সুন্দরী প্রতিযোগিতা হতে আমরা বার বার দেখি। স্বভাবত প্রশ্ন জাগে তাহলে সুন্দর প্রতিযোগিতা হয় না কেন? তাদের প্রতি কি কারো আগ্রহ নাই? আসল কথা হল, সকল সুন্দর ছেলেগুলো তো প্রতিরক্ষাবাহিনী নিজেদের জন্য নিয়ে নেয়! বাজারে প্রতিযোগিতা করবে কে? সুন্দরী প্রতিযোগিতায় হাতে গোনা মাত্র তিনজনে একবছর মেয়াদী মুকুট পায়। আর বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী অগণিত সুন্দর মানুষের ভিড় থেকে সেরা সুন্দর ও চৌকশ মানুষটিকে বাছাই করে সারা জীবনের জন্য মুকুট পরিয়ে রাখে!
পাঠকেরা হয়ত দেখে থাকবেন, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনীতে সামরিক অফিসার হিসেবে নিয়োগ দিতে বছরে কয়েকবার বিজ্ঞাপন দিয়ে থাকে! হাজার হাজার প্রখর মেধাবী, সেরা ফলাফলের অধিকারী, বিজ্ঞান বিভাগে চৌকশ, হ্যাণ্ডস্যাম, স্মার্ট, সুদর্শন, আভিজাত্য ও ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন যুবকেরা লাইনে দাঁড়ায়। প্রতিবছর কতজন পরীক্ষার্থী যোগ দিয়েছে, কতজন প্রতিটি ধাপে উত্তীর্ণ হয়েছে এবং কতজন শেষ ধাপ অতিক্রম করেছে। এই খবর আমরা সাধারণ মানুষেরা জানিনা। কেননা সেখানে মিডিয়ার কোন ভূমিকা থাকেনা। শুনে তাজ্জব হবেন, সেখানে লাখ পরীক্ষার্থী মোকাবেলা করে যদি একশত জন সফল হয়, তাহলে সেটাকে সফল পরীক্ষা বলেই ধরে নেয়া যাবে!
কি সেই পরীক্ষা? কিই বা তাদের যাচাই-বাছাইয়ের ধরন! অনেকের হয়ত এসব জানতে উৎসাহ থাকেনা। কিংবা অনুধাবন করতে চায়না, কেনই বা এত ছাত্র সেখানে উত্তীর্ণ হতে পারে না। কেন ছাত্ররা সেখানে ব্যর্থ হয়! আবার এই ব্যর্থতার মূল কারণ যদি অভিভাবকেরা জানেন, তাহলে ভাববেন; পরীক্ষায় ফেলের জন্য এটা কি একটা কারণ হতে পারে? সাধারণের দৃষ্টিতে হয়ত এটা কোন কারণ নয় কিন্তু একটি পেশাদারী বাহিনীর জন্য এটা একটা বিরাট কারণ! তুচ্ছ বিষয়ের সেই কথাটি বুঝানোর জন্যই আজকের এই লিখা। আমরা যারা সন্তানকে মেধাবী বানাবার জন্য প্রতি নিঃশ্বাসে খেটে মরছি। তাদেরও বুঝতে সহজ হবে, এই খাটুনির লাভের খাতায় কি যোগ হবে।
সুন্দরী প্রতিযোগিতায় চামড়ার রং একটি বড় একটি বড় অধ্যায়! ম্যাগনিফাইং গ্লাসের মত কসরত করে খুঁটিয়ে-খুঁচিয়ে দাগ বিহীন নিখুঁত চামড়ার অধিকারিণীকে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া হয়। বয়স, শরীরের আকৃতি ও গঠন কাঠামো তাকে দ্বিতীয় ধাপে পৌছিয়ে দেয়। যেহেতু কিছু মানুষের সামনে হাজির হয়ে দু‘একটি প্রশ্ন শুনতে হবে, সেহেতু কথা-বার্তায় আচরণে বেকুব কিনা; সেটা পরিমাপের জন্য দুএকটি কথা বলার দরকার পড়ে। এখানে পার হতে পারলে তাকে মূল পরীক্ষায় জন্য বিবেচিত করা হয়। এ টেবিলে পরীক্ষক এবং পরীক্ষার্থীর মেধা-মনন প্রায় একই ধরনের। এখানে কাউকে প্রখর মেধাবী হবার দরকার পড়েনা আবার মেধার কোন গুরুত্বও এখানে নাই।
