পৃথিবীর অনেক মানুষ আছেন, যারা তাদের দাড়ি-মোচ রাখতে পছন্দ করেন, যাতে তাকে আকর্ষণীয় লাগে। আবার পৃথিবীর অনেক মানুষ এমনও আছেন যারা তাদের দাড়ি-মোচ ছেঁটে মুখখানা তেলতেলে করে রাখেন, যাতে তাদেরও আকর্ষণীয় লাগে। মানুষ দাড়ি-মোচ রাখতে চাইল কি চাইল না, এটা তার সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করেনা। সময় হলেই দাড়ি নিজে নিজেই জন্মানো শুরু করে। মানুষ শুধুমাত্র সিদ্ধান্ত নিতে পারে, সেটা রাখবে কি রাখবে না?
আজকাল দাড়ি-গোঁফ-জুলফি একটি ফ্যাশনের বিষয় বস্তু হয়ে গিয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, বিভিন্ন ধরনের মানুষ, তাদের নিজ ইচ্ছানুযায়ী দাড়ির ডিজাইন করে থাকে। তবে উৎকৃষ্ট ডিজাইন করার জন্য চাই গালভরা দাড়ি। গালে যদি দাড়িই না থাকে ডিজাইন করবে কি দিয়ে? তাছাড়া দাড়ি তো হাওলাত করে লাগিয়ে ডিজাইন করা যায়না!
মানুষ ছাড়াও সৃষ্টি কুলের কিছু প্রাণীর কাছেও দাড়ি দেখা যায়। গৃহ পালিত প্রাণীর মধ্যে ছাগল, ভেড়া, দুব্বা, হরিণ, উটের কাছেও কখনও দাড়ি দেখা যায়। কদাচিৎ দেশীয় মুরগীর কাছেও দাড়ি দেখতে পাওয়া যায়। ঠোটের থুতনির নীচে হালকা পালকের একগুচ্ছ বান্ডিল দেখা যায়, এ জাতীয় মুরগীগুলো খুবই ক্ষিপ্ত প্রকৃতির হয়। যে সমস্ত প্রাণীর দাড়ি আছে, সচরাচর বাজারে তাদের দাম ও কদর বেশী। দাড়িযুক্ত এ প্রাণীগুলোকে আলাদা ভাবে বৈশিষ্ট্য মণ্ডিত করে।
প্রাচীন কালে দাড়ি খুবই সম্মানের প্রতীক ছিল। সকল রাজা-বাদশাহ বিভিন্ন ডিজাইনের দাড়ি রাখতেন। মন্ত্রী-সেনাপতি নিজেরা নিজেদের দাড়ির জন্য আলোচিত হতেন। দাড়ি ছিল শৌর্য-বীর্য ও আভিজাত্যের প্রতীক স্বরূপ। সেনাবাহিনীর প্রতিটি সৈন্য বাহাদুরির সহিত দাড়ি রাখতেন। জনসাধারণ ইচ্ছা করলেই দাড়ি রাখতে পারতেন না। তাদের জন্য দাড়ি রাখা ছিল অন্যায় ও উচ্চ পদের ব্যক্তির প্রতি অবজ্ঞার সামিল। সরকারী চাকুরে জীবী কেউ বড় কর্মকর্তা হলে কিংবা বড় প্রমোশন পেলে, অফিসিয়াল ভাবে তার কাছে দাড়ি রাখার অনুমতি মিলত। তারপরও সৌখিন কেউ যদি দাড়ি রাখতে চাইত তার জন্য একটা নির্দিষ্ট খাজনা ধরা হত। যতদিন তিনি দাড়ির খাজনা চালাবেন ততদিন তিনি দাড়ি রেখে শহরে-বাজারে খুব অহঙ্তার করে চলতে পারতেন। দাড়ির আইন প্রাচীন গ্রীক ও পারস্যের সর্বত্র কঠোরভাবে মানা হত।
