প্রতিবাদ করতে অক্ষম হলে কিংবা কারো উপরে হিংসা চরিতার্থ করতে ব্যর্থ হলে কিংবা যুক্তি-তর্কে কোনভাবেই জিততে না পারলে মানুষ গালি দেওয়া শুরু করে। যখন কোন মানুষ গালি দেয় তখন বুঝতে হবে তার কাছে ইতিবাচক আর কোন উপাদান খালি নেই, তাই সর্বশেষ অস্ত্র হিসেবে গালির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। মানুষ কেন গালি দেয়
যে বা যাদের চরিত্রে গালির উপাদান আছে, বুঝতে হবে তার চরিত্রে আর কোন মৌলিক উপাদান সক্রিয় নয়। বাহ্যিক দৃষ্টিতে বহু মানুষকে ভদ্র ও সভ্য মনে হয়। হিসেব করে কথা বলে, সজ্জন মানুষ হিসেবে সবার কাছে পরিচিত আছে। এমন মানুষের কখনও গোস্বা উঠে গেলে, তিনি তখন চোখ বন্ধ করেই গালি দেওয়া শুরু করে। এটা বদমেজাজের কারণে হয়ে থাকে! মেজাজ চড়ে গেলে, প্রতিদ্বন্ধিকে পাল্টা আক্রমণ করার জমানো তথ্যগুলো মগজ ঠিকমত গুছিয়ে দিতে পারে না। ওদিকে শ্রোতা-দর্শকের বিভ্রম ঘটে যে, এই মানুষটির ভদ্রতার আড়ালে, আরেকটি কদর্য চেহারা লুকিয়ে আছে। তাই বদমেজাজি মানুষের আক্রমণের অন্যতম অস্ত্র হয়ে উঠে গালাগালি।
আরো পড়ুন…
- শরাব মানুষের ব্যক্তিত্ব ও আভিজাত্য নষ্ট করে
- উৎপীড়ন : সমাজ ও রাষ্ট্রের মরণ ব্যাধি
- মিতব্যয়ী ও উদার হউন সে দুর্ভিক্ষ যেন না আসে
অনেকে অধীনস্থদের গালি দিয়ে কাজ করায়। এটাকে তাড়া প্রয়োজন মনে করে। কিন্তু এরা ধীরে ধীরে সামাজিক চরিত্র হারিয়ে বসে এমনকি নিজের ঘরের সদস্যদের উপরও একই পদ্ধতি ব্যবহার করে। তার সংসার উচ্ছন্নে যায়।
শিক্ষিত মানুষের গালি
শিক্ষিত অশিক্ষিত সবাই গালি দিতে পারে। বিতর্ক প্রিয় ব্যক্তি, অপরের ছিদ্রান্বেষণ কারী, অন্যকে হেয় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য কারী শিক্ষিত মানুষের গালিগুলো প্রাণী-বাচক গালির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। যেমন গরু, ছাগল, ভেড়া ইত্যাদি। যদিও এসব প্রাণী বেশ উপকারী মানুষের কাছাকাছি থাকে। এরপর আছে শুকর। শুকর বা শূয়র বলে মানুষকে গালি দেওয়া হয়। মুসলিম ও হিন্দুদের কাছে এটা ঘৃণিত প্রাণী। তাই অনেকে এটাতে অপমান বোধ করে। তারপর থাকে কুকুর তথা কুত্তা! মানুষের খাসিয়ত কুত্তার মত হলেই যে, তাকে কুত্তা বলে গালি দেয়া হয়, ব্যাপারটি মোটেও এমন নয়। যে শব্দ বললে সে মানুষের ইজ্জতে খোঁচা লাগে এবং সে প্রতিক্রিয়া দেখায় সেটিই গালি।
ছোটদের প্রতি গালি
কখনও মুরুব্বী ও শিক্ষকেরা ছোটদের ইজ্জতে তেজ লাগাতে, গরু-ছাগল বলে ধমক দেয়। দৃশ্যত এটা ধমকের মত লাগে। একটা মাত্রা পর্যন্ত এটা সহনীয় থাকে। তাছাড়া মুরুব্বীরা ছোটদেরকে এ সব শব্দ প্রয়োগে বকা দিলেও, বস্তুতই তার কোন প্রভাব ছোটদের উপরে পড়েনা। উল্টো মুরুব্বীদের মুখ খারাপ হয়, অ-জায়গায় এই মন্দ কথা নিজের অজান্তে বেরুতে থাকবে। কিন্তু এই শব্দ গুচ্ছ যদি সমবয়সী বন্ধু-বান্ধব কিংবা অফিসের সহকারীদের বললে তারা অপমানিত বোধ করবে। তখনও এই শব্দগুলোই মারাত্মক গালিতে পরিণত হতে পারে। মূলত মন্দ বাক্য প্রয়োগে কোন অবস্থাতেই ইতিবাচক ফল আশা করা যায় না।
সুন্দর বাক্য প্রয়োগে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করার নামও গালি। কাউকে হেয় করে মাষ্টার, মন্ত্রী, প্রেসিডেন্ট, সাহেবজাদা নসরত উল্লাহ হিসেবে উল্লেখ করা। যদিও শব্দগুলো সম্মানিত কিন্তু অন্যকে হেয়, হাস্য-পদ ও অ-সম্মানী করার জন্য বলা হয় বলেই এটা তার জন্য গালি। মানুষ কেন গালি দেয়
