শাঁ শাঁ শাঁ…. কড় কড় কড়াৎ….! অবিরাম মহা প্রলয়ের ঘনঘটা বাড়ছে। প্রতিটি ক্ষণে শরীরের লোমকূপ খাড়া হয়ে যাচ্ছে! ভয়ে আতঙ্কে ছোট ভাই বোনদের শরীরের সমুদয় লোম খাড়া হয়েছে অনেক আগেই! তা আর স্তিমিত হবার লক্ষণ নেই। মহা-প্রলয়ে অবলম্বন
বাহিরের প্রকৃতি যেন নিজে নিজের উপর প্রতিশোধ নিচ্ছে! ঘরের পাশেই দাঁড়ানে নারকেল গাছের বিরাট কাণ্ডটি শূন্যের উপরে তুলার ন্যায় চক্কর মেরে, শত মাইল গতিতে, অন্য গাছের উপরে আঘাত হানছে; তখন আর বুঝতে বাকি রইল না যে, এই রাতটাই হবে পৃথিবীর জীবনের সর্বশেষ রাত!
সবাই উচ্চস্বরে দোয়া পড়ছি, বাঁচার সম্ভাবনা অনেক আগেই তিরোহিত হয়েছে! মৃত্যুর অজানা থাবাটা কিভাবে আসবে, তার জন্য চরম উৎকণ্ঠা আর বিভীষিকাময় আতঙ্ক নিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত পার করছি। বাবা বহু আগে থেকেই চিৎকার করে দোয়া পড়ছেন, “সোবহানাল্লাহে ওয়াল হামদুলিল্লাহে ওয়া লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবর”।
আরো পড়তে পারেন….
দোয়ার কোন অর্থ জানিনা, এই দোয়া আগে কখনও শুনিনি। তবে আমাদের একমাত্র নির্ভরযোগ্য আশ্রয়দাতা পিতার আতঙ্কিত রক্ত শূন্য সাদা চেহারা দেখে বুঝলাম; এই দোয়ার বরকতে হয়ত বাঁচার ক্ষীণ সম্ভাবনা আছে নতুবা নয়! কয়েকটি তাজা প্রাণ, নিশুতি রাতের গভীর আঁধারে, একটি হ্যারিকেন বাতিকে ঘিরে, ভেতরে-বাহিরে অন্তহীন হতাশা নিয়ে, হৃদয়ে ভয়াবহ তাণ্ডব অনুভব করে চলছি। মনে হচ্ছিল বহুকাল ধরেই এই ভয়-বিহব্বলতা আমাদের ঘিরে ধরেছে। তিন বছরের ছোট অবুঝ বোনটি ডাঁশের মত চোখ পাকিয়ে, ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে আছে! সেও বুঝে গেছে বাহিরের বিকট গর্জন, হাজারো আতঙ্কিত কণ্ঠের চিৎকার, সাহায্যের আশায় কর্কশ আর্তনাদ; কখনও খুশীর নয়, বরং তা এক মহা-প্রলয়ের পদধ্বনি।
বাবা চাকুরী জীবনের প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে যে ক’টি টাকা পেয়েছিলেন; সেটা দিয়ে কয়েক বন্ধু মিলে ব্যবসা শুরু করেন। তন্মধ্যে একবন্ধু সমুদয় টাকা নিয়ে ব্যবসায়ীক মালামাল আনতে গেলে; সর্বহারাদের কবলে পড়ে, টাকা সহ তিনি চিরতরে হারিয়ে যান! যাকে আর কোনদিন পাওয়া যায়নি। ফলে বাবাকে দীর্ঘদিন সে অসহায় পরিবারের ঘানি টানতে হয়েছে। সর্বহারা সদস্যরা নিজেদের চিন্তা বাস্তবায়নে, আরো চারটি পরিবারকে সর্বস্বান্ত করে ও সর্বহারাদের কিছু সংখ্যা বৃদ্ধি করেছেন মাত্র! সবকিছু হারিয়ে বাবা একপর্যায়ে পথে বসেন। অবশেষে পৈত্রিক ভাবে প্রাপ্ত সম্পদ বিক্রি করে, চাচাদের পরামর্শে, চট্টগ্রাম শহরের স্টিল মিল এলাকায় ব্যবসা শুরু করেন।
সুখে-দুঃখে পরিবারকে তিনি সর্বদা সাথে রাখতেন। বাবার সরকারী চাকুরীর সুবাদে আমরা দেশের বহু জায়গায় থাকার ও বহু জায়গা দেখার সুযোগ পেয়েছিলাম। এত কষ্টের মাঝেও সব হারানো পিতা, তিনি তার সন্তানদের গ্রামের বাড়ীতে রেখে আসতে ইচ্ছুক ছিলেন না। তাঁর কথা ছিল; সন্তানেরা বাবার দুঃখ কষ্ট নিকট থেকে দেখলে, পিতা-মাতার প্রতি দয়াশীল হয়, এমনকি সন্তানেরা কখনও কল্পনা মুখী জীবন বাছাই করেনা।
ফলে তিনি স্টিল মিল এলাকায় একটি বাড়ী ভাড়া নিলেন; যার পিছনে ছিল বড় পুকুর। তখনও সেখানে দালান-কোটার বাসা ভাড়া চালু হয়নি। জীবনে এই প্রথম, বাবা আমাদের জন্য ছাদ বিহীন একটি টিনের চাউনি ঘরে থাকার ব্যবস্থা করলেন। বারবার মনে পড়ল, গ্রামের দোতলা বাড়ীটির কথা, যার চারিদিকে প্রশস্ত বারান্দা, সামনে-পিছনে বিরাট উঠান। সেই বাড়ি ফেলে, শহুরে জীবনের এই বাড়ীটিতে উঠেছি। তারপরও আনন্দিত ছিলাম এ কারণে যে, আমি বাবাকে খুব ভালবাসতাম, তিনিও আমাকে সর্বক্ষণ না দেখলে পাগল হতেন।
বিকাল থেকেই হালকা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছিল, পুরো আকাশ গুমোট বাঁধা। সারাদিন সূর্যের আলোর দেখা নাই, পুরো আকাশটাই ধূসর-কালো হালকা মেঘে ঢাকা। রেডিও-টিভিতে অনবরত ঘোষণা চলছে, সন্ধ্যার মধ্যেই ঘূর্ণিঝড় চট্টগ্রাম উপকূলে আঘাত হানবে, তাই ১০ নম্বর মহা বিপদ সঙ্কেত ঘোষণা করা হল। আমি এ এলাকাতে আসার পরে, এ ধরনের দুবার বিপদ সংকেত মোকাবেলা করেছি, এটা তৃতীয় দফার ১০ নম্বর মহা বিপদ সঙ্কেত! আগের দুটি সংকেত দেখে বুঝে পেরেছিলাম মহা বিপদের ধরণ কেমন হয়। অভিজ্ঞতার আলোকে ততটা আমলে নেবার মত মনে হল না।
