জুনায়েদ জামশেদের কথা মনে পড়ে কি?
– হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন! তিনি পাকিস্তানের গায়ক ছিলেন! বিমান দুর্ঘটনায় নিহত হন।
– ইসলাম তাঁকে বদলিয়েছিল, ফেব্রিক্স শিল্পে তিনি মানুষের মন বদলিয়ে দিয়েছে।
– দেশে-বিদেশের ঘরের ওয়ারড্রব, আলমিরা জুনায়েদ ফ্রেব্রিক্সে ভরে উঠে।
– সংসদে মতিয়া তো বলেই ফেললেন, ‘পাকিদের কাপড়ে বাঙ্গালীর এত প্রেম কেন’?
– তিনি তো জানেন না, ‘ক্রেতার মন ছিনতাই হলে, আইনের ধমকও অকার্যকর হয়ে উঠে’।
– এ বিষয়ে পড়ে আসব মূলত আমার আজকের বিষয় এটা নয়, ভিন্ন।
বিদেশে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পের গৌরবোজ্জ্বল অনুভূতির কথা তুলে ধরে একটি পোস্ট দিয়েছিলাম। অনেক শুভাকাঙ্ক্ষী মন্তব্য করেছেন, অনেকে শেয়ার করেছেন। যদিও পোষ্টটি ছিল শুধুমাত্র গৌরব করার মধ্যে সীমাবদ্ধ। তারপরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্লগার ভিন্ন মন্তব্য করেছেন, সে গুলো নিচে উল্লেখ করেছি। বস্তুত আজকের পোষ্টটি এসব প্রশ্নের উত্তর ঘিরেই। এসব প্রশ্ন হতাশার হলেও সেখানে অনেক সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। প্রশ্ন গুলো পড়ুন:
#Sabuj Kabir ভারতীয় পোশাক তুলনামূলক কম দাম এটা মানতে হবে।
#Moztaba Hossain তার কোয়ালিটি ও দাম সর্বোপরি ডিজাইন কোনটাই ভারতীয় গুলোর চেয়ে ভালো নয়।
#Mirza Abida Sultana আমাদের দেশের ব্যবসায়ীরা তো দেশী কাস্টমার সম্পর্কে কনসার্ন নয়। তারা বিদেশীদের প্রায়োরিটি দিচ্ছে।
#Ohidul Islam বাংলাদেশে তৈরি পোশাক সব এক্সপোর্ট হয়ে যায়। দেশের ফেব্রিক্স এবং টেইলার্স এর শো-রুম গুলিতে বাংলাদেশী কোন প্রোডাক্ট আপনি পাবেন না।
আমি উপরের গুরুত্বপূর্ণ ব্লগার ও সতর্ক নাগরিকের সাথে মোটেও দ্বিমত পোষণ করছি না। আমাদের দেশীয় পোশাকের দাম কেন বেশী সেটা নিয়ে কয়েকদিন আগে একটি পোষ্ট দিয়েছি। তারপরও সংক্ষিপ্ত কথা যোগ না করলে নয়।
– গার্মেন্টসের আনুষঙ্গিক উপকরণ তথা সকল accessories আমরা আমদানি করি।
– যেমন, সুঁই, সুতা, জীপর, বোতাম, ফিতা, লেইচ, কাপড়, ট্যাগ সহ যাবতীয় সামগ্রী।
– আমদানী নির্ভরতায় উৎপাদনে বেশী লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়, লাভ কম।
– যেখানে আমরা একটি ক্ষুদ্র সুঁই বানাতেও অক্ষম। তাছাড়া
– আমদানিতে ট্যাক্স ও ভ্যাট সহ আনুষাঙ্গিক কর যোগ, হাজারো রকমের চাঁদাবাজি আছেই।
– প্রতিষ্ঠানের চড়া ভাড়া, ব্যবসায়ীদের বেশী মুনাফার আশা।
– পণ্য সামগ্রীর মূলে ঊর্ধ্বগতি হবার এটা মূল কারণ, যেটা দেখার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।
বিপরীতে পশ্চিম বঙ্গে,
– বাংলাদেশের প্রতিটি হাটে-বাজারে কিসের চাহিদা সেটা ওপারের বন্ধুদের নিকট তথ্য আছে।
– ভারতের অন্যান্য অঙ্গ রাজ্যের ধকলে পশ্চিম বঙ্গের অবস্থা খুবই কাহিল।
– পশ্চিম বঙ্গের মানুষদের ক্রয় ক্ষমতা বাংলাদেশের একজন সাধারণ মানুষের চেয়ে কম।
