কৈশোরে মায়ের হাতে যত মার খেয়েছি সবই ছিল গান গাওয়ার অপরাধে! দ্বিতীয় শ্রেণীর ছাত্রাবস্থায় হাফ প্যান্ট পড়ে ঘরের পাশের পেয়ারা গাছে হেলান দিয়ে, গলা হাঁকিয়ে গেয়ে উঠেছিলাম, ‘যৌবন জোয়ার একবার আসেরে…., ফিরে গেলে আর আসেনা’। কঠিন সুরের এই গানের লোক সংগীতের টান শুনে আমার জেঠাই মাকে বলতে শুনেছিলাম, পিচ্চি ছেলের মুখে এসব কি শুনি, বোধহয় দুনিয়া আর বেশী দিন টিকবে না। আমি গেয়েই চলেছিলাম, কিছুক্ষণ পরে বুঝতে পারলাম আমার পায়ে যেন, অগণিত পিঁপড়া কামড়ে দিয়েছে। বুঝতে দেরী হয়ে গিয়েছিল ততক্ষণে মেহেদী গাছের ছিপার আঘাতে আমার দেহে প্রায় ইন্দোনেশিয়ার মানচিত্র ফুটে উঠেছিল। মা পিছন দিক থেকে লুকিয়ে এসে গান গাওয়ার অপরাধে আমাকে এভাবে তড়িৎ পিটুনি দিবে কল্পনাতেও ভাবিনি।
নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে মায়ের এই জঘন্য কাজের কৈফিয়ত চাইলাম। তাঁর সোজা কথা, ঘরে তাঁর হাতের ভাত খেতে চাইলে এভাবে গান গাওয়া চলবে না!
মা ছাড়া আমার জীবন অচল, ত্যাড়ামি চলবে না। তাই অভিমানের মত সুর করে প্রশ্ন করলাম, তাহলে কি গান গাইব?
মায়ের কঠোর উত্তর, কোন গানই গাওয়া যাবেনা!
চোখ ফেটে জল আসল, আবার জেদও পেয়ে বসল, তাঁকে ধমক দিয়ে বললাম, ‘তুমি গানের কি বুঝ? তুমি তো কোনদিন স্কুলে যাও নি! এই গান তো আমি স্কুলের শিক্ষক থেকেই শুনেছি’।
মায়ের কড়া জবাব, কোন অবস্থাতেই গান গাওয়া চলবে না।
সেটাও আর কতক্ষণ চলে। মনের মাঝে খুশি ও সুখ উতলে উঠলে পায়ের ব্যথার কথা কি মনে থাকে? দক্ষিণা বাতাসের দোলায় পুকুর পাড়ে বসে দিয়েছি সেই ঐতিহাসিক গানের টান, ‘প্রেম জ্বালায় জ্বলি পুড়ি, সোনার অঙ্গ গড়িলাম ছাই…’ চট্টগ্রামের এই গানের সূর ছিল দারুণ, যে কেউ উদাসী হয়ে উঠবে। ইতিমধ্যে কেউ একজন মাকে গিয়ে খবর দিল, তিনি বরাবরের মত বেত নিয়ে হাজির, আমি ভোঁ দৌড়।
আমাদের সময়ে সমাজ ব্যবস্থায় অনেক দৃঢ় বন্ধন ছিল। তাই বখাটেপনা বা খারাপ হবার সুযোগ ছিলনা। প্রতিটি মুরুব্বীই ছিল এক একজন শাসক ও অভিভাবক।
প্রতি মাসে একটি বিয়ের আয়োজন তো হতই, কয়েকদিন ধরে গান-বাজনা চলত। অনেকের বিয়েতে নতুন কবিয়াল আনা হত। সেসব গান শুনলেই সূর সহ মুখস্থ হয়ে যেত। সূর ও কথা যত কঠিন হোক, সহজে আয়ত্ত করে ফেলতাম। বর্তমানের মত তখন গান রেকর্ড করার সুযোগ থাকত না। বড়রা সে গান আমাদের থেকে শুনে চিত্ত ঠাণ্ডা করত। গানের ভিতরে যে একটি মর্মার্থ থাকে, সেটা বুঝার বয়স তখনও হয়নি; যার কারণে মার খেতাম। এখন বুঝি সুন্দর গান গাইলে মা শাসন করতেন না; আবার মায়ের সেই ক্ষমতাও ছিলনা এসব জুটিয়ে দিবেন। মা প্রতিটি রাত্রে বোঝাতেন ওয়াদা নিতেন যাতে করে আর গান না গাই। এসব গাইলে সমাজে খারাপ ছেলে বলে বদনাম রটাবে ইত্যাদি।
