ফেসবুকে এখন অনেক উচ্চ শিক্ষিত নারীদের পোষ্টে দেখা যায়। তাঁরা খুবই আফসোসের সাথে লিখছেন, এত লেখাপড়া করে লাভ কি হল! ঘুরে-ফিরে তো রান্না ঘরেরই দায়িত্ব নিতে হয়েছে! এই গ্লানি তাঁদেরকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। এ হতাশায় কলেজ শিক্ষয়িত্রী, ব্যাংক কর্মকর্তার মত চাকুরীজীবী মহিলাও আছে! অনেকে উইমেন চ্যাপ্টারে লিখছেন কিন্তু ব্যাপারটি পরিষ্কার করতে পারছেনা। তসলিমা নাসরিনের কথা তো সবাই জানে, সে দীর্ঘ বছর লড়ছে পুরুষের বিরুদ্ধে কিন্তু কেন লড়ছে সেটা তার বক্তব্য থেকেও পরিষ্কার নয়!
মাতৃত্ব:
মাতৃত্ব নারীর অন্যতম উপলব্ধি। যা সৃষ্টির সকল প্রাণীর নিকট সমানভাবে প্রযোজ্য। আল্লাহ বংশ বিস্তারের জন্য নারী জাতীর হৃদয়ে কাঙ্ক্ষিত এই গুণাবলী দিয়েছেন। মানুষের মা আর অন্য প্রাণীদের মায়ের হৃদয়ে, সন্তানের নিরাপত্তায় সর্বোচ্চ আগ্রাসী মনোভাব আল্লাহ নিজেই ঢুকিয়ে দিয়েছেন! সকল নারীই মা হয়ে মাতৃত্বকে উপভোগ ও দায়িত্ব পালন করতে চায়। ইসলামে নারী সন্তানের মা হবে, আর বাবা সন্তানের সকল দায়িত্ব নিবে। এভাবেই দু’জনের মমতাকে একটি কেন্দ্র বিন্দুতে আটকিয়ে রেখেছে। যে সব পুরুষ তা করেনা, তারা অপরাধী এবং এদের কঠিন বিচার আছে।
নারীত্ব:
নারীত্ব ও নারীর পরিচয় নিয়ে কবি নজরুল তাঁর কালজয়ী সৃষ্টি ‘নারী’ কবিতায় সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন। এক কথায় অসাধারণ এই কবিতা নারী-পুরুষ সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য। তবে বর্তমান সময়ে নারীত্ব নিয়ে নারীরা যা লিখছে, তার মোদ্দা কথা হচ্ছে। লেখাপড়া করে নারীরা কেন রান্নাবান্নার কাজ করবে? তারা কি চাকরানী? আবার এদের বেশীর ভাগ নারীই শ্বশুর- শাশুড়ি, ননদ-দেবরকে আপদ মনে করে। তাদেরকে সাথে রাখতে আপত্তি জানায়! শাশুড়ি সাথে থাকলেও আধা চাকরানীর মত পদ মর্যাদা দিতে চায়।
আরো পরিষ্কার করে বলতে গেলে, নারীরা উচ্চ শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে বিয়ের পরে চাকুরী করবে! চাকুরী না পেলেও ঘরে বসে ভিন্ন ভাবে সময় কাটাবে কিন্তু চাকরানীর কাজ করবে না! অবশ্য অধিকাংশ নারীই এমন নয়, একথা সবাই বুঝে। এসব নিয়ে যার লিখছেন, এদের সংখ্যা হাতে গোনা কিন্তু মিডিয়া কভারেজ পাবার কারণে, মনে হয় এটা বর্তমান শিক্ষিত নারীদের অন্যতম সমস্যা! দৃশ্যত এগুলো দেখতে সব বাহানার মত লাগে; ছুতো খোঁজার মত মনে হয়! কাজের প্রতি অনীহা ও ভীতিরই প্রকাশ ঘটে! নারী জাতির অবহেলার নামে যে কাজের দোষ খোঁজা হচ্ছে, সে মেয়েলী কাজ গুলো এসব নারীরা বিয়ের আগে মায়ের সংসারে আদৌ করেছিল না, তা নিয়েই সন্দেহ-সংশয় জাগে! তারা নিজেরাই নিজের কাজে দক্ষতাহীন কিন্তু দোষ চাপায় নারীত্বের উপরে!
