আমার নাম উট। পিটে কুঁজ, লম্বা পা, নলের মত গলা সহ অনেক বৈসাদৃশ্য নিয়ে উত্তপ্ত মরুভূমির বিরান প্রান্তরে আমার বসবাস। পৃথিবীর মানুষ কম-বেশী সবাই আমাদের চিনে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করেছেন, আমাদের পূর্ব পুরুষ প্রায় ৪০ মিলিয়ন বছর আগে উত্তর আমেরিকার আলাস্কায় বসবাস শুরু করে।
এটা বরফ যুগের আগের কাহিনী। আমাদের বহু প্রজাতি পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেলেও, অনেকে এখনও দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছি। অনেক মানুষ আমাদেরকে জানতে আগ্রহবোধ করে। তাদের কেউ আরব দেশে আসলে আমাদের দেখা পায়, কেউবা চিড়িয়াখানায় ঢুঁ-মারেন। আমাদের পূর্ব পুরুষ আলাস্কার বরফ আচ্ছাদিত অঞ্চল থেকে কিভাবে মরুতে এসেছে, আবার বরফের শীতলতাকে ছুঁড়ে ফেলে কেনই বা উষ্ণতাকে আলিঙ্গন করল, এর উত্তর আমাদের চেয়ে বিজ্ঞানীরাই বেশী দিতে পারবে।
তবে যারা কোনদিন দু’চোখে উট দেখেনি, তারা আমাদের সম্পর্কে কিছু ভুল ধারণা পোষণ করেন। এসব ভুল ধারনা সংশোধনে, আমাদের জাতি সম্পর্কে আপনাদের কিছু স্বচ্ছ ধারণা দিতে চাই।
শুনে আশ্চর্য হবেন যে, আমি যখন ক্ষুধার্ত হই, তখন সব কিছুই খেতে থাকি! চামড়ার বন্ধনী, তাঁবুর দড়ি, গলার রশি, আস্ত জুতা, তাঁবুর শক্ত অংশ বিশেষ, কোন কিছুই আমার পছন্দ থেকে বাদ যায়না! কাগজের কার্টুন, পলিথিনের বস্তা, পাতলা টিনের নরম পাত কোনটাই আমার রুচিতে বাধে না! আমার ঠোঁট এত ভোঁতা যে, লম্বা কাঁটা ওয়ালা গাছ থেকে লিকলিকে জিহ্বা দিয়ে অনায়াসে পাতা সংগ্রহ করতে পারি! আবার মুখ এত মজবুত যে, ফণীমনসার মত ভয়ানক কাঁটা ওয়ালা ক্যাকটাস কে চিবিয়ে খাওয়া আমার জন্য খুবই মামুলী ব্যাপার! তাছাড়া রস-কষ-বাকলহীন যেসব গুল্ম উত্তপ্ত মরুর বালি রাশির মাঝে জন্মে, সেসব গুল্মকে পানের মত চিবাতে আমার দারুণ পছন্দ! ঠান্ডা পানি তো বটেই, প্রচণ্ড গরম পানি পর্যন্ত আমি এক চুমুকে নিঃশেষ করতে পারি! আমি হালকা গড়নের পিটে কুঁজওয়ালা দ্রুতগামী এক বিস্ময়কর প্রাণী! মধ্যপ্রাচ্যের তৃণহীন মরুভূমিতে আমার বাস। যাকে মানুষের বাহন হিসেবে উপযোগী করে সৃষ্টি করা হয়েছে। আমার পিটের সুদৃশ্য কুঁজটি প্রায় আশি পাউন্ডের মত ভারী হয়। এটাতে আমার শরীরের অতিরিক্ত চর্বিগুলো ভবিষ্যতের জন্য জ্বালানী হিসেবে জমা থাকে। কিছু অবোধ মানুষ মনে করে থাকে যে, কুঁজের ভিতরে থাকে পানি, আসলে হাস্যকর কথাটি মোটেও সত্য নয়!