অশিক্ষিত মানুষের গালি
অশিক্ষিত মূর্খ মানুষেরা গালি দেবার ক্ষেত্রে খুবই বিশ্রী শব্দ প্রয়োগ করে। কখনও বিশ্রীর মাত্রাটা এতটুকু পর্যায়ে যায় ভদ্রলোকদের কানে আঙ্গুল দিতে হয়। এসব মানুষের কাছে আত্মসম্মানের কোন মূল্য নেই। বরং অন্যের সম্মান বিনষ্ট করতে পারলে আনন্দ পায়। আবার বিতর্ক-কারী উভয়পক্ষই যদি গালিবাজ হয়, তাহলে সেখানে সৎ ও ভদ্র মানুষ টিকতে পারে না। এমনকি তাদের গালির বাক্য-প্রয়োগে যদি শব্দের অভাব পড়ে যায়, তাহলে নিজের কাপড় উল্টিয়ে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দেখাতেও পিচ পা হয়না। অর্থাৎ মানুষ তখন কাণ্ডজ্ঞান শূন্যের পর্যায়ে নেমে যায়। এই ক্ষেত্রে বিশ্রী অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শনও গালির পর্যায়ে পড়ে।
মাঠে-ময়দানের গালি
রাজনীতির ময়দানও কখনও গালিতে কদাকার হয়। যারা গালি দেয় তারা তো মানুষই। এসব গালিবাজ মানুষ কখনও রাজনৈতিক নেতা বা জনপ্রতিনিধি বনে গেলে; শিক্ষিত ভদ্র, জ্ঞানী মানুষেরা নিজ গরজেই তার সান্নিধ্য ত্যাগ করবে। গালি শুনতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে এমন মানুষেরা তার চারিদিকে ভিড় জমাবে। তারা নেতার গালিকে উৎসবে রূপ দিয়ে ভিন্নভাবে সেটাকে উপভোগ করবে।
এক বক্তা আরেক বক্তাকে গালি দেবার প্রবণতা শিক্ষিত মানুষদের মধ্যে দেখা যেতে পারে। অনেক সময় এটা ধর্মীয় অনুষ্ঠানেও ছড়িয়ে পড়ে। বাগদাদের খলিফা মুহতাসিম বিল্লাহর সময়ে, মোনাজেরা তথা ধর্মীয় বিতর্ক অনুষ্ঠানে এক বুজুর্গ অন্য পক্ষের বুজুর্গকে আক্রমণ করার জন্য উচ্চমার্গের গালিবাজকে নিয়ে মঞ্চে বসাতেন। যথাযথ যুক্তিতর্ক শেষে যখন কেউ কাউকে পরাস্ত করতে পারত না, তখন শুরু হত গালির উৎসব। এক সময় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় এমন গালির শব্দ ভাণ্ডার সংকুচিত হয়ে যেত। এটার অভাব পূরণ করার জন্য, ভিন্ন ভাষার গালি আমদানি করা হত। দর্শক ভিনদেশী ভাষা বুঝবে না। তাই গালির অনুবাদ করার জন্য একজন অনুবাদক উপস্থিত থাকতেন। এতে করে এক পর্যায়ে মারামারি লেগে যেতে, খুনোখুনি হত। দিন বদলের কারণে সেই পরিস্থিতি এখন আর না থাকলেও, বর্তমানেও গালির প্রয়োগ আছে বিভিন্ন বৈচিত্র্যের উপর নির্ভর করে। এখনও আমরা কিছু আলেম নামধারী ব্যক্তির মুখে অহরহ গালি শুনতে পাই। এসব মানুষ ব্যক্তিজীবনেও কদর্য চরিত্র ও হীনমন্যতার অধিকারী।
গালি মোটেও কোন খারাপ জিনিষ নয়, এমনটি বলার মত মানুষও দুনিয়াতে আছে! খোদ ইউক্রেনের ভারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইউলানা সুপ্রুন তো গালির প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বলেছেন, “গালি দেওয়া মানুষের জন্য উপকারী। গালিই একমাত্র অস্ত্র যা দিয়ে মানুষ মনের ঝাল মিটাতে পারে। এভাবে ঝাল মিটে গেলে, মানুষ আর শারীরিক প্রতিশোধ নেবার পিছনে ভাবে না।” (বিবিসি – ০৯.০৭.২০১৯) মানুষ কেন গালি দেয়
ইসলাম ধর্মে গালির পরিণতি