অতীত অভিজ্ঞতায়, পরিপূর্ণ বাতাস শুরু না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোকান বন্ধ করতে দেখি নাই। তবে আজকের বিপদ সঙ্কেতে কাষ্টমার ফিরিয়ে দিয়ে, দোকান বন্ধ করে, ঠিক সন্ধ্যার আগেই বাবাকে বাসায় ফিরতে দেখলাম! সবাইকে আগে-ভাগে খাইয়ে দেবার জন্য মাকে তাগাদা দিলেন। আমি ১৩ বছরের কিশোরী, বড় বোন, ছোট দু’বোন ও এক ভাই। ছোটরা যথাক্রমে ৯ বছরের এক বোন, ৬ বছরের একমাত্র ভাই ও ৩ বছরের ছোট বোন। ঘটনাক্রমে তখন আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিল আমার বৃদ্ধা নানী ও আমারই বয়সে ছোট, জেঠাত বোন। এই ক’জন বাবার নির্দেশে আগে ভাগেই খানা খেয়ে জড়সড় হয়ে বসে আছি। বাহিরে তখন ১০ নম্বর মহা বিপদ সঙ্কেতের ঘনঘটা। আমার সচেতন মা সন্ধ্যার আগেই, সবকিছু ভালভাবে গুছিয়ে-গুটিয়ে নিয়েছেন। সবাই আল্লাহর কাছে বিপদ থেকে মুক্ত থাকার জন্য দোয়া করছি।
আমাদের বাসস্থানের আশে পাশে খুবই ঘন বসতি এবং গাছ-গাছালী দিয়ে ভরা। এক মাইল পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে, পাহাড় সম উঁচু শহর রক্ষা বাঁধ। সাধারণত এই বাঁধ থেকেও এক মাইল দূরে বঙ্গোপসাগরে পানির দেখা মিলে। এই বাঁধের কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে জেলেদের পাড়া, আছে নানাবিধ অস্থায়ী বাসস্থান সহ ছিন্নমূল বস্তিবাসীর বিক্ষিপ্ত আবাস! হাজার হাজার মানুষ এখানে মাছ নির্ভর ব্যবসা করে। এসব আবাসস্থল উত্তরে-দক্ষিণে অনেক মাইল ব্যাপী বিস্তৃত।
চট্টগ্রাম শহরের এই জায়গাটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও জনবসতিপূর্ণ এলাকা। এখানে রয়েছে দেশের প্রথম ই,পি,জেট যেখানে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের আয়ের কেন্দ্রস্থল (বর্তমানে কয়েক লক্ষ)। নৌ-বাহিনী ও বিমান বাহিনীর বিভাগীয় সদর দপ্তর ও ঘাঁটি, এখানেই। বিমান বন্দর, মেরিন একাডেমী এখানেই অবস্থিত। দেশ খ্যাত স্টিল মিল সহ, আরো অনেক মিলের অবস্থান ছাড়াও এটি দেশের একমাত্র ব্যস্ত সমুদ্র বন্দর! সকালে-বিকালে লক্ষ লক্ষ মানুষের জন-স্রোত দেখলে তাজ্জব হতে হয়, এই এলাকা কত লক্ষ খেটে খাওয়া ও নিরন্ন মানুষের আশ্রয় স্থল!
রাত ১০ টার দিকে হালকা বাতাস শুরু হল; ১২ টার দিকে বাতাসের তীব্রতা অস্বাভাবিক বেড়ে গেল। দেয়ালের ফাঁক দিয়ে দেখা গেল, কোন আস্ত গাছ দাঁড়িয়ে নেই! সুপারি গাছ গুলো যেন মাটিতে সেজদাবনত! কোমর সোজা করার কোন সুযোগই পাচ্ছেনা। ঘরের টিন, গাছের ডাল, চেয়ার, টেবিল, খাট সহ যাবতীয় আসবাস পত্র আকাশে শূন্যের মাঝে তীব্র গতিতে একে অপরের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত রয়েছে। আবার সেগুলোর বিক্ষিপ্ত কিছু ততোধিক তীব্র গতিতে কখনও কারো ঘরের উপর আছড়ে পড়ছে। শূন্যের মাঝে সংঘর্ষের সে এক সাংঘাতিক দৃশ্য! গতি প্রাপ্ত বস্তুর পতনের আঘাতে ছোট-খাট ঘরগুলো মুহূর্তেই চিড়ে-চ্যাপ্টা হয়ে যাচ্ছে!
বাতাসের তীব্র গতির দাপটে, মানুষের ক্রন্দন চিৎকার বহু আগেই হার মেনেছে! মুহূর্তে মুহূর্তে পরিবর্তন হচ্ছে পরিবেশ-পরিস্থিতি। আকাশে ঘূর্ণায়মান বস্তুর মহা দামামার বিকট আওয়াজে, মানুষের অসহায়ত্ব চাপা পড়েছে। মহা-আতঙ্কে, রক্ত শূন্য চেহারার একদল মানুষ অসহায়ত্বকে পূঁজি করে গুঁটি মেরে বসে আছি। একটি অলৌকিক সাহায্যের প্রত্যাশায়, কান্না ও চিৎকারের কথা সবাই ভুলে গেছে। ‘ভাড়া বাসার শহুরে সমাজে, কার উদ্দেশ্যে, কেবা সাহায্যের আশায় চিল্লিয়ে থাকে’? এ পরিস্থিতিতে নীরব গলায় আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া ব্যতীত বিকল্প কোন উপায় থাকেনা! সর্বক্ষেত্রে আল্লাই একমাত্র ভরসা, তাই বিপদে-মুছিবতে সর্বদা মানুষ আল্লাহর কাছাকাছি হয়।
মনে হল বাহিরে আওয়াজের হঠাৎ পরিবর্তন এসেছে; তাই খটকা লাগল। বাবাকে বললাম দরজাটা একটু খুলে দেখুন। তিনি কড়া ভাষায় জানালেন, ‘কোন অবস্থাতেই দরজা খুলবেন না’। যদি দরজা খুলে, তাহলে বাতাসের গতির সাথে তিনি পারবেন না!