শিক্ষক বাবাকে বুদ্ধি দিলেন, গান বন্ধের পিছনে খাটা-খাটুনী বাদ দিয়ে, তাকে কিছু ইসলামী গান শিখান। বাবা ইসলামী গান শিখানোর জন্য এমন ব্যক্তির কাছে সোপর্দ করলেন, যিনি আমাকে ভাণ্ডারী গানে দক্ষ করলেন। গলা ফাটিয়ে গাইতাম, সুন্দর গান, অভদ্রতার কিছু ছিলনা, তাই বাধাবিপত্তি থাকত না। একদা গেয়ে উঠেছিলাম, ‘মাওলানা মাওলানা মাওলানারে, নূরের পুতলা বাবা মাওলানা….’ একজন হুজুর ধমক দিয়ে এসব গান আর না গাইতে বললেন! এবার ভিন্ন ধরনের বাধার সম্মুখীন হলাম, তবে সমাজের বাহিরের কারে নিকট থেকে। হুজুর বাবাকে বোঝালেন এসব গান শুনতে ভদ্র লাগলেও মুসলমানদের ঈমানের জন্য ক্ষতিকর।
অবশেষে আমার জন্য একজন বৃদ্ধ শিক্ষক ঠিক হয়েছিল, যিনি ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন। দেওবন্দ মাদ্রাসা দেশীয় কওমি মাদ্রাসার সূতিকাগার হলেও তিনি ছিলেন সকল জ্ঞানে পণ্ডিত। ছিলেন এক চলমান ইংরেজি অভিধান। পরবর্তীতে তাঁর কাছে আরবি-ইংরেজি পড়ে বহু বিদ্বান ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় উচ্চ পদে পর্যন্ত সমাসীন হয়েছেন। কওমি মাদ্রাসার কোন ছাত্রকে বাকী জীবনে এমনটি আর দেখিনি।
যাই হোক, তিনিও আমাকে অবশেষে আবদুল আলীম ও আব্বাস উদ্দিনের মুখে গাওয়া কিছু ইসলামী গান শিখার ব্যবস্থা করেছিলেন। শেষাবধি আমার আম্মা এটা পছন্দ করতেন না। কেননা আমার শিশুকাল থেকেই গান নিয়ে ওনাকে অনেক কটূক্তি শুনতে হয়েছে। আমি আমার মায়ের স্নেহ বাৎসল্যের কাছে গানের অভ্যাস ত্যাগ করতে পেরেছিলাম। এখন আর গাইতে পারিনা। মুহূর্তে মায়ের ছবি ভেসে উঠে আর হৃদয়ে আমি যেন, প্রবল বাধা অনুভব করি। এমনকি একাকী গান গাইলেও মনে বাধা পাই! বুঝতে পারি এটা আমার মায়ের কবুল হওয়া দোয়ার ফজিলত।
মানব শিশুর এই জন্মগত স্বভাবকে কাজে লাগাতে পারলে সন্তানকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য পিতা-মাতাকে চিন্তিত হতে হয়না। এটাকে আরবিতে বলে ‘ফিতরাত’। এটা কখনও পরিবর্তন হয়না। সুপ্ত অবস্থায় মানব শিশুর চরিত্রে আজীবন বেঁচে থাকে। কোথাও পরিবেশ পেয়ে গেলে সে এটাতে ইর্ষণীয় বুৎপত্তি অর্জন করতে পারে। ইচ্ছা করলে ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক কোন একটা দিকে এই চরিত্রকে মোড় ঘুরিয়ে দেওয়া যায়। মোড় ঘুরানোর এই কারুকাজ টা সম্পূর্ণ পিতা-মাতার চরিত্র, ইচ্ছা, অভিলাষের উপর নির্ভর করে। সমাজের এই চিন্তা থেকেই, সন্তানের বদ খাসিয়তের জন্য মানুষ তার পিতা-মাতাকে গালি দেয়।
