উম্মে হারাম (রাঃ) ছিলেন মদিনার প্রখ্যাত খাযরাজ গোত্রের নজ্জার বংশের মেয়ে। তিনি ছিলেন একজন খোদা ভীরু, জ্ঞানী এবং পুণ্যবান মহিলা। তাঁর মধ্যে ছিল বিপুল উদারতা, পরার্থপরতা এবং আত্মত্যাগের সহজাত প্রবণতা। উম্মে হারাম মহিয়সি সাহাবী
আরো পড়তে পারেন…
- ইমাম আযম আবু হানীফা (রহঃ)
- উম্মুল মোমেনীন হাফসা (রাঃ)
- উম্মুল মোমেনীন মাইমুনা (রাঃ)
উম্মে হারাম (রাঃ) ছিলেন সেই আনসার মহিলা যিনি রাসুল (সাঃ) মদিনায় আগমনের পূর্বে শুধু ইসলাম গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হন নাই বরং প্রকাশ্যে নতুন ধর্মের ঘোষণা দিতে দ্বিধাবোধ করেন নাই। এ জন্য আনসার নারীদের মধ্যে উম্মে হারাম (রাঃ) এক অনন্য মর্যাদার অধিকারিণী ছিলেন। তিনি মনে-প্রাণে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করতেন যে তিনি যেন ইসলাম কায়েমের লড়াইয়ে শাহাদাৎ লাভ করেন।
উম্মে হারামের প্রথম স্বামী ছিলেন আমর বিন কাইস বিন জাহিদ (রাঃ)। তাঁদের প্রথম পুত্রের নাম কাইস বিন আমর বিন কাইস (রাঃ)। দ্বিতীয় পুত্রের নাম আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ)। তাঁর প্রথম স্বামী এবং প্রথম পুত্র বদর ও ওহুদের যুদ্ধে শরীক হন এবং ওহুদের যুদ্ধে দুজনই শাহাদাৎ বরণ করেন।
ওহুদের যুদ্ধে ৭০ জন সদস্য সাহাদাৎ প্রাপ্তির কারণে ছোট্ট নব গঠিত মুসলিম সংঘ নতুন ধরণের সংকটে পতিত হয়। সেই সব শহীদদের পরিবার পরিজনরা প্রিয়জন হারানোর গভীর শোকে পতিত হয়। এই সব অসহায় শহীদদের পরিবার পরিজনের জন্য মানসিক, পারিবারিক, সামাজিক নিরাপত্তা সহ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করে মুহাম্মদ (সাঃ) কে নানামুখী কর্মতৎপরতা পরিচালিত করতে হয়েছিল। এই উপলক্ষে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন নাজিল হয়। নবগঠিত মুসলিম সংঘের এই শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে ৬২৫ সালে বিরে মাউনার সাথে মুশরিকরা বিশ্বাসঘাতকতা করে ৬৮ জন মুসলিমকে হত্যা করে। ঐ মিশনে উম্মে হারাম (রাঃ) এর দুই ভাই যথাক্রমে হারাম বিন মিলহান (রাঃ) এবং সালীম বিন মিলহান (রাঃ) ছিলেন। তাঁরাও বদর এবং ওহুদ যুদ্ধ করে অংশ গ্রহণকারী সাহাবী ছিলেন!
