আমি তাদেরকে একের পর এক এমন সব নিদর্শন দেখাতে থাকলাম যা আগের টার চেয়ে বড় হতো। আমি তাদেরকে আযাবের মধ্যে লিপ্ত করলাম যাতে তারা তাদের আচরণ থেকে বিরত থাকে। সুরা যুখরুক-৪৮
এসব নিদর্শন হল সেগুলো, যা আল্লাহ মূসা (আঃ) মাধ্যমে তাদের দেখিয়ে ছিলেন। সে সব নিদর্শনের ছোট্ট বর্ণনা:
এক, জনসমক্ষে যাদুকরদের সাথে আল্লাহর নবীর ঐতিহাসিক মোকাবিলা! যাদুকরেরা তাদের ভয়ানক সব যাদুর প্রাণী ছেড়ে দিলে, মুসা (আঃ) এর লাঠি বিশাল সাপে পরিণত হয়ে, সকল যাদুর উপকরণ খেয়ে ফেলে। এতে যাদুকরেরা পরাজিত হয় ও ঈমান আনে।
দুই, মূসার (আঃ) ভবিষ্যৎ বাণী অনুসারে মিসরে প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং মূসার (আঃ) দোয়ার কারণেই তা দূরীভূত হয়।
তিন, তাঁর ভবিষ্যৎ বাণীর পর গোটা দেশে পর্যায়ক্রমে ভয়াবহ বৃষ্টি, শিলা বর্ষণ, বজ্রপাত, ঝড়ো হাওয়া, প্রবল তুফানে জনপদ ও কৃষি ক্ষেত্র ধ্বংস করে ফেলে! অতঃপর তাঁর দোয়াতেই বিপদ কেটে যায়।
চার, তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে পঙ্গপালের ভয়ানক আক্রমণে সারা দেশ তছনছ হয়ে যায়। সকল প্রকার শস্য, উদ্ভিদ-ঘাস মাটি থেকেই হারিয়ে যায়। এ মহাবিপদও ততক্ষণ পর্যন্ত দূরীভূত হয়নি যতক্ষণ না মুসা (আঃ) এ বিপদ দূর হবার জন্য না দোয়া করেছেন।
পাঁচ, মুসা (আঃ) এর ঘোষণা অনুযায়ী গোটা দেশে উকুন ও কীটাণু ছড়িয়ে পড়ে। যার ফলে একদিকে মানুষ ও প্রাণীকুল মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়। অপর দিকে খাদ্য-শস্য ও গুদাম জাত পণ্য ধ্বংস হয়ে যায়। পিস-পিস করা উকুন আর কিলবিল করা কীটাণুতে আক্রান্ত জাতি যখন এ আযাব থেকে মুক্তি পায় তখনই যখন কাকুতি-মিনতি করে হযরত মূসার (আঃ) দ্বারা দোয়া করানো হয়।
ছয়, হযরত মূসা (আ) এর পূর্ব-সতর্ক বাণী অনুসারে সারা দেশের আনাচে-কানাচে ব্যাঙে সয়লাব হয়ে যায়। সর্বত্র ব্যাঙের অনাহুত লাফালাফি আর মূত্র আক্রমণের ফলে গোটা জনপদে প্রায় দম-বন্ধ হওয়ার মত অবস্থা হয়। এত ব্যঙ দমাতে যখন পুরো জাতি কাহিল হয়ে পড়ে, তখন উপায়ন্তর-হীন হয়ে মূসা (আঃ) এর শরণাপন্ন হন এবং তার দোয়ার মাধ্যমে জাতি এই গজব থেকে মুক্তি পায়।
সাত, ঠিক তাঁর ঘোষণা মোতাবেক রক্তের আযাব দেখা দেয়। যার ফলে সমস্ত নদী নালা, কূপ, ঝর্ণাসমূহ, দীঘি এবং হাউজের পানি রক্তে পরিণত হয়। মাছ মরে যায়, সর্বত্র পানির আধারে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয় এবং পুরো এক সপ্তাহ পর্যন্ত মিশরের মানুষ পরিষ্কার পানির জন্য তড়পাতে থাকে। মানুষ হতাশ ও অনন্যোপায় হয়ে মুসা (আঃ) শরণাপন্ন হয় এবং তাঁর দোয়ার বরকতে জাতি এই বিপদ থেকে মুক্তি পায়।
উল্লেখ্য মুসা (আঃ) সম্প্রদায় ছিল গোঁয়ার, হঠকারী, অকৃতজ্ঞ ও ওয়াদা খেলাপকারী। তারা এসব আসমানি বিপদে মুসা (আঃ) এর শরণাপন্ন হয়ে বলত, ‘হে মুসা! তুমি তোমার আল্লাহকে বল, যাতে এই যাত্রায় আমাদের উপর থেকে বিপদ তুলে নেয়। হতে পারে আমরা তোমার দেখানো পথে ফিরে আসতে পারি।’ কখনও ওয়াদা করত, ‘যা হয়েছে তা তো গেছেই, এই বারই শেষ, আমরা তওবা করছি, আপনি আমাদের পক্ষ হয়ে আল্লাহর নিকট দোয়া করুন।
তারা যতবারই আল্লাহর নবীর সাথে ওয়াদা করেছে, ততবারই ওয়াদা ভঙ্গ করেছে। মুসা (আঃ) জিন্দেগীর পুরোটাই এসব মানুষ তাঁকে অতিষ্ঠ করে ছেড়েছে! তাদের কেউ মুসা (আঃ) কে লক্ষ্য করে বলত, আমাদের কি কপাল খারাপ! আল্লাহর বুঝি সময় হল, আমাদের জীবিত কালেই আপনাকে দুনিয়াতে পাঠাবার! আমাদের কি মুসিবত! আপনার কথা শুনলেও বিপদ, না শুনলেও বিপদ! দুনিয়া কাঁপানো এত মোজেজা মুসা (আঃ) মাধ্যমে দেখার পরও খুব কম সংখ্যক মানুষই তাঁর হাতে ইমান এনেছিল। সুতরাং সত্যের পথ লাভ করা একমাত্র আল্লাহর হাতেই নিবদ্ধ। যে আগ্রহী হয়ে তা পেতে চায় কিংবা আল্লাহ যাকে চান তিনিই সঠিক পথ পেয়ে থাকেন; বাকীরা সবাই হতভাগা।

Discussion about this post