মারুলা ফল আফ্রিকা মহাদেশের নাইরোবি ও দক্ষিণ সুদানে জন্মে। সে জন্য এটার সাথে আমাদের পরিচয় তেমন একটা নেই। এটি খুব সুস্বাদু, দারুণ সুঘ্রাণ। এর সুঘ্রাণ যখন চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন এর মৌ সুগন্ধে কোন প্রাণী আর ধৈর্য ধরে নিজের বাসায় বসে থাকতে পারে না। মারুলার আকর্ষণে তাদের মবাইকে মারুলা তলে আসতে হয়! মারুলা ফল প্রকৃতিকে করে পাগল
Marula (মারুলা) গাছ দেখতে ঠিক আমাদের দেশের আম-কাঁঠাল গাছের মতই। এগুলো পুরুষ ও মাদি দু’ধরণের হয়। পুরুষ গাছে ফুল হয় এবং বাহারি সুঘ্রাণে পরিবেশ মাতিয়ে রাখে। আর ফল পাকলে মাদী গাছের পাকা ফলের গন্ধে পুরো এলাকা তারই হয়ে যায়! প্রথম দর্শনে মারুলা ফলকে ছোট আম বলে ভ্রম হতে পারে। কাঁচা অবস্থায় সবুজ, পরিপক্ব হলে হলুদাভ সবুজ এবং পেকে গেলে লাল-কমলালেবুর বর্ণ মিশ্রিত হয়। ফল পরিপক্ব হলেই গাছ থেকে ঝরে পরে। মাটিতে পরেই এগুলো পাঁকতে থাকে। যার কারণে এই গাছের নীচের পতিত ফল সকল প্রাণীর পক্ষে খাওয়া সহজতর হয়।
আরো দেখতে পারেন…
- Lithops জীবন্ত পাথরের কথা
- কর্ক শিল্প ও আমাদের পাটখড়ি
- দুনিয়ার ফণীমনসা জাহান্নামের যাক্কুম
- স্ন্যাক লিলি Snake lily দেখতে অপূর্ব
কারা খায় এই ফল?
মারুলা ফলে কে বা কারা খায় এই প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর। সারস পাখি মাছ খায় ফল-ফুল,সবজিতে তার কোনই আকর্ষণ নেই। কিন্তু মারুলা পেকে গেলে সেও হাজির হয় মারুলা তলায়! বানর, শুকর, শিম্পাজী, কাঠবেড়ালী, ইঁদুর, উটপাখি গরু, ছাগল, হরিণ, পাখি, হাতি-গণ্ডার, জলহস্তী, মৌমাছি, কীট-পতঙ্গ সবারই অন্যতম পছন্দ মারুলা ফল। হাতি-গণ্ডার যখন এই গাছের নীচে আসে তখন সজোরে গাছ ধাক্কাতে থাকে, যাতে করে বেশী পরিমাণ ফল ঝরে পরে এবং পরদিন তা মজা করে খেতে পারে।
এই ফলে কেন এত আকর্ষণ?
মূলত এই ফলে রয়েছে চরম মাদকাসক্তি। পাকা ফলের ঘ্রাণে আকৃষ্ট হয়ে হিতাহিত বুদ্ধি হারিয়ে এটা খাওয়ার জন্য ধেয়ে আসে। খাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই শুরু হয় মাতলামি। তখন এই গাছের নীচে সংঘটিত হয় “হরেক রকম পাগলের মেলার” মত দশা। প্রাণীরা মাতাল হয়ে পড়ে থাকে যত্রতত্র। শত্রু ভাবাপন্ন প্রাণীরা পর্যন্ত নিজেদের শত্রুতার কথা ভুলে যায়। মূলত তখন তাদের মগজ আর ঠিক মত কাজ করেনা। তাছাড়া এই ফলের মাদকে একবার অভ্যস্ত হয়ে গেলে, সে আর এই গাছের গণ্ডির বাইরে যায় না। এক প্রাণী অন্য প্রাণীর গোশত খাওয়ার চেয়ে মারুলা খেয়েই বৈরাগীর মত জীবন পালন করে। ঠিক আমাদের সমাজের মাদকাসক্ত মানুষদের মতই।
মারুলা ঔষধি গাছ হিসেবে খুবই প্রসিদ্ধ। লোকালয়ের মানুষেরাও এই গাছের বাকল, ফল ও রস থেকে মদ তৈরি করে। এই গাছের বাকলে প্রচুর এন্টিহিস্টামিন রয়েছে, তাই দেহ অবশ করার কাজে ব্যবহৃত হয়। ম্যালেরিয়া রোগের প্রতিষেধক হিসেবে স্থানীয়রা এই গাছের বাকল দিয়ে হার্বাল ঔষধ তৈরি করে।
স্থানীয়রা কাচা মারুলা ফল রান্না করে খায়। ঠিক আমাদের দেশের টমেটোর বিকল্প মতোই। কাচা অবস্থায় খাওয়া যায়, মাটিতে পড়ে থাকলেই এই ফলে এলকোহল সৃষ্টি হয়। কাচা ফল দিয়ে জ্যাম-জেলি বানানো হয়। তার পাতা দিয়ে সালাদের ড্রেসিং করা হয়। ফলের বৃন্ত দিয়ে সুস্বাদু ভাজি বানানো হয়। চর্ম রোগে এর বাকল ব্যবহৃত হয় এবং প্রসাধন সামগ্রীতে মারুলা গাছের সর্বাঙ্গই কাজে লাগে। মারুলা ফুলের শুকনো পাপড়ি ও পাতা মসল্লা হিসেবেও ব্যবহার করে।
প্রকৃতি এখন বদলে গেছে। মারুলার সবকিছু বাণিজ্যিক ভাবে উৎপাদিত হয়। মানুষই যেখানে খেতে পায় না সেখানে প্রাণীদের খাওয়ার সেই সুযোগ এখন আর আগের মত নেই। প্রায় ৩৫ বছর আগের একটি পুরানো ভিডিওতে দেখা যায় মারুলা খেয়ে প্রাণীদের সে কি বেহাল দশা! ইউটিউব সৃষ্টির শুরু থকেই আজ পর্যন্ত সকল শ্রেণীর দর্শকদের এই ভিডিওটি খুব আনন্দ দেয়। ভিডিওতে মাথা খারাপ হয়ে উঠা পথহারা প্রাণীদের হাস্যপদ চরিত্রের কিছু ক্লিপ সন্নিবেশিত হয়েছে। কৌতূহলীরা দেখতে পারেন এবং ধারনা করা যাবে যে, কারো প্ররোচনায় যদি মাদক খাওয়া হয়, তাহলে তার দশাও এই প্রাণীদের চেয়ে বেশী করুন ও অসম্মানজনক হবে। কেননা মাদকের শক্তি মারুলা ফলের চেয়ে বেশী সক্রিয়।


Discussion about this post