মহা-পরাক্রমশালী আমার সৃষ্টিকর্তা দয়া করে আমাকে এভাবেই তৈরি করেছেন। কেননা তিনি জানতেন মরুভূমিতে আমি সদা সর্বত্র খাদ্য জোগাড়ে ব্যর্থ হব। খাদ্য বিহীন অবস্থায় আমি যখন তপ্ত বালিরাশির উপর দিয়ে চলি এবং জাবর কাটার মত এক টুকরা ঘাস খুঁজে পেতে ব্যর্থ হই; তখন আমার শরীর স্বয়ংক্রিয় ভাবেই পিটের কুঁজ থেকে কিছুটা চর্বি গলিয়ে নেয়। এতে আমার পিটের কুজটি উপর থেকে সামান্য চ্যাপ্টা হয়ে যায়। বিপদের দিনে এই গলানো চর্বিই আমার জন্য খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এর মাধ্যমে আমি বেঁচে থাকি এবং চলার জন্য পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করি। জরুরী অবস্থায় খাদ্য ঘাটতি মেটাতে এটাই আমার একমাত্র উপায়! চলার পথে যদি কোন মরূদ্যান কিংবা স্রোতস্বীনি পেয়ে যাই, সাথে সাথেই মুখ লাগিয়ে সুযোগ গ্রহণ করি। এই পানি গ্রহণে আমার চ্যাপ্টা কুঁজটি পুনরায় আগের অবস্থায় ফিরে আসে। আমি ভাল করেই জানি, কিভাবে দশ মিনিটের সুযোগে প্রায় ২৭ গ্যালন পানি পান করতে হয়। আমাকে যিনি তৈরি করেছেন, তাঁর আশ্চর্য ও নিখুঁত ডিজাইনের কল্যাণে খুব কম সময়ে আমি অনেক পানি গলাধঃকরণ করতে পারি! আমার গলায় পানি ঢুকার পর মুহূর্তে, বহু বিলিয়ন মাইক্রোস্কোপিক কোষ শরীরের মাংসপেশিকে সক্রিয় করতে কাজে লেগে যায়। এর ফলে আমি পুনরায় সতেজ ও তর-তাজা হয়ে উঠি।
আমার পানি পান করা মাত্রই তা সরাসরি পেটে চলে যায়। সেই পানি পেটে পড়ার সাথে সাথেই দেহের তৃষ্ণার্ত রক্ত কণিকা গুলো সকল পানি চুষে নেয় এবং আমার শরীরের প্রতিটি অঙ্গে পৌঁছে দেয়। আমার পানি পান করার পরে বিজ্ঞানীরা আমার পেট তল্লাশি করে দেখেছে। আশ্চর্য কথা! তারা আমার পেটে কোন পানি পায় নাই! মিনিট দশেক পরে যদি আবারো পানি পানের সুযোগ পাই তাহলে পুনরায় অনায়াসে আবারো বিশ গ্যালন পান করতে পারি! দৈনিক আট ঘণ্টার পরিশ্রমে, আমি সহজে চারশত পাউন্ড ওজনের ভারী মালামাল বহন করতে পারি। উত্তপ্ত, শুষ্ক এবং রুক্ষ মরুভূমিতে কোথাও না দাঁড়িয়ে খাদ্য ও পানীয় ছাড়া একটানা একশত মাইল চলতে পারি। একটি গোপন কথা বলি! এই অবস্থায় খাদ্য ও পানীয় ছাড়া আমি অনবরত আট দিন অতিবাহিত করতে পারি। এই ধরনের একটি কঠিন যাত্রার শেষে আপনারা যদি আমার প্রতি তাকান, তখন আমাকে দেখতে পাবেন, আমি যেন একটি শুকনো কাষ্ঠ খণ্ড! আমার শরীরে ভয়ঙ্কর চর্মসার দশা হবে! আপনারা দেখলে মনে করবেন, আমার সকল গোশত শুকিয়ে শুটকি হয়েছে, শুধু চামড়াটাই কোনমতে যেন হাড়ের উপরে লেপ্টে আছে! কেননা ততদিনে আমি শরীরের দুইশত সাতাশ পাউন্ড ওজন হারিয়ে ফেলব!
