যথাসময়ে মুয়াজ্জিন সাহেব জোহরের আজান দিতে পারে নাই। সে কারণে মুয়াজ্জিন কাম ইমাম সাহেবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হয়েছে এলাকার মানুষেরা। শুধু তাই নয়, ঘরের মহিলারাও মসজিদের পাশে ভীর করে, ইমাম সাহেবের এমন গর্হিত কাজের কৈফিয়ত চাচ্ছেন। ইমাম সাহেব যতই বলেন ভুল হয়ে গেছে ভবিষ্যতে আর এমনটি হবেনা! মহিলারা ততই চিল্লায়ে বলেন, গ্রামের মানুষ কি একাজে তাকে কম বেতন দেয় নাকি! যে, তার ভুল হবে। হুজুর যথাসময়ে আজান না দিয়ে কি গর্হিত কাজ করেছেন সেটা কি হুজুর বুঝতে পেরেছে?
হুজুর সবিনয়ে বলছেন, দেখুন আমার গ্রামের বাড়ী দূরে। যথাসময়ে রওয়ানা হয়েছিলাম কিন্তু পৌছতে দেরী হয়ে গেছে। এই দেরী টা আমি ইচ্ছে করে করিনি।
অমনি এলাকার মুরুব্বীরা বলে উঠে, আমরা আপনাকে বেতন দিতে কি দেরী করি? মাস শুরুর এক তারিখে আমরা আপনার বেতন পরিশোধ করিনা?
হুজুর বললেন, হ্যাঁ আপনারা বেতন তো যথাসময়েই দিয়ে দেন।
তাহলে আপনাকে যথাসময়েই আজান দিতে হবে, এই ব্যাপারে যেন কোন হেরফের না হয়। আপনার সমস্যা আপনি কিভাবে ঠিক করবেন সেটা আপনি জানেন। কিন্তু আজানের হেরফের যেন না হয়!
হুজুর পড়েছেন মহা ঝামেলায়। এলাকার মানুষ আজান নিয়ে যেভাবে প্রতিবাদে সোচ্চার কিন্তু নামাজ পড়ার বেলায় তেমন আগ্রহ নাই। শুক্রবারে শিশু কিশোর মিলে জনা পনের মুসল্লি আসে। ওয়াক্তিয়া নামাজে বেশীর ভাগ সময় ইমাম একাকীই নামাজ পড়েন। অধিকন্তু তিনি এই মসজিদে আসার পর, আজ পর্যন্ত জোহরের নামাজে কোন মুসল্লিকে জামায়াতে পান নাই! অথচ সেই জোহরের আজান যথাসময়ে দেওয়া হয় নাই, একথা গ্রামের নারী-পুরুষ, আবাল-বৃদ্ধ সবাই খেয়াল করেছেন এবং প্রতিবাদে ফেটে পড়েছে! এই ঘটনা তাকে বিব্রত করলেও অনেক কৌতূহলও বাড়িয়ে দিয়েছিল।
ঘটনাটি ভিডিওর মাধ্যমে এক হুজুরের মুখ থেকে শুনেছিলাম। তিনিই এই ঘটনার সাক্ষী ও প্রত্যক্ষদর্শী। এক প্রত্যন্ত এলাকার মসজিদের ঈমাম ছিলেন। যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছেনি, বিদ্যালয় নাই, অশিক্ষিত মানুষের আয়ের একমাত্র উৎস হল চাষাবাদ। তার বর্ণিত ঘটনাটি দু’ভাগে বিভক্ত। সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সুযোগ ছিলনা। তবে দু’ভাগের ঘটনাগুলো শুনলে আমাদের কারো না কারো সাথেই মিলে যাবে। অন্তত আমার কাছে এই বিদঘুটে ঘটনা দু’টোর কাছাকাছি ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা ছিল। আজকের ঈমাম সাহেবের ব্যাপারটি একটি একক ঘটনা, তাই এই লেখাটিকে উপস্থাপনের জন্য বাছাই করেছি।
আজান নিয়ে গ্রামের মানুষদের গোলযোগের কারণ জানতে আমার মত নিশ্চয়ই পাঠকদের মনও হিস-পিস করছে। তাই ঘটনাটি হুজুরের মুখ থেকেই শোনা যাক।
