ইনিও আরেক অশিক্ষিত ধনী পিতা। চল্লিশ বছর বয়সে তিনি অংকের কোটি সংখ্যার ঘর চিনতে শিখেছিলেন! তার আগেই তিনি কোটি পতি বনে যান। অশিক্ষিত বলে গৌরব, অহংকার, লোক দেখানো ক্রিয়াকলাপ কিংবা ধনের বড়াই করতে জানতেন না। একদা তিনি বন্ধুদের কথাচ্ছলে বলেছিলেন, “খোদা মনে হয় বেকুব, না হলে আমার মত অশিক্ষিতকে কিভাবে এত অর্থ-সম্পদ দেয়”! এটাও এক ধরনের লোক দেখানো গর্ব। অশিক্ষিত হবার কারণে জনসমাজে কিভাবে ধনের গৌরব করবে তখনও তা শিখে নাই। মধ্য প্রাচ্যে এ ধরনের বহু মানুষ আছে, যাদের দেখতে মামুলী মনে হবে কিন্তু ব্যাংক এদের টাকা উত্তোলন করতে কাহিল থাকে। চোখ ধাঁধানো গাড়ী, বাড়ীর মহরৎ তো থাকেই; ২০১২ সালে তিন মাসের ব্যবধানে এক বাংলাদেশী ধনীর কন্যা দুবাই শহরে বাংলাদেশী ৪০ কোটি টাকার ট্রাফিক ফাইন গুনে জাতীয় খবরের উপাদান হয়েছিল। তাদের বহু মানুষ অদ্ভুত ও হাস্য-পদ কাজ করে টাকার গরম দেখাতে চায়। যাই হোক, আমি অশিক্ষিত পিতার ইংরেজি উচ্চ শিক্ষিত বিলাতি সন্তানের কথাই বলছিলাম।
এই অশিক্ষিত পিতা তার সন্তানকে আহবান করেছিলেন, আমিরাতে প্রতিষ্ঠিত তার কোম্পানির দায়িত্ব নিতে। তিনি একাকী এই কাজটি করতে পারছিলেন না। তাছাড়া তার পরিকল্পনা দেশমুখী হওয়া। পিতার দৃষ্টিতে পাশ্চাত্যের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী পাওয়া সন্তানের জন্যও এটা উত্তম প্রস্তাব।
ওদিকে ছেলের আকাঙ্ক্ষা, পিতার কোম্পানির কোন কাজেই অংশ নিবেনা! প্রয়োজনে সে একটি নতুন কোম্পানি খুলে তিলে তিলে সেটাকে বড় করবে! পিতা বহু অনুনয় করে ছেলেকে বলেছেন, অন্তত তোমার পিতার কোম্পানিটা দেখার জন্য হলেও একবার আসো! বাবার এই ন্যুনতম আবদার রক্ষার্থে ছেলে এসেছিল কিন্তু পিতার অফিসের নিকটস্থ বাসা থেকে, বাবার অফিসে আসা কিংবা সেখানে বসা কোনটাই সম্ভব নয় বলে সাফ জানিয়ে দিলেন!