মুর্শিদাবাদের শিশু আবদুল আলীম শুনে শুনেই গান গাইতেন। এতটুকু ছিল তাঁর প্রশিক্ষণ; তার মুখের গান তের বছর বয়সে রেকর্ড হয় এবং জীবনের শেষাবধি বনেছিলেন শিক্ষক। কুচবিহারের আব্বাস উদ্দিনও ছিলেন বৈশিষ্ট্য গত গায়ক। শিশু বয়সে গাইতেন, আর এটাই ছিল তাঁর প্রশিক্ষণ। ডিজিটাল জমানায় মাইক লাগিয়ে, টিভি ফাটিয়ে, সারা দেশের মোবাইল ম্যাসেজ ভিক্ষা করে যে খ্যাতি অর্জন করে, দুই বছরের মাথায় সে খ্যাতি পরিত্যক্ত হয়। কেননা এটা তাদের বৈশিষ্ট্য ছিলনা, পিতা-মাতা চেয়েছিলেন এভাবে তারা খ্যাতি যোগাড় করবেন। তাই শুরুতে গতি দেখা গেলেও সহসাই এটার মৃত্যু ঘটে। আবদুল আলীম ও আব্বাস উদ্দিনের ফিতরাত ছিল গান গাওয়ার আর পরিবেশ পেয়েছিল ইসলামী ভাবধারার। ফলে তারা কলিকাতায় গান গাইলে, কোন প্রচারণা ছাড়াই সে গান সারা দেশের গ্রামে, গঞ্জে, নগরে বন্দরে ছড়িয়ে পড়ত আর শিক্ষক, মৌলভী, চাকুরীজীবী, কৃষক, মাঝি, চাষা, গাড়োয়ান, রাখালের মুখে শোভা পেত। কবি নজরুলের উদাহরণ নাই বা তুললাম। এটাই হল বৈশিষ্ট্য গত ভাবে কিছু পাওয়া ও নেতিবাচক ভাবে ঘুরিয়ে দেবার জ্বলন্ত উদাহরণ।
সমাজের এক মাতব্বর পিতা, কন্যাকে গানে পারদর্শী বানানোর জন্য শিক্ষক নিয়োগ করলেন। স্কুলের বাৎসরিক অনুষ্ঠানের স্টেজে তার কন্যা গেয়ে গেয়ে নাচবেন এই প্রত্যাশায় মেয়ের ইচ্ছের বিরুদ্ধে পিতা প্রধান শিক্ষক মহোদয়কে বলে নাম লিখালেন। পিতার মতলব ভিন্ন, তার সুন্দরী কন্যা রূপে, গুনে, গানে, নাচে অতুলনীয় হবে। এসব দেখে তাগড়া যুবকেরা স্বত্বর বিবাহের প্রস্তাব পাঠাবে। মেয়ে গানে কিছুটা চতুরতা অর্জন করলেও নাচে তেমন পারদর্শী নয়, তাছাড়া এটা মেয়ের ইচ্ছেও নয়। নৃত্যের সময় স্টেজে দৌড়ে গিয়ে হঠাৎ ব্রেক করে থামতে হয়। এমাথা-ওমাথা ছয় বার ব্রেক কষার মাধ্যমে তক্তা দিয়ে বানানো স্টেজ টালমাটাল হয়ে পুরোটাই একদিকে কাৎ হয়ে পড়ে যায়। এতে মেয়ের নতুন পরিচিতি জুটে এমন হয়ে, ‘কোন মেয়ের কথা বলছেন? ষ্টেজ ভেঙ্গে ফেলা সেই নর্তকীর?’ উদাহরণ টা একারণেই টানা হল, পিতা-মাতা কি চিন্তা করল তা দিয়ে সন্তানের জীবন গড়ে উঠে না। জোড় করে যদিও একটা মাত্রায় আনা গেল কিন্তু পরিণতি হবে এই স্কুল ছাত্রীর পিতার মত। এটা কখনও সন্তানের দোষ নয় মূলত সন্তানের কি বৈশিষ্ট্য রয়েছে তা পিতা-মাতার উদ্ধার করার ব্যর্থতা।