খেয়াল করে দেখলাম দরজার ফাঁক গলে, ঘরের ভিতর পানি ঢুকছে! ইশারায় ৬ বছর বয়সী ছোট ভাইকে বললাম, ‘তোমার প্রস্রাব ধরেছে বলে কান্না কর’। আমার মন চাইছে, পানি গলিয়ে পড়া দরজাটা খুলে দেখি! মহা-প্রলয়ে অবলম্বন
ছোট ভাই ও আমার চাপাচাপিতে বাবা কিছুটা সায় দেয়। হয়তবা তাঁর মনেও খটকা চেপে বসেছিল। তিনি ছোট ভাইকে তাঁর দু’পায়ের মাঝে শক্ত করে আটকিয়ে, দরজাটা একটু মাত্র ফাঁক করেছেন। দরজার ফাঁকে সামনে তাকিয়ে অজানা ভয়াবহতা দেখে তিনি শুধু একটি চিৎকার দিতে পেরেছিলেন, ‘পালাও!।
কিছু বুঝে উঠার আগেই, প্রবল বেগে ঘরের ভিতরে পানি ঢুকে গেল। মুহূর্তের মাঝে আমরা সবাই উলট পালট খেয়ে ভেসে উঠলাম, ঠিক ঘরের চাল বরাবর উপরে। একেবারে উপরে টিনের কাছাকাছি! ঘরের সমুদয় জিনিষও আমাদের সাথে ভেসে উঠল। জীবন যাপনের তাকিদে যে সমস্ত আসবাব কেনা হয়েছিল, সেগুলো নিজের অস্তিত্ব রক্ষার তাগিয়ে আমাদের সাথে ভেসে উঠল, এখন সেগুলোর ধাক্কায় নিজেদের জান যাবার যোগাড়। মালামালের চাপাচাপির মাঝে, দো-চালা টিনের ঠিক উপরের ফাঁকে একবার নিঃশ্বাস নেবার সুযোগ পেয়েছিলাম। তখনি বুঝতে পারলাম ঘরের টিনের উপরেও পানির স্রোত বয়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ আমাদের পুরো ঘরটি এখন পানির নিচে।
অসম্ভব অন্ধকারের ভিতরে সবাই ঘরের ভেতরে ভাসছি। এক হাতে ছোট বোনকে ধরেছি। নানু চাচাত বোনকে ধরতে পেরেছেন! মায়ের কোলে সবচেয়ে ছোট বোন থাকার কারণে, মায়ের সাথে সেও ভেসে উঠল। বাবা ও ছোট ভাই শুরুর মুহূর্তেই কোথায় যেন, হারিয়ে গেল বুঝতে পারলাম না। তারা কি বেঁচে আছে! এমন ধারণা মাথায় ঢুকানোর পর্যাপ্ত সময় নাই!
শুধু এক মুহূর্ত ভাবলাম; ‘আল্লাহ যে কেয়ামতের কথা বলেছিলেন, এটা সেই কেয়ামতের শুরু কিনা’! আর ভাবার সময় কোথায়? প্রতিটি সেকেন্ড মহা মূল্যবান, উপরে নীচে প্রবল বেগে ছুটছে পানি। ঘরের ভিতরে বাতাস কমে আসায়, পানি উভয় দিকে আমাদের চেপে ধরেছে। টিনের চালার নীচের ফাঁকে, কিছু অক্সিজেন লুকিয়ে ছিল, সেটুকু সজোরে টেনে নেয়া মাত্রই,পানির এক প্রবল ধাক্কায় পুরো বাড়ীর টিনের চালটি মুহূর্তে উল্টে গেল! একটু আগেও কিঞ্চিত বাতাসের অভাবে যেখানে মরতে বসেছিলাম, ঘরের চাল চলে যাওয়াতে বাতাসের প্রচণ্ড খোলা গতি ও পানির প্রবল ধাক্কার মুখে সেখানে নতুন করে আবার মরতে চলেছি। ঘরের চাল চলে গেলেও আমরা ঘরের চার দেওয়ালের মাঝেই ভেসে-ভেসে ঘুরপাক খাচ্ছি। এক পর্যায়ে পানির স্রোতের দাপটে, ঘরের দেওয়ালও হার মানে। পানির ধাক্কা সামলাতে না পেরে কঠিন দেওয়াল পানির মাঝেই শুয়ে পড়ে! ক্ষণিকের মধ্যেই বাড়িটি হারিয়ে যায়! তীব্র গতি-প্রাপ্ত টিনের চালের পেছন পেছন আমরাও এক মুহূর্তে ভেসে গেলাম।
সে রাত ছিল পূর্ণিমার রাত! পৃথিবীর সকল রাতের মাঝে পূর্ণিমা হল সবচেয়ে সুন্দর, আকর্ষণীয়। পূর্ণিমার কারণেই রাতের আঁধারের দুঃখ বুঝে মানুষ। তবে আজকের পূর্ণিমা প্রকৃতির উপর ভয়াবহতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছে, ক্ষুদ্ধ মরণ আক্রোশ নিয়ে! তবুও দিনের মত সব কিছু, সব দূরত্ব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। ঝড়ের তাণ্ডবে সবাই ভেসে চলছি, সবার আতঙ্কিত কান্নার স্বর শুনতে পাচ্ছি। আমার পাশেই মাকে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করলাম! তিনি চিৎকার করে উঠলেন, হায়! হায়! লায়লা ফসকে গেছে! ঐ, ঐ তো ডুবে যাচ্ছে সে। হাত পা নাড়ানো অবস্থায় কাদা পানি খেতে খেতে সামনেই তলিয়ে যাচ্ছে তিন বছরের ছোট বোনটি!
গায়ের সমুদয় শক্তি জোগাড় করলাম, বোনটির তলিয়ে যাবার স্থানে ঝাঁপিয়ে পড়লাম! একটা পা ধরতে পারলাম! বুঝলাম না কার পা! হ্যাঁচকা টানে উপরে ভাসালাম। নিথর দেহের একটি বাচ্চা উঠে এলো, মা বললেন হ্যাঁ, লায়লা। বুঝলাম না বেঁচে আছে কিনা। সবাই চলমান স্রোতের সাথে ভেসে থাকার জন্য লড়ছি। মনে হল একটি বড় পুকুরের উপর ঘূর্ণায়মান ভাসছি, সম্ভবত আমাদের পুকুরটিই। দুই বোনের পরিচিত ডাক শুনতে পেলাম। আওয়াজ বরাবর যেতে চেষ্টা করলাম, পারলাম না। যায়গাটিতে সবকিছু জমে বিরাট জটলার সৃষ্টি হয়েছে।
কেন জানি এখানে পানির স্রোত কম, আমিও ডাকতে রইলাম। তাদের ডাকের সাড়া পেলাম, কাছাকাছি ভিড়াটা কঠিন হয়ে উঠল। গাছ, কাঠ, টিন ও আসবাব পত্রের সাথে, অসংখ্য মানুষের লাশ; গরু, ছাগল, কুকুর, বিড়াল, হাঁস, মুরগী, কাকের লাশ ভাসছে। বাবা আর ছোট ভাই ছাড়া সবাই আছি, একপর্যায়ে পুকুরের কুণ্ডলী থেকে সাঁতরিয়ে কোনমতে একত্রিত হলাম।
