মানব ইতিহাসের সবচেয়ে জঘন্য ও কদর্য কাহিনীতে ভরা অন্ধকার যুগের বীভৎসতা দূর করতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন জগতের মানুষের কল্যাণে মুহাম্মদ (সা) কে মানবতার বিমূর্ত প্রতীক করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন। আর রাহিকুল মাকতুম – সীরাত গ্রন্থ
আরো পড়ুন…
- মানুষ সৃষ্টিতে DNA প্রভাব
- রাসুল (সা) সীরাত গ্রন্থ রিভিউ
- নামের মাহাত্ম্য ও আরবের বিশ্বাস
অন্ধকার যুগের সেই অসভ্য সমাজে কদাচার, অজাচার আর ব্যভিচারের ভারে নুইয়ে পড়েছিল। সন্তান তার মৃত পিতার পরিত্যক্ত স্ত্রী তথা সৎ মাকে বিয়ে করত। পিতা মারা গেলে তার স্ত্রীদের ভাগীদার হত সন্তান। নারীর অধিকার দূরের কথা, গরু-ছাগলের মত তাদেরকে বাজারে বিক্রি করত। এক কবিলা অন্য কবিলার উপর হামলে পড়ত। পুরুষ গুলোকে মেরে মহিলাদেরকে আজীবনের জন্য দাসী বানিয়ে নিত। সম্মানিতা সম্ভ্রান্ত বংশের নারী বলে কোন বাচ-বিচার ছিলনা। কুলাঙ্গার ছেলেদের উদ্দেশ্যে এসব সম্মানিতা নারীদের রাস্তায় উন্মুক্ত ছেড়ে দিত। তাদেরকে নিত্য উৎপীড়ন, অবিরত ধর্ষণ, উলঙ্গ-ভাবে ঘুরানো সহ মানবতা বিনষ্টে হেন ঘৃণিত উপায় বাকি ছিল না যা সে সমাজতে সংঘটিত হত না!
নারী জাতির এই জিল্লতীর কথা মনে করে তাদের পিতারা শিশুকালেই নিজের কন্যাকে জীবিত কবর দিয়ে হত্যা করত! যাতে করে বড় হয়ে এর মোকাবেলা করতে না পারে! এ ধরনের কুৎসিত সমাজের পরিবর্তন করা, আসমানি সাহায্য ছাড়া সম্ভব ছিলনা। তাই আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মোহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (সা) কে মুক্তির দূত করে মক্কা নগরীতে প্রেরণ করেন। সে সময়ে মক্কা নগরীতে তিনি ব্যতীত আর কোন ভাল মানুষ ছিলেন না! অবশেষে তাঁর হাত ধরেই, সেই সমাজের সকল মানুষগুলো সোনার মানুষে পরিণত হয়। একটি অন্ধ জাতিকে তিনি সারা দুনিয়ার সামনে সভ্য জাতি হিসেবে উপস্থাপন করে, অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। রাসুল (সা) এর জীবনীর সেই অবিস্মরণীয় ঘটনাগুলোর সবটাই ধাপে ধাপে বিধৃত হয়েছে আর রাহিকুল মাকতুম নামক সীরাত গ্রন্থে।
গ্রন্থ পরিচিতি:
গ্রন্থের নাম: আর রাহিকুল মাকতুম
লেখক: আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী
অনুবাদিকা: খাদিজা আখতার রেজায়ী
প্রকাশক: আল কোরআন একাডেমী – লন্ডন।
পরবর্তীতে ছফিউর রহমান সৌদি আরবের মদিনা ইউভার্সিটি থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রী নিয়েছিলেন। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের মধ্য থেকে যে ক’জন স্কলার সারাবিশ্বে সুনাম কুড়িয়েছিলেন, আল্লামা ছফিউর রহমান তাদেরই একজন। ব্যক্তি জীবনে তিনি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। তার মধ্যে অন্যতম হল মুসলিম বিশ্বের খুব শ্রদ্ধাভাজন প্রসিদ্ধ দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়”। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনি সেরা ছাত্র ছিলেন এবং আলোচিত শিক্ষকদেরও একজন ছিলেন।
