ছাত্র জীবনের শেষ দিকে, এমন এক জায়গায় কিছুদিনের জন্য থাকতে হয়েছিল। যে সমাজের মানুষ কথায় কথায় গালি দিত। শিক্ষিত অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবার মুখে এমন গালির প্রচলন দেখে, প্রথম প্রথম নিজের কাছে নিজেই লজ্জা পেতাম! মুরুব্বীরা গালি দিলেও, গালির মেজাজ কতটুকু উঠানামা করবে, সেটা অন্তত খেয়াল রাখত কিন্তু শিশুরা যখন গালি দিত তখন নিজের কানকেও বিশ্বাস করা কষ্টকর হতো, দুনিয়াতে এত বিশ্রী, কুশ্রী ধরণের গালি আছে! তার মধ্যে কিছু সংক্ষিপ্ত গালি, কিছু গালি ছিল ব্যাখ্যা মূলক। গালি যেখানে সামাজিকতার অংশ
আরো পড়তে পারেন…
- হিংসা : উনুনে তাতানো বিষের নাম
- শৃগালের সাথে মানুষের মিল যেখানে
- বুয়েট মেধাবীদের প্রেম নিবেদন
কাউকে উপদেশ দিতে কিংবা ছোটদের প্রতি স্নেহ বাৎসল্যেও গালির ব্যবস্থা ছিল। মানুষ ওসব শুনতে শুনতে অভ্যস্ত পড়েছিল বলে গায়ে মাখত না। জুমায়ার নামাজে একটি শিশু গান্ধি টুপি পড়ে মসজিদে যায়। সেটা ছিল আড়াআড়ি সাঁটানো। শিশুর আরেক মুরুব্বী, তার পিতার বন্ধু শ্রেণীর একজন, তাকে যথাযথ টুপি পড়ানো শিখাতে, আদর করে বলল, “তোমার মামনি কি, তোমার পিতার ওইটা চোখের উপর চাপা দিয়ে ঘুমায়? এখনও টুপিও পড়তে শেখায় নি!” এটা ছিল একটা আদরণীয়, সহনীয় গালি। বাকি গালির ভাষা আমার পক্ষে লিখা সম্ভব নয়। ভাষাবিদ মরহুম ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বেঁচে থাকলে, হয়ত কায়দা করে লিখতে পারতেন।
আগে চলতে থাকা চার বন্ধুর দুঃখের কথা শুনতে শুনতে, পিছনে আমাকে কর্দমাক্ত রাস্তায় খালি পায়ে আধা কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়েছিল। সারা পথে যত বাক্য ব্যয় হয়েছে, গালির চরণ ব্যতীত একটি বাক্যও মুক্ত থাকেনি! বাক্যের শুরুতে কিংবা শেষে এভাবে গালির শব্দ জোড়ানো যায়, তা ইতিপূর্বে আমি বই পড়ে কিংবা আলোচনায় শুনিনি! ভিখারুননেচ্ছার অধ্যক্ষ মহোদয়ের ভদ্র গালির প্রতিক্রিয়া দেখে মনে হয়েছে, অনেক মানুষের কাছে গালি আজো অপছন্দের বিষয়। তবে যেহেতু উচ্চ শিক্ষিত ব্যক্তিরাও এটাতে অভ্যস্ত হতে শুরু করেছে; তাহলে অচিরেই তা সাহিত্যে জায়গা করে নিতে পারে। সেদিন বেশী দূরে নয়।
সারারাত ওয়াজ হচ্ছিল। মিলাদুন্নবীর মাহফিল। নিস্তব্ধ রাতে মাইকের আওয়াজ ভেসে আসছিল। একজন ওয়ায়েজিন তখনও উপস্থিত হয় নি। এই ফাঁকে বিকাল থেকে হামদ ও নাত শুনিয়ে যাওয়া এলাকার উদীয়মান তরুণের পক্ষে কিছু কথা বলার সুযোগ ঘটে যায়। মঞ্চে উঠে দুটো কথা বলতে এটা তার জন্য মহা-সুযোগ। মীলাদুন্নবীর মাহফিল। রাসুল (সা) জীবনের কথা আসলে, আবু জেহেল আবু লাহাবের ঘটনা আসবেই। অবশেষে এই নতুন বক্তার ভাষাতেও সেই প্রভাব পরিলক্ষিত হল, “বাইনচোতের আবু জেহেল, আইজ যদি তুই দুনিয়ায় বেঁচে থাকতি, তাহলে তোর ওলা ধরে…!” দুনিয়াতে প্রতিবছর নতুন আবু জেহেলের জন্ম হয়। তাদেরও ছেড়ে দেওয়া হয়নি তার কদর্য ভাষার আক্রমণ থেকে।
সকালে মুরুব্বী কয়েকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন শুনলেন নতুন বক্তার ওয়াজ? বুঝলাম তারা এই ওয়াজ খুব খুশী মনে উপভোগ করেছে। ওয়ায়েজিনের জগতে এক নতুন সম্ভাবনাময় বক্তার উত্থান হচ্ছে বলে তাদের মনে হল! কানে ভো ভো করে তখনও বক্তার কদাকার ভাষা ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। কিন্তু সাধারণের কাছে ওটা তার বাগ্মিতা ও দক্ষতার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়াদের কানে তুললাম বিষয়টি। তাদের দৃষ্টিতে এটা কোন বিষয়ই নয়। কেননা ওরাও এই সমাজে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আমাকেও পরামর্শ দিল, কিছুদিন থাকলে আমিও ওসবে অভ্যস্থ হয়ে যাব।
ভদ্র চেহারার আড়ালে কেমন চরিত্র লুকিয়ে থাকে, তা মানুষ বাহ্যিক-ভাবে আচ করতে পারে না। সে জন্য মানুষের সাথে মিশতে হয়, পরিবেশ সম্পর্কে জানতে হয়। উচ্চ শিক্ষা নিলেই যে মানুষ আলোকিত হয়ে উঠে, এমন ধারণা মহাভুল। মানুষ গড়তে হলে মৌলিক ও নৈতিক শিক্ষা লাগে। আলোকিত মানুষ হতে হলে, আলোকিত মানুষের সাহচর্যে থাকতে হয় এবং ধর্মীয় জ্ঞানে উদ্ভাসিত হতে হয়।


Discussion about this post