বীর মাউনার কাপুরুষিত আক্রমণে এই দুই ভাই শহীদ হবার কারণে উম্মে হারাম (রাঃ) এর এক বোন ছাড়া আপন কেউ দুনিয়াতে বেঁচে ছিলেন না। তাঁরা নিঃস্ব ও রিক্ত হয়ে পড়েন! তখন থেকে রাসুল (সাঃ) তাদেরকে সান্ত্বনা আর সাহস দিতে প্রায়ই তাদের ঘরে আসা-যাওয়া করতেন। পরবর্তীতে উম্মে হারাম (রাঃ) আবার বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।
মুহাম্মদ (সাঃ) মক্কা থেকে হিজরত করে প্রথম কয়েকদিন মদিনার উপকণ্ঠের কুবা পল্লীতে অবস্থান করেছিলেন। কুবা পল্লীতে গাছপালা সমৃদ্ধ সবুজ উদ্যান ছিল তাই রাসুল (সাঃ) প্রায়ই প্রখর-দুপুরে গরমের সময় কুবাতে হয় উম্মে হারামের ঘরে না নয় তাঁর একমাত্র বোন উম্মে সুলাইম (রাঃ) এঁর ঘরে বিশ্রাম নিতেন। তাঁরা এভাবে রাসুল (সাঃ) এঁর খেদমত করার সুযোগ পাওয়াকে বড়ই সৌভাগ্য মনে করতেন।
ইসলামের জন্য সেদিন যারা নিঃস্ব ও রিক্ত হস্তে মদিনায় এসেছিলেন আনসাররা তাদের আতিথেয়তায় আত্মত্যাগের যে বিমল উদাহরণ রেখেছিলেন ইসলামের ইতিহাসে তা এক অমর অধ্যায়। সেই আথিতেয়তায় উম্মে হারাম (রাঃ) ছিলেন এক অনন্য অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। মদিনার আনসারদের নিঃস্বার্থ ত্যাগ আর সেবায় যেমন পুরুষরা ছিল তেমনি ছিল নারীরাও। আনসার নারী পুরুষদের মধ্যে সেবা আর আত্মত্যাগে কোন পার্থক্য ছিলনা। আনসারদের এই বদান্যতা ও অবদানের কথা আল কোরআন এভাবেই উল্লেখ করে:
“যারা মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে মদিনায় বসবাস করেছিল এবং বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তারা মুহাজিরদের ভালবাসে, মুহাজিরদেরকে যা দেয়া হয়েছে, তজ্জন্যে তারা অন্তরে ঈর্ষা পোষণ করে না এবং নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও তাদেরকে অগ্রাধিকার দান করে। যারা মনের কার্পণ্য থেকে মুক্ত, তারাই সফলকাম।” (৫৯:৯)
রাসুল (সাঃ) এঁর জন্য অধিক ভালবাসা এবং অধিক ত্যাগকারীদের মধ্যে উম্মে হারাম এঁর পরিবার অগ্রগামী ছিলেন। এর জন্য উম্মে হারাম (রাঃ) এঁর পরিবার নবী মুহাম্মদ (সাঃ) এঁর কাছ থেকে একাধিকবার দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য লাভের আশীর্বাদ বা দোয়া পেয়েছিলেন, যেরূপ দোয়া বা আশীর্বাদ খুব অল্প লোকের সৌভাগ্যে এসেছিল। এটাই হচ্ছে উম্মে হারাম (রাঃ) ও তাঁর বোন উম্মে সুলাইম (রাঃ) এঁর মর্যাদা ও ধর্মীয় অবস্থান।
তাঁদের ঈমানের অবস্থান এমন ছিল যে যখনই রাসূল (সাঃ) তাঁদের ঘরে আসতেন, তাঁরা সে আগমনকে আল্লাহর তরফ থেকে রহমত বলে জ্ঞাপন করতেন এবং রাসূল (সাঃ)-কে তাঁদের হৃদয় উজাড় করে সেবা করতেন। এগুলো ঈমানের বিষয়। যাদের এসব বুঝার জ্ঞান আল্লাহ দেননি তাদেরকে অন্য কেহ দিতে পারবেনা। ধর্মীয় বিষয়ে যাদের সন্দেহ রয়েছে সে সন্দেহ উকি ঝুঁকি মারার অসংখ্য স্থান রয়েছে। কেবল নিষ্কলুষ আত্মা ছাড়া ঈমানের পথ রুদ্ধ।
মহিলা সাহাবী উম্মে হারাম সর্ম্পকিত ঐতিহাসিক ঘটনা সমৃদ্ধ একটি হাদিস আছে। যে হাদিসের মাধ্যমে রাসুল (সা) এর একটি ভবিষ্যত বাণী কার্যকর হয়েছিল। চলুন আগে সেই হাদিসটি দেখে নেই।
আনাস বিন মালিক (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত যে,