আর রাহিকুল মাকতুম শব্দের বাংলা অর্থ হল “ছিপে আঁটা সুপেয় পানিয়”। এই বাক্যটি পবিত্র কোরআন থেকেই নেওয়া। লিখক আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী বইয়ের হেডিং হিসেবে পবিত্র কোরআনের আয়াতকেই বাছাই করেছেন। আর রাহিকুল মাকতুম – সীরাত গ্রন্থ
লেখক সম্পর্কে ধারণা:
আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী ১৯৪৩ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের আযমগড় জেলার, হোসাইনাবাদের মোবারক পুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আবদুল্লাহ তিনি একজন প্রখ্যাত আলেম। আগেকার সময়ে দূর দূরান্ত পেরিয়ে ভিন দেশের মক্তবে গিয়ে পড়তে হত। ফলে ছাত্রদের চিনে রাখার সুবিধার্থে ছাত্রের নামের সাথে দেশ কিংবা বৃহত্তর এলাকার নাম লাগিয়ে, একসাথে দুইটি পরিচয় চিহ্নিত করা হতো। যেমন সাহাবী সালমান ফারসি (রা), ইমাম বোখারী (র) ইত্যাদি। সেভাবে ছফিউর রহমান ভারতের মোবারক পুরের মানুষ ছিলেন বলে তার নামের শেষেও মোবারক পুরী টাইটেল যোগ হয়। আর রাহিকুল মাকতুম – সীরাত গ্রন্থ
তিনি ছিলেন একাধারে প্রতিভাবান, বাগ্মী, সু-সাহিত্যিক ও লেখক। আরবি ভাষা ও ব্যাকরণে তার ছিল উচ্চমাত্রার দক্ষতা। তিনি কওমি ধারার মাদ্রাসা শিক্ষা এবং সরকারী আলীয়া ধারার মাদ্রাসা শিক্ষার উভয় ধারাতেই সর্বোচ্চ নম্বর প্রাপ্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। সকল শ্রেণীতেই তার সমতুল্য অন্য কোন মেধাবী ছাত্র ছিলনা।
রাবেতার পুরষ্কার
১৯৭৬ সালের কথা। সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংস্থা “রাবেতায়ে আলামে ইসলামী” একটি যুগান্তকারী পুরষ্কারের ঘোষণা দেন, যা সারা মুসলিম বিশ্বে আলোচিত ও সমাদৃত হয়। সারা দুনিয়ার মুসলিম স্কলার ও ছাত্রদেরকে রাসুল (সা) এর জীবনী নিয়ে রচনা প্রতিযোগিতা করার জন্য আহবান জানানো হয়। এর জন্য আকর্ষণীয় লোভনীয় পুরষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হয়। নির্বাচিত পাঁচটি পুরষ্কারের প্রথম থেকে পঞ্চম যথাক্রমে ৫০, ৪০ করে ১০ হাজার রিয়াল পুরষ্কার ঘোষিত হয়। সে জমানাতে এটা ছিল বিশাল পরিমাণ অর্থ! ছফিউর রহমান সবে মাত্র ছাত্রজীবন শেষ করে নবীন শিক্ষক হিসেবে মোবারকপুরের মাদ্রাসায় শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছেন। ভারতের অখ্যাত মোবারক পুরে বসেই তিনি লিখেছিলেন “আর রাখিকুল মাকতুম” নামে জগত বিখ্যাত সীরাত গ্রন্থটি। অতঃপর ছিনিয়ে এনেছিলেন বিজয়ের মালা হিসেবে প্রথম পুরষ্কার। সারা দুনিয়াতে অখ্যাত মোবারক পুর এক দিনেই বিখ্যাত হয়ে পড়ে। তিনি প্রমাণ করেন, একজন সফল মেধাবীর কারণে বিস্তীর্ণ অঞ্চলও কখনও গৌরব করার সুযোগ পায়।