আমার শরীরের এই করুন দশা সৃষ্টির জন্য অনেকে আমার মনিবকে বকাবকি করে। আমি কিন্তু ভিতরে ভিতরে এই দৃশ্যটি দারুণ ভাবে উপভোগ করি! আসলে এই ধরনের কঠোর পরিশ্রমে আমি দুর্বলতা কিংবা অসুস্থতা অনুভব করিনা, এমনকি মনোবল পর্যন্ত হারাই না। কেননা আমি নিশ্চিত জানি যে, সূর্যতাপের ফলে আমার মাংসের কোটি কোটি কোষ থেকে পানি শুকিয়েই আমি চর্মসার হয়েছি। দেহের মাংস কোষ থেকে পানি শূন্য হয়েই, আমি শুঁটকীর মত হয়েছি! সাধারণত আমার রক্তে ৯৪ শতাংশের মত পানি থাকে, ঠিক মানবজাতির রক্তের জলীয় অংশের কাছাকাছি। প্রখর সূর্যতাপের কারণে আমার শরীরের রক্ত থেকে কিছুটা পানি বের হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা আমার রক্ত পরীক্ষা করে পেয়েছে যে, কদাচিৎ গরমের কারণে আমার রক্ত থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত পানি বাষ্প হয়ে বেড়িয়ে যায়। ডাক্তারেরা বলেছে যে, মানবদেহের রক্তেও প্রায় ৯৪ শতাংশের কাছাকাছি পানি থাকে। তবে, মানুষের রক্ত থেকে যদি ৫ শতাংশ পানি বেড়িয়ে যায়, তাহলে আপনাদের দৃষ্টি শক্তি নষ্ট হয়ে যাবে, আপনারা কিছুই দেখবেন না! যদি ১০ শতাংশ পানি বের হয়ে যায়, তাহলে আপনি কিছুই শুনবেন না উপরন্তু একজন বদ্ধ উন্মাদে পরিণত হবেন! যদি আপনাদের রক্ত থেকে ১২ শতাংশ পানি বের হয়ে যায়, তাহলে আপনাদের রক্ত ঝোলাগুড়ের ন্যায় আঠালো হয়ে পড়বে! যার কারণে আপনাদের হৃৎপিণ্ড সে আঠালো রক্ত কোনমতেই পাম্প করতে পারবে না, ফলে আপনারা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বেন। অথচ আমাদের রক্ত থেকে ৪০ শতাংশ পানি চলে গেলেও আমরা দিব্যি চলাফেরা ও খেলাধুলা করতে পারি। মানুষের রক্তের পানি শূন্যতা একটা দুঃসংবাদ হলেও আমাদের জন্য এটা কোন চিন্তার কারণ নয়।
বিজ্ঞানীরা আমাদের রক্ত কণিকা আর মানুষের রক্ত কণিকা পরীক্ষা করে দেখার পর ঘোষণা দিয়েছেন যে, উট আর মানুষের রক্তকণিকা এক প্রকারের নয়! আমাদের লোহিত রক্ত কণিকা গুলো বেশ দীর্ঘ আর আপনাদের রক্ত কণিকা গুলো গোলাকার। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, হতে পারে এই কারণে আমদের প্রচুর পানি শূন্যতা হবার পরও আমরা মারা যাই না, এমনকি অসুস্থ হই না বরং সুস্থ ও সবল ভাবে চলতে পারি! তবে এই ঘটনার মাধ্যমে সেই চির সত্য কথাটি প্রমাণিত হয়েছে যে, ‘আমাকে মরুভূমির উপযোগী করেই সৃষ্টি করা হয়েছে অথবা আমাদের জন্যই মরুভূমিকে সেভাবে সাজানো হয়েছে’! আপনারা নিশ্চয়ই কখনও এমন কথা শুনেন নি যে, ‘একজন পরিকল্পনা বিধের চিন্তা ব্যতীত কোন কিছু এমনিতেই সৃষ্টি হয়েছে’!
