এই উপদেশ সন্তানের জীবনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অভিভাবকের সাথে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব সৃষ্টি করবে। শিশুরা কামনা করে, তার পিতা-মাতা সর্বদা তাকে নিয়েই ভাববে। সে ভাবনায় অন্য কেউ ঢুকে পড়ুক, এটা তারা বরদাশত করেনা। এই অধিকার তারা আপন ভাই-বোনের জন্যও দিতে চায়না। এমতাবস্থায় অভিভাবক যদি অন্যের সন্তানের উপমা দেয়, তখন সন্তান ক্ষুব্ধ হয়ে উঠবেই!
সে ভাবতে শুরু করে, আমার পিতা-মাতা আমার প্রতি আগ্রহী না হয়ে, আমারাই প্রতিদ্বন্দ্বী চোখের দুষমন কে উত্তম বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে! তলে তলে নিশ্চয়ই আমার বাবা-মা ঐ ছেলেকেই বেশী ভালবাসে। ক্ষুব্ধ সন্তান, আহত মনে ভাবতে থাকে, আমি বাবা-মায়ের সাথে থাকি, কত ভাল কাজ করি, একটিও কি তাদের চোখে পড়েনা! সকল ভাল কি আমার ঐ দুষমনেই করে! ঠিক আছে, সংসারে যেহেতু ভাল কাজের দাম নাই, আর কোন কাজ করব না, তাতে কপালে শাস্তি যত আছে, আসুক। কিশোরের জীবনে এ পরিবেশের একদিন আসবেই! আর তখনই তাকে মানসিক অবসাদ গ্রস্ততা আক্রান্ত করে, ঘরের প্রতি আগ্রহ হারাবে, বাহিরের বন্ধু খোজ করতে থাকবে, মনমরা হতে থাকবে, ভুলো মনের কাজ বাড়তে থাকবে। দেখতে বাস্তব সম্মত লাগলেও, এই ধরনের পরামর্শ এক রক্তিও উপকারে আসে না!
এই কাজটি যে একেবারে ভুল সে কথা বলা হচ্ছে না। সমাজ বিজ্ঞানীরা সে জন্য ভিন্ন পথ অনুসরণ করে। নিজের ছেলেকে শিখানোর জন্য এমন একজন ছেলেকে উদাহরণে আনা যাবে, যে তার বন্ধু নয়, স্কুল সহপাঠী, পূর্বের পরিচিত, প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয় নয়। সর্বত্র যার খ্যাতি আছে কিংবা যে বেঁচে নেই তাকেই বাছাই করা হয়। ইতিহাসে, সাহিত্যে, যোগাযোগ মাধ্যমে যার পরিচিতি আছে, নিজেদের অভিরুচি অনুসারে তাকেই আদর্শ হিসেবে মেনে নেবার প্রবণতা দেখা যায়। সন্তানকে প্রাণবন্ত ও উজ্জীবিত করতে কোন সেরা-সফল ব্যক্তির শিশুকালের জীবনীকে সামনে আনা হয়। আমরা দেখতে পাই দুনিয়ার প্রায় প্রতিটি দেশে এই পদ্ধতি সফলভাবে কার্যকর। তবে এজন্য অভিভাবকদের সচেতনতা ও লেখাপড়ার দরকার। ইতিহাসের কোন ব্যক্তিকে দেখিয়ে সন্তানকে জাগিয়ে তুলবে এ কথা যদি তাঁরাই না জানে, সন্তানকে পথ দেখাবে কিভাবে?