যেহেতু লিখাটি রাসুল (সা) এর সীরাত সম্পর্কিত আলোচনারই অংশ। তাই এই প্রতিযোগিতা সম্পর্কে কিঞ্চিত আলোকপাত রাখা জরুরী মনে করছি। এটি কোন সামান্য রচনা প্রতিযোগিতার মত বিষয় ছিলনা। রাসুল (সা) এর সারা জীবনকে বিশ্লেষণ করে সঠিক ও যথাযথ তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সাজাতে হবে। সঙ্গত কারণে গ্রন্থটি বড় হবে। তাছাড়া এই গ্রন্থ শুধুমাত্র রাসুলের (সা) এর জীবনীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। সমসাময়িক জমানার বিষয়াবলীও এতে আলোচিত হবে।
রাবেতার এই প্রতিযোগিতায় সর্বমোট ১১৮২ টি পাণ্ডুলিপি জমা পড়ে। সেখান থেকে প্রাথমিক যাচাই-বাচাই শেষে ১৮৩ টি পাণ্ডুলিপি বিচার্যের জন্য স্থান পায়। বিচারকদের দীর্ঘদিনের পর্যালোচনা ও অধ্যয়নের মাধ্যমে সর্বশেষে ৫ টি পাণ্ডুলিপিকে পুরষ্কারের জন্য নির্বাচিত করা হয়। তারা হলেন, ৫. ওস্তাদ আবদুস সালাম – সৌদি আরব ৪. শেখ হামেদ মাহমুদ – মিশর ৩. ড. নাসির আহমেদ – পাকিস্তান ২. ড. মাজেদ আলী খান – ভারত ১. আল্লামা ছফিউর রহমান – ভারত। হাজার বছরের ব্যবধানে রাসুল (সা) সীরাত লিখা হয়েছে অগণিত। শুধুমাত্র এই প্রতিযোগিতাকে কেন্দ্র করেই লিখিত হয়েছে ১১৮২ টি গ্রন্থ! যা ইতিহাসে বিরল ঘটনা। এ সম্পর্কিত সকল গ্রন্থই সৌদি আরবের আর্কাইভে জমা আছে।
এক ব্যক্তিকে নিয়ে লিখিত এত জীবনী গ্রন্থ দুনিয়াতে আর কারো নেই। কোন একক ব্যক্তির জীবনী লিখতে এতগুলো গুণী মানুষ প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়েছে। এটা বিরাট আশ্চর্যের ব্যাপার! এ ধরনের সম্মান-মর্যাদা একমাত্র আকাশের অধিপতি আল্লাহর পক্ষেই দেওয়া সম্ভব। কেননা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজেই ঠিক করে দিয়েছিলেন যে, আমিনার কোলে জন্ম নেওয়া অতীব সুন্দর শিশুটির নাম হবে মোহাম্মদ তথা চরম প্রশংসিত। তাঁর মৃত্যু পরবর্তী সময় থেকে আজ পর্যন্ত তিনি চরম প্রশংসার চূড়ান্ত শিখরে আরোহণ করেছেন। তাইতো সারা দুনিয়ায়, হাজারো জীবনীকার তার জীবনী লিখতে গিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়েছে। ফেসবুকের পাঠশালা গ্রুপ সীরাত সংক্রান্ত বইয়ের রিভিউ প্রতিযোগিতার আয়োজন করে, তারা তার প্রশংসার জোয়ারে শামিল হয়েছে। আমিও নিজেকে ভাগ্যবান মনে করছি এই উপলক্ষে একটি রিভিউ লেখার জন্য।