যেই না, একে অন্যের হাত ধরে চিন্তা করছি কি করব; ঠিক সেই মুহূর্তে বিশাল আকৃতির আরেকটি ঢেউ আমাদের উপর আছড়িয়ে পড়ল! সে যাত্রায় আমরা ডুবে যাওয়া থেকে রেহাই পেলেও, মুহূর্তের মধ্যে পানি ফুলে-ফেঁপে পাশের একটি ভবনের দুই তলা পর্যন্ত ঢুবিয়ে নেয়। অধিক গাছ পালা থাকার কারণে ঢেউ গুলো উপর দিয়ে না এসে, নিচের দিকে পানি ফুলে যাবার মাধ্যমে প্রকাশ ঘটল।
আবারো পানির তীব্র স্রোত তৈরি হল, প্রচণ্ড স্রোতে যেদিকে ভেসে যাচ্ছি, তার একটু সামনেই প্রকট বিস্ফোরণ ঘটে, দাউ দাউ করে পানির উপরে আগুন জ্বলে উঠল। পুরো পানিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ল। বুঝতে পারছিনা কি করা উচিত। নিজেদের উপর নিয়ন্ত্রণ নাই, সোজা আগুনের উপর দিয়েই আমাদের গতি! মহা-প্রলয়ে অবলম্বন
অবশেষে আগুনে পুড়েই মরতে হবে! আগুন কুণ্ডলীর কাছাকাছি পৌঁছামাত্র, পানির আরেকটি প্রবল ধাক্কা! সবাই চিৎকার করে উঠলাম। মুহূর্তে তাকিয়ে দেখি আগুন এখন আমাদের পিছনে পড়ে গেছে! বুঝতেই পারিনি ঢেউয়ের একটি ধাক্কায় এতটুকু পথ দ্রুত পাড়ি দিয়ে ফেলেছি! পেছন থেকে শুনতে পাচ্ছি, অনেক মানুষের আতঙ্কিত কণ্ঠস্বর আর চিৎকার। বুঝলাম, রেল রাস্তার পাশে যে গ্যাস সংযোগ কেন্দ্র ছিল, সেটা ভেঙ্গে গেছে; ফলে সেখানে কোনভাবে আগুন ধরেছে এবং সেটি বিপদের মাত্রাকে আরো ভয়াবহ করে দিয়েছে।
স্রোত আমাদেরকে একটি পাঁচ তলা ভবনের সামনে দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। দূরে থেকে অনুমান করলাম, ভবনের দুই তলা পর্যন্ত ঢুবে গেছে। তৃতীয় তলার গ্রিল লাগানো বারান্দায় কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। বাতাসের গতি অনেক কমে গেছে, পানির বন্যা থই থই করছে, বিক্ষিপ্তভাবে স্রোত তৈরি হচ্ছে।
আমাদের নজর যখন ঠিক পাঁচ তলা ভবনের দিকে, ঠিক তখনই পানির নীচে অনেকেই তার কাঁটার জালে আটকা পড়েছি। পায়ের নীচে অগণিত লাশ আটকা পড়েছে, এ যেন একটি বিশাল লাশের দেওয়াল। অগণিত লাশ আগে থেকেই আটকা পড়ার কারণে আমরা ক্ষত-বিক্ষত হলেও, প্রাণে রক্ষা পেয়েছি!
স্থানীয় প্রভাবশালীরা দুই ভাই, আজন্ম শত্রু, কারো চেহারা কেউ দেখে না। শত্রুতার পরিমাণ ও হৃদয়ের দূরত্ব বুঝানোর জন্য, উঁচু সীমানা প্রাচীরের আরো উপরে, দুই তলা পরিমাণ উচ্চতায় কাঁটা তার বসিয়েছে। পানির উচ্চতা আর তার কাটার উচ্চতা প্রায় সমান হওয়ায়; বহু জীবন্ত মানুষ এই মরণ ফাঁদে মরেছিল। আমাদের আটকে পড়ার মুহূর্তে নতুন ঢেউ না থাকায়, মাংস ছিলে বহু কষ্টে উদ্ধার পেয়েছিলাম। পা দুটো ফালা ফালা হয়ে যায়! তাছাড়া ঐ তারে আটকানো টিনের টুকরা, কাঠের সাথে লাগানো পেরেক ও তারের সূচাগ্র কাঁটা পুরো শরীর ক্ষত বিক্ষত হয়ে যায়। আরেকটি ঢেউ আসার আগেই, অনেকে পোশাকের মায়া ত্যাগ করে, অবধারিত মৃত্যুর জটলা থেকে উদ্ধার পায়!
সাঁতরিয়ে সেই পাঁচ তলা ভবনের, দ্বিতীয় তলার ফ্লোরের রড ধরে ভাসতে পারলাম। এই প্রথম বাঁচার জন্য ক্ষুদ্র একটি নির্ভরতা পেলাম। এটি এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তির বাড়ি। তারা অতীতে অনেক দুঃখ কষ্টে বড় হয়েছেন। একদা তাদের বংশের একজন জাহাজ থেকে লাফিয়ে, সমুদ্রে সাঁতরিয়ে আমেরিকার উপকূলে উঠতে পেরেছিলেন। আমেরিকার টাকায় তারা বড় মানুষ হিসেবে পরিচিত এবং বর্তমানে অর্থ সম্পদ আর ক্ষমতার মালীক। আজ আমরা তকদিরের নির্মম কষাঘাতে, তার ভবনের দ্বিতীয় তলার ফ্লোর ধরে ভেসে আছি এবং সাহায্যের জন্য অরণ্য রোধন করছি। একটি বাক্য শুনে মনে হল, আমাদের রোধন আমাদের দিকেই ফিরে এসে ধ্বনিত প্রতি-ধ্বনিত হচ্ছিল, তা কারো হৃদয়ে পৌঁছেনি।
ঘরের ভিতর থেকে কঠোর কণ্ঠে দারোয়ানের প্রতি নির্দেশ জারি হল। কাউকে ঘরে ঢুকতে দেবেনা! ভেজা শরীরে ঢুকে সব বরবাদ করে দেবে! সৌভাগ্য নাকি দুর্ভাগ্য জানিনা, কোনভাবে ভবনের সিঁড়ি ঘরে ঢুকার পথ আবিষ্কার করলাম এবং তৃতীয় তলায় ঘরে ঢুকার জন্য যেখানে দাঁড়াতে হয়, সেখানে গিয়ে দাঁড়াতে পারলাম।
কলাপসিবল গেট বন্ধ, ভিতরে দারোয়ান বসা। অনুরোধ করলাম, আমাদেরকে যেন সকাল পর্যন্ত তাদের বারান্দায় বসার সুযোগ দেয়! আবেদন যথারীতি প্রত্যাখ্যাত হল এই ভয়ে যে, শরীরের ভেজা কাপড়ের পানি ঘর ভিজিয়ে দিবে, দামী জিনিষ নষ্ট হবে!