“আল্লাহ্র রাসুল প্রায়ই উম্মে হারাম বিনত মিলহানের বাড়িতে বেড়াতে যেতেন এবং তিনি ছিলেন ওবায়দাহ বিন সামিত (রাঃ) এর স্ত্রী। একদিন নবী তাঁর সাথে দেখা করতে গেলেন এবং তিনি তাকে খাওয়ানোর পর মাথার উকুন বাছতে লাগলেন। আল্লাহর নবী ঘুমিয়ে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পর হাসিমুখে জেগে উঠলেন! উম্মে হারাম জানতে চাইলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, কিসের জন্য আপনি হাসলেন? রাসুল (সাঃ) জানালেন, ‘তিনি স্বপ্ন দেখেছেন উনার কিছু অনুসারী আল্লাহর জন্য জেহাদ করতে জাহাজের মধ্যে মধ্য সাগরে ভাসছে, যেমন করে রাজা-বাদশাহ সিংহাসনে উপবিষ্ট দেখায়’। উম্মে হারাম বলেন ইয়া রাসুলুল্লাহ, ‘আল্লাহর কাছে আমার জন্য দোয়া করুন যাতে করে আমি ঐ অভিযাত্রী দলের একজন হতে পারি’! রাসুল (সাঃ) উম্মে হারামের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করতে আল্লাহর কাছে দোয়া করে আবার ঘুমিয়ে পড়েন এবং আবারো হাসি মুখে জেগে উঠেন। আবার উম্মে হারাম রাসুল (সাঃ) কে জিজ্ঞাস করেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, ‘কিসের জন্য আপনি হাসলেন’? রাসুল (সাঃ) ঠিক আগের মত জানালেন, ‘তিনি স্বপ্ন দেখেছেন উনার কিছু অনুসারী আল্লাহর জন্য জেহাদ করতে জাহাজের মধ্যে মধ্য সাগরে ভাসছে যেমন করে রাজা-বাদশাহ সিংহাসনে উপবিষ্ট দেখায়’। উম্মে হারাম আবারো বলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ, ‘আল্লাহর কাছে আমার জন্য দোয়া করুন যাতে আমি ঐ অভিযাত্রী দলের একজন হতে পারি’! এবার রাসুল (সাঃ) বলেন, ‘হ্যাঁ তুমি সেই দলের প্রথম জন হবে’!”
বোখারী-মুসলিম।
আমিরুল মোমেনীন উসমান (রাঃ), তাঁর শাসনামলে, মুয়াবিয়া বিন আবু সুফিয়ান (রাঃ) কে সাইপ্রাসে ইসলামের দাওয়াত নিয়ে যেতে অনুমতি দেন। মুয়াবিয়া (রাঃ) নৌ-বাহিনী গঠন করে উম্মে হারাম (রাঃ) এঁর স্বামী ওবায়দাহ বিন সামিত (রাঃ) কে উক্ত বাহিনীর জেনারেল করে সাইপ্রাসে প্রেরণ করেন। মুসলমানদের সাইপ্রাস অবরোধের প্রেক্ষিতে মুসলিম বাহিনীর নিকট সাইপ্রাস আত্মসমর্পণ করে। এই আত্মসমর্পণের মাধ্যমে রাসুল (সাঃ) এঁর স্বপ্ন পরিপূর্ণ হয়। উম্মে হারাম (রাঃ) সেই অভিযানে তাঁর জেনারেল স্বামীর সাথে ছিলেন। তখন তিনি ছিলেন ৭০ বছরের এক বৃদ্ধা। বিজিত বাহিনী যখন দক্ষিণ সাইপ্রাসের লারনকার সল্ট লেকের পশ্চিম তীর দিয়ে প্রবেশ করছিল তখন তিনিও গাধায় চড়ে সেই বাহিনীর সাথে শহরে প্রবেশ করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু গাধার পিঠ থেকে পিছলে মাটিতে পড়ে যান। ফলে তিনি সেখানেই শাহাদাৎ বরণ করেন। যে কারণে উম্মে হারামকে (রাঃ) সাগর জেহাদের প্রথম শহীদ হিসাবে সম্মানিত করা হয়। তার এই শাহাদাৎ প্রাপ্তি রাসুল (সাঃ) এর হাদিসের সত্যাসত্য প্রমাণিত হয় এবং রাসুলের একটি ঐতিহাসিক মোজেজা পূর্ণ হয়। উম্মে হারাম (রাঃ) যে স্থানে শাহাদাত বরণ করেন সেই স্থানেই তাঁকে দাফন করা হয়। সেখানে তাঁর মাজারে অগণিত মানুষ জেয়ারত করতে উপস্থিত হয়। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল ধরনের মানুষ শ্রদ্ধা জানাতে সেই মাজারে হাজির হয়!
