বর্তমানে আমরা যেভাবে সিলেবাস ভিত্তিক লেখাপড়া করে থাকি, দেড়শত বছর আগেও শিক্ষা অর্জন করার পদ্ধতি সেভাবে ছিলনা! নবাব সীরাজদৌলার পতনের প্রায় একশত বছর পর্যন্তও শিক্ষানীতি মুসলমানদের নিজস্ব স্টাইলে অব্যাহত ছিল। তখন মানুষ কিতাব ভিত্তিক শিক্ষালাভ করত। ইন্টারভিয়্যুতে প্রশ্ন করা হত, কয়টা কিতাব পড়েছেন? উত্তর আসার পরে কিতাবের নাম ও লেখকের নাম জিজ্ঞাসা করা হত। কিতাবের নাম শুনেই যে কোন প্রশ্নকর্তা বুঝে নিতে পারতেন, তিনি কোন মাপের জ্ঞানী। এ ধরনের লেখাপড়ায় ছাত্রদের বিদ্যা অর্জনের স্বাধীনতা ছিল। ছাত্রদের ইচ্ছা-আগ্রহ অনুসারে বিষয় অধ্যয়ন করার সুযোগ থাকত। ছাত্ররা শিক্ষকদের খানকায় গিয়ে পড়ে আসত। এভাবে শিক্ষকের আশায় ছাত্ররা দেশ-বিদেশে ঘুরে বেড়াত। ফলে একজন শিক্ষার্থী বহু বিষয়ের জ্ঞান অর্জন করতে পারত। মোগল আমল থেকে সিরাজদ্দৌলার আমল পর্যন্ত রাষ্ট্রিয় পৃষ্ঠপোষকতায় বিদ্যাশিক্ষার আলাদা একটি ধরন চলে আসে। যে শিক্ষা ব্যবস্থায় কোন বিষয়ের উপরে স্পেশাল কিছু অর্জনের সুযোগ ছিল।
ইতিহাসের পাতা ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাব, ওমর খৈয়াম বিশ্ব-সাহিত্যের নাম করা কবি ও দার্শনিক ছিলেন, তিনি গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানে সেরা ছিলেন। তদানীন্তন জ্যোতির্বিজ্ঞান মান মন্দির প্রধানের পদে ছিলেন। একই ধরনের শিক্ষা দিয়ে, আল্লামা জালালুদ্দীন সূয়তি বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় এক হাজারের উপর বই লিখেছেন, প্রায় ছয়শ বই সংকলন করেছিলেন। যা বর্তমান যুগেও বিস্ময়ের ব্যাপার বৈকি! সক্রেটিসের যুগ থেকে শুরু করে অষ্টাদশ শতাব্দীর ভারতীয় উপমহাদেশ পর্যন্ত এধরনের অগণিত উদাহরণে মানব ইতিহাস ঠাসা। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থায় সে দিন আর নাই। শিক্ষার্থী তার ইচ্ছা ও আগ্রহ মোতাবেক শিক্ষা পায়না। যা পায় সেটার জন্য শিক্ষার্থীর নিজেরও আগ্রহ থাকেনা। অধিকন্তু শিক্ষার্থী তার অভিভাবক কর্তৃক বেধে দেওয়া বিষয় নিয়ে পড়তে বাধ্য হয়। এর প্রভাব দ্বীনি শিক্ষার ক্ষেত্রেও পড়েছে।
সিলেবাস ভিত্তিক লেখাপড়া করার সিস্টেমটি ব্রিটিশের মাধ্যমে বেশী প্রসার লাভ করে। কম সময়ে, কম কষ্টে একটি নির্দিষ্ট বিষয়কে সহজে আয়ত্ত করে সহসা কাজে লেগে যাবার জন্য এই পদ্ধতির লেখাপড়া দুনিয়া জোড়া সমাদৃত হয়। দুনিয়াতে নিজের চাহিদা মত বিত্ত-বিভব অর্জন করা, তরতরিয়ে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে উঠে বসা, বৈষয়িক স্বার্থ হাসিলে কর্ম-কৌশলী