অশিক্ষিত মানুষের শিক্ষিত সন্তান হবে এটাতে দোষের কিছু নেই। বাংলাদেশের আপামর সমাজ ব্যবস্থায় আজকে যারা প্রতিষ্ঠিত তাদের অনেকের পিতাই অশিক্ষিত। এটা দোষনীয়, অশোভনীয় কোনটাই নয়। তোফায়েল আহমদকে তার পিতা নির্দেশ দিয়েছিলেন, সকালে উঠে মরিচ ক্ষেতে গিয়ে পানি দিতে হবে। তোফায়েল সে কাজ করতে পারেন নি। পিতার বারণ থাকা স্বত্বেও সে যথারীতি মেট্রিক পরীক্ষার প্রস্তুতি হিসেবে টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে স্কুলে গিয়েছিল। তেলে বেগুনে জ্বলে উঠা পিতা, তোফায়েলকে কেটে হত্যা করার জন্য কুড়াল নিয়ে ছুটেছিল! পিতা চিল্লায়ে বলছিল, তোমার পরীক্ষা ভাত জোগাবে? না, ক্ষেতের শস্যই তোমার জীবন বাঁচাবে। তার ফাইনাল হিস্যা হবে আজ তোর সাথে দফারফা হবে! পিতার সোজা কথা, মানুষ হবার জন্য লেখাপড়ার দরকার নাই। পিতার কথা বারংবার অমান্যের শাস্তি হিসেবে কাছে পেলেই তাকে হত্যা করবে নতুবা দেশ ছাড়া করবে। তোফায়েল আহমেদ বাবার ভয়ে ঘর ছেড়ে পালিয়েছিল, লজিং এ থেকে লেখাপড়া করে, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে গোল্ড মেডেল নিয়ে দেশে ফিরেন। পূর্ব পাকিস্তানের সূচনা লগ্নে তিনি চট্টগ্রামের নাজিরহাট কলেজের প্রথম বাঙ্গালি প্রিন্সিপ্যাল হিসেবে কাজে যোগ দেন।
তোফায়েল আহমেদ যেদিন দেশে ফিরেন সেদিন জনতার ঢল নেমেছিল, সে ঢলে চুপি চুপি তার পিতাও যোগ দিয়েছিল। লোক লজ্জার ভয়ে মুখে গামছা পেঁচিয়ে কীর্তিমান ছেলের মুখচ্ছবি দেখার জন্য ব্যর্থ চেষ্টা করছিল। তোফায়েল আহমেদও জনতার মাঝে তার পিতাকে খুঁজে ফিরছিলেন। হাজারো মানুষের মাঝে একজন মানুষের চেহারা লজ্জায় মুখ ঢাকা। বিদ্বান ছেলে বুঝে নিয়েছিলেন ইনিই হবেন তার পিতা। তিনি জনতার ফাঁক থেকে বাবাকে বের করে প্রথমে পায়ে পড়েন তারপরে কাঁধে তুলে, পরিচয় করিয়ে দেন ইনিই তার মহান বাবা, যাঁর কারণে তিনি ভাগ্যবান, খ্যাতিমান ও কীর্তিমান। তোফায়েল আহমেদ পিতাকে একটি বাক্য ব্যয় করার সুযোগ দেয়নি, মুহূর্তে পরিবেশ পাল্টে যায় এবং তার পিতার জয় জয়কারে মানুষের মুখ ধন্যি হয়। অজ পাড়া গাঁয়ের এ ধরনের বহু দৃষ্টান্ত আজো বাংলাদেশে অগণিত।
তোফায়েল আহমেদ যা অর্জন করেছিলেন সেটার নামই ছিল প্রকৃত শিক্ষা। তিনি সমাজের গুরুত্ব ও মূল্য বুঝতেন। তার বাবা ছিল অশিক্ষিত ও মূর্খ চাষা কিন্তু অর্থের অভাব ছিলনা। তারপরও তোফায়েলের লেখাপড়া বাধার সম্মুখীন হয়েছে। লেখাপড়া বাদ দিয়ে চাষা-বাদ না করার শাস্তি হিসেবে পিতার হাতে খুনের ভয়ে দেশ ছাড়ে। তোফায়েল বুঝেছিলেন, বাবার এই গোঁড়ামি শিক্ষার আলোর অভাবে হয়েছে। একদিন তার ভূমিকা দেখলে পিতার রাগ, লজ্জায় পরিণত হবে এবং তার আচরণের জন্য আফসোস করবে। দেশবরেণ্য সন্তান তার অশিক্ষিত পিতাকে গর্বভরে জনতার মাঝে তুলে ধরেছিলেন। এর জন্য তিনি লজ্জিত, হেয় প্রতিপন্ন, মর্যাদাহানির পেরেশানিতে ভুগেন নি। এই লেখায় আমরা দেখতে পাব, তোফায়েলের বাবার চেয়েও উত্তম অশিক্ষিত কিছু মানুষের নমুনা, যারা সন্তানকে উচ্চ শিক্ষা করিয়েছেন কিন্তু হতাশ আর অপমানিত হয়েছে, শুধুমাত্র শিক্ষার দর্শন ভিত্তি ভিন্ন হবার কারণে।