বিপরীতে সামরিক বাহিনীর পরীক্ষার্থী একজন ছাত্রকে দরখাস্ত করার আগেই মেধাবী ও সু-নির্দিষ্ট বিষয় গুলোতে বেশী নম্বরের অধিকারী হতে হয়। অতঃপর শরীরের ওজন, উচ্চতা, আকৃতি ও বয়স পরিসীমার মধ্যে যথাযথ হওয়া লাগে। এটা মেধা ও শারীরিক প্রাথমিক যোগ্যতা।
এখানে প্রাথমিক পরীক্ষাটিও অনেক কড়া। চামড়ার রং, গায়ের বর্ণ, চর্মরোগের উপস্থিতি নিরূপণ, চোখের জ্যোতি, দাঁতের মূল্যায়ন, টনসিল, কানের দশা, আঙ্গুলের নখ, চুলের ধরণ, গলার দৃশ্য, পায়ু পথের সমস্যা, শরীরের বিন্যাস, শরীরের লুকায়িত অঙ্গ পর্যবেক্ষণ, পোশাকি চরিত্র, ব্যক্তিত্ব ও ধৈর্য পরীক্ষার পরে মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে একজন ছাত্রকে বলা হয়, বাবা প্রাথমিক পরীক্ষায় তুমি পাশ করলে এবার লিখিত পরীক্ষাটা দাও!
সেনাবাহিনীতে যারা নেতৃত্ব দিবে উপরের বিষয়টি তাদের জন্য প্রাথমিক যোগ্যতার মাপকাঠি! সন্তানকে মেধাবী বানানোর প্রচেষ্টার সময় অভিভাবকেরা কি উপরের বিষয়গুলো কখনও মাথায় রাখে! পাঠকের পড়ার ধৈর্যচ্যুতি ঘটার ভয়ে উপরে আরো অনেক আইটেম লিখলাম না! এরপরেই থাকে, লিখিত পরীক্ষা! এটা চূড়ান্ত পরীক্ষা নয়, সবে মাত্র শুরু। এই লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার পরেই বলা হবে, আসল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করো। সে পরীক্ষাটা দিতে চারদিনের জন্য ক্যান্টনম্যান্টে চলে আসতে হয়। চারদিনের এই পরীক্ষায় একজন অফিসার ক্যাডেটকে যত ভিন্ন ধরনের পরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণের মুখোমুখি হতে হয়, একজন বিসিএস ক্যাডারকে তার কানাকড়িও করা লাগেনা।
চার দিনের এই পরীক্ষার নাম ISSB (Inter Service Selection Board). সামরিক বাহিনীর মেধাবী অফিসারেরা চুল-ছেরা পরীক্ষার মূল কারিগর। ম্যাট্রিক্স, আইকিউ, উপস্থিত মেধা, সাইকোলজি, চালচলন, কথাবার্তা, খাওয়া, শোয়া, উঠা, বসা, হাঁটা-চলা, খেলা, শারীরিক সঙ্গতি, উপস্থিত বক্তৃতা, নেতৃত্বের যোগ্যতা, আদেশ মানা ও পরামর্শ দেবার মাপকাঠি সহ অজানা আরো পঞ্চাশের অধিক পরীক্ষার মোকাবেলা করতে হয়। এত সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার কোন একটিতে যদি ব্যর্থ হয়; তাহলে সে ফেল এবং আউট। ফাইনালি, হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র এই জটিল ও দূরহ সীমানা পাড়ি দিতে পারে। তারা ভাগ্যবান হয়।
সামান্য নামমাত্র পরীক্ষায় যদি বিশ্ব-সুন্দরী হতে পারে, তাহলে এত জটিল ও দূরহ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যারা বিজয় মুকুট ছিনিয়ে নেয়; তাদেরকে সুন্দর বলা যাবে না কেন? অভিভাবকেরা তার সন্তান সেরাদের সেরা বানাবার স্বপ্ন দেখেন কিন্তু দেশের সিংহভাগ অভিভাবকদের এসব বিষয় অজানা। তাদের চিন্তায় থাকে একটি জল্পনা, সেরা স্কুলে সুযোগ না পেলে তো সেরা হওয়া যাবেনা। এই ধরনের সেরাদের সেরা‘রা কেন ISSB থেকে বিফল মনোরথে ফেরত আসে; এ ধারনা আমাদের নাই। আরো আশ্চর্যের বিষয়, নেতিবাচক চিন্তার প্রভাবে, প্রথম দিনেই অতি ঠুনকে বিষয়ে অগণিত ছাত্র ফেল করে! এদের মধ্যে ব্যক্তি জীবনে নেতিবাচক আর ইতিবাচক ব্যাপার গুলোর সাথে সম্যক পরিচিতি না থাকলে; সে যত বড় শিক্ষিত-বিদ্বান ব্যক্তি হউক না কেন, ইহ-জনমে বুঝতে পারবেনা কেন সে ফেল করল।
