শিশু-কিশোর জীবনে ইতিবাচক ধারণা প্রয়োগের অনেক পদ্ধতি আছে। এসব পরিবেশ পরিস্থিতি ও শিশুর বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে। তারপরও কিছু দিক তুলে আনা যায়,
শিশুর হাত দিয়ে, কাউকে কিছু দেবার অভ্যাস করানো। নিজে গ্রহণ করার সময় শোকরান, ধন্যবাদ, থ্যাংকস বলা। একাজটি করার কারণে বুকে জড়িয়ে চুমো দিন। ভিক্ষুকদের দেবার সময় নিজের দাঁড়িয়ে থাকা এবং ভিক্ষুককে বলা আমার সন্তান আপনাকে কিছু দিলে তার জন্য তাকে ধন্যবাদ দিন। আমাদের দেশের ভিক্ষুকেরা অনেক শিষ্টাচারী, তারা এটা এমনিতেই করে। এই উৎসাহ বোধ দিনে দিনে সন্তানের উত্তম খাসিয়তে পরিণত হবে। শিশু হয়ত পাঁচ টাকা হরে বিশ জন ভিক্ষুককে একশত টাকা দিবে কিন্তু শিশুর এই চরিত্র পিতা মাতার জন্য একশত মিলিয়ন টাকার কাজ দেবে।
বাড়ীতে মেহমান আসা-যাবার কালে সন্তানকে দিয়ে তাদের মালামাল আনা নেয়ার কাজে লাগান। শিশুকে একপাটি স্যান্ডেল টানার জন্য হলেও দায়িত্ব দিন এবং অবশ্যই মেহমানদের নিকট থেকে ধন্যবাদ আদায় করার কথা ভুলা যাবে না। শিশু স্যান্ডেলের অসম্মানের কথা বুঝে না কিন্তু সে দেখতে পাবে তাকেও বড়দের মত গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফলে সে বড়দের সব আচরণ শুধু নজরেই রাখবে না, সুযোগ পেলে এই কাজে সে প্রথম ভূমিকা পালন কারী হবে। শিশুর এই অভ্যাসও পিতা-মাতার কাজেই আসে।
গরীব আত্মীয়ের বাড়ীতে বেড়াতে গেলে তাদের ঘরে যে আসবাব পত্র আছে সেগুলো ব্যবহার করেই প্রীত হয়েছেন; এমন উৎফুল্লতা দেখান। শীতল পাটিতে বসে আরাম পেয়েছেন বলে বারে বারে ঘোষণা দিন। তাদের আপ্যায়নের জন্য ঘন ঘন ধন্যবাদ দিন। সন্তান বুঝতে শিখবে এ ধরনের পরিধিস্থিতেও পিতা-মাতা উৎফুল্ল হয়। তারা বিনয়ী হতে শিখবে, গরীব হলেও মানুষকে মর্যাদা দিতে শিখবে। আনন্দ শপিং মলে বেশী না পার্কে? এই প্রশ্ন শিশুর কাছে গুরুত্বহীন। সে তার পিতা-মাতার চোখে-মুখে আনন্দ খুঁজে বেড়ায়। যেখানে মা খুশী সেটার প্রতিই তার আগ্রহ কেন্দ্রীভূত থাকে। সকল আনন্দ শহরেই, এই চিন্তা মহাভুল! যদি শহরেই হত তাহলে নিভৃত পল্লী কিংবা পাহাড়ি অধিবাসীদের শিশুরা আনন্দহীনতার ব্যর্থতায় পুরো জীবন কান্না করত।
আনন্দ উপকরণ কিংবা খেলনা জিনিষের ব্যবহার শিশু মাতা-পিতা থেকেই শিখে। কম দামী প্লাস্টিকের খেলনা যখন শিশু আছড়ে ভেঙ্গেছিল, তখন মা-বাবা নির্ভীক ছিল। দামী মোবাইলের প্রতি যখন একই আচরণ করা হল, তখন শিশুর পিঠে একমন ওজনের থাপ্পড় পড়ল! সে কি অপরাধ করল! এই প্রশ্নে শিশু ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায়। সুতরাং শিশুকে ভাঙ্গার অভ্যাস না করানো উচিত! ভেঙ্গে ফেলা জিনিষ গুরুত্বহীন নাকি মূল্যবান সেটা বিবেচ্য নয়; বিবেচ্য হল তার অভ্যাস বদলে যাচ্ছে। শিশুকে গড়ে তোলার জন্য এটাই মৌলিক পদ্ধতি। আবার দামী খেলনা দিলেই শিশু বেশী খুশী হবে, এ ধারনাও ভুল। শিশুমনে তার যে চরিত্র তৈরি হয়েছে, সেটা ব্যবহারে তাকে স্বাধীনতা দিলেই সে মহা খুশী হয়। তাই শিশুর মনটাকে নিয়ন্ত্রণে নিতে পারলে সব কিছুই নিজের আয়ত্তে থাকবে।