এমন কিছু পুরুষ আছে, যাদের ‘স্ত্রী’ চাকুরী করে কিন্তু এক সাথে ঘরে ফিরে আসার পর নারী যায় রান্না ঘরেয়, আর পুরুষ সাহেবের মত বসে টিভি দেখতে! স্ত্রীর সামান্যতম কাজে সহযোগিতা তো করেই না বরং তাদের কাজকে স্বীকৃতি দেয়না। এটা নীতি ও মৌলিক শিক্ষার দৈন্যতা, বড় হীনমন্যতা। প্রধানত রান্নাবান্নায় প্রধান ভূমিকা নারীর এবং পুরুষের ভূমিকা সাহায্যকারীর। চাকুরী শেষে পুরুষের ঘরে ফিরে যদি আরাম করতে মন চায়, তাহলে তার স্ত্রীও তো চাকুরী করে ঘরে ফিরেছে, তার মনেও একটু রেস্ট চায়! অগোছালো পরিবেশ ও সন্তানদের নিরীহ মুখ দর্শনে নারী আরামের কথা ভুলে গিয়ে, সরাসরি রান্না ঘরে ঢুকে পড়ে। এক্ষেত্রে পুরুষের যদি আরামের প্রয়োজন হয়, তাহলে তার উচিত স্ত্রীকে চাকুরী থেকে মুক্ত রাখা। অথবা তাকে বেশী মাত্রায় সহযোগিতা করা। কেননা স্ত্রী চাকুরী করে পুরুষকে খাওয়াবে এজন্য সে দায়িত্ববান নয়! এসব মানুষের নিকট পুরুষের অবয়ব থাকলেও সে পুরুষত্বহীন। মানুষের পুরুষত্ব নারীর প্রতি কিল-ঘুষিতে থাকেনা, তা লুকিয়ে থাকে তাদের প্রতি সাহাযার্থে। আমাদের সমাজে মূলত এটাই বড় সমস্যা। রাসুল (সাঃ) এর মত বিখ্যাত ব্যক্তিও স্ত্রীদের সাংসারিক কাজে সহযোগিতা করেছেন। পুরুষ যদি এটাতে অপমানিত বোধ করেন, মূলত সেই প্রকৃতই পরুষত্ব ও ব্যক্তিত্বহীন; সে কোনদিন মর্যাদাবান হয় না। বলছিলাম নারীত্ব নিয়ে।
নারীত্ব হল নারীর সবচেয়ে বড় গুন। নারীত্বের সাথে বিদ্যা-শিক্ষার কোন সম্পর্ক নাই; আছে ভালবাসা আর দায়িত্ববোধের সাথে। বস্তুত বিদ্যা-শিক্ষার সাথে পুরুষত্বেরও কোন সম্পর্ক নাই। আমরা তো কবিতার সেই চরণ দুটো পড়েই শিক্ষিত হয়েছি, ‘গ্রন্থগত বিদ্যা আর পরহস্তে ধন, নহে বিদ্যা নহে ধন হলে প্রয়োজন’। কবিতার এই চরণ দুটোই হতে পারে আজকের সময়ের নারীত্বকে যথাযথ সংজ্ঞায়িত করার জন্য উপযুক্ত। নারী-পুরুষ রোজগারের আশায় যদি লেখা-পড়া করে তাহলে দুনিয়ার কোন লেখাপড়াই ভাল আয়ের জন্য যথেষ্ট নয়া। নতুবা বিদ্যাহীন মানুষকে তো না খেয়ে মরতে হত! মূলত, লিখা-পড়া করা হয়, মানুষ হবার জন্য। স্রষ্টা-সৃষ্টি, সত্য-মিথ্যা, ভাল-মন্দ, শঠ-উপকারী, ঠগবাজ-প্রতারক, দোস্ত-দুষমন, বিষ-মধু ইত্যাদির পার্থক্য নির্ণয়, মৌলিক গুণাবলি সম্পর্কে ধারণা অর্জন করাই বিদ্যা শিক্ষা অর্জনের মূল লক্ষ্য। যারা অনেক অর্থ ব্যয়ে, উচ্চ বিদ্যা অর্জন করে চাকুরী তথা চাকর হবার জন্য, এতে তাদের জীবনে হতাশা আসবেই।