ইসলাম বিদ্বেষীরা এই হাদিসের সূত্র ধরে রাসুল (সাঃ) এর সমালোচনা করার চেষ্টা করে। প্রথম সমালোচনা হল রাসুলের (সা) মাথায় উকুন। দ্বিতীয় সমালোচনা হল, পরস্ত্রীকে মাথায় হাত বুলাতে দিয়েছে।
তাই এ সর্ম্পকিত কথাগুলোর উত্তরও এখানে সন্নিবেশিত করা হলো,
১. উম্মে হারাম (রাঃ) ছিলেন রাসুল (সাঃ) এঁর দাদা আব্দুল মোতালিবের সৎ বোন মুলাইকাহর মেয়ে। তাতে তিনি সম্পর্কে হন রাসুল (সাঃ) এঁর ফুফু।
২. উম্মু হারাম (রাঃ) এঁর বাবা মিলহান বিন খালিদ ছিলেন মদিনার খাযরাজের উপগোত্র বানু নাজ্জারের লোক। বানু নাজ্জার গোত্র ছিল রাসুল (সাঃ) এঁর মা আমেনা বিবির বংশ।
৩. উম্মে হারাম (রাঃ) এর দুধ খালা ছিলেন। অর্থাৎ রাসুল (সাঃ) এঁর মা যে মহিলার দুধ পান করেছিলেন সেই মহিলার দুধ উম্মে হারাম (রাঃ) পান করেছিলেন।
অতএব উম্মে হারামের সাথে, উভয় দিক দিয়ে (রক্ত এবং দুধ) তাঁর সম্পর্ক মুহরিম ছিল। কাজেই রাসুল (সাঃ) উম্মে হারামের সেবা গ্রহণ করে ইসলামী শরিয়তের কোন আইন লংঘন করেন নাই।
রাসুল (সাঃ) যখন কুবায় যেতেন তখন তিনি তাঁর দাদি মুলাইকাহর ঘরে নামাজ আদায় করতেন। সেই নামাজে আনাস বিন মালিক (রাঃ) তাঁর মা উম্মে সুলাইম (রাঃ) ও খালা উম্মে হারাম (রাঃ) শরীক হতেন।
এই কুবার উম্মে সুলাইমের (সাঃ) বাড়িতে রাসুল (সাঃ) সহধর্মীনি উম্মুল মুমেনীন মারিয়া কিবতীয়া (রাঃ) মিশর থেকে এসে উঠেছিলেন এবং এই হাদিসের ঘটনা উল্লেখের সময় মারিয়া (রাঃ) সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
রাসুল (সা) এর মাথায় উকুন প্রসঙ্গে
রাসুলের ফুফুরা নবীজির চুলে আঙ্গুল বোলাতেন! সেটা উকুন তালাশের জন্য নয়; বরং আদর করে। একজন ফুফু তাঁর শরীর থেকে নির্গত ঘাম বোতল ভরে রেখেদিয়েছিলন! পরবর্তী সময়ে সেগুলো থেকে খুশবো বের হত! একদা এক ব্যক্তি লম্বা চুল রাখার অনুমতি চাইলে, রাসুল বললেন, সর্বদা পরিপাটি করতে না পারলে, রীতিমত আঁচড়িয়ে যত্ন করতে না পারলে যাতে লম্বা চুল না রাখে!