সন্তানকে আজীবন চেয়ারে বসার অভ্যাস করাতে নেই! দুনিয়ার সর্বত্র চেয়ার নেই, চেয়ারম্যানের জন্য স্থানও সংকুচিত। পরিবেশ-পরিস্থিতি সামনে রেখে মাটিতে বসাবার অভ্যাসও করাতে হবে। যে মাটিতে বসতে শিখেছে, পৃথিবীতে তার বসার যায়গার অভাব নাই। রূপক এই কথাগুলোর অর্থ হল, সন্তানের জীবনে কোন এক ক্রান্তিকালে যদি তাকে অভাব ও সমস্যা ঘিরে ফেলে তাহলে সে পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে পারবে। অন্যথায় সামান্য পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে আত্মহত্যা করবে। সুতরাং শিশুকে সর্বদা উচ্চ জীবনে অভ্যস্ত করালে, পরিণতিতে সে পিতা-মাতার জন্যই কাল হয়ে দাঁড়ায়।
ভাল ও মেধাবী! এই কারণে সন্তানকে লাই দেওয়া যাবেনা। তা দেয়া হয়েছে তো মুসিবতকে আলিঙ্গন করা হল! বরং সৎ ও চরিত্রবান, শিষ্টাচারে নিষ্ঠাবান এই কারণেই তার প্রশংসা করুন। মনে রাখতে হবে, পুরো জীবন বিদ্যা অর্জন করলেও, তা একটি ভাল চরিত্রের সমান হয়না। চরিত্রই মানুষের শ্রেষ্ঠ সম্পদ! তাই সেটার প্রশংসা করুন। খুব মেধাবী, সেরা ছাত্র, ক্লাসের সেরা, স্কুলের সেরা ছাত্র এসব প্রশংসা সর্বদা বর্জনীয়। বিদ্যার প্রশংসায় শিশু একগুঁয়ে, দাম্ভিক, অসামাজিক, একরোখা হতে পারে। চরিত্রের প্রশংসায় শিশু গুণবান ও আলোকিত হতে পারে। অন্যের কাছে নিজের সন্তানের প্রশংসা এভাবে করুন, “আমার সন্তান পিতা-মাতা, ভাই-বোন, দাদা-দাদীর ও চাকর-বাকরের প্রতি দয়াময় ও সহনশীল”। এতে সে ভাবার উপাদান পাবে, অল্প বয়সে দায়িত্ব নিতে শিখবে। শিশু গঠনের এই মৌলিক পদ্ধতি, আণবিক বোমার ক্ষমতার চেয়েও শক্তিশালী।
পরীক্ষায় খারাপ করলে ধমক দিয়ে হতাশ করা যাবে না। আগে নিজেরাই চিন্তা করুন, পরীক্ষার আগে তাকে যথাযথ সহযোগিতা দেওয়া হয়েছিল কিনা। আপনার পরিবেশ পড়ার উপযোগী আছে কি? তার জন্য চেয়ার, টেবিল ও পরিবেশ অধ্যয়নের জন্য যুতসই ছিল কি? তার পরীক্ষার প্রস্তুতি কালে তাকে পড়ার টেবিলে বসিয়ে নিজেরা সিরিয়ালে ব্যস্ত ছিলেন না তো? এসব প্রশ্নের উত্তর পাবার পরেই আসবে সন্তানের শাসনের প্রকৃতি কেমন হবে? নিজেদের কারণেই সন্তানের বিদ্যা-শিক্ষায় বিঘ্ন ঘটে। বেশীর ভাগ শিশু পিতা-মাতার কিছু কাণ্ড মুখ বুঝে সহ্য করে। পরীক্ষা খারাপ কেন হয়েছে, এই প্রশ্নের ব্যাখ্যাটা আগে তার কাছ থেকেই জানুন। বুঝতে চেষ্টা করুন, সে কোন কিছু লুকাচ্ছে কিনা? এবার তাকে বুঝান, ‘বাবা, আমাদের সন্তান হিসেবে আমরা নিশ্চিত জানি, তুমি শিশুকাল থেকেই যথেষ্ট মেধাবী, যেটা দেখতে, যা পড়তে, যত কঠিনই হোক তা তুমি সহজে আয়ত্ত করতে পারতে। এবার তুমি যদি ঠিকমত চেষ্টা করতে তাহলে অবশ্যই ভাল করতে। এটা তোমার ব্যর্থতা। এখনও সময় সুযোগ হারিয়ে যায়নি কাল থেকেই নতুন উদ্যমে শুরু কর‘।