– পশ্চিম বঙ্গের লাখ লাখ মানুষ কেরালা, মাদ্রাজ, মোম্বাই ও বাঙ্গালোরে চাকুরী করে।
– বানানো স্বর্ণ ও পোশাক রপ্তানীতে তারা দক্ষ; তাদের লক্ষ্য বাংলাদেশের বাজার দখল।
– এসব পোশাক শ্রমিক গার্মেন্টের অধীনে নয়, বরং ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের হয়ে কাজ করে।
– সবশেষে গুরত্বপূর্ন যে কথাটি সকল কাঁচামাল সেখানের এবং শ্রমিকের বেতনও কম।
– ওরা শ্রমিক হিসেবে ভদ্র-নম্র; এবং পুরুষ শ্রমিকেরা একাজে বেশী অংশগ্রহণ করে।
আমাদের দেশে:
– পোশাক তৈরিতে বেশীর ভাগ মহিলারা জড়িত, যাদের বিয়ের পরে দক্ষতা মূল্যহীন হয়ে পড়ে।
– সৃষ্টিশীল, শিক্ষিত, স্মার্ট ছেলেরা এই কাজে সরাসরি জড়িত নয়, যারা জড়িত তারা অনাগ্রহী।
– ফলে নতুনত্ব, অভিনবত্ব, বিশ্ব বাজারের প্রয়োজনীয়তা ও চাহিদা বুঝার একটা ফাঁক থেকে যায়।
– যারা দেশীয় বাজারের জন্য পোশাক বানায়, তারা কম দামী কাপড় ও স্বল্প মজুরীকে প্রাধান্য দেয়।
– ফলে রুচিশীল ব্যক্তিদের চাহিদা মাফিক কাপড় বাজারে থাকেনা।
– আবার দেশীয় পণ্যে যারা পেশাদারী, তারা বেশী দাম হাঁকিয়ে বিজ্ঞাপনের মুল্য তুলে নেয়।
– বাংলাদেশের মানুষ বিজ্ঞাপন ও প্রচারিত জিনিষের প্রতি আগ্রহ-বোধ করে বেশী।
– আমাদের দেশে টেইলারিং দোকান বলতে একটি সাদা-মাটা দোকানের কল্পনা করা হয়।
– সাধারণ টেইলারের সকল মেশিন পা চালিত, এসব মেশিনে মোটা কাপড় সেলাতে পারেনা।
– একটি প্রফেশনাল টেইলারিং প্রতিষ্ঠানের সকল মেশিনই বিদ্যুৎ চালিত হতে হয়।
– এসব মেশিনের সবগুলোই দামী কিন্তু এগুলো ছাড়া প্রতিযোগিতায় টিকা সম্ভব নয়।
– তাছাড়া একজন টেইলর মাস্টারকে আর্টিস্ট হতে হয় নতুবা শিল্পসুলভ মন থাকতে হয়।
– সুইং মাস্টারের অনেক দক্ষতা লাগে, ভারতে এখন এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চ ডিগ্রি দেওয়া হয়।
– আমরা তো গার্মেন্টস বিষয়ে মাস্টার্স, এম,ফিল করাতে পারতাম, কই কারো ভূমিকা আছে?
একটি ঘটনা:
– বিএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি কালীন সময় রমজান মাস ছিল।
– পড়তে পড়তে বিরক্ত হতাম, সময় কাটাতে একটি কাজেরও দরকার ছিল।
– সদা হাস্যোজ্জল ফ্যাশন-টেইলার সাইফের কথা মনে পড়ল, তার কাছে কাজ চাইলাম।
– তিনি বললেন, ‘লজ্জা দিবেন না, আপনার অর্থকড়ির সমস্যা হলে যতদিন লাগে যোগান দিব’।
– আমি বেঁকে বসলাম, চাইলাম কাজ; শুরু করলাম টেইলারিং! ‘একেবারেই মুফত’।
– সে এলাকাতে আমি প্রসিদ্ধ ছিলাম, তার দোকানে আমাকে বসা দেখে;
– কাস্টমার আসতে রইল বায়ুর গতিতে; আমার লেখাপড়া শেষ, টেইলারিং শেখাও শেষ।
– সময়কে অনর্থক নষ্ট না করার জন্যই, এই কাজে হাত দিয়েছিলাম।
– পেশা হিসাবে হয়ত বাছাই করতে হয়নি কিন্তু ধারনাটা পরবর্তীতে বিফলে যায় নি।
– আমার আয় করার অনেক পথ, কেননা কাজ বাছাইয়ে আমার হিনমন্যতা ছিলনা।
– কাজের প্রতি আন্তরিকতার কারণে, বারে বারে আমি আকর্ষণীয় পদে কাজ পেয়েছি!