রাসুলের (সা) মাথায় বাস্তবের উকুন থাকার কথাটি সম্পূর্ণ ভুল ও মিথ্যা। রাসুল (সাঃ) খুবই স্মার্ট ও সুদর্শন ছিলেন। তিনি যে রাস্তা দিয়ে হেটে যেতেন সে রাস্তায় অনেকক্ষন পরে কেউ হেঁটে গেলে তাঁহার শরীরের সুগন্ধি পেয়ে সবাই বুঝতে পারতেন, এই রাস্তায় রাসূল (সাঃ) হেঁটে গেছেন। তিনি যে মাপের সৌখিন, সৌন্দর্য প্রিয়, পরিপাটি, পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন মানুষ ছিলেন, তাঁর মাথায় উকুন থাকা বাস্তবতার নিরিখে সম্ভব নয়। আবার উকুন অপরিচ্ছতার আলামত, আর পরিষ্কার-পরিচ্ছনতা ইমানের একটি শাখা। যে রাসুল মানুষকে ইমানদার বানাতে এত সংগ্রাম করলেন, তিনি কোন অবস্থাতেই অপরিচ্ছন্ন থাকতে পারেন না! বস্তুত তার জীবনে এটা পাওয়া যায় নাই। মূলত উম্মে হারাম (রাঃ) উকুনের উছিলায় রাসুল (সা) এর মাথায় হাত দেবার সুযোগ নিয়েছেন মাত্র; প্রকৃতই তার মাথায় কোন উকুন ছিলনা।
১. হাদীস বর্ণনাকারী আনাস (রাঃ)।
উল্লেখ্য এই হাদিসের বর্ণনাকারী আনাস বিন মালিক (রাঃ) ছিলেন উম্মে সুলাইমের পুত্র এবং উম্মে হারামের বোন পো। বালক আনাস (রাঃ) কে, রাসুলের খেদমতে তাঁর মা চিরজীবনের জন্য উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। রাসুলের মৃত্যু পর্যন্ত তিনি তার খেদমতে অবিচল ছিলেন। সেই কারণে এই ঘটনাটি, রাসুলের সাথে তাঁর মা-খালা কেমন আচরণ করতেন তা নিকটে থেকে স্বচক্ষে দেখেছেন। সে হিসেবে তিনি ছিলেন ঘটনার মহা সাক্ষী।
২. উম্মে হারামের দ্বিতীয় স্বামী ওবায়দাহ বিন সামিত (রাঃ)।
ওবায়দাহ বিন সামিত (রাঃ) ছিলেন উম্মে হারামের দ্বিতীয় স্বামী। আগেই বলা হয়েছিল তাঁর প্রথম স্বামী ও সন্তান উহুদ যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। ওবায়দাহ বিন সামিত (রাঃ) এঁর সাথে ইসলামের তথা রাসুল (সাঃ) এঁর এক বিশেষ সম্পর্ক ছিল। রাসুল (সাঃ) নবুয়াত প্রাপ্তির এগারটি বছর নিজের জন্মভূমি মক্কার মানুষদের ইসলামের দাওয়াত দিয়েও তেমন ব্যাপক ভাবে সাড়া পাচ্ছিলেন না। বরং নব ধর্মে দীক্ষিত মুসলিমরা তাদের জান মাল নিরাপদে রেখে মক্কায় বাস করা কঠিন হয়ে পড়েছিল। যখন এই নতুন মিশনের জন্য রাজনৈতিক কোন আশ্রয় একান্ত জরুরী হয়ে উঠেছিল, ঠিক তখন, ৬২০ খৃষ্টাব্দে, মদিনা থেকে আগত ৬ জনের একটি দলের সাথে আচানক ভাবে মুহাম্মদ (সাঃ) এঁর পরিচয় ঘটে, তিনি তাদেরকে ইসলামের দাওয়াত দেন। তারা রাসুলের (সাঃ) দাওয়াতকে মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেন এবং রেসালতকে গভীরভাবে উপলদ্ধি করেন। তারা ইসলাম গ্রহণ করেন এবং রাসুল (সাঃ)-কে প্রতিশ্রুতি দেন যে আগামী বছর হজ্জে আরও লোক নিয়ে তার কাছে আসবেন। এই ৬ জনের সাক্ষাৎ ছিল ইসলামের ইতিহাস, বরং বলা ভাল এই পৃথিবীর ইতিহাসে, এক যুগান্তকারী টার্ণিং পয়েন্ট। এই ৬ জনের একজন ছিলেন ওবায়দাহ বিন সামিত (রাঃ)।