একটি কথা আপনাদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হবে যে, আমি চলার পথে কোথাও যদি, একটু পানি পেয়ে যাই এবং মিনিট দশেকের জন্য তাতে মুখ লাগাবার সুযোগ পাই। তাহলে মুহূর্তেই আমার অস্থিচর্মসার শরীরে এক বিরাট পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে। আমি সহসা সুন্দর ও তরতাজা হয়ে উঠি। বুঝতেই পারবেন না, মাত্র আধা ঘণ্টা আগেও আমি ছিলাম যেন এক হাড়ের জটলা! হঠাৎ পানির কল্যাণে সহসাই আমি ২২৭ পাউন্ডের হারানো ওজন ফিরে পাই। মরুভূমির প্রখর রৌদ্রতাপের ফলে অনেক প্রাণীর শরীর থেকে প্রচুর পানি বের হয়ে যায়, যার ফলে তারা মরুভূমিতে বাঁচতে পারেনা। তবে আমার শরীরের আশ্চর্যজনক বিশেষ ব্যবস্থার কারণে এই সমস্যার মোকাবেলা করতে হয়না। কেননা আমার এই দেহের আকৃতি দানকারী সৃষ্টির শুরুতেই এসব ভেবে রেখেছিলেন। তাই তিনি আমাকে বিশেষ বৈশিষ্ট্যসূচক একটি নাক দিয়েছেন। যার দ্বারা আমি দেহে পানি সংরক্ষণ করতে পারি। আমি যখন শ্বাসত্যাগ করি তখন খুব অল্প পরিমাণ পানিই শরীর থেকে বের হবার সুযোগ পায়। আমার নাকের নাসিকা ঝিল্লি গুলোতে একপ্রকার উষ্ণ ফাঁদ রয়েছে। যখনই আমি ফুসফুস থেকে নিঃশ্বাসের সাথে আর্দ্র বাতাস ত্যাগ করি। তখন সেই উষ্ণ ফাঁদ গুলো আমার ত্যাগ করা পানি মুহূর্তেই শোষণ করে নেয়। আমার নাসিকা ঝিল্লিগুলো সংগৃহীত পানির কণা গুলোকে অতি ক্ষুদ্র রক্তনালীর মাধ্যমে পুনরায় রক্তের মাঝে চালান করে দেয়। ফুসফুস থেকে নির্গত উষ্ণ পানি কণাকে পূনঃ ব্যবহারের জন্য শীতল অবস্থায় আমার দেহ রক্তকণিকার মাধ্যমে পেয়ে যায়। ফলে রক্তকণিকা গুলো প্রয়োজনীয় মাত্রায় শীতলতা পায়!
এতো গেল আমার নিঃশ্বাস বের হবার কাহিনী! আপনি শুনে আশ্চর্য হবেন যে, আমার নিঃশ্বাস গ্রহণেও রয়েছে এক আশ্চর্যজনক কারিগরি! আপনারা জানেন আমি তপ্ত মরুর উষ্ণ বায়ুকে নিঃশ্বাস হিসেবে গ্রহণ করি। এই উষ্ণ বায়ু যখন আমার ফুসফুসে ঢুকতে যায়, তখন সেটি শীতল হয়েই ঢুকে! চিন্তা করতে পারেন কি! এটা কিভাবে সম্ভব হয়? আসলে আমার নাক হল খুবই শীতল প্রকৃতির! গরম বাতাস শ্বাস হিসেবে যখন আমার নাসিকা দিয়ে ঢুকতে থাকে তখন আমার নাকের স্বাভাবিক তাপমাত্রা থাকে মাত্র মাত্র ১৮ ডিগ্রী সেন্টিগ্রেড! আমার পুরো শরীরের সকল স্থানের মাঝে নাকই হল সর্বনিম্ন তাপমাত্রার স্থান। আমার নাকের এই করিডোর দিয়ে মরুভূমির যত গরম বাতাসই যাক না কেন, তা গন্তব্যে পৌছার আগে শীতল হতে বাধ্য হয়! আপনারা এয়ার কন্ডিশন তৈরি করেছেন আমাদের জন্মের কোটি কোটি বছর পরে অথচ যিনি আমাকে পরিকল্পিত ভাবে সৃষ্টি করেছেন, তিনি আমাকে মরুভূমিতে চলার উপযোগী করতে আমার নাক টিকেই এয়ার কুলার বানিয়ে দিয়েছেন সৃষ্টির শুরুতেই!