– তারপরও ভাবী টেইলারিং দক্ষতা পুঁজি হিসেবে তো সাথেই আছে!
– এভাবে আরো দক্ষতা আমার মেধায় আছে, দেখেছি দক্ষতা কখনও ফাঁকি দেয় না।
– জুনায়েদ ফেব্রিক্সের উদাহরণ টেনেছিলাম, মুসলিম সংস্কৃতির মিল থাকা কারণে।
– গৃহীনির পছন্দকে সঙ্গ দিতে গিয়ে, প্রচুর ফেব্রিক্সের ডিজাইন-কোয়ালিটি রপ্ত করেছি।
– ফেব্রিক্স, ফ্যাশন, রং, ধরণ বিশ্লেষনে তিনি পারদর্শী, একদা এটা তাঁর পেশা ছিল।
– এই প্রবাসেও ভারতীয়-পাকিস্তানী রমনীরা ঘরের দরজায় প্রতিনিয়ত নক করেন!
– বলছিলাম জুনায়েদ ফেবিক্সের কথা, তিনি নিত্য নতুন আকর্ষনীয় ডিজাইনের সৃষ্টিকর্তা।
– এটা অঢেল অর্থ ঢালার কারণে হয়নি, হয়েছে একদল সৃষ্টিশীল যুবকের কারনে।
– আমাদের ছেলে-মেয়েরা তাদের চেয়েও অনেক বেশী সৃষ্টিশীল ও নান্দনিক।
– মধ্য প্রাচ্যের নারীরা তার পোশাক ও কাপড়ের ডিজাইন দেখলে চোখ ফেরাতে পারে না।
– ভারতীয় দোকান গুলোতে অনিচ্ছা স্বত্বেও জুনায়েদের কাপড় রাখতে বাধ্য হয়!
দেশীয় বাজারে এখনো এটি একটি বিরাট সম্ভাবনাময় শিল্প
– বিদেশী বাজার ধরতে গিয়ে স্বদেশী বাজারকে আমরা অন্যের হাতে তুলে দিয়েছি!
– বাংলাদেশের স্থানীয় বাজারে ভাল ও অভিজাত পোশাকের চাহিদা ব্যাপক।
– শিশুদের পোশাকের জন্য থাইল্যান্ড, চীন সেরা, ভারত প্রতিযোগিতায় আছে।
– শিশুদের পোশাকে আমরা একেবারেই পিছনে অথচ এটাতেই বেশী মার্জিন আসে।
– সুন্দর, আকর্ষণীয় দামে সাশ্রয়ী পোশাক হলে অনেক নতুন উদ্যোক্তা লাভবান হবেন।
– এ কাজে প্রথমেই উচ্চ শিক্ষিত ছাত্র যুবকদের এগিয়ে আসতে হবে।
– কুমার দের মাটির কাজ চারুকলায় ছিনিয়ে নিয়েছে, এখন এটি মর্যাদাবান শিল্প!
– পোশাক শিল্পেও বৈপরীত্য আনতে, উচ্চ শিক্ষিত সৃষ্টিশীল তরুনদের জড়িত করাতে হবে,
– পোশাক ডিজাইনের জন্য এডোবি ইলাস্ট্রেটর খুব উপযোগী প্রোগ্রাম।
– Colour Matching একাজের গুরুত্বপূর্ণ অংশ, এই পোগ্রামে এটা সহজে করা যায়।
– কালার ম্যাচিং নিয়ে অনলাইনে লেখাপড়া করা যায়, বহু সাহায্যকারী সাইট আছে।
– সর্বোপরি হীনমন্যতা ঝেড়ে ফেলে, নিজেদের কাজে লাগাতে হবে; সফলতা আসবেই।
– তাই ক্রিয়েটিভ তরুণদের উচিত, আলস্য ঝেড়ে উঠা, নিজেকে কাজে লাগানো।
– চেয়ারে বসতে চাইলে সিট অপ্রতুল হবে, মাটিতে বসতে চাইলে পুরো দুনিয়াটাই তার।
– প্রতিষ্ঠানের মালিক হতে চাইলে, আগে প্রতিষ্ঠান ও মালীকের চাকর হওয়া লাগে।
– বড় হবার ইচ্ছা থাকলে! আগে ছোট থাকার অভ্যাস গড়তে হয়।
– আরো অনেক কথা ছিল বলার….. শিক্ষিত যুবকের হাতেই আলো, জাতিকে পথ দেখাবার…
আর জুনায়েদ কে দেখতে চাইলে এখানেই ‘ঢুঁ’ মারুন: https://www.junaidjamshed.com

Discussion about this post