ঘরে বাচ্চাদের হই-চইয়ে, ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে অনেক অভিভাবক কিছুক্ষণ নিরিবিলি কাটাতে কিংবা একটু সুখনিদ্রা দিতে সন্তানদের বাহিরে পাঠিয়ে দেন! যাও যাও বলে বাহিরে যেতে ঠেলে দেন। এই সিদ্ধান্ত মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনে। প্রথম দিকে সন্তানেরা হয়ত ভাবে, বাহিরে কোথায় যাব? কিছু দিনের মধ্যেই তারা অসৎ সঙ্গ জোগাড় কিংবা অসৎ চিন্তা মাথায় ঢুকিয়ে নিজেদের মত পরিকল্পনা বানিয়ে ফেলে। পরবর্তীতে অভিভাবকদের যা, যা বাহিরে যা, কথা শুনার জন্য সন্তানেরা তন্ময় হয়ে অপেক্ষা করে। অতঃপর পিতা-মাতার অর্ডারকে ইনডেমনিটি সুবিধা বিবেচনায় সন্তান নিজের ক্ষমতার বহু বাহিরে চলে যায়। এটা করা মোটেও ঠিক নয়; তাছাড়া যে সন্তানের হই চইয়ের কারণে স্বয়ং পিতা-মাতা ঘরের ভিতরে ত্যক্ত-বিরক্ত, তারা যে পাড়া-মহল্লার অন্য অভিভাবকদের অতিষ্ঠ করে ছাড়বে না! এই কাণ্ডজ্ঞান টুকু অভিভাবকদের মাথায় রাখা উচিত। দেশের বেশীর ভাগ ছেলে-পুলে মাদকাসক্ত, বেয়াড়া, বখাটে হচ্ছে এই সামাজিক উপাদানের কারণেই। যতই কষ্ট হউক, সন্তানদের কল্যাণে কিছুদিনের জন্য এই কষ্ট অভিভাবককে করতেই হবে; নতুবা সেই সন্তানের কারণে এমন আরো বড় অভিযোগ আসবে, সারা জীবন পস্তালেও কোন কাজ দিবেন।
ভাল-মেধাবী শিশু হবার পরও, ঠুনকো উসিলায় তাকে কখনও হালকা বেত্রাঘাত করুন! অপমান করুন! বাজার-সওদা ঠিকমত হয়নি বলে তিরস্কার করুন। এসব করার জন্য পিতা-মাতাকে রীতিমত ওঁৎপেতে থাকতে হবে! এসব হালকা শাস্তি মোকাবেলায় শিশুর ধৈর্য ও সহ্য শক্তি বাড়বে! অভিজ্ঞতা হবে! সামরিক বাহিনীতে একজন চৌকশ কর্মকর্তা বানাতে, সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে অনাবশ্যক, প্রতিনিয়ত এ ধরনের কত কাজ করানো হয় তার ইয়ত্তা নেই। সংসারে এটা পিতা-মাতা, দাদা-দাদীকে দিয়েই করাতে হয়। কেননা একমাত্র তাদের পিটুনিতেই থাকে সোহাগ মেশানো শাসন। আমাদের দেশে অভিভাবকেরা মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের আদর-কদরে ফুলিয়ে রাখে। তাদের অনাহুত আবদার পূরণে আদাজল খেয়ে নামে। তারা কোন একদিন বিরূপ পরিবেশের কবলে পড়লে, শুরুতেই খেই হারায়! অপদস্থ ও হাসির পাত্র হয়, নিজের উপর আস্তা-বিশ্বাস হারিয়ে; অনেক বড় পদ-পদবী পাবার পরও জেদ ও গোঁয়ার্তুমির কারণে তা ছেড়ে চলে আসবে। ফাইনালি দিকভ্রান্ত হয়ে পিতা-মাতার কাঁধেই সিন্ধাবাদের ভুতের মত চড়ে বসবে।
সর্বোপরি শিশুদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন ও তা পালন করার জন্য উপযোগী পরিবেশ দিতে হয়। শিশুকে ধর্মীয় শিক্ষায় চালানোর জন্য অন্যতম শর্ত হল পিতা-মাতাকে তা আগে মেনে চলা। মানুষের মৌলিক চরিত্র বিকাশের জন্য ধর্ম শিক্ষার কোন বিকল্প নাই।
সর্বোপরি শিশুদের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা অর্জন ও তা পালন করার জন্য উপযোগী পরিবেশ দিতে হয়। শিশুকে ধর্মীয় শিক্ষায় চালানোর জন্য অন্যতম শর্ত হল পিতা-মাতাকে তা আগে মেনে চলা। মানুষের মৌলিক চরিত্র বিকাশের জন্য ধর্ম শিক্ষার কোন বিকল্প নাই।

Discussion about this post