প্রাচীন রোমে ২০ বছর বয়স না হওয়া পর্যন্ত কেউ দাড়ি কাটতে পারত না। যেদিন ২০ বছর পূর্ণ হবে, সেদিন আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দাড়ি কাটা হত। রোম সম্রাট ‘নিরো’ তার দাড়ি কাটার দিনটিকে জাতীয় দিবস করেছিলেন। প্রতি বছর এ দিনে জনগণ আনন্দ উল্লাস করত। রোমানেরা গ্রীকদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিবাদে, দাড়ি শেভ করত অথবা দাড়িকে চামড়া ছাটা করত। তখন গ্রীক বাসী শিক্ষা-শিল্পে-মর্যাদায়-শৌর্যে শ্রেষ্ঠ ছিল, তাই রোমানেরা হিংসা পূর্বক দাড়িওয়ালা গ্রীকদের অসভ্য-বর্বর হিসেবে চিত্রিত করত।
গ্রীক-বীর আলেকজান্ডার যখন ক্ষমতায় আসেন, তখন তিনি সেনাবাহিনীকে দাড়ি কেটে ফেলার জন্য আদেশ দেন। দাড়ির উপর আলেকজান্ডারের কোন অভিযোগ ছিলনা। যুদ্ধক্ষেত্রে তিনি দেখেছেন, গ্রীক সৈন্যদের লম্বা দাড়ি নিয়ে যুদ্ধ করতে সমস্যা হত। এই লম্বা দাড়ি নিয়ে যুদ্ধ করে ছোট একটি যুদ্ধেও বেশী সৈন্য হতাহত হত। ফলে যুদ্ধ জয় করার নিমিত্তে, সেনাবাহিনীর সদস্যদের তিনি দাড়ি ফেলে দিতে আদেশ করেন।
আলেকজান্ডার অল্পদিনেই রোম দখল করেন, দক্ষিণে তার বড় প্রতিপক্ষ রাজা ‘দারায়ুসকে’ পরাজিত করেন। দারায়ুসের পরাজয়ে পারস্য (বর্তমান ইরান) আলেকজান্ডারের পদানত হয় এবং তিনি তার মেয়ে ষ্টেটেইরা-২ কে বিয়ে করেন। আলেকজান্ডার পারস্যেও দাড়ির আইন রহিত করেন। তখনও ভারত, চীন, জাপান ও কোরিয়া উপদ্বীপে দাড়ির বিভিন্ন ব্যবহার প্রচলিত ছিল।
আলেকজান্ডার বর্তমান আফগান অঞ্চলে প্রবেশ করেন, সেখানে রাজা ‘পুরু’কে গ্রেফতার করেন। তবে সেখানকার জনগোষ্ঠীর উপর দাড়ির ফরমান তিনি জারি করতে সক্ষম হননি। এখনও সে অঞ্চলের প্রায় মানুষের মুখে দাড়ি শোভা পায়, বংশগত এবং ধর্মগত ঐতিহ্য হিসেবে তারা দাড়িকে যত্ন ও সম্মান করে। প্রাচীন মিশরে ফারাও রাজারা দাড়ির প্রতি যথেষ্ট সম্মান রাখতেন। তারা দাড়িকে দামী ধাতব চুঙ্গার মধ্যে ভরে রাখতেন, পরে যখন তা বাড়তে থাকত, সেটাকে স্বর্ণ নির্মিত সূতা দ্বারা পেঁচানো হত। স্বামীর মৃত্যুর পর দাড়ি-গুচ্ছের উত্তরাধিকারী হত স্ত্রী। তারা বিশ্বাস করত পরজন্মে এই দাড়ি চুঙ্গাই হবে সাফল্যের সকল চাবিকাঠি।
বর্তমানে দাড়ির যুগ বদল হয়েছে, বাহারি দাড়িওয়ালা ব্যক্তিদের দুনিয়াতে এখন যথেষ্ট কদর। বিগত ৩ অক্টোবর ২০১৫ সালে অষ্ট্রিয়ায় হয়ে গেল “বিশ্ব দাড়ি চ্যম্পিয়নশীপ প্রতিযোগিতা”। ১৯৯৫ সাল থেকে প্রতি দু’বছর অন্তর অন্তর বিশ্ব সেরা দাড়ি প্রতিযোগীতার আয়োজন চলছে। এটার জন্য পৃথিবীর দেশে দেশে আছে ‘দাড়ি ক্লাব’। বার্বাডোজ ওয়েষ্ট-ইন্ডিজের একটি দ্বীপের নাম, এটি বহু বছর স্প্যানিশদের দখলে ছিল। স্প্যানিশ ভাষায় বার্বাডোজ শব্দের অর্থ হল ‘দাড়িওয়ালা’! ত্রয়োদশ শতাব্দীর এই নাম, বার্বাডোজের অধিবাসীরা এখনও ধারণ করে আছে। কিউবার নেতা ফিদেল ক্যাস্টোর বিপ্লবী বাহিনীর নাম ছিল ‘বার্বোডোস’ তথা ‘দাড়ি বাহিনী’। দাড়ির বিভিন্ন দিক ও খ্যাতি রয়েছে। বিশ্বের সবচাইতে লম্বা দাড়ির অধিকারী একজন ভারতীয়। ‘শারওয়ান সিং’ নামের এই শিখ ভদ্রলোকের দাড়ির দৈর্ঘ্য ছিল ১.