একজন অশিক্ষিত পিতাকে দেখেছি, যিনি তার দক্ষতা-গুনে অঢেল অর্থ সম্পদের মালিক হয়েছেন। তিনি শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতেন না। শিক্ষিত মানুষকে পাত্তাও দিতেন না। আমাদের দেশে যে কেউ ইচ্ছা করলে একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠান দিয়ে দিতে পারে। পাশ্চাত্যের কোন দেশে এমনকি মধ্যপ্রাচ্যেও এটা করতে পারেনা। যে ব্যক্তি যে ধরনের শিল্প-সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠান দিবে, সেখানে সে সম্পর্কিত ইঞ্জিনিয়ার রাখা বাধ্যতামূলক। ফলে উপরে উল্লেখিত ব্যক্তিও তার প্রতিষ্ঠানে কয়েকজন ইঞ্জিনিয়ার রাখতে বাধ্য হন। এর ফলে তিনি আগে থেকে যে শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতেন না, এটা আরও দৃঢ় হল। তিনি দাম্ভিকতার সাথে এটা বলতেই থাকতেন, আমি লেখাপড়া করিনি, আমি অশিক্ষিত! কিন্তু কোন কাজে আমি অসফল? যেখানে হাত দিয়েছি সেখানেই শতভাগ সফল হয়েছি? এমন একজন শিক্ষিত মানুষ আমাকে দেখান, যিনি আমার মত সংক্ষিপ্ত সময়ে বুৎপত্তি অর্জন করেছে। উদাহরণ হিসেবে দেখাতেন, আমি অশিক্ষিত কিন্তু ইঞ্জিনিয়ারদের ইন্টারভিয়্যু আমিই নিয়ে থাকি। সকল ইঞ্জিনিয়ার আমাকেই স্যার বলতে গিয়ে মুখ ভোতা করে ফেলে। সুতরাং একথা সত্য নয় যে, লেখাপড়া না করলেই দুনিয়াতে সেরা হওয়া যায়না!
পরে একসময়ে তাকে হার মানতে হয়েছিল। কেউ একজন বুঝিয়েছিল, তিনি যদি ইঞ্জিনিয়ার হতেন, কিংবা একাউন্টটেন্ট হতেন, কিংবা ম্যানেজম্যান্টে পড়তেন তাহলে অফিস চালাতে এত জনশক্তি লাগত না এবং সরকারী কাজে লিষ্টেট হতেও প্রতিদিনকার মত কাঠখড় পোড়াতে হত না।
তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তার ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করাবেন। যত অর্থকড়ি লাগুক সবচেয়ে দামী স্কুলে, সবচেয়ে উন্নত শিক্ষা ব্যবস্থায় সন্তানদের মানুষ করাবেন। তার প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবে সন্তানদের বসিয়ে ব্যবসাকে আরও গতিময় করবেন। এই লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠানে কাজও করবে আবার সন্তানদের প্রয়োজনীয় শিক্ষায় সহযোগিতা করবেন এমন কয়েকজনকে কোম্পানিতে নিয়োগ দিয়েছেন। ব্রিটিশ সিলেবাসে ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলে তাদের যথারীতি ভর্তিও করে দিলেন।
ছেলেমেয়েদের পড়ানোর জন্য তার বাসায় বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকেরা কিলবিল করত। যথারীতি A Level পাশ করার পরে ছেলে-মেয়েদের মধ্যে দু’জনকে ইঞ্জিনিয়ার, এক জনকে একাউন্টেন্ট, একজনকে ম্যানেজম্যান্টে পড়ান। পিতার অগাধ অর্থকড়ি আছে, উচ্চতর ডিগ্রী অর্জন করাতে সন্তানদের কানাডাতে পাঠালেন। যথারীতি ডিগ্রী অর্জনও হয়ে গেল কিন্তু তারা কানাডা থেকে ফেরত আসতে রাজি হল না। একজন ইতিমধ্যে হোটেলে পার্টটাইম কাজ করাও শুরু করেছে! পিতার হাজারো অনুনয় বিনয় বিফলে গেল, তারা পিতার কোম্পানিতে বসে তিন লাখ টাকার বেতন তুলতে আগ্রহী নয় কিন্তু কানাডার রেস্টুরেন্টে বসে পার্টটাইম কাজ করে খেতে আগ্রহী।
তার কোন সন্তানই পিতার সাথে থাকতে রাজি নয়। এই কোম্পানিতে শিক্ষিত ইঞ্জিনিয়ারেরা কাজ করলেও সন্তানেরা আশে-পাশেও থাকতের রাজী নয়। পিতা স্বগতোক্তির ভাষায় সন্তানদের শিক্ষিত করে তোলার জন্য যে পরামর্শ দিয়েছিল, তার চৌদ্দগোষ্ঠি ধরে গালাগালি করে। তিনি বলেন, স্কুলে পাঠানোই ভুল হয়েছে, যদি সন্তানেরা অশিক্ষিত থাকত তাহলে তার ফার্মে বসে বাঁদরামি করলেও তার উপকার হত।
এর কারণ বুঝার বহু চেষ্টা করেছিলাম। তত্ত্ব-তালাশ করেও সিদ্ধান্তে পৌছতে পারি নাই। কাছাকাছি ধরনের অন্য আরেক পিতার ক্রিয়া-কাণ্ড থেকে পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিলাম উপরোক্ত সমস্যার মূল কারণ কি।

Discussion about this post