একটি চিত্তাকর্ষক ব্যতিক্রমী উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। ব্যক্তিটি বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা লাইনের সর্বোচ্চ ডিগ্রী প্রাপ্ত। মেধাবী, সম্মানজনক পদে চাকুরী করে। তার বড় দুর্বলতা ছিল, তিনি ছিলেন তোতলা। প্রতিটি বাক্যই তার আটকে যেত। এক বড় অনুষ্ঠানে অতিথিদের নাম লিখে উপস্থিত বক্তৃতা প্রতিযোগিতার আয়োজন হয়েছিল। ইচ্ছা-অনিচ্ছায় সবাইকে অংশ নিতে হবে। অপ্রত্যাশিত ভাবে তার নাম উঠেছিল একটি গান শুনানোর জন্য। দৃশ্যত তোতলা মানুষ গাই গাইতে অস্বস্তি বোধ করে, কেননা তাদের স্বাভাবিক কথাতেই মানুষ হাসাহাসি করে। তিনি সাবলীল চিন্তায় স্টেজে গান গাইতে উঠলেন। ফেসবুকে হাস্য রসাত্মক সুন্দর একটি পোষ্ট দেবার জন্য, সবার মোবাইল গুলো তাকে কেন্দ্র করে ধরা। তিনি একটি কঠিন দেশাত্মবোধক গান ধরলেন। সুন্দর সুর ও কণ্ঠে আশ্চর্যজনক ভাবে বিনা তোতলামিতে পুরো গানটি শেষ করলেন! সকল উপস্থিতির মুহুর্মুর্হ করতালির শব্দে পুরো হল আন্দোলিত হয়ে উঠল। পরবর্তীতে তাকে প্রশ্ন করে জানতে পারলাম। ছোটকাল থেকেই গান ভাল লাগত, নিজে নিজে গাইত এবং সে গানে তোতলামি হতনা। মাদ্রাসার ছাত্র হেতু, কোথাও গাওয়ার পরিবেশ পায় নাই। জীবনে এই প্রথম গানের অনুরোধ, তাই সাহস করে গেয়ে ফেলে এবং এক গানেই বাজিমাত।
শিশুদের জন্মগত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা অর্জন করা প্রতিটি পিতা-মাতার প্রথম কাজ। কেউ গাইবে, কেউ আঁকবে, কেউ বানাবে, কেউ ভাঙবে, কেউ দুরন্ত, কেউ প্রশান্ত আবার কেউ অশান্ত এসব কিছুই তার বৈশিষ্ট্যের ধারণা দেয়। পাশ্চাত্যে চাকুরীজীবী প্রতিটি মানুষের হবি তথা শখ কি সেটা জানতে চায় এবং ফাইলের উপরে মোটা কলমের কালিতে সেটা উল্লেখ থাকে। কখনও কোম্পানির ব্যতিক্রম ধর্মী কাজে যুতসই মানুষের দরকার হলে, শখ তালিকা খুঁজে মানুষ বের করা হয়। তাকেই যদি সে কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়, সেটা হবে আন্তরিক, সুন্দর, গোছালো, সুবিন্যস্ত, পরিপাটি এবং কার্যকর। তাই সন্তানকে ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার, ব্যরীষ্টার হিসেবে কল্পনা না করে আল্লাহ তাকে যে বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করেছে, সে বৈশিষ্ট্যের উপর গুরুত্ব দিয়ে পথ দেখালে দুনিয়ার প্রতিটি সন্তান খ্যাতিমান হবে। প্রতিটি মা-বাবা হবে সৌভাগ্যবান ও দুঃচিন্তাহীন।

Discussion about this post