বললাম, “সকালে যাবার সময় ভেজা ঘর, মুছে পরিষ্কার করে দিব।”
উল্টো নির্দেশ আসল, “যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকেই যেন সরে যাই।”
বললাম, আমাদের শরীরের পানিতে ঘর ভিজে যাবে বলে ঘরে ঢুকার অনুমতি দিলেন না। ইতিমধ্যে আপনাদের দুটি ফ্লোর পানির নীচে তলীয়ে আছে। বাহিরে হাজার হাজার মানুষ মরেছে। এর পরে আরেকটি ঢেউ আসলে অন্যদের মত, আমাদের সাথে, আপনাদেরও মরতে হবে।
আবারো বললাম, আমাদের সবাই আহত, ছোটবোন আর নানীর নাকে-মুখে লবণাক্ত কাদা পানি ঢুকেছে। নিঃশ্বাস নিতে পারছেনা, অন্তত একটু পরিষ্কার পানি দিন, তাহলে অন্তত তাঁদের বাঁচিয়ে রাখতে পারব। মহা-প্রলয়ে অবলম্বন
দারোয়ান এক মগ পানি নিয়ে আসলেন এবং মগটাকে গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দিতে চেষ্টা করলেন। তার প্রচেষ্টা বার বার ব্যর্থ হল; এবার দারোয়ান ভয়ে ভয়ে কলাপসিবল গেট খুলল! পানি দিতে এসে আমাদের কাঁপুনি, স্বল্প বসনে দেহ এবং ক্ষত বিক্ষত রক্তার্থ শরীর দেখে, তার দিলে দয়ার উদ্রেক হল। তিনি আমাদের ইশারা দিলেন, চিৎকার না করে এখানে বসে পড়ুন, সকালেই বের হয়ে যাবেন!
শেষ রাতের দিকে, বাতাসের তাণ্ডব বন্ধ হল, সকালের আলোতে দেখলাম চারিদিকে থৈ থৈ পানি। যতটুকু নজর যায় শুধু লাশ আর লাশ। রাস্তার দিকে দেখতে পেলাম, চারিদিকে কেয়ামতের আলামত। কোথাও একটি গাছ আস্ত দাঁড়িয়ে নাই, একটি ঘরও অক্ষত নাই, ভেঙ্গে যাওয়া গ্যাস কেন্দ্রের আগুনের মাত্রা আরো বেড়েছে। পানি একটু কমেছে, রাত্রে সাঁতরিয়ে যে স্থান দিয়ে সিঁড়িতে ঢুকেছিলাম, সে স্থানটি এখন আমাদের মাথার উপরে। এক তলা পর্যন্ত উঁচু বাড়ীগুলো তখনও পানির নীচে! শরীরের ক্ষতস্থান গুলো ফ্যাকাসে হয়ে গেছে, জানিনা কি পরিমাণ রক্ষ ক্ষরণ হয়েছিল তবে তখনও রক্ত ঝড়ছিল।
সন্ধ্যা-সকাল ব্যবধানে একটি সরব জনপদের এই বিরান পরিণতি দেখে সবার কান্না শুরু হল। নতুন করে ভাবা শুরু করছি, এখন কি করা যায়! আমার বয়স ১৩ হলেও এই অসহায় মানুষগুলোর জন্য এই মুহূর্তে আমিই প্রধান অভিভাবক। কেউ মুখে কিছু না বললেও, সবাই ধরে নিয়েছে পিতা ও ৬ বছর বয়সী একমাত্র ছোট ভাইয়ের পরিণতি অন্য দশ জনের মতই হয়েছে। ভাবছি যদি তাদের লাশগুলো পাওয়া যায়, তাহলে অন্তত মনকে সান্ত্বনা দেওয়া যাবে। কিভাবে এই বিপদ-ঘনঘটা দিনের যাত্রা শুরু করব, কোথা থেকে শুরু করব ভেবে পাচ্ছিনা! এখানে আমাদের কোন আত্মীয় স্বজন নাই। ঘরের চাল উল্টিয়ে আল্লাহ অলৌকিকভাবে ভাবে আমাদের ভয়াবহ বিপদ থেকে প্রাণে বাঁচিয়েছেন, আশা করা যায় যে, বাকি পথ গুলো তিনি ভালভাবে সমাধা করার সুযোগ দিবেন।
ঠিক এমন সময় কাউকে যেন আমার নাম ধরে ডাকতে শুনলাম! ঢুবে যাওয়া বাড়ী গুলোর সীমানা প্রাচীরের একটির মাথা পানির উপর থেকে বের হয়েছে। তার উপরে দাড়িয়ে এক কিশোরী সুনসান নিরব, বিরান জনবসতির দিকে তাকিয়ে সজোরে চিল্লাচ্ছে! হ্যাঁ, এটি আমার খুবই পরিচিত কণ্ঠস্বর! আমারই সহপাঠী ‘জিন্নাত আরা’। এলাকায় স্থানীয় মেয়ে, ক্লাস মেট, এখানে আসার পর আমার প্রথম বান্ধবী।
সে জানেনা আমাদের কি অবস্থা, আমাদের বাসা তার চিৎকারের উৎসস্থল থেকে বহু দূরে। তারপরও মনের টানে, মনুষ্যত্বের টানে, ভোর বেলাতেই সে বের হয়েছে প্রথমে আমার খবর নিতে। সে নিজেই একটি পথ আবিষ্কার করে, বাড়ী-ঘরের দেওয়ালের উপর দিয়ে এতটুকু এসেছে। ‘এটাকেই সৌভাগ্য বলে, না হলে মাইলের পর মাইল বিরান জনপদের, এক ক্ষুদ্র বালিকা, তার চেষ্টায় যতটুকু যাওয়া যায়, সেখানে গিয়ে যার উদ্দেশ্যে হাঁক ছেড়েছে, সে তা শুনতে পেয়েছে’!
তাকে চিল্লায়ে আমাদের বেঁচে থাকা ও বাপ-ভাইকে হারানোর কথা জানালাম। উত্তরে জানাল, মূল সড়কে হাজার হাজার লাশ পড়ে আছে। জীবিত ও আহত মানুষেরা লাশ সংগ্রহ করছে, তুমি আমার সাথে আস, সেখানে হয়ত কারো লাশ পেয়ে যেতে পারি। আমরা উভয়ে শারীরিক ভাবে তখন পাতলা ছিলাম, তাই তার দেখানো পথে, আপন জনের লাশের সন্ধানে, দেওয়ালের উপর দিয়ে হাঁটা দিলাম। জিন্নাতের সাথে যাবার সময় একটু পিছনে ফিরে তাকাই, দু’চোখে জল ফেটে আসছিল! চরম আহত মা আর নানু ততক্ষণে বিত্তশালীর ঘরের ভিজানো বারান্দার পানি মুছতে শুরু করেছে! ‘মূলত স্বার্থপর মানুষ যতই বিত্তবান হউক না কেন তার নিকট থেকে তার নিজের আত্মাও উপকৃত হয়না’।
বিমান বন্দরে যাবার মূল সড়কে নামার পর, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিনা, কত শত লাশ বিকৃতভাবে রাস্তার পাশে শোয়ানো। প্রচণ্ড গতির উচ্চমাত্রার ঢেউ এসব লাশকে এখানে রেখে গেছে। পানি কমাতে মাটিতে আটকে পড়েছে। তার চেয়েও অনেক বেশী পরিমাণ লাশ জোয়ারের পানিতে ভাসছে আর রাস্তার পাশে ভিড়ছে!