প্রথমে বলে নেই, যেহেতু এই সীরাত গ্রন্থটি সারা বিশ্বের ১১৮২ টি পাণ্ডুলিপির মধ্যে সর্বোচ্চ স্থান দখল করেছে। সেহেতু এটি একটি শ্রেষ্ঠতম সীরাত গ্রন্থ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমরা সবাই জানি, প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে হলে বহু ধরনের সীমাবদ্ধতা ও নিয়ম-নীতির মধ্যে থেকেই সবাইকে অংশগ্রহণ করতে হয়। এটা করা না হলে অসংখ্য প্রতিযোগীর মধ্যে সেরাদের বের করা কঠিন। কেননা এক একজন লেখক এক এক বিষয়কে প্রাধান্য দিবে। সেক্ষেত্রে একটি মাত্র মানদণ্ড দিয়ে বিচার করা কঠিন হয়ে দাড়ায়। তাই এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের জন্যও নয়টি শর্তের মধ্যে থেকে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হতে হয়েছে। সে হিসেবে নিজেদের অনেক মন্তব্য সংযোজন ও ভাষার অলংকারকে উপেক্ষা করতে হয়েছে। কিন্তু রাসুল (সা) জীবনীর কোন অংশই বাদ যায়নি। এমন শর্তের মধ্যে আবদ্ধ থেকেও এই গ্রন্থটি রাসুলের (সা) এর সীরাতের সকল বিষয়ই যোগ করতে সক্ষম হয়েছে! এই দূরহ কাজটি লেখক দক্ষ হাতে সফলভাবেই শেষ করতে পেরেছেন।
এটি শুধুমাত্র সীরাত গ্রন্থ নয়। রাসুল (সা) এর আগমনের পূর্ব তদানীন্তন আরবের সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, কৃষ্টি-সংস্কৃতির সবই তুলে ধরা হয়েছে। আবার আশে পাশের দেশগুলোর অবস্থা ও সামাজিক চিত্রগুলো চিত্রের মত বর্ণনা করা হয়েছে। যা পাঠকদেরকে পড়ার মধ্যে আটকিয়ে রাখবে। রাসুল (সা) এর জীবনীর প্রতিটি দিক আলোচনা করতে গিয়ে সবগুলো তথ্যের উৎস প্রকাশ করা হয়েছে। প্রাঞ্জল বর্ণনায় কথাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। ঘটনা বর্ণনায় অতিমাত্রায় সাহিত্য ভঙ্গিকে উপেক্ষা করা হয়েছে। বাহুল্য বাক্য প্রয়োগ ও ঘটনার পুনরাবৃত্তি প্রয়োগ এই গ্রন্থে নেই। বইয়ের আকার কেমন হয়েছে এখানে তা বিবেচ্য বিষয় নয়; তবে যা লিখা আছে তাই ইতিহাসের কথা; অন্তত এটা নিশ্চিত বলা যায়।
নবী জীবনের শেষ দিক তথা মৃত্যু সময়ের ঘটনাপঞ্জিগুলো লেখক খুব বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। পাঠক যখন পড়বে মনে পড়বে তিনিও সেখানে উপস্থিত আছেন। রাসুল (সা) এর পত্নীগন তথা উম্মেহাতুল মোমেনিনদের জীবনী ও সংসার জীবন নিয়ে ঐতিহাসিক আলোচনা রয়েছে। সবশেষে রাসুল (সা) এর দৈহিক বৈশিষ্ট্যের আকর্ষণীয় বিবরণ দিয়ে লেখার ইতি টানা হয়েছে।
এই বইটি যার সংগ্রহে থাকবে, তার কাছে ১১৮২ টি বই থাকার সমতুল্য ব্যাপার বলে গণ্য হবে। কেননা এতগুলো গ্রন্থকে টপকে আর রাহিকুল মাকতুম সেরাদের সেরা হয়েছে। বইটি পড়ার পরেই বুঝা যাবে বইয়ের নামের সাথে উপস্থাপনার বিরাট মিল রয়েছে। গ্রন্থটি পড়ার পর রাসুল (সা) স্মৃতি আজীবনের জন্য মনের দেওয়ালে গেঁথে যাবে। বিশ বছর আগে পঠিত এই বইটির কথাগুলো আজো আমার মনের মুকুন্দে স্থান করে আছে। যার উপর ভিত্তে করেই আমি আজকের রিভিউ লেখা শেষ করলাম। আল্লাহ আমার দুর্বলতা ক্ষমা করুন।


Discussion about this post