৮৯৫ মিটার। তিনি ২০০৮ সালে গ্রীনিজ বুকে, নিজের আগের রেকর্ড ভাঙ্গেন। ‘ভিভিয়ান হুয়েলার’ নামের আমেরিকান ভদ্র মহিলার দাড়ি ছিল ১১ ইঞ্চি লম্বা! এ পর্যন্ত লম্বা দাড়িযুক্ত মহিলার মধ্যে তিনিই দীর্ঘতম দাড়ির অধিকারিণী।
দাড়ির অভিনব ব্যবহারের মধ্যে ভারতীয়রা অগ্রগণ্য! এক সাধু এক ধরনের দাড়ি রাখল তো, আরেক সাধু অন্য ধরনের রাখবে। এভাবে ব্যতিক্রম করতে করতে হাজারো ব্যক্তির কাছে হাজারো রকমের দাড়ি পাওয়া যায়। জটলা দাড়ি, পোটলা দাড়ি, শামুক দাড়ি, শিং দাড়ি, লতা দাড়ি, জটা দাড়ি এসব হাজারো দাড়ির দু-একটি নাম। এক সাধুর দাড়ি লম্বায় যেমন, ঘনত্বেও তেমন। তিনি সেটা গলায় পেঁচিয়ে ঠাণ্ডার সময় মাফলার হিসেবে ব্যবহার করতেন! ঘুমানোর সময় বুকের উপর দাড়ি বিছিয়ে দিত, ফলে মশা-মাছি-ছারপোকা দাড়ি ভেদ করে কামড়াতে পারত না। দাড়িতেই সাবান মেখে সেই দাড়ি দিয়েই গামছার কাজ সাড়তেন! মুখমণ্ডল ও ঘাঢ় ঘষার কাজ করতেই এই লম্বা দাড়ি দিয়েই। গঙ্গায় পুণ্যস্নান করতে আসা সাধুদের দেখলে বুঝা যায় কত প্রকারের দাড়ি আছে ভারতবর্ষে ও কি বিচিত্র তার ব্যবহার।
দাড়ি-মোচে একাকার হলেও কেউ সুবিধা নিতে ভুলে না। এটা নিয়ে একটি কৌতুকলী কথা বাজারে রটে আছে। একদা বন্ধুর এক অনুষ্ঠানে রবী ঠাকুর ও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিমন্ত্রণ করা হয়েছিল । ভারী আমিষ খাবেন না বলে, খাদ্য তালিকায় সিদ্ধ ডিমের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। অর্ধেক ডিম খাওয়ার পর শরৎচন্দ্র দেখলেন, তাঁর ডিমটি পচা! যার বেশীরভাগই ইতিমধ্যেই উদরে ঢুকেছে। শরৎবাবু কি করবেন চিন্তা করছিলেন! বন্ধুকে বলবেন? নাকি উঠে যাবেন? এই দোটানা পরিস্থিতিতে হঠাৎ দেখলেন! রবী ঠাকুরের পাতের ডিমটিও পচা। তাঁকে কিছু বলার কিংবা সতর্ক করার আগেই ঠাকুর পুরো ডিমটি মুখে ভরে দিয়েছেন! অগত্যা অনেক কষ্টে শরৎবাবু খাদ্য-পর্ব শেষ করলেন।
খাওয়ার পরেও শরৎবাবুর পেটে কেমন জানি লাগছিল, তিনি রবী ঠাকুরকে প্রশ্ন করেন, মশাই আপনি কিভাবে একটা আস্ত পচা ডিম খেয়ে ফেললেন? রবী ঠাকুর আশ্চর্য হয়ে উল্টো প্রশ্ন করেন, আমিতো ডিম খাইনি, তুমি কি তোমারটা খেয়ে ফেলেছ!? শরৎবাবু অতিশয় আশ্চর্য হয়ে বললেন, আমিতো খেয়েছি বরং আমি দেখেছি আপনিও নিজের ডিমটি মুখে ভরে নিয়েছেন!