ক্ষতি হয়নাই এমন মানুষ সে দিন সে উপকুলে ছিলনা। উপস্থিত মানুষেরা যে যার মত করে মানবাত্মার সেবায় নিজেকে কাজে জড়িত করছে। বেশীর ভাগ লাশের শরীরে কাপড় নাই, তাই শুধুমাত্র মহিলাদের লাশগুলোকে টুকরো কাপড় দিয়ে ইজ্জত আব্রু ঢাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মহা-প্রলয়ে অবলম্বন
অবশেষে সেখানে কাপড়ের অভাব দেখা দিল। আমি বাবা ও ছোট ভাইয়ের আকৃতির যত লাশ পাচ্ছি, প্রতিটি পুরুষের লাশ উল্টিয়ে বাবা ও ভাইকে খুঁজছি; আর উদভ্রান্তের মত সী বীচের দিকে দৌঁড়াচ্ছি। পানির কাছাকাছি ভাসতে থাকা লাশগুলোও পরখ করে দেখছি, হয়ত সেখানে আপনজন কেউ থাকতে পারে? আমার সহমর্মী বান্ধবী আমাকে সেভাবে ক্লান্তিহীন সহযোগিতা দিচ্ছে। সে যদি সাথে না থাকত, দীর্ঘ চার কিলোমিটার পর্যন্ত বাবা-ভাইয়ের সন্ধানে শত শত লাশকে উল্টিয়ে দেখার মত হিম্মত পেতাম না।
অল্প শোকে কাতর, অধিক শোকে পাথর হয়ে, কান্নার কথা ভুলে গেছি। বুঝতে পারছি রাত্রে কেয়ামতের চোবলে, চোখের পানি শুকিয়ে গেছে। হারানো বাবা-ভাইকে খোঁজতে এসে, ইতিমধ্যে মা-বোনদের কিভাবে রেখে এসেছি তা ভুলে গেছি! সামনে একটি লাশকে ভাসতে দেখে এই প্রথম থমকে দাঁড়ালাম। কাট-গড়ের এই জায়গাতে এখনও কেউ উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেনি। মনে হল এ জায়গার এক জন মানুষই বেঁচে নাই। ঢেউয়ের আওয়াজ ছাড়া, চারিদিকে অসম্ভব নীরবতা। লাল শাড়ী, লাল ব্লাউজ পড়া লাশ; হাতে চুড়ি, কানে দূল, নাকে নোলক, গলায় তখনও স্বর্ণের হাঁর খানা লেপ্টে আছে। হিন্দু নব বধুই হবে; হয়ত আজকের রাতে বিয়ে ছিল, মাথায় লাল সিঁথি তখনও স্পষ্ট চিক চিক করছে।
ঘূর্ণিঝড়ের প্রথম প্রহরে আমরা দু’জন কিশোরী এই বিরান জনপদের প্রথম সাক্ষী। আপনজনের লাশটি হাতে পাবার আশায় অনর্থক অধিক দূরত্ব অতিক্রম করে এতটুকু এসেছি বুঝতে পারিনি। আরো যেতে চাইলাম, এই প্রথম জিন্নাত ওদিকে আর না যেতে বারণ করল। মহাপ্রলয়ে অবলম্বন
পুনরায় একই পথে ছুটলাম, ততক্ষণে নতুন ভাবে আরো হাজারো লাশ জড়ো হয়েছে। একইভাবে প্রতিটি লাশ চেক করতে করতে পুরানো গন্তব্যের দিকে ছুটলাম। দু’জন কিশোরী মেয়ে আপন জনের লাশের সন্ধানে, শত শত লাশ উল্টিয়ে দেখার ভৌতিক দৃশ্য কেমন হতে পারে, তা কেবল দিব্যদৃষ্টির প্রবল কল্পনা শক্তি সম্পন্ন মানুষই বুঝতে পারবে। বন্দর টিলা ঈশা খাঁ গেইটের সামনে যখন পৌঁছি তখন মধ্যাহ্ন পেরিয়ে গেছে। ততক্ষণে উদ্ধারকারী মানুষ ও লাশের সংখ্যা দুটোই বেড়ে গেছে। আর কত লাশ দেখব? কোথায় দেখব? কাকে প্রশ্ন করব? কোন কূল কিনারা করতে পারছিনা।
ততক্ষণে মনে হল প্রচণ্ড খিদে ও পিপাসায় আক্রান্ত হয়েছি। শরীর আর চলছে না, সেই রাত ১০ টা থেকে পরদিন দুপুর পর্যন্ত প্রায় ১৪ ঘণ্টা প্রকৃতির সাথে লড়াই করে চলছি। আমাদের স্কুলের সামনে একটি নলকূপ ছিল, পানির আশায় সেদিকে ছুটলাম। রাস্তার ওপারে গতরাত্রে এসব এলাকাও পানিতে ভেসেছিল, তবে পানি হয়েছিল গলা পরিমাণ, তাই সম্পদের ক্ষতি হলেও, প্রাণের ক্ষতি হয়েছে কম। যখনি নলকূপের কাছে গেলাম, জিন্নাত শুনতে পেল, আমার নাম ধরে কেউ একজন তার কন্যাকে খুঁজে ফিরছে!
খেয়াল করে শুনলাম হ্যাঁ ঠিক তাই, আমার নাম ধরে ডাকছে, তবে সেটি আমার বাবার গলা নয়, পরিচিত কারো কণ্ঠও নয়। তিনি কোনদিকে, কোথা থেকে চিৎকার করে ডাকছেন শত চেষ্টা করেও বুঝতে পারলাম না। পানি পান করার কথা ভুলে গেলাম! গায়ের সমুদয় বল, গলায় হাজির করে চিল্লায়ে বললাম; ‘মেরী এখানে’। বার বার, কয়েক বার, চিল্লানো হল, মনে হল তিনি আমার গলা শুনেতে পেয়েছেন। আবার বললাম ‘মেরী স্কুলের সামনে’।
খানিক পরেই দেখলাম, একটি লোক উদভ্রান্তের মত ছুটে আসছে; পুরো গায়ে কাদা, ধুসর চামড়া, শুধু লুঙ্গি খানা পরনে, তাও ফাটা। তিনি মাঠের মাঝ দিকেই ছুটে আসছেন, পরিষ্কার চিনতে পারলাম না তাঁকে! আরো কাছাকাছি হলাম! হ্যাঁ! তিনিই আমার বাবা! আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরলাম! জানিনা কতক্ষণ-কতসময় পিতা-কন্যা এভাবে ছিলাম।
আমিই প্রশ্ন করলাম, বাবু কই? তিনি কোন উত্তর না দিয়ে উল্টো প্রশ্ন করলেন, আমার মা কই? তাঁকে জানালাম সবাই কমবেশি আহত, তবে সবাই জীবিত আছে। এবার বলুন বাবু কোথায়?