৬২১ খ্রিঃ দ্বিতীয় মিশনে আকাবায় প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী যে ১২ জন রাসুল (সাঃ) এঁর প্রতি আনুগত্যের শপথ নিয়েছিলেন সেই ১২ জনের একজনও ছিলেন তিনি এবং ৬২২ খ্রিঃ তৃতীয় মিশনেও যে ৭২ জন এসে চূড়ান্ত শপথ নিয়েছিলেন তাদের মধ্যেও তিনি একজন ছিলেন! এর থেকে প্রমাণিত হয় যে এই ওবায়দাহ বিন সামিত (রাঃ) কেবল মাত্র একজন সাহাবী ছিলেন না, তিনি এমন এক ব্যক্তি ছিলেন যিনি রাসুল (সাঃ) এঁর পয়গাম নিয়ে মদিনাবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, রাসুল (সাঃ) এঁর নবুওয়াতী মেনে নিয়ে ইসলামকে নিজের দ্বীন হিসাবে গ্রহণ করতে এবং তাতে তিনি সফলও হয়েছিলেন যার ফলে মাত্র ৬ জন থেকে ১২ জন, ১২ জন থেকে ৭২ জনে উন্নত হয়েছিল তাদের সাংগঠনিক শক্তি।
রাসুল (সাঃ) মদিনা গমনের পূর্বে চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেবার জন্য মদিনার যে ১২ জন অধিবাসী সদস্যে্কে যে আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেছিলেন সেই ১২ জন আহ্বায়কদের একজন ছিলেন ওবায়দাহ বিন সামিত (রাঃ)।
যেদিন নামাজের মধ্যে মুসলিমদের কেবলার দিক পরিবর্তন করা হয়েছিল সেই জামাতেও তিনি শরীক হবার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন।
রাসুল (সাঃ) তাঁকে জাকাত কালেক্টর নিয়োগ করেছিলেন। ইসলামী খেলাফতের খলিফাগণ উনাকে সম্মানজনক ভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনে নিয়োগ করেছিলেন। এই সাহাবীর নেতৃত্বে একদিন আরব উপদ্বীপ অতিক্রম করে ইসলামের আলো বহির্বিশ্বে প্রবেশ করেছিল।
ওবায়দাহ বিন সামিত (রাঃ) যেমন স্ত্রীর প্রতি আদর্শ একজন স্বামী ছিলেন, তেমনি সন্তানদের কাছে একজন আদর্শ বাবাও ছিলেন। নিজ ঔরসের সন্তান মুহাম্মদ বিন ওবায়দাহ (রাঃ) এর প্রতি যেমন করে পিতৃত্বের দায়িত্ব পূর্ণ করেছিলেন ঠিক একই ভাবে উম্মে হারাম (রাঃ) এর আগের পক্ষের সন্তান আবদুল্লা বিন আমর (রাঃ) পিতৃত্বের ভালবাসা দিতে কার্পণ্য করেন নাই।
আল্লাহর রাসুলের (সাঃ) আচরণ যদি উপরোক্ত সম্মানিত মহিলাদের প্রতি ইসলাম সম্মত না হত, তাহলে এই ধরনের সম্মানিত বীর সাহাবী সেটা মেনে নিতেন না। পরবর্তী ইসলামী যুগে কোন এক পর্যায়ে এটা নিয়ে কথা উঠত। আর উঠে নাই এই জন্য যে, শরিয়তের মানদন্ডে রাসুলের (সাঃ) আচরণও ইসলাম সম্মত ছিল।


Discussion about this post