রবী ঠাকুর বললেন, আমি সে ডিমটি মুখে ঢুকাইনি বরং সেটাকে দাড়ির জঙ্গল দিয়ে শার্টের ভিতরে পৌঁছিয়ে দিয়েছি! দেখ এই সেই ডিম! শরৎ বাবু আর বমি ধরে রাখতে পারলেন না। তিনি ভুলেও বুঝতে পারেননি, রবী ঠাকুর পচা ডিম মুখে দিয়েছেন নাকি দাড়ির জঙ্গলে ঢুকিয়েছেন? কারণ বুদ্ধিমান রবী ঠাকুরের দাড়ি-মোচের জঙ্গলে মুখের অবস্থান ঠিক কোথায় তা একমাত্র তিনি ব্যতীত কেউ বুঝতেন না। এটি কৌতুক কিনা সত্য ঘটনা, তা না জানলেও দাড়ির অভিনব ব্যবহারের এটি একটি চমকপ্রদ ঘটনা। কথা প্রচলিত আছে যে, সাদা দাড়ি-মোচে একাকার বুদ্ধিমান ব্যক্তিরা কখনও মসূরীর ডাল খায় না!
গ্রীকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রোম ও মিশরীয়রা দাড়ি শেভ করত। আগেই বলেছি, দাড়ি ওয়ালা গ্রীকদের বর্বর আখ্যা দেবার জন্যই তারা দাড়ি শেভ করত। পরবর্তীতে আবার গ্রীকদের স্থলে পুনরায় রোমানদের সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সুযোগ এসে যায়। দাড়ি-মোচ শেভ করা কিংবা দেখতে তিন দিন শেভ করে নাই, এমন আকৃতির দাড়ি ব্যবহার করার প্রক্রিয়াটি রোমান সাম্রাজ্যের রাজাধিরাজেরা চালু করে! শেভ করে কিংবা দাড়ির কিয়দংশ দেখা যাবে এমন প্রকৃতির দাড়িকে রোমান সাম্রাজ্যে আভিজাত্য ও ব্যক্তিত্বের প্রতীক মনে করত।
রোমের কর্তৃত্ব খৃষ্টান ধর্মের উপরে যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করে, ফলে পরবর্তীতে ব্রিটিশ ও ফরাসীরাও এই ফ্যাশনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। ব্রিটিশ ও ফরাসীদের বিভিন্ন দেশে কলোনি থাকার সুবাদে দাড়ির সে ব্যবহার, কমনওয়েলথ অধিভুক্ত দেশগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। মূলত ব্রিটিশের অধিকারে থাকা বর্তমানে স্বাধীন, এমন দেশগুলোকেই কমনওয়েলথ গণ্ডির মধ্যে বিবেচনা করা হয়। ব্রিটিশেরা খৃষ্টান হলেও, কমনওয়েলথ ভুক্ত দেশের হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, জৈন, জরথুস্ত সহ সকল ধর্মালম্বির উপর নিজেদের স্টাইল, আভিজাত্য, পছন্দ, সংস্কৃতি চালিয়ে দিতে দারুণভাবে সক্ষম হন। ফলে বর্তমান দুনিয়ায় রোমানদের সৃষ্টি করা দাড়ির স্টাইলকে আভিজাত্যের প্রতীক মনে করে বিভিন্ন ধর্মের মানুষেরাও তা ব্যবহার করছে। আলেকজান্ডার অল্প বয়সে মারা যাওয়াতে তার সাম্রাজ্য আর টিকে থাকেনি। ফলে গ্রীকেরা দুনিয়ায় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব দেখাতে পারেনি। এখন গ্রীকেরা দাড়ি রাখে না, দেখতে অবিকল গ্রীকদের মতো না হলেও, লম্বা দাড়িযুক্ত মানুষদের সন্ত্রাসী, বদমাশ, গুণ্ডা হিসেবে পরিচিত করার সে আদি প্রচেষ্টা এখনও বন্ধ হয়নি বরং বেড়েছে দুনিয়ার দেশে দেশে সর্বত্র।