তবে গালি নিয়ে ইসলাম বলেছে ভিন্ন কথা। ইসলামে গালি দেওয়াটাই হারাম। ইসলাম ধর্মে গালি প্রথাটাকেই জুলুম তথা নির্যাতন বলা হয়েছে। ইসলাম ক্ষতিপূরণ হিসেবে যেখানে চোখের বদলে চোখ, নাকের বদলে নাক কেটে নেবার আইন অনুমোদন করে। সেখানে ইসলাম উল্টো গালির বদলে গালি দেওয়াটাকেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তাতে গালি শোনার মাধ্যমে একজন মানুষ যতই ক্ষতিগ্রস্ত হউক না কেন। রাসুল (সা) কে ইহুদীরা গায়ে পড়ে গালি দিতে আসত। এই গালি বাক্য শুনে তাঁর সাথীদের মাথা ঠিক থাকত না। কেউ তাদের আঘাত করতে চাইতেন কিন্তু রাসুল (সা) এটা করতে নিষেধ করেছেন। কেননা তিনি জানতেন, যিনি গালি দেন, তার প্রতিটি কথা, প্রতিটি শব্দ অল্প-কিছুদিন পরেই তার উপর বর্তাবে। তখন মানুষ খালি চোখে তা দেখতে পাবে। পরিণতিতে সাধারণ মানুষ গালিবাজদের প্রতি অতিষ্ঠ হত এবং রাসুল (সা) কে ভালবাসতেন। সে হিসেবে গালি শোনা মুমিন-মুসলমানের জন্য সুন্নাতও বটে।
ইসলাম ধর্মে সবচেয়ে বেশী অপমানিত ও ঘৃণিত চরিত্র হল মুনাফেকি। মোনাফেক কোনদিন জান্নাতে যাবেনা। আর মোনাফেকের অন্যতম বৈশিষ্ট্যের একটি হল, “তারা বিবাদে লিপ্ত হলে মিথ্যা বলে, অশ্লীল ভাষায় গালাগালি করে।” – বোখারী-৩৪। অন্যত্র বলেছেন, “মুমিন কখনও দোষারোপ-কারী, অভিশাপ-দাতা, অশ্লীল-ভাষী ও গালিগালাজ করে না।” তিরমিজী।
অপবাদ, গালিগালাজ-কারী নিয়ে এতটুকুতেই ইসলামী মতাদর্শ সন্তুষ্ট নয়। হাদিস শরীফে আছে, কেউ কাউকে গালি দিলে, ফেরেশতারা সেটা সেই ব্যক্তির আমলনামায় লিখার জন্য যায়। যখন দেখে সে প্রকৃতই সে কাজের আসামী নয় তখন উল্টো এটা গালিবাজ ব্যক্তির আমল নামায় লিখে দেন। এতে করে সে যেভাবে অন্যকে গালি দিয়েছিল, এই অপরাধের কারণে আল্লাহ সেই গালির মতই চরিত্র তার জীবনে সাজিয়ে দেন। এতে করে মানুষ বদ চরিত্র তার কাছে দেখবে ফলে সে দুনিয়াতে অসম্মানিত হবে এবং আখেরাতে তাকে এক কদমও নড়তে দেওয়া হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা সেটাও যথাযথ উত্তর না দেবে।
গালাগালি বন্দের উপায়
কাউকে অনর্থক কৌতূহল বশতঃ গালাগালি করে দুনিয়া ত্যাগ করে তথা মরতে নিষেধ করা হয়েছে। অবশ্যই সে যেন মৃত্যুর আগে ক্ষমা চেয়ে নেয়। নতুবা তার ভাল কাজ গুলো যাকে গালি দেওয়া হয়েছিল তাকে দিয়ে দেওয়া হবে এবং তার মন্দ কাজ গুলো গালিবাজের কাঁধে চড়িয়ে দেওয়া হবে। সেদিন এটাই হবে গালিবাজের প্রকৃত প্রতিদান।
গালাগালি করা গালাগালি, অপবাদ, মন্দ-কথা, মন্দ-কাজ এসকল কাজকে ইসলামে “ফাহশা” তথা অশ্লীল কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত করা হয়েছে। মানুষ ইচ্ছে করলে, খুব সহজেই এই নিন্দনীয় মন্দ থেকে বেঁচে থাকতে পারে। এটার জন্য রাস্তা দেখিয়ে দিয়েছেন স্বয়ং আল্লাহ। সেটা হল সঠিক সময়ে, সঠিক নিয়মে সালাত (নামাজ) আদায় করা। সালাতের অনেকগুলো মহান বৈশিষ্ট্যের অন্যতম একটি হল সালাত মানুষকে সকল মন্দ-কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে। চৌদ্দশত বছর ধরে, সারা দুনিয়ার লাখ লাখ মসজিদের প্রতিটি জুমার খুতবায় একেবারে শেষদিকে যে কথাটি বলা হয় তা হলো, “ইন্নাস সালাতা তানহা আনিল ফাহশায়ে ওয়াল মুনকার” আনকাবুত-৪৫। অর্থাৎ নিশ্চিতভাবেই নামাজ যাবতীয় অশ্লীল ও খারাপ কাজ হতে বিরত রাখে।


Discussion about this post