বহু স্বপ্ন লালন করে সন্তানকে শিক্ষিত করেছিলেন এই পিতা। এখন টাকা থাকলে শিক্ষা হাতের নাগালে। এই পিতারও কাড়ি কাড়ি টাকা আছে তাই সন্তানকে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে লোভনীয় শিক্ষা তথা O Level, A Level পাশ করিয়ে বাইরের দুনিয়ার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রীও জুটিয়ে দিয়েছেন। তবুও সন্তানের চোখ খোলাতে পারে নাই। এই পিতাও আফসোস করলেন, মানুষ বানানোর চেয়ে যদি অমানুষ করে রাখতাম তাহলে কিছুটা উপকার হত।
ভদ্রলোকের সন্তানের বন্ধু লেভেল থেকে তথ্য সংগ্রহ করে যা জানা গেল, তাতে শিক্ষিত মানুষের আক্কেল গুড়ুম হবার কথা। ছেলের পরিষ্কার কথা, আমার পিতা অশিক্ষিত, ইংরেজি জানেন না। ছোট-খাট বাক্যও বলতে পারে না! এমন কি শব্দগুলো এমন বিশ্রী ও হাস্যকর উচ্চারণে করেন, যাতে শিক্ষিত মানুষের হাসি আসবে। এটাতে আমরা অপমানিত বোধ করি। আমার বন্ধুরা যদি ফার্মে আসে, তখন আমার পিতা-মাতার সাথে তাদের পরিচয় হবে, তখন তারা নির্ঘাত বুঝে ফেলবে আমার পিতা আস্ত একটা গবেট! আর আমি এই গবেটেরই ছেলে।
বাবার বয়সও হয়েছে, এই বয়সে চেষ্টা করেও তার Personality Buildup তথা ব্যক্তিত্ব বিকাশ করানো যাবেনা। উল্টো আমাদের Carrier টাই নষ্ট হবে। এসব ওনাকে বহু বুঝিয়েছি, বললে গালাগালি, চিল্লাচিল্লি ও আফসোস করে। কয়েকদিন পরে আবারো সেই কথা বলতে থাকে, এসবে আমাদের বিরক্তি ধরে গেছে! বাবাকে বহুবার বলেছি, এসব কাজ কর্ম বন্ধ করে দেশে চলে যাও। যা কামিয়েছ তা দিয়ে বসে খাও। ‘আফটার অল’ আমরা তো আছিই, আপনার মৃত্যুর পরে দেখা যাবে কি করা যায়। এখন তোমার কোম্পানিতে, আমার না বসা সম্ভব, আর না চাকুরী করা সম্ভব।
আমরা উপরে তৎকালীন তোফায়েলের অশিক্ষিত পিতাকে দেখেছি কিন্তু তিনি সম্মানিত হয়েছিলেন এবং বর্তমানে দুটি পিতাকে দেখেছি, যাদের কপাল থাপড়াতে হয়েছে।
সন্তানকে শুধুমাত্র দুনিয়া অর্জনের জন্য লেখাপড়া শেখানোর কারণে। এধরনের লেখাপড়া আর ইঞ্জিনীয়ারিং ওয়ার্কশপে কাজ শিখে রুটি-রুজি কামাই করতে জানার মধ্যে কোন তফাৎ নাই! সুপ্রিয় পাঠক ভুল বুঝবেন না, সবিনয় দুঃখ প্রকাশ করছি যে, আমি বলছি না O Level, A Level পড়ানোর কারণেই সন্তান মানুষ হচ্ছেন না। বুঝাতে চাচ্ছি, ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থায় সনদ পেতে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হয়! কিন্তু কিছু ভুলের কারণে এত অর্থ ব্যয় আশানুরূপ সুফল আনেনা। আমরা সামনে দেখতে পাব, আমাদের চলমান শিক্ষা ব্যবস্থায় লেখাপড়া করেও সন্তানেরা তাদের মত হয়।
দুনিয়া অর্জনের জন্য যে বিদ্যাশিক্ষা, তাতে শিক্ষার্থীর ব্যক্তিত্ব বাড়ে, ক্যারিয়ার মজবুত হয়, প্রতিষ্ঠান চালানোর মত দক্ষতা অর্জিত হয়; এই সন্তানগুলোর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছিল। কিন্তু যে শিক্ষা শুধুমাত্র ব্যক্তিত্ব বাড়ায়, যোগ্যতা-দক্ষতাকে শানিত করে, আত্ম-সম্মানকে ফুঁসিয়ে তুলে, মর্যাদাবোধকে উষ্কিয়ে দেয়; সে শিক্ষা যতই উন্নত এবং যে দেশেরই হোক, তা ছাত্রকে গর্ব-অহংকারী, উদ্যত, অদূরদর্শী ও আত্ম-কেন্দ্রিক হিসেবে গড়ে তুলে। শিক্ষার মধ্যে পরিবার ও সমাজ সম্পর্কে ধারণা না থাকলে সে শিক্ষা হয়ত ছাত্রের কাজে লাগতে পারে কিন্তু কোনদিনও পিতা-মাতার কাজে লাগেনা।

Discussion about this post