আমার পায়ের পাতাগুলো প্রসস্থ। শক্ত চামড়ার মাঝে প্রতি পায়ে সামনের দিকে দুটি বলিষ্ঠ আঙ্গুল রয়েছে। দেখতে দু’টি জোড়া আঙ্গুলের মত দেখায়। আমার আঙ্গুল ও পায়ের এই বিন্যাসের কারণে আমরা ফাঁপাতে সহজে ডুবে যাই না। উত্তপ্ত বালি, পাথরের উপরে চলতে অস্বস্তি অনুভব করিনা। যেখানে আপনাদের দ্রুতগামী গাড়ী চালানো দায় সেখানে আমার পথচলা হয় একদম স্বাভাবিক এবং নিঝঞ্ঝাট! এটা আমার জন্য এক উত্তম পদ্ধতি, আমার মহান স্রষ্টা তাঁর নিখুঁত পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাকে সুবিন্যস্ত করেছেন। কেননা তিনি চেয়েছেন আমাকে ভারী মালামাল পিঠে করে, দৈনিক শত মাইল পাড়ি দিতে হবে। কখনও মরু ঝড় সাইমুম আঘাত হানতে শুরু করে। রাশি রাশি বালি উড়তে থাকে, মানুষের জন্য পথ চলা, পথ চিনা এবং নিঃশ্বাস নেওয়া দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে। কিন্তু যিনি আমাকে নিখুঁত পরিকল্পনার আলোকে সৃষ্টি করেছেন, তিনি দয়া করে আমাকে এক বিশেষায়িত নাসারন্ধ্র দিয়েছেন। বালি-ঝড়ের মাঝে আমার নাসারন্ধ্র বালি প্রবেশের সমুদয় পথ বন্ধ করে দেয়। তবে আমি নির্ভয়ে নিঃশ্বাস চালাবার মত প্রয়োজনীয় বাতাস গ্রহণ করতে পারি।
আমার চোখের পাতা গুলো উপরের দিক থেকে নীচের দিকে ভাঁজ করা, দেখতে মনে হবে যেন একটা ছাউনি। ছাউনি পড়া চোখের ছোট্ট অংশ দিয়েও আমি পরিষ্কার দেখতে পাই। চক্ষু পলকের ছাউনি আমাকে বালি ও প্রখর রৌদ্রতাপ থেকে বাঁচিয়ে রাখে। তারপরও প্রচণ্ড বালি ঝড়ের তোড়ে যদি বালির একটা পরিমাণ আমার চোখের ভিতরে ঢুকেই যায়? সেই ব্যাপারটিও আমার মহান প্রভু তাঁর অপূর্ব ডিজাইনের সময় মাথায় রেখেছিলেন। তিনি আমার চোখের উপরে অতিরিক্ত আরেকটি স্বচ্ছ পর্দার ব্যবস্থা করেছেন। সেটা দিয়ে এক পলক ঝাড়ু মারলেই, গাড়ীর কাঁচের গ্লাস থেকে বালি ঝড়ে পড়ার মত চোখের বালিও নিমেষে ঝড়ে পড়ে। আমার চোখের পাপড়ি গুলো, বাঁকা তলোয়ারের ন্যায় চোখের উপরে ঝুলে থাকে। এই পাপড়ি গুলো ঘূর্ণায়মান ধুলো বালি থেকে আমার চোখ দুটোকে বাঁচিয়ে রাখে। আবার এসব পাপড়ি চিকন গাছের সরু কাণ্ডের ন্যায় ছায়া তৈরি করে রোদের প্রখরতা থেকেও রক্ষা রাখে। ফলে আমার চোখ শুকিয়ে যাওয়া থেকেই রক্ষা পায়। অনেকেই মনে করে আমার মন ও ব্যক্তিত্ব প্রচণ্ড দাম্ভিক প্রকৃতির! কেননা সর্বদা আমি মাথা উঁচু করে রাস্তায় চলতে পছন্দ করি! কথা সত্য নয়, বস্তুত এখানে একটা ছোট্ট রহস্য লুকিয়ে আছে। আমার চোখের ভ্রু-গুলো যেমনি মোটা তেমনি জঙ্গলাকৃতির। মাথা উঁচু করে চললে সামনে যেভাবে দেখতে পাই, সেভাবে নীচের জিনিষগুলো পর্যবেক্ষণ করতে পারি। তাছাড়া সূর্যের আলো ও তাপ থেকে বাঁচতে ভ্রু’র জঙ্গলকে সূর্যের ছায়া হিসেবে ব্যবহার করি। মাথা নিচু করলে তো আমি কিছুই দেখতে পাবো না!