দীর্ঘক্ষণ থামলেন, কি যেন চিন্তা করছেন! ঘর থেকে বের হয়ে, কি কি পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। তিনি মাথায় আনতে চেষ্টা করলেন কিন্তু সবার দুঃচিন্তায় তিনি সব ভুলে গেছেন! মহা-প্রলয়ে অবলম্বন
অবশেষে মনে করতে পারলেন, আমরা যে পরিমাণ জায়গা ভ্রমণ করে তাদের লাশের সন্ধান করেছি, তিনি ইতিমধ্যে সেসব জায়গা আমাদের সন্ধানে, কয়েকবার বার ঘুরে এসেছেন। তারপর এতটুকু মনে করতে পারলেন যে, ‘বাবুকে’আমাদের বাসার পাশে নির্মাণাধীন ভবনের উপরে খালি আকাশের নীচে রেখে এসেছিলেন। তিনি যখন তাকে রেখে নীচে নামছিলেন, সে সময় পানির দ্বিতীয় ধাক্কাটা আঘাত হানে। এক মুহূর্তে নির্মাণাধীন ভবনের প্রায় সবটুকুই ঢুবে যায়।
একটু পরে তিনি প্রায় সাঁতরে বাসার দিকে যেতে চেষ্টা করেন; ঢেউয়ের পরবর্তী প্রচণ্ড ধাক্কায় সে এলাকাতে অবশিষ্ট যা ছিল, সব কিছুই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। তিনিও সে স্রোতের ধাক্কায় হারিয়ে যান এবং কিভাবে প্রাণে বেঁচেছেন, সেটা মাথায় আনতে পারছেনা। সকাল বেলা সাঁতরিয়ে তিনি প্রথমে বাবুর সন্ধানে গিয়েছিলেন; আমাদের বাসা কিংবা বাবুকে রেখে আসা বাড়িটির কোন হদিস তিনি পাননি। কেননা সকল বাড়ীগুলোই পানিতে ভেসে গিয়েছিল, কোন গাছেরই কাণ্ড ছিলনা, বাকী সব পানির নিচেই তলিয়ে ছিল। যার কারণে ঠিকানা চিহ্নিত করা কঠিন ছিল।
পানি পান করার কথা আগেই ভুলে গিয়েছি। এই প্রথম আপন জনের জন্য কান্না আসল। আমার নাদুস-নুদুস একমাত্র ভাইটির চেহারা মনের পর্দায় ভেসে উঠল। তার শান্ত-সুন্দর চেহারা দেখলে, রাগান্বিত মানুষের গোস্বা ঠাণ্ডা হয়ে যেত! পাশের বাসার মানুষ বুঝতে পারত না যে, আমাদের কাছে একটি ছেলে বাচ্চা আছে। সে ছিল আমরা তিন বোনের কাছে ‘টেডি বিয়ারের’মত। আদর পাওয়া ব্যতীত তার অন্য কোন আবদার থাকত না, কিছু চেয়ে জেদ করত না, যেটা দিতাম সেটা পেয়েই উৎফুল্ল হত।
প্রশ্ন করলে কি চাই তোমার? বলত আপনি যা দেন! তাকে খুশী করা ছিল একেবারে সহজ। প্রতিবেশী বহু মানুষ শুধু তাকে দেখার জন্য, আমাদের ঘরে ক্ষণিকের মেহমান হতেন। সব বোনেরা মিলে শবে ক্বদর, শবে বরাতের রাতে; একটি ভাইয়ে আশায় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতাম। সে ধরনের একটি আদরণীয় ভাই পেয়েও দুর্ভাগ্যজনক ভাবে হারালাম! বাবা বললেন, তুমি মায়ের কাছে যাও, বাবুকে খুঁজতে আমি আবারো যাচ্ছি।
সকাল বেলা বাবা-ভাইকে খুঁজতে গিয়ে, নতুন করে আমিই হারিয়ে গেছি। সেজন্য মা-নানুর কান্নার নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। তাদের কে সেই বাড়ীর সিঁড়িতেই পেলাম। বাবার জীবিত থাকার কথা শুনে মনে হল তাদের দুর্বল শরীরে শক্তি ফিরে এসেছে!
কিছুক্ষণ পরেই বাবা ছোটভাইকে জীবিত উদ্ধার করে আমাদের কাছে পৌঁছলেন। সবার সে কি আনন্দ! লেখায় বুঝানো দুষ্কর। ওখানে বাড়ী ঘরের কোন হদিস ছিলনা, আমাদের বাসায় একটি দেওয়াল, নির্মাণাধীন ভবনের খালি পিলার গুলোই দাড়িয়ে ছিল। ভবনের ইট, সিমেন্ট মাটি সহ সব উদাও হয়ে যায়। তাছাড়া সকালে ওসব পানির নিচেই ছিল, যার কারণে বাবা সেটিকে চিহ্নিত করতে পারেনি! বাবা কৌতূহল বশত: তল্লাশি করতে গিয়ে দেখে, বাবু ছোট্ট ইটের গাঁথুনির আড়ালে সেভাবে বসে আসে, যেভাবে বাবা তাকে রেখে গিয়েছিলেন। সে উপুড় হয়ে ছিল, অসম্ভব কাঁপছিল, তখনও বৃষ্টির গুড়ি গুড়ি ফোঁটা তার দেহের উপর আছড়ে পড়ছিল। আমরা সবাই একসাথে লড়াই করলেও ষোল ঘণ্টা সে একাকী সেখানেই ছিল। অবশেষে বাবা দোকানের খবর নিতে গেলেন। গিয়ে দেখলেন সেখানে কোনকালে দোকান ছিল, তার কোন অস্তিত্বই বর্তমান নাই। দু’দিন পরে বাবা আমাদের বাসায়, কাদায় আটকানো ব্যবহার্য ঘড়িটি উদ্ধার করেন। সেটির কাঁটা তখন রাত ১ টা ১০ মিনিটে এসে বন্ধ হয়ে যায়!
