বাংলাদেশের নারীরা তার প্রিয় পোশাক কেনার জন্য যখন কলিকাতার অলিগলিতে উঁকি মারছে তখন বহির্বিশ্বের শপিং মল গুলোতে বিত্তশালীরা হিসাব কষছে বাংলাদেশী এই পোশাকের মূল্য যদি আরেকটু কম হত তাহলে এই যাত্রায় দারুণ এক জোড়া পোশাক কেনা যেত। বাংলাদেশে প্রস্তুতকৃত পোশাক যেমনি দামী তেমনি আকর্ষণীয়। এ পোশাক একবার পড়লে ইহজন্মে অন্য ব্রান্ডের পোশাক পড়তে মন চাইবে না।
BHS, H&M, F&F, Marks & Spencer, Next সহ আরো বেশ কিছু বিশ্বখ্যাত কোম্পানি রয়েছে যাদের একটি ব্রাঞ্চ খোলার জন্য শপিং মল কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করে নিয়ে আসে। এসব কোম্পানির দুনিয়া জোড়া সুনাম সুখ্যাতি রয়েছে। তাই বিত্তশালী, সৌখিন মানুষেরা এসব স্টল থেকেই শপিং করে। নিজেই গুগলে এসব কোম্পানির নাম টাইপ করে দেখুন, তারা সারা দুনিয়ার তারা কত প্রসিদ্ধ! বিত্তশালীরা এখান থেকে বাজার করে বলে নিম্ন মধ্যবিত্তরা ভয় পান এই ভেবে যে ওখানকার সকল জিনিষের দামই বোধ করি বেশী।
এদের পলিসি ভিন্ন, যে কোন নতুন স্টাইলের পোশাক বাজারে আসলে শুরুতে এই পোশাকের দাম হাঁকায় বিরাট অংকে। বিত্তশালীদের হাতে অর্ধেক পোশাক বিক্রি হলেই তাদের লাভ ও মুনাফা দু’টোই মিঠে যায়। বাকী পোশাক কম মূল্যে ছেড়ে দেয়, কেননা নতুন স্টাইলের জন্য জায়গা দরকার। এগুলো তাদের অতিরিক্ত লাভের অংশ।
না আমি পোষাকের বিজ্ঞাপন দেবার জন্য ওসব কোম্পানির হয়ে কলম ধরছি না। আমি ধরছি আমার দেশের প্রতি ভালবাসার টানে। এসব কোম্পানি গুলোতে সবচাইতে দামী, সবচেয়ে ভাল পোশাক গুলোকে ট্যাগ লাগানো আছে বাংলাদেশের নামে। যত বিত্তশালী দেখবেন, কোন না কোন ভাবে তার গায়ে বাংলাদেশের ট্যাগ লাগানো পোশাক থাকবেই। আন্তর্জাতিক বাজারে নাম করা বহু কোম্পানিকে ভারতীয়রা কায়দা করে তাদের দেশে নিয়ে গিয়েছে। উপরের এই পেশাদারী কোম্পানিগুলোকে আজো নিতে পারেনি। জানিনা ভবিষ্যতে কি লেখা আছে জাতির কপালে। তবে আমি ড. ইউনুস কে এই মানদণ্ডে হৃদয়ের অন্তস্থল থেকে শ্রদ্ধা করি, তিনি সর্বত্র বাংলাদেশের পোশাকের ই্জ্জত দেন। নোবেল পুরষ্কার গ্রহনকালেও ইউনুসের শরীরে লেপ্টে ছিল বাংলাদেশী কাপড়ের, বাংলাদেশী কারিগরের বানানো, বাংলাদেশী পোশাক। এটার নাম ঐতিহ্য, এটাই সংস্কৃতির অংশ।
দুনিয়াতে আমাদের পোশাকের এত মূল্য, এত মর্যাদা, এত চাহিদা, এত সম্মান। ভারত আন্তর্জাতিক বাজারে ঘুরে ঘুরে বড় বড় কোম্পানি গুলোকে বুঝাচ্ছে যে, আমরাও বাংলাদেশর মত সার্ভিস দিতে সক্ষম। সেক্ষেত্রে আমাদের মহিলারা উল্টো ভারতের বাজারে হানা দিচ্ছে তাদের পছন্দসই রঙয়ের সন্ধানে। মূলত জাতি হিসেবে আমরা এতটুকু নীচে নেমে গেছি যে, আমাদের গৌরব করার মত কিছু আছে কিনা সেটা নিয়েই আমরা চিন্তিত। আবার গৌরব করার মত কিছু থাকলেও জ্ঞান-বুদ্ধির অভাবে সেটা নিয়ে যথাযথ গৌরব করার পদ্ধতিও আয়ত্ত করতে পারছি না।
