Violence is the language of the unheard “যাদের কথা শোনার কেউ নেই, হাঙ্গামা করেই তারা কথা শোনায়”।

বাড়ীতে মেহমান আসলে এবং পাশে যদি গরীব মানুষ প্রতিবেশী হয় তাহলে অনেকে ইজ্জত হানিকর মনে করে। মনে মনে দোয়া করতে থাকে যে, প্রতিবেশীর পোশাক ফাটা শিশুটি যেন এই মুহূর্তে ঘর থেকে বের না হয়। কেননা গরীব প্রতিবেশী পাশে থাকা মানেই তো হীনতা-দীনতা স্ট্যাটাসের পরিচায়ক! এসব রুখতে ধনীরা উঁচু দেওয়ালের বাড়ী বানান। উচ্চবিত্তরা এক সাথে মিলে, গরীব মুক্ত এলাকায় থাকে; এটাকে তারাই নাম দিয়েছে ‘সোসাইটি’! পরিবেশের বিভিন্ন ধারণা বদলিয়েছে, তাই সোসাইটি শব্দটির অর্থ গত দিক সুন্দর হলেও, গরীব, মিসকিন মুক্ত শহুরে গ্রামকেই বুঝিয়ে থাকে।

প্রতিবেশী হিসেবে যারা গরীব, তারা বড় অসহায়ত্বে দিন কাটায়। তারা যত না নিজের কারণে অসুখী হয়, তার চেয়েও শতভাগ বেশী কষ্টে থাকে ধনী প্রতিবেশীর হেঁয়ালি আচরণে। ধনীর সন্তানেরা শপিং মলের পাশ দিয়ে যাবার সময় ফাস্ট ফুডের ঘ্রাণ নাকে আসলে পিতা-মাতাকে খাওয়াতে বাধ্য করে। ঠিক সেভাবে ধনীদের চুলোয় যখন মাছ-মাংস সহ নানাবিধ উপাদেয় রসনার ঘ্রাণ গরীব প্রতিবেশীর অসহায় সন্তানদের নাকে যায়, তখন তাদের হৃদয় হাহাকার করে উঠে। যে পিতা সন্তানের মুখে এক প্লেট ভাত তুলে দিতে অক্ষম, সেখানে তাদেরকে এক চামচ মাছ-মাংসের ঝোল খাওয়ানো ততোধিক কঠিন। এই কথাটি সামান্য উপলব্ধি সম্পন্ন মানুষ অনুধাবন করতে পারে না। যারা চিন্তাশীল তাদের ভাবাবেগকে প্রচণ্ড বেগে কাপিয়ে তুলবে। তারা নিজেদের অপরাধী মনে করবে। এই সমস্যাটি যত না, অর্থনৈতিক তার চেয়েও বেশী নৈতিক ও ধার্মিক!

প্রকৃতিবাদীদের নিকট এটি একটি সামাজিক বৈষম্য। যা রাষ্ট্র ধনীদের সহযোগিতা করে দিনে দিনে, তিলে তিলে বাড়িয়ে তুলেছে। তারা মনে করে এটা দরিদ্রের বিরুদ্ধে ধনীদের শোষণ। তাই তারা দরিদ্র শ্রেণিকে ধনীদের বিরুদ্ধে ক্ষেপীয়ে তুলে। ধনীদের বিরুদ্ধে ঘৃণার বাষ্প ছড়ায় এক সময় এটা বারুদের মত জ্বলে উঠে। তারা ধনীদের বিরুদ্ধে শোষণের অপবাদ দেয়, রাষ্ট্রীয় সম্পদ কুক্ষিগত করার বদনাম ছড়ায়। তারা বুঝাতে থাকে, এসব ধনীদের পিটিয়ে, ছেঁচিয়ে নিঃস্ব করে গরীবের সমান করে ফেলতে পারলে, সমাজে শান্তি, সাম্য, সৌম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
সমাজে ধনীর চেয়ে দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেশী। তাই তাদের আন্দোলনও দাবানলের মত ছড়িয়ে পড়ে। কমিউনিস্টেরা এটার নাম দিয়ে শ্রেণী সংগ্রাম। এভাবে সমাজে সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে কত শত ধনী নিরীহ মানুষকে কমিউনিস্টদের হাতে অকাতরে প্রাণ দিতে হয়েছে; তার হিসাব করা কঠিন। বস্তুত দুনিয়াতে কমিউনিস্ট শাসন একশত বছর পূর্ণ হতে চলল কিন্তু মানুষের মাঝে এই ভেদাভেদ দূর হয়নি। বরং আমাদের সমাজে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান দিন দিন বাড়ছেই।

এটি শুরুতেই থাকে একটি সামাজিক সমস্যা হিসেবে অতঃপর এটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। রাষ্ট্র পরিচালনায় যারা ভূমিকা রাখে তাদের অনৈতিক লোভের খেসারত জনগণের কাঁধে চড়ে বসে। ফলে এটির বাড়ার কারণে রাষ্ট্রীয় মেকানিজম গুলো অকেজো হয়ে পড়ে। প্রতিশোধ স্পৃহা, জিঘাংসা, প্রতিহিংসা পরায়ণতা গাণিতিক হারে বাড়তে থাকে। রাষ্ট্র বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। আমেরিকার মত দেশের বাহিরে কত সুনাম! কিন্তু ধনী দরিদ্রের পার্থক্য ও অবক্ষয় অনেক বেশী। মার্কিন প্রেসিডেন্ট পদ পাথী মার্টিন লুথার কিং এর জনপ্রিয়তাই বেড়েছিল বঞ্চিত মানুষের পক্ষ হয়ে কথা বলার কারণে। রাষ্ট্রের একদিকে দখলের আন্দোলন চলে, প্রশাসন মৌনতা অবলম্বন করে। অন্যদিকে বঞ্চিত, বুভুক্ষু, অভাবী মানুষদের ক্ষুধার আন্দোলনকে বলা হয় নৈরাজ্য হিসাবে। এক্ষেত্রে আইন বড়ই কঠোর এবং শাসনের প্রক্রিয়া প্রতি পদেই দৃঢ়।  এটাকে লক্ষ্য করেই জগত-জোড়া জনপ্রিয় বাগ্মী মার্টিন লুথার কিং বলেছেন, Violence is the Language of the Unheard অর্থাৎ “যাদের কথা শোনার কেউ নেই, হাঙ্গামা করেই তারা তাদের কথা শোনাতে চায়”।

ইসলাম উপরের কোন পদ্ধতিকেই সমর্থন করেনা। ধনী দরিদ্রের আন্তরিক ব্যবধান কমিয়ে দিতে ইসলাম একেবারে তৃণ মূলেই সমাধান করে। এটাকে সামনে বাড়তে দেয় না। ইসলামের এই পদ্ধতি প্রয়োগে মানুষের মধ্যে এমন সৌহাদ্য বোধ সৃষ্টি হয়, ফলে বাদশাহ আর চাকর একই ভূমিতে নেমে এসে এক কাতারেই নামাজে শরীক হয়।

(দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *