প্রবাস জীবনে ঘরের মধ্যে এক ভয়ঙ্কর মারপিট থামিয়েছিলাম! যার সূত্রপাত হয়েছিল, বন্ধুদের নিজের বিয়ের ক্যাসেট দেখাতে গিয়ে; এক তম্বী-তরুণীর প্রতি নজর পড়ে, তারই ইঁচড়ে পাকা অবিবাহিত বন্ধুর। সে মন্তব্য করল, তুই ভাঙ্গাচোরা একটা আইবুড়ি মেয়েকে বিয়ে না করে যদি, এই দারুণ ‘মাল’টিকে (সুন্দরী মেয়েদের বিদ্রূপাত্মক অর্থ) বিয়ে করতি, তাহলে জীবন উপভোগ্য হত! এই কথায়, মুহূর্তেই বেধে গেল তুমুল মারামারি! কেননা ঐ মেয়েটি ছিল তারই আপনা ছোট বোন! ঘরে দুই বন্ধুর অধীনস্থ আত্মীয়রা ভাড়ায় থাকত; দল বিধে মারামারির ঘটনা খুনা-খুনির পর্যায়ে পৌঁছে যাচ্ছিল! পরে নিজেই গিয়ে ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করি!
একটা সময় ছিল, বিয়ের আগে কনের মুখ দেখার জন্য হবু বরের অগ্রিম খরচ করতে হত। আবার বিয়ের পরে কনের মুখ দর্শনেও অনেকের পকেটের টাকা হাওয়া হত। এই সুযোগ সবার জন্য অবারিত ছিলনা; মুরুব্বীরাই কনের চোখ বন্ধ রাখা চেহারা দেখার সীমিত সুযোগ পেতেন! শরীয়তের বাধ্যবাধকতার মধ্যে থেকেও, অনেক যুবক চুরি করে অন্যের বউ অযাচিত দেখে নেবার সুযোগ নিত। বিয়ের পরে অবিবাহিত যুবকেরা অন্যের নব বধূকে চুরি করে দেখার চৌর্যবৃত্তি, বাংলাদেশী সমাজে অহরহ চালু ছিল। চুরি অপরাধ হলেও, দাদী-নানীরা এ জাতিয় চুরিতে হালকা সহযোগিতা করতেন, যাতে করে এসব হাবলা নাতিরা বিয়ের করার লোভে তাড়াতাড়ি স্বাবলম্বী হয়। অনেক দুলাভাই শালা বউয়ের চেহারা না দেখার জন্য এড়িয়ে চলতেন। ভাবখানা এমন, শ্বশুর বাড়ীতে বেড়াতে আসলে, কয়দিন পরে তো নববধূর মুখশ্রী এমনিতেই ‘মুফত’ দেখা যাবে! তবুও বেশীরভাগ দুলাভাই জোড়ে-জব্বরের পাল্লায় পড়ে মুখ দেখতে বাধ্য হতেন এবং অনিচ্ছায় পকেটের স্বাস্থ্য হানী ঘটাতেন!
দুই যুগ আগেও কনে দেখার অভিনব মাত্রা ছিল যার এখন আর দরকার পড়েনা। উঠতি বয়সী যুবকেরা ভিডিও গ্রাহকের সাথে বন্ধুত্ব করত, তারপর তার দোকানে গিয়ে মেয়েদের ছবি খুঁটিয়ে দেখত। কোন ভিডিও গ্রাহক অনৈতিক সুযোগ নিয়ে, অন্যর বিয়ের সিডি তার বন্ধুদের নিকট বিক্রি করে দিতেন। বহু ঝামেলা হত এসব মীমাংসায়। অনেকে নিজের জন্য পছন্দের গুণবতী সুন্দরী নারী সন্ধান, বিয়ের সিডি থেকেই করতেন! একজন তো নিজের পছন্দের জন্য অন্যের বিয়ে করা তরুণীকেই বাছাই করেছিলেন! যার আজকের মূল কথা কিন্তু হাল জমানায় বিয়ের হাল চাল নিয়েই। এখন তো মেক’আপের পাল্লায় পড়ে পৌঢ়ের চেহারা কুমারীতে পরিণত হয়। আবার সুন্দরী কুমারীর চেহারাও বদবখত সুরতে প্রকাশ পায়। তাদের সৌন্দর্যের প্রকাশ পুরোটাই মেকআপ রমণীর শিল্পীমনের উপর নির্ভর করে।
বর্তমানের যুগ বদলিয়েছে যত, মানুষের খাসিয়ত হানি হয়েছে তার চেয়েও বেশী। বিয়ের কনে দেখার জন্য অত খরচাদি করতে হয়না কিংবা দুলাভাইদের পালিয়েও বেড়াতে হয়না। গায়ে হলুদের দিনেই অগ্রিম কনে দেখার সুযোগ ঘটে যায়। মিষ্টির প্যাকেট হাতে নিয়ে লটাং-ফটাং করে ঘরে ঢুকেই ঘোষণা করলে চলে, তিনি বরের পক্ষের লোক! প্রস্তুতি দেখতে এসেছেন। ব্যস! তার খাতির যত্ন অন্দর মহলেই হবে। তিনিও কনে পক্ষের লাইভ প্রস্তুতি পর্ব নিজ চক্ষে দর্শন করার সুযোগ পাবেন। এই কিছুদিন আগেও কনের সাথে, তার ভাবী-বান্ধবীরাও প্রায় সমান সাজে সাজতেন! কোনটা কনে, কোনটা নারী, কোনটা গৃহিণী তফাৎ করাও কঠিন হত। কেউ স্টেজে গুটি মেরে বসে থাকলে বোঝা যেত তিনিই বিয়ের কনে।
ফেসবুক বিপ্লব আসার পরে এখন বিয়ে আর বিয়ের মধ্যেই নাই। কোনটা বিয়ে কোনটা মেলা তা তফাত করাও মুস্কিল। কষ্ট করে অর্থ খরচ করে কনের দেখার সেই বিড়ম্বনা এখন আর নাই। চুরি করে কনে দেখার দরকারও পড়ে না। কেননা, কনে তার চেহারা সৌষ্ঠব নিজেই গায়ে পড়ে ফেসবুক লাইভে দিয়ে দেয়। আশাহত তরুণ যুবকেরা যাতে হতাশ হতে না হয়, সেজন্য কনে তার মুখ, বুক, হাত-পা সবই জন সম্মুখে উন্মুক্ত করে। তারপরও কিছু যোগ্যতা যাতে অপ্রকাশিত না থাকে সে জন্য কন্যারা মনের আনন্দে বিয়ের রাতেই দুম-ধারাক্কা নাচে মতোয়ারা হয়ে যান। বিয়ের রাতে কনেরা কেঁদে বুক ভাসায় এটা এককালের প্রবাদ বাক্যে পরিণত হয়েছে। এখন বিয়ের রাতেই কনেরা নাচে! এটাই বাস্তব সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা দুনিয়ার মানুষ উদ্বাহু নৃত্য যাতে চিত্তভরে উপভোগ করতে পারে, সে জন্য ফেসবুক লাইভে প্রচারও করা হয়। তাঁদের বিয়ের জমকালো অনুষ্ঠানকে, জগতে অমর করে রাখতে তা আবার চিরস্থায়ী ভাবে ইউ টিউবে ঢুকিয়ে রাখা হয়। যাতে করে তাদের ছেলে-নাতিরা বড় হয়ে পরিণত বয়সে চিত্ত ভরে মা-দাদীর উচ্ছল যৌবনের অদেখা উজ্জ্বল দিক গুলো বিশদভাবে উপভোগ করতে পারে!
প্রবাস জীবনে যেভাবে মারামারি থামিয়েছিলাম, সে ধরনের সমস্যা এখন আর সমাজে হয়না, এটাই বা কম কিসে! মানুষের চামড়া এখন এমন শক্ত হয়েছে তাই যে, কোন ধরনের বিশ্রী মন্তব্য তাদের শরীরকে খুঁজলাতে পারে না। তারা তাতে আহতও হয়না, তাই নিহত হবার হারও কমেছে।
বিয়েতে আনন্দ উৎসব করাতে ইসলামে মানা নাই। তাহলে ফেসবুক আসার আগে যারা বিয়ে করেছে তাদের বিয়ে কি নিরানন্দ ছিল? মোটেও না। আনন্দ হতে হবে শালীনতা ও শরীয়তের বাধ্যবাধকতার মধ্যে। যারা দাম্পত্য জীবনকে সুখকর করতে চায়, তাদের জন্য ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণ করে বিয়ে করাই বাঞ্ছনীয়। কেননা,
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে বিয়েতে খরচ, চিন্তা ও শালীনতার অপচয় হয়, ফেরেশতারা সম্মিলিতভাবে সে দম্পতির জন্য বদদোয়া করতে থাকে। তারা বলতে থাকে, আল্লাহ এই দম্পতিকে তুমি অসুখী কর, এই দম্পতির সংসারকে তুমি অভাবগ্রস্ত করে এদের ঘরে যে সন্তানাদি আসবে তাদের কে তুমি পিতা-মাতার জন্য ফেতনা বানাও! পাঠকেরা আজ থেকে নিজেদের চোখকে সযত্নে সতর্ক করুন আর লক্ষ্য রাখুন সে সব বিয়ের দিকে যারা উপরের নিয়মের ব্যতিক্রম করেছে। আর পরীক্ষা স্বরূপ অপেক্ষা করুন এবং তাকিয়ে দেখুন সেই সব দম্পতির পরিবার কিভাবে নষ্ট হয়েছে! শান্তি বরবাদ করে পরিবারকে ছারখার করেছে।

Discussion about this post