সন্তানের এই প্রতিভা অর্জনের জন্য বিদ্যালয়ের সাহিত্য ও সমাজ বিজ্ঞান নামে অবশ্যই পঠনীয় গুরুত্বপূর্ণ দু‘টো আলাদা বিষয় রয়েছে। এ বিষয়গুলো শিক্ষার্থীকে আজীবন পড়তে হয়। আমাদের দেশে এই দুটো বিষয়ের পাঠক্রম নিয়ে অনেক কথা আছে। যদি আমরা অন্যান্য দেশের Social Science, Literature গুলোর পাঠচক্রের মৌলিকত্ব দেখি, তাহলে সেটা সহজে ধরা পড়বে।
আমাদের যাদের স্মৃতি এখনও মলিন হয়নি তাঁরা দেখতে পাবে, কিছুদিন আগের বাংলা সাহিত্যে আমরা এমন সম্মানিত ব্যক্তিদের লিখনি পড়তাম, যাঁরা সে সময় দুনিয়াতে বেঁচে ছিলেন না। সাহিত্যে তাদের গুণগান ও প্রশংসা হত, ফলে তাদের নিয়ে গর্ব করাটা হৃদয়ে স্থায়ী হত। বর্তমান পাঠচক্রে এমন ব্যক্তিদের রচনা পড়া হয় যারা এখনও বেঁচে আছেন। তাদের অনেকেই বহাল তবিয়তে চাকুরী-বাকরী করে চলছেন! এসব সম্মানিত ব্যক্তিরা অযোগ্য নন বরং অতীতের অনেকের চেয়েও উজ্জ্বল-খ্যাতিমান।
যেহেতু তাঁরা দুনিয়াতে বেঁচে আছেন সেহেতু শিক্ষার্থীরা তাদের জীবনাচরণ স্বচক্ষে দেখতে পায়। যেহেতু শিক্ষার্থীরা অনুসরণ-আনুগত্য করার ক্ষেত্রে প্রখর। সেহেতু শিশু-কিশোর তাদের দোষ-গুনের সবগুলোকেই সামনে রাখবে। ফলে তাদের প্রতি ততটুকু আকর্ষণ সজীব থাকেনা, যতটুক থাকে অতীতের না দেখা খ্যাতিমানদের জন্য। এটা হল জাতীর অন্যতম লোকসান। যারা অতীত হয়েছেন তাদের কোন দোষ ছিলনা ব্যাপারটা এমনও নয়, যেহেতু তারা বেঁচে নেই, তাদের স্বচক্ষে অবলোকন করার সুযোগ কম। ইতিহাসে অনুকরণীয় মানুষের গুনের কথা লিখেই সাহিত্য রচনা করার ঐতিহ্য আছে। পাঠক লক্ষ্য করবেন, ঠিক যে কারণে সমাজ বিজ্ঞানীরা শিশুকে অন্যের উপমা দিতে নিষেধ করে; ঠিক সে মৌলিকত্ব রক্ষা করেই অতীতে আমাদের সাহিত্য রচনা করা হত। আগে কম পড়েও শিশুরা যে প্রেরণা ও প্রাণশক্তি পেত, এখন বেশী পড়েও সেটা অর্জিত হয় না! নিজেদের ভুলের কারণেই আমরা শিশুদেরকে সমালোচক বানিয়ে ছাড়ি।
আমাদের সমাজ বিজ্ঞান নিয়েও কথা আছে। আজকাল এটি কদাচিৎ শিশুতোষ রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভূমিকা পালন করে! সমাজ বিজ্ঞানের মূল কাজ হল, আমাদের পরিচয়, জাতিসত্তা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি, শিক্ষা-সংস্কৃতি সহ যাবতীয় সামাজিক কর্মকাণ্ডকে তুলে ধরা; যাতে করে আমাদের সন্তানেরা নিজ জাতি নিয়ে গৌরব করতে শিখে। জাতিগত গৌরব শিশু-তরুণদের উৎসাহ-উদ্দীপনা যোগায় এবং আদর্শ নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠার জন্য এটা বেশী প্রেরণা যোগায়। ইরানী, তুর্কি, জার্মান সহ বহু জাতি এমন আছে যারা সর্বদা তাদের ঐতিহ্য নিয়ে গৌরব করতে কাউকে সমীহ করেনা। ফলে এত অবরোধ, এত আক্রমণ তাদেরকে হীনবল করতে পারে নি! এই প্রেরণা সৃষ্টি ও হৃদয়ে ধারণ করতে শিখানোটাই সমাজ বিজ্ঞানের মূল কাজ। এ বিষয়ে আমরা কতটা অগ্রসর সে বিশ্লেষনে এখন নাই বা গেলাম। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্কুলগুলোতে সকল ছাত্রদের জন্য প্রতিটি ক্লাসে UAE Social Science পড়াটা বাধ্যতামূলক। এই বইগুলোর সাথে পরিচিত হয়ে সমাজ বিজ্ঞান বিষয়টিকে আমি ভিন্নভাবে দেখতে পেয়েছি। লেখক নিজেও তুলনামূলক যাচাইয়ের জন্য বেশ কয়েক দেশের সমাজ বিজ্ঞান বিষয়টি দেখেছেন কিন্তু আরব আমিরাতের সমাজ বিজ্ঞানের তুলনা কোনটার সাথে হয়না।
এই বইটিতে একজন শিশু-ছাত্রের করনীয় কি, তার কোন বয়সে কোন কাজটি করা লাগবে, কিভাবে করতে হবে অনুশীলনের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠার জন্য এই পদ্ধতিটি খুবই দারুণ, চিত্তাকর্ষক এবং যথেষ্ট কার্যকর। সচেতন অভিভাবক এই শিক্ষাকে যে কোন সমাজে সহজে প্রয়োগ করতে পারবে।
চলবে……..
Discussion about this post