আবু হুরাইরাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “যখন তোমাদের কারও কোন খাবার পাত্রে মাছি পড়ে, তখন তাকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দিবে, তারপর ফেলে দিবে। কারণ, তার এক ডানায় থাকে আরোগ্য, আরেক ডানায় থাকে রোগ”। সহিহ বুখারী-৫৭৮২
হাদিসটি মাছির উপরকার কিংবা মাছির সুনামের জন্য বর্ণনা করা হয়নি। এটি উম্মতের জন্য সতর্কতা মূলক কথা। যাতে করে মাছির উপদ্রবের কারণে কেউ খাদ্য বরবাদ না করে। আরব দেশে মাছির পরিমাণ আমাদের দেশের চেয়েও বেশী। বাচ্চারা কান্না করলে, তার চোখের পানি চেটে নেবার জন্য দলে দলে মাছি আক্রমণ করে বসে! চুলা থেকে নামানো খাদ্যে মানুষ বিসমিল্লাহ বলার আগেই মাছি ঝাঁপিয়ে পড়ে। আমাদের দেশে মশারী ব্যবহার করে মশার বিরুদ্ধে; আরব দেশের বহু গ্রামে দিন-দুপুরে মাছির ভয়ে মশারীর ভিতরে ঢুকে দুপুরের খানা খেতে হয়। তাই এসব হাদিস বর্ণিত হয়েছে মানুষের সমস্যা লাঘবের জন্যই।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক কথা লুকিয়ে আছে এই যে, মাছির কোন এক ডানায় আরোগ্য-দান কারী ঔষধ লুকিয়ে আছে। বিজ্ঞানের আবিষ্কারের ফলে একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, মাছির দেহে anti-bacterial উপাদান থাকে। আমরা আরো জানি, মাছি যাবতীয় bacterial রোগ বহনের বড় মাধ্যম। নিন্দুকেরা রাসুল (সাঃ) এই হাদিসটিকে নিয়ে কটূক্তি করে। কিন্তু পচা খাদ্য, মাছি পড়ার চেয়েও মারাত্মক সেটা তো বিজ্ঞান স্বীকৃত। এটা নিয়ে তেমন উচ্চ বাচ্য করেনা!
উল্লেখ্য, দুনিয়াতে বহু প্রজাতির মাছি বিদ্যমান। আমরা হাতে গোনা কয়েক প্রজাতির মাছি সম্পর্কে অবহিত। যেমন; মৌমাছি, গৃহ মাছি, ফল মাছি, মধু মাছি, মোম মাছি, কাঁটা মাছি, ডাশ মাছি ইত্যাদি সহ লাখো লাখো মাছি রয়েছে। সব মাছি একই জাতীয় খাদ্যে আকৃষ্ট নয়। পচা খাওয়ার মাছি, ফুলে বসে না। মধু খাওয়ার মাছি মল খায়না। গৃহ মাছি (House Fly) পচা খায়না। মোম মাছি মানুষের গায়ে বসে না। কাঁটা মাছির কোনটাই পছন্দ নয় একমাত্র লোমশ প্রাণীর ঘাম ছাড়া!
রাসুল (সাঃ) যে মাছির কথা বলেছেন, সেটা গৃহ মাছি হিসেবে সবার নিকটি পরিচিত। ইংরেজিতে House Fly বলে। মানুষ যা খায় তাতে তার আকর্ষণ বেশী। এই মাছিই মানুষকে ত্যক্ত-বিরক্ত অতিষ্ঠ করে ছাড়ে! ঘরের পাশে পচা, বাসি, কুখাদ্য পড়ে থাকলেও সেদিকে আগ্রহ না দেখিয়ে, মানুষের নাকে, মুখে, চোখে, পিটে বসে আরামের সময়টাকে অতিষ্ঠ করে তুলে। মানুষের জন্য বানানো খাদ্যের প্রতি এই মাছির আকর্ষণ বেজায়। যেখানে তৈরিকৃত খাদ্য পায় সেখানেই সে আত্মাহুতি দেয়। সে জন্য এটাকে গৃহ মাছি হিসেবে বলা হয়। এই মাছিটির প্রধান আকর্ষণের বস্তু হল মানুষের চামড়ার ভাঁজে জমে থাকা বাসি ঘাম ও সেঁতসেঁতে মরা কোষের পচন রস। সে এসব খাওয়ার জন্যই মানুষের শরীরে বসে। মানুষের শরীরে সৃষ্ট এসব রাসায়নিক উপাদান মানুষের খাদ্যের মধ্যেও কিছুটা পাওয়া যায়। সে কারণে মানুষের খাদ্য তার বেজায় পছন্দ। গরু-মহিষের গায়েও এসব মাছি খাদ্য উপাদান পায়, তাই তাদেরকেও বিরক্ত করে।