আমার বয়স যখন ছয় মাস হয়, তখন থেকে আমার সামনের পায়ে এক প্রকার প্যাডের জন্ম হতে থাকে। সকল প্রাণীর পিছনের পায়ে একটি হাঁটু থাকলেও আমার পিছনের পায়ে থাকে দুটি হাঁটু! আমার মহান স্রষ্টা এই ব্যাপারটি তাঁর জ্ঞানে রেখেছিলেন যে, এক হাজার পাউন্ড ওজনের আমার বিরাটকায় শরীর নিয়ে ভূমিতে বসতে গেলে আমাদের হাঁটু এমনই হওয়া চাই। তাছাড়া আমি যদি মানুষের উচ্চতায় ভূমিতে বসার উপযোগী না হতাম তাহলে মানব সম্প্রদায় আমার পিটে মালামাল বোঝাই করতে সক্ষম হত না! আমার পায়ের উপরে জন্মানো তুলতুলে প্যাডের কল্যাণে পায়ে ঘষা লেগে চাট তৈরি হয়ে সংক্রমিত হওয়া থেকে রক্ষা পাই, অধিকন্তু এসব নরম তুলতুলে প্যাড আমাকে ভূমিতে বসতে আরাম দেয় এবং আঘাত থেকে মুক্ত থাকি।
মরুভূমির মানুষেরা আমাদের দ্বারা অনেকভাবে উপকৃত হয়। আমরা যেন তাদের জন্য এক চলমান মুদির দোকানের মত। কেননা আমাদের ‘গৃহিনী উট’ প্রচুর পরিমাণ দুধ দিয়ে থাকে। এসব দুধ আমিষ, স্নেহ ও পুষ্টি সমৃদ্ধ। মানবজাতি উটের অসম্ভব শক্তিশালী কাঁচা দুধ পান করতে পছন্দ করে। অতিরিক্ত দুধ থেকে মাখন ও পনির বানিয়ে কাঁচের পাত্রে সংরক্ষণ করে। বছরে আমরা প্রচুর পরিমাণ লোম দিয়ে থাকি, যদ্বারা মানুষ শীত থেকে বাঁচতে গরম কাপড় তৈরি করে। তাছাড়া আমরা জানতে পেরেছি যে, আমাদের সন্তানেরা বৃদ্ধকালে যখন বেশী কাজ করতে পারেনা, তখন মানুষ তাদের জবাই করে গোশত খায়। নাড়ি ভুঁড়িকে পিষিয়ে কিমা বানিয়ে রুটি দিয়ে চিবায়! চামড়া দিয়ে পোশাক বানায়। হাড্ডি গুলো গুড়ো করে জিলেটিন বানিয়ে রঙ বে-রঙ্গের নাস্তা বানায়। আমাদের পায়খানা গুলো সংগ্রহ করে মাটি উর্বর করতে জমিতে ছিটায়, এমন কি আমাদের মৃতদেহের লেজের শক্ত চুলের গোছা কেটে নিয়ে জোতা রং করার ব্রাশ বানায়! এই কথাগুলো বলতে গিয়ে, মনটা আমার দুঃখে ভারাক্রান্ত হয়ে গেল! যাক, এই বিষয়ে আর একটি কথাও বাড়াতে চাইনা।
বহু বছর আগে থেকেই বলা হয়, ‘উট হল মরুভূমির জাহাজ’। কথাটি শতভাগ সত্য, জাহাজ পরিবহনে যেভাবে মালামাল নষ্ট হয়না, ঠিক সেভাবে আমাদের পিটেও মালামাল বিনষ্ট হয় না। মহান স্রষ্টা এসব মাথায় রেখে আমাদের চলার গতিকে দিয়েছেন সমান্তরাল ও মসৃণ করে। আমাদের চারটি পা থাকলেও অন্যান্য চার পেয়ে প্রাণী যেমন; গরু-ছাগল, বাঘ-সিংহ, ঘোড়া-জিরাপের মত চলাচল করিনা। আমাদের ডান পাশের সামনের ও পিছনের দুটি পা একসাথে চলে, তারপর বাম পাশের দুটি পা একসাথে চলে। এতে করে আমাদের পিটের বাহনে হ্যাঁচকা টান পড়েনা বরং পালকির মত আরামদায়ক দুলুনি তৈরি হয়।