হওয়া, এই বিদ্যা শিক্ষার মূল স্পিরিট। নির্দ্দিষ্ট বিষয়ে সহসা পাণ্ডিত্য অর্জন করায় এই শিক্ষার তুলনা নাই। ফলে শিক্ষার্থীর অভিভাবকেরা এখানে বিনিয়োগ ও ঝুঁকি নিতে দুঃচিন্তা করে না। কিন্তু শিক্ষার্থীর নিজের জীবনধারণ ও সমাজে গ্রহণযোগ্য হবার মত, অনেক গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয় পড়া ও জানা থেকে বঞ্চিত থাকে। পরিণত বয়সে গিয়ে শিক্ষার্থী হাড়েহাড়ে বুঝতে পারে, যে শিক্ষা অর্জন করেছে তা দিয়ে কিছু বেশী অর্থ আয় করেছে মাত্র কিন্তু তার সামাজিক জীবনকে নিরাপদ করেনি। (এ বিষয়গুলো বর্তমান সমাজের বাস্তব উদাহরণ টেনে আলাদা ভাবে লিখা হবে)
ইংরেজদের হাতে ভারত শাসনের পর, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দেখা দেয়। মুসলমান শাসনের অধীনে থাকা হিন্দুরা ইংরেজ শাসনে চলে আসে। এতে তাদের জীবনের ছন্দপতন হয়নি। বরং তারা দীর্ঘদিন মুসলমান শাসনের চেয়ে ইংরেজ শাসনের অধীনে আরও বেশী মানিয়ে নিতে পারছিল। ইংরেজ কৃষ্টি-সংস্কৃতির সাথে হিন্দুদের তেমন একটা দূরত্ব তৈরি হয়নি যতটুক ছিল মুসলমানদের সাথে। ফলে তারা ইংরেজদের দেওয়া সকল প্রস্তাব, সুযোগ-সুবিধা নিজেদের অনুকূলে বানিয়ে নেয়। সঙ্গতই যারা রাষ্ট্র-শক্তির পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তারা জনজীবনে এগিয়ে থাকে। হিন্দুরা ইংরেজ কর্তৃক প্রণীত শিক্ষা ব্যবস্থায় নিজেদের জড়িয়ে আগেই কর্ম ও ভাগ্য বদলিয়ে নেয় এবং আগে থেকেই সুযোগ পেয়ে যায়।
যেহেতু ভারত মুসলমানদের নিকট থেকেই ছিনিয়ে নেওয়া সেহেতু, মুসলমানদের সাথে ইংরেজদের মানসিক দূরত্ব বরাবরই বেশী ছিল। ফকির বিদ্রোহ, টিপু সুলতানের সংগ্রাম, বালাকোটের যুদ্ধ, সিপাহী বিপ্লব, তিতুমীরের অনবদ্য লড়াই সবই তো মুসলমান বনাম ইংরেজদের সাথেই ঘটেছে। যার কারণে ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষা ব্যবস্থায় মুসলমানেরা খুব সহজে যোগ দিতে পারে নাই। সিপাহী বিপ্লবের পরে মুসলমানদের আর সেই শক্তি থাকেনি, যার মাধ্যমে তারা একক ভাবে ইংরেজ হঠাতে পারবে কেননা ততদিনে ইংরেজদের স্বপক্ষে হিন্দু, শিখ সহ একই সংস্কৃতির অনুসারীরা ইংরেজের আনুগত্য গ্রহণ করে। অন্যদিকে মুসলিম পরিচয়ে কাদিয়ানী, বাহাই ও ইসমাইলীয়া সম্প্রদায়ের মানুষেরা ইংরেজদের প্রভুত্ব স্বীকার করে নেয়। ইংরেজেরা মুসলিমদের উপকারের নামে এই তিন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে ব্যাপক সুবিধা করে দেয়। তারা বুঝাতে চেষ্টা করে, তাদের মত হয়ে চললে সুযোগ সুবিধার অভাব থাকবে না।

Discussion about this post