লক্ষণীয় ব্যাপার হল, ভারতের বাহিরে গেলে সে দেশের মহিলারাও আর ভারতীয় থাকেনা। তারা ওয়েস্টার্ন পোশাক পড়ে গৌরব বোধ করে। ভারতীয় সিনেমা-নাটকের মত পোশাক পরিহিতা ভারতীয় নারীদের পশ্চিমা বিশ্বে খুবই কম দেখা যাবে। ব্যাপার খানা সেই কবিতার ছন্দের মত,
খোকা চায় পাখি – পাখি চায় বন –
স্বাধীন মুক্ত প্রাণ,
কণ্ঠে তাহার জাগে ক্ষণে ক্ষণে
নীল আকাশের গান।
অর্থাৎ আমরা ভারতীয়দের পিছনে দৌড়ছি আর তারা দৌড়াচ্ছে পশ্চিমা পিছনে! মহাত্মা গান্ধী যদি কিছুক্ষণের জন্য জীবিত হবার সুযোগ পেতেন; তিনি লজ্জায় ধূতি মাথায় পেঁচিয়ে বলতেন, আমার জাতি কবে থেকে পশ্চিমা হয়ে গেল। আর বেগম রোকেয়া ও নবাব ফয়জুন্নেসারা যদি জীবিত হতেন, তারা বাঙ্গালী কন্যাদের ঝাড়ু পিঠা করতেন এই বলে যে, যে ভারতীয় পোষাকে ভারতীয়দের আগ্রহ নাই, সেটা নিয়ে তোদের এত আকর্ষণের কারণ কি?
আসলে জাতি হিসেবে আমরা বড় হীনমর্ণ্য ও অকর্মা। ভারতীয় সংস্কৃতির নাঙ্গা-উলঙ্গ নাটক দেখে আমাদের বোনেরা ভাবছে সম্ভবত এই পোশাক পড়ে চলতে পারলে নিজেকে স্মার্ট, গ্রহনযোগ্যা ও সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ কারী ব্যক্তিত্বে অঙ্গ ভরে উঠবে। ব্যবসায়িক মতলবে সৃষ্ট; মহিলাদের জন্য সৃষ্ট এসব পোশাকের কাপড় মোটেও উন্নত মান সম্পন্ন নয়। এদের কিছু মশারীর কাপড়ের সাথে, কিছু ভেলভেটের কাপড়ের সাথে তুলনীয়। দুটোর উপাদান মানুষের চামড়ার জন্য উপযোগী নয়। তবুও আমরা অন্ধভাবে ব্যবহার করেই চলছি। কেননা নাটকে যে বর্ণের যে বাহারি ডিজাইন দেখানো হয়েছে, সেই ডিজাইটাই চাই। কাপড় যত মস্করা, নিন্মমানের হউক সমস্যা নাই। বর্ণ ও ডিজাইনে ঐ ধরনের হতে হবে। ব্যবসায়ীরা প্রবৃত্তির এই চিন্তাকেই ভাল ভাবে কাজে লাগিয়েছে আর সে ডিজাইন স্বল্পমূল্যে করতে গেলে এই কাপড়ই উপযোগী। অথচ এসব কাপড়ের জন্ম হয়েছিল মশারী ও পর্দার বিকল্প হিসেবে। আমাদের দেশে কবর-মাজার ডিজাইনে, মৃত ব্যক্তিদের লাশের চাদর হিসেবে দীর্ঘ বছর এসব কাপড় ব্যবহৃত হয়েছে।
অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বে খাদি ও তাঁতের কাপড়ের চাহিদা যত বাড়ছে, আমাদের দেশে তত ঘৃণিত হচ্ছে। অথচ আমরা নাকি স্বাবলম্বী হতে চাচ্ছি। তাই জাতিকে স্বাবলম্বী বানাতে হলে নাটক, চলচ্চিত্র, সাহিত্য, সাময়িকীতে নিজের গৌরব প্রকাশের ব্যবস্থা নিতে হবে। লিঙ্গ নাড়ানোর সাহিত্য-বোধ; কুটনামি, ঝগড়া ও পরহিংসা চর্চাকারী নাটক-সিনেমা বানালে বেজন্মা নাগরিকের সংখ্যাই বাড়াবে মাত্র। এরা যতই একাডেমিক যোগ্যতা প্রাপ্ত হউক না কেন; জাতীয় জীবনে দুই পয়সারই মূল্য নাই। জমিদার বাড়ীর চাকর যেভাবে নিজেকে জমিদার ভাবে, আমরাও অন্যের রংয়ে রঙ নিয়ে নিজেদের সম্ভ্রান্ত ভাবছি; বাহিরে যার দুই পাইয়ের মূল্য নাই।

Discussion about this post