কৃতি ফুটবলার ‘মেসি’ একবার কলার মোছার আকৃতিতে দাড়ি রেখে তাক ফেলে দেন। এতে করে তার ভক্তদের মাঝেও ‘মোছা দাড়ি’ রাখার হিড়িক পড়ে যায়। এই মোছা দাড়ির প্রভাব দেশ, কাল, পাত্র, গোত্র ও ধর্মীয় ঐতিহ্যকেও একাকার করে দেয়। বর্তমানে ইউরোপ, আফ্রিকা ছেড়ে এশিয়াতেও ঢুঁ-মেরেছে। এই কিছুদিন আগেও আমাদের দেশে দাড়ি ছিল সন্ত্রাসী ও মৌলবাদের প্রতীক। কিন্তু মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান নির্বিশেষে, আমাদের দেশের ছেলেরাও যখন মেসির ‘মোচা’ দাড়ি রাখা শুরু করে তখন দাড়ি মুখে সবই একাকার হয়ে যায়। অবশ্য ধর্মীয় দাড়ির মাঝে স্বাতন্ত্র্যটা রয়েছে, যারা বুঝে তারাই এটা ধরতে পারে।
ধর্মীয় অনুশাসনে দাড়িকে যথেষ্ট সম্মানের সহিত বিবেচনা করা হয়। পৃথিবীর সকল নবীই দাড়ি রেখেছেন, তাই আসমানি কিতাবে যারা বিশ্বাস করে তাদের সকলেই দাড়িকে সম্মান করেন। তার মধ্যে ইহুদি, খৃষ্টান ও মুসলমান অন্যতম। খৃষ্টান ধর্মে দাড়িকে প্রভুর অবয়ব বলা হয়েছে, যেহেতু প্রভুর অবয়বে দাড়ি আছে, সেহেতু দাড়ি ছাটাই করা কিংবা কর্তন করা শ্রেষ্ঠতম অপরাধের অন্তর্ভুক্ত। এটা হল তাদের চিন্তা এবং কিতাবের কথা। তবে রোমান সংস্কৃতি খৃষ্টান ধর্মের উপর যথেষ্ট প্রভাব প্রতিপত্তি সৃষ্টির কারণে পৃথিবীর প্রায় সকল খৃষ্টানেই প্রভুর অবয়বের দাড়ির স্থলে রোমানদের অনুকরণে দাড়ি রাখতে অভ্যস্ত হয়ে যায়। তাই যীশু খৃষ্টের মত দাড়ি বর্তমান সময়ের খৃষ্টানদের মুখে শোভা পায় না!
ইসলাম ধর্মে দাড়ির ভূমিকা অপরিসীম এবং সবার জন্য দাড়ি রাখা একটি অপরিহার্য কর্তব্য করা হয়েছে। আরব দেশের গ্রামাঞ্চল গুলোতে দাড়ি বিহীন ছেলেদের বর হিসেবে পছন্দ করেনা মেয়েরা। সমাজের মানুষ বিশ্বস্ত মনে করেনা তাদের। গ্রামাঞ্চল বলার কারণ হল বিগত দশকের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ধকল আরব ভূখণ্ডেও আঘাত হানে। ফলে শহরের ছেলেরা পাশ্চাত্য পোশাকে, ফাস্ট ফুড খাবারে অভ্যস্ত হতে চলছে। তবে যারা ইসলাম ধর্মীয় অনুশাসন মেনে জীবন চলার পথ রচনা করেন তাদের কাছে দাড়ি একটি অপরিহার্য অঙ্গ। নিজেরা রাখেন, অন্যকে রাখতে উৎসাহ দেন। ইসলাম ধর্মে দাড়ির গুরুত্ব ও তার সুফল বহু জায়গায় বিস্তারিত দেওয়া আছে। তবে ইসলাম ধর্ম অনুসারে দাড়ি রাখতে চাইলে, তার একটি পরিমাপ দেয়া আছে, ছোট্ট দু-একটি শর্তও আছে। মুখের দাড়ি দুরে থেকে দৃশ্যমান হলে তাকে দাড়ি বলা হবে। কেউ ইচ্ছা করলে দাড়িকে নাভি পর্যন্ত ঝুলাতে পারবে না। দাড়ি লম্বা-ছোট নিয়ে, কিছু মতভেদ থাকলেও, তবে দাড়ির শর্ত পূর্ণ হবার জন্য মোচের বৈশিষ্ট্যকে মানদণ্ড করা হয়েছে, যেটা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায়না। যেমন দাড়ি রাখলেন বটে, তবে মোচ হতে হবে একেবারে ছোট্ট, পানি বা তরল পান করার সময় যাতে মোচের সাথে না লাগে।