এটা ছিল ১৯৯১ সালের ২৯ শে এপ্রিলের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের রাত। যেটাকে “Super Cyclonic Storm BOB 01” হিসেবে অভিহিত করা হয়। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বরিশাল, ভোলা ও নোয়াখালী সহ দেশের প্রায় অর্ধেক অংশে এটি আঘাত হানে। পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়াবহতম ঘূর্ণিঝড় গুলোর মধ্যে এটিও একটি। ২৫০ কিমি তথা ১৫৫ মাইল গতি সম্পন্ন ঘূর্ণিঝড়, ২০ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসের মাধ্যমে দেশের বিশাল অংশ ধ্বংস করে দেয়। সরকারী হিসেব মতে ১ লক্ষ ৩৮ হাজার, বেসরকারি হিসেবে প্রায় ৬ লক্ষ মানুষ মারা যায়। এক কোটি মানুষ আশ্রয়হীন হয়ে পড়ে। আমার পিতাও আমাদের সবাইকে এক কাপড়ে নিয়ে, চিরতরে নিঃস্ব হয়ে যান, এই ঘূর্ণিঝড়ের কবলে পড়ে। আমাদের হারানোর আর কিছুই ছিলনা, দুঃচিন্তা গ্রস্ত বাবাকে, মা সান্ত্বনা দেন। কোন চিন্তা করোনা, আমার কাজের ডিমান্ড আছে, আমি চাকুরী করব তোমার সংসারে উপকার হবে। আমি কি বলে বাবাকে সান্ত্বনা দিব বুঝতে পারছিনা; তারপরও বললাম. আমি ছোটদের লালন পালনের দায়িত্ব নেব! বাবা আজ বেঁচে নেই; তবে বাবার সাথে কৃত ওয়াদা আমি অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলাম।
স্কুলের একটি রুমে আমাদের আশ্রয় হল; না খেয়ে, না পড়ে পরবর্তী রাত খানা সেখানে কাটাতে হয়েছিল। বড় বিভীষিকাময় ছিল সে রাত! সামান্য সাহায্য দেবার উছিলায়, ঘূর্ণিঝড় থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষগুলো খোদার কৃতজ্ঞতার কথা ভুলে গেল। সে অবস্থায়ও তারা অসহায় নারীদের উপর থেকে লোলুপ দৃষ্টি সরাতে পারেনি। কার কি হয়েছে জানিনা, আমার বাবা একটি বড় চাদর যোগাড় করেছিলেন এবং স্কুল কক্ষের এক কোণে জড়ো-সড় করে বসিয়ে, চাদর দিয়ে আমাদের সবাইকে ঢেকে রেখেছিলেন! তখনও আমাদের পেটে কিছু পড়েনি; শরীরের বড় ক্ষতস্থান গুলো থেকে হালকা রক্ত ঝরছিল। বিবেকহীন মানুষের তত্ত্বাবধানে কাটানো সে রাত ছিল, ২৯ শে এপ্রিলের রাতের চেয়েও ভীতিকর ও কঠিন! পরদিন প্রত্যূষেই মামা এসে পড়েন এবং আমরা তার সাথে চলে যাই।
২৯ শে এপ্রিল বার বার আসে। স্মৃতিগুলো সব স্বপ্ন হয়ে ধরা দেয়। ইতিমধ্যে বাবা এবং নানু দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। সেই ভাই বোন বড় হয়েছে, তারাও তাদের মত করে জীবন বেছে নিয়েছে। আজ আমরা একে অপর থেকে অনেক অনেক দূরে। স্বার্থপরতার জীবন, স্বার্থের কারণে আপনজনকে দূরে ঠেলে দেয়।
সবাই তার অতীত ভুলে যায়। এখনও মনে পড়ে সেই বিত্তশালী ব্যক্তির দয়ার কথা, যার পূর্ব পুরুষ একদা ভাগ্যের অন্বেষণে সাঁতরিয়ে আমেরিকার উপকূলে উঠেছিল। আমরা কিছু নারী ও শিশু সাঁতরিয়ে তার ঘরের ফ্লোর ধরে ভেসেছিলাম। তার মনে গলেনি; অন্ধ বিবেক তাকে আমাদের কাপড়ের পানিতে ঘর ভিজার ভয় দেখিয়েছিল! অথচ আল্লাহ তখনও তার ভবনের দুটি ফ্লোর পানির নীচে রেখেছিলেন! চাক্ষুষ জলজ্যান্ত উদাহরণও তাদের দিলে কখনও চিন্তার খোরাক জোঠায় না।
আমরা সর্বস্বান্ত হয়েছি ২৯ শে এপ্রিলের তাণ্ডবে। যাকে এক কথায় বলে, রাস্তায় নেমে যাওয়া। তারপরও কারো জীবন থেমে থাকেনি। প্রতিনিয়ত সময় এবং প্রতিকূলতার সাথে লড়াই করে এ পর্যন্ত এসেছি। আল্লাহ কিছু মানুষকে কর্তব্যানুভূতি দিয়ে সৃষ্টি করেন, তাদের উপর অন্যরা সহায় হয়। কিছু মানুষ শুধু নিজেকে নিয়েই ভাবতে ব্যস্ত, তারা অকৃতজ্ঞ হয়। এসব মানুষ যত বড় ধনী কিংবা জ্ঞানী হোক, তাদের দিয়ে কোন কল্যাণ আশা করা যায়না। উপরে তার প্রমাণ বিদ্যমান পেয়েছি।
আমরা যেখানকার বাসিন্দা ছিলাম, সেখানকার প্রতিটি পরিবারে হয় সবাই মারা গেছে নতুবা কেউ না কেউ মরেছেন। কোন পরিবারে কেউ না মরে থাকেনি। যাদের একতলা পাকা দালান ছিল, তাদের সবাই মরেছে। কেননা তারা ভেবেছিল, দালান তাদেরকে বাতাস থেকে রক্ষা করবে। তারা পানি নিয়ে চিন্তা করেনি! যখন তাদের উপরে পানি এসেছিল, প্রত্যেকে নিজের ঘরে মরেছে। যাদের ঘর সেমি পাকা ছিল উপরে ছাদ ছিল, তারাও মরেছে। আমাদের ঘরের উপরে কোন ছাদ ছিলনা, আর সে ঘরে বেশীর ভাগ মানুষ ছিল মহিলা ও শিশু। আমি সে ঘরকে নিয়ে একদা মন ছোট করেছিলাম। আল্লাহ আমাদের কে সে ঘরের বিপদ থেকে শুরু করে, প্রতিটি কঠিন মুহূর্তের বিপদ হতে বাঁচিয়ে দিয়েছেন।
মাছ ধরার মত করে অতি-প্রিয় ছোট বোনকে ডুব দিয়ে উদ্ধার করেছি, সেও বেঁচে গেছে। এগুলো মানুষের কোন কৃতিত্ব নয়, সব আল্লাহর রহমতের কারণেই হয়েছে। মহাপ্রলয়ে তিনিই আমাদের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন। সেদিন যিনি বেঁচে গেছেন এবং যিনি মরে গেছেন, তারা সবাই কেয়ামতের আলামত দেখেছেন। সেদিনের প্রতিটি প্রলয় দোলায়, মানুষ, মাটি আর পাথর একাকার হয়ে গিয়েছে। এখনও মনে করি সেই রাতের কথা, হয়ত বেঁচেছিলাম কিছু ভাল কাজ করতে পারার জন্য, অসহায় ভাই-বোনদের জন্য এবং আজকে লিখে যেতে পারার জন্য। প্রতিটি জীবিত মানুষের জন্য একটি কেয়ামত এখনও অপেক্ষা করছে, সেটি হল তার মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। সে সন্ধিক্ষণে হিসেব করার সময় থাকেনা, তাই প্রত্যেক মানুষের উচিত তার হিসাব ঠিক রাখা এবং নিজের অবলম্বন ধরে রাখা।


Discussion about this post