পাঠক হয়ত ভাববেন, লেখার দিক বদলিয়ে হঠাৎ করে সেনাবাহিনীর বিজ্ঞাপনের কাজে হাত লাগালাম কেন? যেহেতু শিশু-কিশোরদের ইতিবাচক সমৃদ্ধি নিয়ে লিখা চলছিল, এই ব্যাপারটি আমাদের জাতীয় জাতীয় জীবনেও জরুরী এবং তার একটি উত্তম দৃষ্টান্ত সেনাবাহিনীর পরীক্ষা পদ্ধতির মধ্য রয়েছে। তাই বিষয়টাকে সামনে এনেছি। বাংলাদেশের সেনাবাহিনী জাতির গৌরব। তাঁরা নিখুঁত মানদণ্ডে, বিচার ও বিশ্লেষণে যেভাবে একজন ইতিবাচক মানুষের সন্ধান করে, সেই বিরল ও অভিনব কায়দাটি তুলে ধরাই আমার আজকের লেখার মূল ভিত্তি। নেতিবাচক ধারণা মুক্ত একজন ইতিবাচক চেতনার মানুষ সেঁচিয়ে বের করার জন্য যে ঘামঝরা কাজ করে, সেটা জানলে পাঠক নিশ্চয়ই উপকৃত হবেন।
ISSB পরীক্ষার প্রথম দিনেই সিংহভাগ ছাত্র ফেল করে তাদের সাইকোলজি টেস্ট তথা নেতিবাচক পরীক্ষায় ধরা খেয়ে। একজন ছাত্র, যত মেধাবী, বিচক্ষণ, সতর্ক ও সচেতন থাকুক না কেন, ব্যক্তি জীবনে তিনি যদি নেতিবাচক হন; এই পরীক্ষায় নির্ঘাত ধরা খাবেই। মাত্র তিন সেকেন্ডের পরীক্ষায় মনের ভিতরের লুকায়িত মানুষটিকে বের করে আনা হয়! ঘটনাটা কিভাবে ঘটে, বলছি। তিন সেকেন্ডের জন্য একটি সাদামাটা ছবি দেখানো হয়। দেখা মাত্রই সাত সেকেন্ডের মধ্যে এই ছবির ব্যাখ্যা দিতে হয়। দীর্ঘ সময় নিয়ে এভাবে প্রচুর ছবি প্রদর্শন করে, উত্তর আদায় করা হয়। এই উত্তরের মধ্যেই শিক্ষার্থী কেমন মানুষ হবে, কেমন পরিবেশে তার চলাচল, কেমন তার সামাজিক গণ্ডি সবই বের হয়ে যায়। সর্বোপরি তিনি নেতিবাচক নাকি ইতিবাচক সেটা সহজে বের হয়ে আসে। এই পরীক্ষার মূল লক্ষ্যই হল, নেতিবাচক শিক্ষার্থীদের বাছাই করে শুরুতেই বাদ দেওয়া। কেননা শিক্ষার্থী পরবর্তী সকল ইভেন্ট মেধা, দক্ষতা, চৌকশতা ও পারদর্শিতায় সর্বোচ্চ পজিশন পেলেও একটি মাত্র নেতিবাচক বদ গুনের কারণে সবই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। তাই নেতিবাচক চিন্তার মানুষকে বিদায় একদম শুরুতেই।
ধরুন, তিন সেকেন্ডের জন্য একটি ‘ছুরি‘ দেখানো হল। কেউ লিখল এটা দিয়ে মুরগী জবাই করে, কেউ লিখল রান্নাঘরে তরকারী কাটে। আবার দেখানো হল, যেতে অনিচ্ছুক এমন একটি গরুকে এক ব্যক্তি টেনে নিয়ে যাচ্ছে; উত্তরে কেউ লিখল জবাই করতে নিচ্ছে, কেউ লিখল গরুটা চুরি হচ্ছে, কেউ লিখল গোসল করাতে নিচ্ছে! একটা মাস্তুল দেখানো হল, কেউ লিখল এটা দিয়ে ইট ভাঙ্গে, কেউ লিখল কাঠমিস্ত্রির অস্ত্র যা দিয়ে পেরেক-বাটালে আঘাত করে!