নীল বর্ণের বর্ণিল আভাযুক্ত আরেকটি মাছি আছে, যেটা মানুষের মল পছন্দ করে। রাসুল (সাঃ) এর হাদিস টি যখন বলা হয় তখন তারা কল্পনার রাজ্যে মলের এই মাছিটির কথাই মানস-পটে ফুটিয়ে তুলে। মূলত যে মানুষ যে ধরনের তার কল্পনা শক্তির রাস্তাও সেদিকে প্রসারিত হয়! মৌমাছি কিন্তু এক প্রকার মাছি! জগতে মধুর চাহিদাকে দুধের সাথে তুলনা করা যায়; অন্য কোন কিছুর সাথে নয়। যে মধু আমরা খাই সেটা কিন্তু মৌমাছির বমি! এটা মানুষ ভাবতে চায়না! উল্লেখ্য মৌমাছি মধু সংগ্রহে ফুলে বসে কিন্তু মধুকে নিরাপদ ও স্থায়িত্ব দিতে মৌমাছিকে মানুষের মল-মূত্রের উপর বসতে হয়! এটা আমরা কতজনে খবর রাখি। বাড়ীতে আরেকটি মাছির উৎপাত দেখা যায়, যেটাকে ফল মাছি বা Fruit fly বলে। আম কাঁঠালের উচ্ছিষ্ট রসালো চামড়ায় এই পতঙ্গের উৎপাত লক্ষণীয় কিন্তু এই ক্ষুদ্র মাছির উপস্থিতি ফলের রসকেই কেন্দ্রে করে সীমাবদ্ধ থাকে।
মশা-পিপড়া মানুষের জন্য ভিন্ন ধরনের সমস্যা সৃষ্টি করে। ভ্রমর, বোলতা, ভিমরুল এসব মানুষের জন্য বিরক্তি কর নয়। কিন্তু মানুষের জীবনে আর মাছির উপদ্রব দুটোই সমান তালে চলেছে এবং চলবে। কেননা এই দুই প্রাণীই কাছাকাছি ধরনের খাদ্যে জীবন ধারণ করে। দুজনের স্বার্থই একই উপাদানের উপর নির্ভরশীল। আবার মানুষ খানা খেয়ে বিশ্রাম নেয়, আর মাছি বিশ্রামরত মানুষকে বিরক্ত করে। এখানে মানুষের শত্রু মাছি। তারা নোংরায় বসে, তার মাধ্যমে রোগ-জীবাণু ছড়ায় এবং তার প্রথম ক্ষতির শিকার হয় মানুষ। মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্য, পানীয়তে দৃশ্যমান ক্ষতি মাছিই বেশী করে। তাই সতর্ক মানুষও কখনও বেকায়দায় পড়ে যেতে পারে। সে সব সমস্যা সমাধানে রাসুল (সাঃ) শরীয়তের এই বিধান দিয়েছেন। হাদিসের এই অর্থ দাড়ায় না যে, জাল দিয়ে মাছি ধরে এনে, রোগ মুক্তির আশায় পানিতে চুবিয়ে তা পান করা! জ্ঞানী-বিজ্ঞানী যারা চিন্তা-ভাবনা-গবেষণা করে, তাদের জন্য একটি অগ্রিম সংবাদ সেখানে লুকিয়ে আছে, যে মাছির ডানায় ঔষধ রয়েছে।
উপসংহারে বলা যায়, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পবিত্রতা ঈমানের অঙ্গ। এটি আল্লাহ প্রদত্ত বিধান। যার ঘরে মাছি আসে, সে যে মাছিই হোক, তার বাড়ীর আশে পাশে নিশ্চয়ই মাছির জীবন ধারণের উপকরণ রয়েছে। যা অন্য কথায় অপরিচ্ছন্নতার অংশ। মানুষ সামাজিক জীবনে অভ্যস্ত। একজন ব্যক্তি সমাজ পরিবর্তন করতে পারে না। তবে সমাজে সচেতনতার জন্য মানুষ কাজ করতে পারে। এলাকায় পরিষ্কার-পরিছন্ন অভিযান পরিচালনা করা ইমানী দায়িত্বেরই একটি অংশ। এ কাজটি যেমনি সামাজিক, তেমনি রাজনৈতিক আবার তেমনি ধর্মীয়! গায়ে সুগন্ধি তেল, ভ্যানিশিং ক্রিম অগত্যা কেরোসিন লাগান! মাছি গায়ে বসবে না! শরীরে সুগন্ধি ব্যবহারে মাছির ঘ্রাণ শক্তিকে বিভ্রান্ত করে দেয়। সে কোন মানুষের গায়ে বসবে সেটা নিয়ে সমস্যায় পড়ে, তাই সাময়িক কিছুটা উপকারে আসে। ইসলাম সুগন্ধি ব্যবহার কে ও উত্তম সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত করেছে। সর্বোপরি পরিষ্কার-পরি-ছন্ন থাকা সুবাসিত পরিবেশে জীবন যাপন করলে বহু রোগ ব্যাধি থেকে বেঁচে থাকা যায় এবং মানসিক ভাবেও দৃঢ় থাকা যায়।


Discussion about this post