রাসুল মোহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন দাড়ি হল মুসলমানদের খারাপ কাজের প্রতিবন্ধক স্বরূপ। এর কারণে ব্যক্তি অন্যায়, পাপকার্য, গর্হিত, লজ্জাজনক কাজ করতে পারবে না। দাড়ি তাকে সবক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে। একদা রাসুল (সাঃ) একজন সঙ্গীর দিকে তাকালেন, অতঃপর মৃদু হাসলেন। উল্লেখ্য সঙ্গীর মুখমণ্ডলে মাত্র একখানা দাড়ি ছিল। তিনি ভাবলেন মনে হয় নবীজি (সাঃ) আমার একখানা দাড়ি দেখে হাসলেন। তিনি বাসায় গিয়ে তা ছিঁড়ে ফেললেন। পরদিন নবীজি (সাঃ) সঙ্গীর এ আচরণে খুবই পেরেশান হলেন এবং তার ব্যাখ্যা চাইলেন। সঙ্গী সব সত্য বললেন, নবীজি তাকে শুধালেন, আমি দেখেছি তোমার একটি মাত্র দাড়িতে অনেক ফেরেশতা ঝুলে আছে, আরো অনেক ফেরেশতা ঝুলতে কে চেষ্টা করছে, তা দেখেই আমার হাঁসি পেয়েছে। তাই কাজটি তুমি ভাল করনি।
মানুষ যৌবনে পদার্পণের পর দাড়ির জন্ম হয়। আল্লাহ বলেছেন আমি মানুষকে সুগঠিত-সুশোভিত করে সৃষ্টি করেছি। ফলে দাড়ি পুরুষের প্রয়োজন বলেই তিনি তা দিয়েছেন। দাড়ি মুখের আকৃতিকে ভরাট করে, বৃদ্ধকালে চেহারাকে সম্মানিত ও শ্রদ্ধাভাজন করে। অনেকে মুখের বিশ্রী ভাঁজ, কাটা-ছেঁড়া লুকানোর জন্য দাড়ি রাখেন। আমাদের দেশে রাজনৈতিক- সাংস্কৃতিক ব্যক্তি আছেন যারা মুখের দুর্বলতা ঢাকতে দাড়িকে বাহন বানিয়েছেন।
হালুয়া, শিরনী খেতে হবে বলে শিশুদের আল্লাহ এক সেট অস্থায়ী দাঁত দেন। শিশু দাঁতের যত্ন করতে পারবে না বলে, তা পরিচর্যার কোন দায়িত্ব শিশুকে দেননি। যখন সে মাংস ও শক্ত খানা চিবাতে শিখে, তখন তাকে পুরানো সেটের জায়গায় আরেক সেট মজবুত ও দীর্ঘস্থায়ী নতুন দাঁত দেন। এগুলোকে আমরা নতুন সভ্যতার খাতিরে ফেলে না দিয়ে বরং পরিচর্যা করি। দাড়িও সে ধরনের একটি অপরিহার্য অংশ ও অঙ্গ। যাকে ব্যক্তি জীবনের মান-সম্মান রক্ষার মানদণ্ড হিসেবে বানানো হয়েছে।
আমরা দাড়ি রাখতে না পারি, এটা আমাদের হীনমন্যতা। তাই বলে দাড়ি ওয়ালা কাউকে হেয় প্রতিপন্ন করা স্রষ্টা ও সৃষ্টির সাথে বিদ্রূপ করার নামান্তর। বর্তমানে সিনেমা-নাটকে খারাপ মানুষ বুঝাতে দাড়িওয়ালাদের দেখানো হয়, বাচ্চাদের মনে ধারনা তৈরি করা হয় দাড়িওয়ালা মানে খারাপ। এখন আমাদের দেশীয় সংস্কৃতিতে দাড়ি বিদ্বেষী মানুষের জয়গান চলছে। এরা তারাই যারা, প্রতিষ্ঠিত একটি সামাজিক অবকাঠামো উচ্ছেদ করে বিদেশী সাংস্কৃতিকে স্থায়ীভাবে গেড়ে দিতে চায় এবং তদস্থলে ভিন জাতির কৃষ্টি বহাল করতে প্রয়াস পায়। যেভাবে খৃষ্ট ধর্মের প্রতিষ্ঠিত একটি মৌল-বিষয়কে উচ্ছেদ করেছে রোমান সংস্কৃতি। সাধারণ খৃষ্টানতো বটেই, তার সাথে সম্মানিত পোপ পর্যন্ত মহান যীশুর চেয়ে রোমানকে করেছে শ্রেষ্ঠতর। তাই তাঁর মুখেও খৃষ্টের অস্তিত্বের জায়গায় রোমানদের অস্তিত্ব দৃশ্যমান।


Discussion about this post