নারী যতই ক্ষমতাশালী হউক, রান্না তার হাতেই শোভা পায়, এর মজাও তাদের হাতে বেশী। গৃহস্থালি কর্ম, সংসার গোছানো, পরিবার সাজানো, সন্তানের যত্ন, স্বামীকে প্রীতময় শাসন, অভিমান, মজাদার রান্না ও নাস্তার পরিবেশন নারীদের হাতেই বেশী আকর্ষণীয় ও উপাদেয় হয়। নারীরা যতই চেষ্টা করুক না কেন এসব থেকে নিস্তার পায় না। এগুলো ছেড়ে দিয়ে নারীরা যদি চাকুরী করে, তিনি নিজেই অতিরিক্ত কাজের দায়িত্ব কাঁধে নিলেন মাত্র। আগের দায়িত্ব তাঁকে ছেড়ে যাবেনা। বাসায় ফিরে এসে নিজ থেকেই কোন না কোন ভাবেই তিনি সাংসারিক কাজে জড়িত হয়ে যাবেন। একেবারে চোখ বন্ধ করে থাকলেও পারবে না! চোখ মেলার সাথে সাথেই সাংসারিক বৈসাদৃশ্য তাঁর চোখে আগে ধরা পড়বে এবং সমাধানে তাঁকেই ভূমিকা রাখতে হয়। তা না করলে তিনি নিজেই অস্বস্তিতে থাকবেন। এটা নারীদের অন্যতম মৌলিক গুন।
কাজ করাটাকে যদি নারীত্বের অপমান মনে করা হয়, তাহলে মানবজাতি ধ্বংস হবে। একটা ছবিতে আমরা দেখেছি আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিজ হাতে রান্না করছেন। কই! এই ছবি নিয়ে কাউকে তো টিপ্পনী মারতে দেখিনি। যারা তাঁর দুষমন তারাও তো এটা নিয়ে হাসা-হাসি করেনি! বরং প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও একজন নারীর হৃদয় থেকে নারীত্বের অনুভূতি লোপ পায়না; সেই ছবিতে এটাই বেশী প্রকাশ পেয়েছে! জেলে যাবার পরও কত মহান পুরুষেরা ক্যান্টিনের রান্না খেয়েছে কিন্তু জনগণ দেখেছে দেশের দু’জন নেত্রী তাদের জেল জীবনে নিজেরা রান্না করে খেয়েছেন। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই।
কবি নজরুলের নারী কবিতার একটি চরণ দিয়ে শেষ করব।
রাজা করিতেছে রাজ্য-শাসন,
রাজারে শাসিছে রানী,
রানির দরদে ধুইয়া গিয়াছে,
রাজ্যের যত গ্লানি।
পুরুষ হৃদয়হীন!
মানুষ করিতে নারী দিল তারে,
অর্ধেক হৃদয় ঋণ।
যে রাজা রাজ্যের সকল প্রজা শাসন করে, তাকে শাসন করতে পারে একজন নারী। রাজা কে শাসনের মূল অস্ত্রই হল ‘হৃদয়’ এর কর্ম। এই হৃদয়, এই কর্ম, এই আকর্ষণ, এই আতিথেয়তা নারীত্বের মাঝেই লুকিয়ে থাকে; নারীর মাঝে নয়! একজন নারী, তার স্বীয় নারীত্বের এই গুন ধীরে ধীরে বিকাশ সাধন করতে পারে। বিদ্যা শিক্ষা এখানে প্রভাবকের কাজ করে মাত্র। তবে বিদ্যা শিক্ষা অর্জন করে যদি এই নারীত্বকেই ঘৃণা করে, তাহলে তিনি নারীত্ব-হীন স্বত্বা। তাঁর দ্বারা আর যাই হোক কিন্তু বিকাশ সাধন করার মত কোন বংশ তার ঔরসে হবে না! এটা সুনিশ্চিত!

Discussion about this post