“আজানের ঘটনার পর থেকে আমার আগ্রহ বেড়ে যায় তার রহস্য জানতে যে, বেনামাজি মানুষের কাছে আজানের গুরুত্ব কেন বেশী হল! সুবিধাজনক একজনকে প্রশ্ন করায় তিনি কপালে চোখ তুলে উল্টো আমার দিকে এমন ভাবে তাকালেন যেন আমি ভিন গ্রহের কোন জীব! তিনি জানালেন, মসজিদের আজানের সুর ধরেই এখানকার মানুষের জীবন যাত্রা পরিচালিত হয়। ক্ষেতে-খামারে, সংসারে-গৃহস্থালিতে আজানের প্রভাব ব্যাপক! একেবারে আজান না দেওয়া কিংবা ভুল সময়ে আজান দিলে এখানে তার বিরাট খারাপ প্রভাব পড়তে বাধ্য। এই ধরুন, ফজরের আজানের পর চাষা-ভুষা মানুষ গরুর হাল নিয়ে মাঠে-বিলে চলে যায়। তাদের হাতে তো ঘড়ি নাই, থাকলেও সময় বুঝবে না। জোহরের আজান শুনলেই তারা হাল ছেড়ে দিয়ে বাড়িতে চলে আসবে। ঘরের বৌ-ঝিরা জানতে পারে এখন হালের মানুষ ঘরে ফিরবে এবং তাদের খানা দিতে হবে। সবাই খানা খেয়ে একটু বিশ্রাম নেবে। গরু-ছাগলকে খানা খাওয়াবে। আছরের আজান শুনলে হালকা কাজগুলো সেরে আসার জন্য কেউ মাঠে যাবে, কেউ যাবে বাজারে। মহিলারা যাবে রান্নাঘরে। মাগরিবের আজানের সাথে সাথেই সবাই ঘরমুখো হবে এবং মহিলারা রাতের খাবার পরিবেশন করবে। এশার নামাজের পরই সবাই ক্লান্তি দূর করতে গভীর নিদ্রায় ঢলে পড়বে”।
ভদ্রলোক বলেই যাচ্ছেন।
“সেদিন আপনি জোহরের আজান দিতে দেরী করেছেন। দিনটা ছিল মেঘলা, সূর্য দেখা যায় নি। ফলে মানুষজন পেটে খিদে নিয়ে মাঠে অতিরিক্ত কাজ করেছে। এই নিয়ম কামলারা মেনে চলে, তাদেরকে দুর্বলতা কাহিল করেছে। মহিলাদের রান্না করা খাদ্য ঠাণ্ডা হয়েছে। ফলে সবার গোস্বা গিয়ে আপনার উপর পড়েছে। আপনি যদি যথাসময়ে আজান দিতেন তাহলে এই সামাজিক গণ্ডগোলটা এড়ানো যেত। সুতরাং যদি আরেকবার এই ভুল করেন তাহলে কিন্তু কপালে খারাপি জুটবে আপনার চাকুরী ফিনিশ হয়ে যাবে”।
ঈমাম সাহেব এইবার আজানের মহাত্ম বুঝলেন। আজানের উদ্দেশ্য যদিও মানুষকে নামাজের কথা মনে করিয়ে দেওয়া কিন্তু এলাকার মানুষ আজানকে কাজে যোগদানের উপলক্ষ হিসেবে বাছাই করেছে। এতে করে তাদের জীবনে এক ধরনের শৃঙ্খলা কাজ করে। চাষাদের জীবনে ছন্দপতন না হবার জন্যই তারা আজানকে উপলক্ষ বানিয়েছে। রমজানে, ঈদে, জানাজার জন্য মসজিদ দরকার তাই একটি মসজিদ বানিয়ে একজন ইমামকে চাকুরীতে নিয়োগ দেযা হয়েছে।
ইমাম সাহেব প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা আপনারা তো মসজিদের ঈমামকে যথা সময়ে বেতন পরিশোধ করেন। এই টাকাটা আসে কোত্থেকে? কে ইমাদের বেতন জোগান দেয়’?
সহাস্যে ভদ্রলোক বললেন,
‘এইটা একটা কথা হইল। এই মসজিদের নামে অনেক জায়গা সম্পত্তি আছে। বাজারে দোকান আছে। নগদ টাকাও আছে। ফসলী জমি থেকে ফসল আসে, এভাবে প্রতিবছর মসজিদের টাকা বাড়তে আছে। মসজিদের সম্পদ, ব্যবসায়ের আয়-ব্যয় দেখা-শোনার জন্য একটি কমিটি আছে। তারা মসজিদের নগদ টাকা মাসিক-সাপ্তাহিক হারে মানুষদের ঋণ দেয়। সেই ঋণের লাভের টাকা দিনে দিনে বাড়ছে। বর্তমানে মসজিদের অনেক সম্পদ! আপনার মত ছয়জন ইমাম রাখলেও মসজিদের টাকা শেষ হবেনা’!