এভাবে দীর্ঘ পথে মালামাল বহনে কারো কোন ক্লান্তি ও বিরক্তি আসেনা। আপনারা চিন্তা করে দেখুন, আমার পিট পাহাড়ের মত উঁচু আর জিরাপের পিট একটু ঢালু। তারপরও আমার পিট মাল বহনের উপযোগী কিন্তু জিরাপের পিট উপযোগী নয়! বেচারা জিরাপ মাটিতে বসতে পারেনা, তাই তার পিটে মাল তোলা যায়না। তারপরও কেউ যদি কষ্ট করে তার পিটে মালামাল বেঁধেও ফেলে তবু কোন কাজে আসবে না। কেননা জিরাপ দ্রুত হাটতে কিংবা দৌড়াতে সামনের দুই পা প্রায় এক সাথে এবং পিছনের দুই পা প্রায় এক সাথে ফেলে। ঠিক যেন আমাদের উল্টো। এতে হ্যাঁচকা টানে পিটের মালামাল, টালমাটাল হয়ে মুহূর্তেই লণ্ড-ভণ্ড হয়ে পড়ে যাবে। আমার মহান প্রভু সৃষ্টির শুরুতেই চিন্তা করেছিলেন যে, জিরাপের মত অদ্ভুত ও হাস্যকর প্রাণীকে দিয়ে মানুষের কাজে ব্যবহার করাবেন না। তাই বেচারাকে একটি বারও মাটিকে বসার সুযোগ দেননি!
আপনাদের চর্ম চোখে আমার বাহিরের আবরণ দেখে ভিতরের বিশ্লেষণ করা অনেক দূরহ ও কঠিন হবে। তারপরও কিছু অতি চালাক প্রাণীরা ভেবে থাকেন যে, ‘যুগের চাহিদা মেটাতে আমাদের মত আলাদা বৈশিষ্ট্যের প্রাণীও নাকি এমনিতেই সৃষ্টি হয়েছে’! এসব বেকুপের কথা শুনে মনে হয়, ‘জিরাপ ও একদিন আমাদের মত কাজের উপযোগী হয়ে উঠবে’! হাস্যকর কথা হল, ‘যেখানে জিরাপ নিজের একটি হাঁটুই বাঁকা করতে পারেনা, সেখানে কিভাবে আশা করা যায় যে, তার পিছনের পায়ে উটের মত করে দুটি নতুন হাঁটু গজিয়ে উঠবে এবং মানুষের উপকারের জন্য সে মাটিতে বসবে’! মূল কথা হল, আমরা জন্মের শুরুতে যেভাবে ছিলাম এখনও সেভাবে আছি এবং আমার মহান সৃষ্টিকর্তা আমাদের বানিয়েছেন অন্যদের চেয়ে ব্যক্তিক্রম করে। আমাদের গঠন নিখুঁত প্রাযুক্তিক, উন্নত প্রকৌশলীক, পরিমিত ও সুবিন্যস্ত গঠনশৈলী দ্বারা আবৃত। তাছাড়া আমার মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ, মানব সম্প্রদায়কে বলেছেন উট নিয়ে আরো ভাবতে! তাতে মানব সম্প্রদায় আরো জ্ঞানী ও বিজ্ঞ হয়ে উঠতে পারবে! তাইতো দেড় হাজার বছর আগেই পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, “আফালা ইয়ান জুরুনা ইলাল ইবলি খাইফা খুলিক্বত” অর্থ, তারা কি উটের প্রতি তাকিয়ে দেখে না যে, তাকে কিভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে! সূরা আল গাশিয়াহ-১৭।


Discussion about this post