সুপ্রিয় পাঠক, তিন সেকেন্ডে কেউ রচনা লিখতে পারেনা, ভাবার সময়ও সীমিত। উপস্থিত যা মাথায় আসে, তাই লিখতে হয়; না লিখলে ফেল! উপরে সবার উত্তর গুলো সঠিক হতে পারে কিন্তু এখানে সে কথা বের করতেই যাচাই-বাছাই করা হয় যে, কোন শিক্ষার্থী উত্তর দেবার ক্ষেত্রে কিসের দ্বারা বেশী প্রভাবিত হল! ইতিবাচক সৃষ্টিশীল ব্যক্তি হলে সে দেখতে পেত, মাস্তুল কামারের শিল্পকার্যে এবং স্বর্ণকার আকর্ষণীয় অলঙ্কার তৈরি করে। ছুরি দিয়ে জবাই হয়, গরু টানার অর্থ গরু চুরি, মাস্তুল ভাঙ্গার কাজেই লাগে; এ সবই নেতিবাচক চিন্তার ইঙ্গিত। এই ব্যক্তি যদি কোন একদিন জেনারেল হয় এবং তড়িৎ সিদ্ধান্ত নেবার মত ঘটনা ঘটে, তাহলে তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষেত্রে নেতিবাচক চিন্তার প্রভাবে ভুল ও হঠকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন। এতে তার হাতে দেশ ও জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ছাত্রের পরীক্ষায় ফেল করার এই কারণটি অভিভাবকদের কাছে তুচ্ছ ও গুরুত্বহীন মনে হতে পারে কিন্তু সামরিক বাহিনীর কাছে এটার মূল্য ব্যাপক! সেজন্য তারা একজন ইতিবাচক মানুষকে অফিসার বানানোর জন্য সারা দেশ তন্ন তন্ন করে খুঁজে বেড়ায়। আর অভিভাবকেরা যদি দিনে দিনে নিজের নাদুস নুদুস সন্তানকে আদর, সোহাগ, উৎসাহ দিয়ে নেতিবাচক শিক্ষা দেয়। তাহলে সেই সন্তান থেকে পিতা-মাতা কি আশা করতে পারে। নেতিবাচক শিক্ষা যেভাবে একটি শৃঙ্খলিত বাহিনীকে সমস্যায় ফেলে, একটি জাতিকেও পর্যদূস্ত করে, সমাজকে করে গন-বিচ্ছিন্ন। ইতিবাচক মানুষ ধার্মিক হয়, নেতিবাচক হয় নাস্তিক। ইতিবাচক ধারণা, দেশ যে অবস্থায় আছে সেখান থেকেই আগাতে স্বপ্ন দেখায়, নেতিবাচক ধারণা আগে ভাঙ্গ তারপর নতুন করে গড়ার স্বপ্ন দেখায়। আজকের দিনে আমাদের জাতীয় জীবনে যে মরণ দশা চলছে সেটাও নেতা-নেত্রীদের নেতিবাচক কুফলতার কারণে। তাই আসুন আমরা ইতিবাচক হই, অধস্তন মানুষদের ইতিবাচক ভাবে বড় করি। তাহলে আমরা ব্যক্তি জীবনে যেভাবে উপকৃত হব সেভাবে জাতীকে সমৃদ্ধির শিখরে পৌছাতে পারব।

Discussion about this post