বাংলা সন সৃষ্টিতে মুসলমানদের রয়েছে বিরাট অবদান। পৃথিবীর দুটি বিখ্যাত ক্যালেন্ডারের সাথে মুসলমানদের আছে বিরাট ঐতিহ্য ও ইতিহাস। বাংলা ও হিজরি সন দুটোই সৃষ্টি করেছে মুসলমানেরা। ‘সন’ ও ‘তারিখ’ দুটিই আরবি শব্দ। সন অর্থ হল ‘বর্ষ’ বা ‘বর্ষপঞ্জী’ এবং তারিখ অর্থ ‘দিন’। আরবিতে ‘তারিখ’ দ্বারা ইতিহাসও বুঝিয়ে থাকে। ‘সাল’ হচ্ছে একটি ফারসি শব্দ, যার অর্থ হল বৎসর। বাংলা সনের সূত্রপাত হয়েছে আরবি হিজরি সনের ওপর ভিত্তি করে। বাংলা-নববর্ষে-মুসলমান
একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে জলবায়ু, অঞ্চল ও বিরাট রাষ্ট্রীয় কাজ আঞ্জাম দিতে, সময়ের প্রয়োজনেই বাংলা সনের উদ্ভব হয়। আগে সরকারী খাজনা আদায় করা হত চন্দ্র সনের হিসেবে। এতে বছরে ১১ দিন সময় কমে যেত। যার ফলে ফসলের ঋতুর মিল থাকত না। কৃষকেরা উৎপাদিত ফসল খেয়ে ফেলার পরে, সরকার খাজনা নিতে আসত। তাতে মানুষের হাতে না থাকত ফসল, না থাকত অর্থ। এটা সমাধান করতে একটি সৌর সনের দরকার হয়ে পড়ে। মোগল সম্রাট হুমায়ুনের পুত্র সম্রাট আকবর ১৫৮৪ সালের এক নির্দেশে রাজ-জ্যোতিষী আমীর ফতেহ উল্লাহ সিরাজি বহু চিন্তা-ভাবনার পর প্রচলিত হিজরি সনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন সৌর সন উদ্ভাবন করেন। সেই সৌর সনের রাষ্ট্রীয় নাম হল ফসলী সন তথা আজকের ‘বাংলা সন’।
উল্লেখ্য ৯৬৩ হিজরি তথা ১৫৫৬ সালে সম্রাট আকবর ক্ষমতায় আরোহণ করেন। তাঁর ক্ষমতারোহণ কে চিরস্থায়ী করতে সেদিনই বাংলা সনকে ৯৬৩ সাল ঘোষণা করে পিছন থেকে হিসাব করে নূতন এই সৌর ক্যালেন্ডার চালু করেন। উল্লেখ্য হযরত ওমর (রাঃ) তাঁর ক্ষমতা কালে পিছন থেকে হিসেব করে রাসুল (সাঃ) এর হিজরতের তারিখ বের করে হিজরি সন চালু করেন। সেই একই পদ্ধতি আকবরের রাজ জ্যোতিষী অনুসরণ করে বাংলা সন চালু করেন। হিজরি সনের প্রথম মাস মহরম; বাংলা সনের প্রথম মাস বৈশাখের সাথে সম্পৃক্ত করেই বাংলা ক্যালেন্ডার পূর্নাঙ্গ করা হয়। এতে করে যেদিন বাংলা সন চালু হয়, সেদিনই তার বয়স হয়ে যায় ৯৬৩ বছর। হিজরি সন চন্দ্র ক্যালেন্ডার এবং বাংলা সন সৌর ক্যালেন্ডার দুটিই মুসলমানদের সৃষ্ট দুটি জগত বিখ্যাত পঞ্জিকা হিসেবে আজো পৃথিবীতে চালু আছে। বাংলা-নববর্ষে-মুসলমান
ভারতের বর্তমান জাতীয় সনের নাম শকাব্দ, প্রাচীন ভারতের ‘শক’ দের স্মরণে এই সালের উৎপত্তি। বাংলা বার মাস ও দিন গুলোর নাম গ্রহণ করা হয়েছে শকাব্দ থেকেই। শকাব্দে দিনের নাম গুলো গ্রহের নামে এবং মাসের নাম গুলো নক্ষত্রের নামে ব্যবহার করা হয়। বাংলাতেও একই আঙ্গিকে তাই ব্যবহৃত হচ্ছে। শকাব্দ ছাড়াও ভারতে গুপ্তাব্দ, বিক্রমাব্দ, বুদ্ধাব্দ, লক্ষণাব্দ সহ আরও বহু সাল চালু ছিল; এগুলোর মাঝে বৈচিত্র ও ব্যবধানও ছিল। গুপ্তাব্দের বছর শুরু হত চৈত্র মাসে; বিক্রমাব্দের বছর শুরু হত কার্তিক মাসে। বাংলা সনের বছর শুরু হচ্ছে বৈশাখ থেকে। বাংলার এই সাল পরিপূর্ন ফসলের সাথেই সম্পর্কিত। এটাকে অনেকে ধর্মীয় রূপ দিয়ে নতুন বছরে কল্যাণ আসা, গত বছরের অকল্যাণ ঝেঁটিয়ে বিদায় করার সাথে কোনই সম্পর্ক নাই। যদিও মিডিয়াতে এ ধরনের কথাই প্রকাশ পায়।
বাংলাদেশের এই ক্যালেন্ডারেও মাসের হিসেব করতে কিঞ্চিত সমস্যা ছিল। শতভাগ সঠিক ছিলনা, ১৯৬৭ সালে ঢাকাস্থ বাংলা একাডেমী কর্তৃক বহুভাষাবিদ জ্ঞানতাপস ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর তত্ত্বাবধানে বাংলা সনের যুগোপযোগী সংস্কার সাধিত হয়। অধিবর্ষের ব্যবস্থাসহ দিন ও তারিখাদির অনিয়ম সংশোধন করে নিম্নবর্ণিত সিদ্ধান্তসমূহ গৃহীত হয়:
(১) মোঘল আমলে বাদশাহ আকবরের সময়ে হিজরি সন ভিত্তিক যে বঙ্গাব্দ প্রবর্তন করা হয় তা থেকে বছর গণনা করতে হবে।
(২) বাংলা মাস গণনার সুবিধার্থে বৈশাখ থেকে ভাদ্র পর্যন্ত প্রতি মাস ৩১ দিন হিসেবে এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র পর্যন্ত ৩০ দিন পরিগণিত হবে।
যাক, যারা ইতিহাসকে স্বীকার করেন না বা যারা ইতিহাস সম্পর্কে অজ্ঞ, তারাই মনে করেন যে, বাংলা সন অমুসলিমদের দ্বারা প্রবর্তিত একটি বর্ষপঞ্জী। এটা মোটেও ঠিক নয়। সংস্কৃতি পালনের নামে বাংলা নববর্ষে যা হয় সেটা যদিও মুসলমানদের সংস্কৃতি নয়। বরং সেটাও হয়েছে তারা নিজেরা নিজেদের হাত গুটিয়ে বার ফল। জায়গা যখন খালি থাকে তখন সেটা শূন্য থাকেনা, কেউ না কেউ দখল করবেই। এই খালি জায়গা অন্যদের দখলে সমর্পণ করার জন্য মূলত প্রকৃত মুসলমানেরাই দায়ী। ইতিহাস এবং বাংলা নববর্ষ দায়ী নয়।


Discussion about this post