ঈমাম সাহেব আতঙ্কে চোখ বড় বড় করে প্রশ্ন করলেন, আপনি এটা কি শোনালেন! ঋণের টাকার সাপ্তাহিক-মাসিক সুদকে বানিয়ে নিলেন লাভ হিসেবে! এটাতো পরিষ্কার হারাম! হারামের টাকা খেয়ে নামাজ পড়লে, হারাম আয় দিয়ে মসজিদ বানালে কোনদিনই সওয়াব হবেনা, আল্লাহ দোয়া কবুল করবেন না; নামাজ, রোজা সহ সকল এবাদতই বরবাদ হয়ে যাবে।
ইমাম সাহেবকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘আরে রাখেন আপনার হারামের কাহিনী, এই টাকা দিয়াই তো আপনেরে বেতন দেয়া হয়। বেতন খাওনের সময় মনে আছিল না, এটা হারাম…’।
ঈমাম সাহেবের মাথা চরকার মতো ঘুরছিল। এসব মূর্খ মানুষকে কি বলে বুঝাবে আর কি বলে শাসন করবে বুঝতে পারছিল না। অগত্যা গরীব ঈমাম সাহেব সেই দিন সন্ধ্যার আগেই মসজিদের চাকুরী ছেড়ে দিয়ে বের হয়ে গেলেন। আর ভাবতে রইলেন, এখন থেকে মসজিদের ঈমাম হিসাবে যোগ দেবার আগে জিজ্ঞাসা করা লাগবে বেতনের টাকাটা হারাম থেকে না হালাল থেকে উৎসরিত। আর এতসব প্রশ্ন করতে গেলে কেউ কি এমন ব্যক্তিকে ঈমাম হিসেবে নিজেদের মসজিদে নিয়োগ দিবে?
মসজিদের মতোয়াল্লীর যত যোগ্যতাই থাকুক না কেন, তার অন্যতম যোগ্যতা হল খোদা-ভীরু নামাজী হওয়া এবং দ্বীন সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা। তিনি যে মসজিদের মতোয়াল্লী সে মসজিদে বেশী ওয়াক্ত নামাজ আদায়কারী এবং ঈমাম সাহেবের অনুপস্থিতে অন্তত দু’এক ওয়াক্ত নামাজে ঈমামতি করার যোগ্যতা সম্পন্ন। এখন মতোয়াল্লী হবার জন্য পোষ্টার ছাপিয়ে ভোট প্রার্থনা করা হয়। আবার ভোট দিতে আসার সময় যাতে করে ভোটার আইডি কার্ড সাথে রাখা হয় এই শর্ত জুড়ে দেওয়া হচ্ছে! মুসল্লি হবার কোন বাধ্যবাধকতা আর নাই! তাছাড়া প্রকৃত মুসল্লিদের পক্ষে কি জানা সম্ভব মসজিদের জন্য অর্জন করা আয়-ব্যয়ে কতটুকু পরিছন্নতা আছে।
মসজিদ আল্লাহর ঘর। এখানে মানুষ শান্তি পায়, আল্লাহর সান্নিধ্য পায়। নিজের স্বপ্নের ঘর বানাতে যে ধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে আগাতে হয়; মসজিদ বানাতেও সে ধরনের উদ্দীপনা রাখতে হয়। সে জন্য মসজিদ বানাতে ফিতরা-যাকাতের অনুদান নেওয়া নিষেধ। ভিক্ষা করে দান তোলাও কদাচিৎ আল্লাহকে হেয় করার নামান্তর। আল্লাহ তো পুরো দুনিয়াকে নামাজ পড়ার উপযোগী করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) জায়গা কিনেই মসজিদের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেছেন। ওমর (রা) কাবার হারামের সম্প্রসারণ করতে গিয়ে কিছু জায়গা যোগ করেন। যারা জায়গা দিয়েছেন তারা সেটার মূল্য নিতে অপারগতা দেখান। তিনি জোড় করেই তাদের হাতে টাকা গছিয়েছেন, যাতে করে মানুষ এই উপকারের জন্য আল্লাহকে খোঁটা দেওয়া কিংবা বড়াই করার মত উপলক্ষ খুঁজে না পায়।
মসজিদের অন্যতম উপকরণ হল মুসল্লি। মুসল্লি বাড়লে মসজিদ বাড়বে। তাদের হাতের দেওয়া গুপ্ত টাকায় মসজিদ হবে। মসজিদের ঈমামের জন্য ভাতাও মুসল্লিরা বহন করবে। বৃষ্টির দিনে মসজিদের নববীতে পানি ঢুকে মেঝ কর্দময় হত। রাসুল (সাঃ) এর সেজদায় সে কাদা কপালে লেগে আসত। তিনি সেটাকে সে ভাবেই রেখেই দুনিয়া ত্যাগ করেছেন। আজকের দিনে আলীশান মসজিদ বানানো হচ্ছে। মসজিদের আয়ের কথা বলে নীচের তলায় বাজার বানানো চলছে। সে সব টাকার পরিচালক হবার জন্য কিছু দ্বীনমুর্খ মানুষ নির্বাচনে লড়ছে! রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ‘মসজিদ হল উত্তম স্থান আর বাজার হল নিকৃষ্টতম স্থান’। মসজিদের মত উত্তম স্থানের হেফাজতের জন্য বাজারের মত নিকৃষ্ট আয়ের উপর নির্ভর করা লাগে! সমাজে এ ধরনের মানুষ বাড়লে এবাদতের দশা হবে উপরের বর্ণিত ঈমাম সাহেবের মসজিদের মত। তারা ছিল অশিক্ষিত মূর্খ মানুষ তাই অনেক কিছু হয়ত বুঝেনি, তাই বলে যদি শিক্ষিত মানুষ এসব করে, তাহলে এবাদতের নামে এসব তামাশার কারণে তার নিস্তার হবে না।

Discussion about this post