিনি আজীবন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিয়ে কথা বলেছেন কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের পক্ষ হতে ন্যুনতম শোধবোধও পায়নি! নিরাপদ-বৈরাগী
তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা! সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা নন। গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করা ব্যক্তিত্ব। এ ধরনের মহান মানুষদের প্রতি যদি হয় তাচ্ছিল্য, তা হলে এমন দিন আসবে যখন মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে তামাশা করবে।
আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যত বাগাড়ম্বর হয় কিন্তু ততবেশী সম্মান-মর্যাদা তাদের জুটে না! ঘটনাক্রমে আল মাহমুদের মৃত্যুদিনে মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জেনারেল আতাউল গনি ওসমানীর ও মৃত্যুদিন। এ ব্যাপারে কোন সংবাদ চোখে পড়েনি। এটাই কি মুক্তিযোদ্ধাদের স্বীকৃতি দেবার নমুনা!
একজনের লাশ সৎকারের কাজ আটকে রেখে রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান, আবার আরেকজনকে একেবারে উপেক্ষা করার এই নজীর জাতীর জন্য খুবই ক্ষতিকর। একজন প্রকৃত মুসলিম, জীবন-মৃত্যুর কোন স্থানেই তোপধ্বনি আশা করেনা।
মুমিন ব্যক্তি নীরবে, নির্বিঘ্নে জগত সংসারকে বিদায় জানাতে চায়। এই সম্মান না তাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাবে না ফেরেশতাদের প্রশ্নের উত্তর পেতে উপকারী হবে। কিন্তু রাষ্ট্র প্রকৃত মানুষকে তার যথাযথ স্বার্থ না দেওয়া মানেই তো তার প্রতি অবজ্ঞা, হিংসা কিংবা গোস্বা প্রদর্শনের নামান্তর। কবিকে গার্ড অব অনার না দিয়ে রাষ্ট্রের কয়েকটি গুলি বাঁচানো ছাড়া জাতির আর কি আর বড় কোন উপকারে হয়েছে।

Discussion about this post