আমাদের সময়ে হাই স্কুলে ভর্তি হয়ে অষ্টম শ্রেণী পর্যন্তই এক বিরাট সংখ্যক ছাত্র ঝড়ে যেত। তারা আগেই বুঝে নিত অংক-ইংরেজিতে যখন এই পর্যন্তই সুবিধা করতে পারে নি, তাহলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে আরো বোঝা মাথায় নেওয়ায় বিপদ হবে। শিক্ষা যেখানে বেকার তৈরির কারখানা
যারা নবম-দশম শ্রেণী পড়ে টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিত। সেখান উত্তীর্ণ হতে না পেরে কিছু ছাত্র ওখানেই বিদ্যা শিক্ষার ইতি টানতেন। তখন স্কুলে টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াটাও কিন্তু একটি কৃতিত্বের বিষয় ছিল।
যারা এস এস সি পরীক্ষায় অংশ নিত তাদের মধ্য থেকে আবার প্রায় অর্ধেকের বেশী সংখ্যক ছাত্র অকৃতকার্য হতো! পরীক্ষায় ৬০ শতাংশ মার্ক তুলতে পারলে সারা এলাকায় তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ত। যে ছাত্র ৩৩ শতাংশ মার্ক পেয়ে থার্ড ডিভিশন প্রাপ্ত হতো, সেও নিজেকে কৃতকার্য ভাবত; সমাজ ও রাষ্ট্রে তার জন্যও একটি স্থান ছিল।
এস এস সি উত্তীর্ণদের মধ্য থেকে কিছু সংখ্যক কলেজে ভর্তি হতো। তাদের মধ্য থেকে খুব অল্প সংখ্যক ছাত্রই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান পেত। বাকিরা নানা স্থানে চাকুরী-বাকরী করতেন। কেউ টেকনিক্যাল কাজ শিখে ভিন্ন রাস্তা ধরতেন।
আরো পড়ুন…
- নিজের পায়ে দাঁড়ানো
- অলস মানুষ লজ্জাহীন ও সমাজের বোঝা
- যোগ্য লোক অলস হলে কূটচালে অভ্যস্ত হয়
মেট্রিক পরীক্ষায় যারা অকৃতকার্য হতো, তাদের হৃদয়ে ভয়ানক মর্ম-যাতনার সৃষ্টি হতো। কেননা পরীক্ষা পর্যন্ত আসতে পারাটাও ছিল এক মহা লড়াইয়ের মত বিষয়। তারা আজীবন এই কষ্ট বুকে ধারণ করতেন। তবে তারা পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক দিক নির্দেশনা দেওয়ার মত যোগ্য হয়ে উঠতেন।
কৌতূহলের বিষয় হল, পরবর্তীতে এসব মানুষগুলোই সমাজ বিনির্মাণে সবচেয়ে বেশী অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। সমাজের কর্মকাণ্ড এদের হাত ধরেই আবর্তিত হত। এই মানুষগুলোকে অশিক্ষিত বলা হতো না বরং অনেকেই এলাকার শিক্ষার আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতেন।
এরা এলাকায় নিজ থেকে যেত। কেউ দোকান-পাট দিত। কেউ গ্যারেজ ওয়ার্কশপে কাজ শিখে নিজেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলতেন। কেউ সার্বক্ষণিক কৃষিকাজে জড়িত হয়ে পড়তেন। কেউ মেম্বার-চেয়ারম্যান হওয়া সহ, নানাভাবে সামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তেন। তাদের মধ্যে যারা মেধাবী তারা টিউশনি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।
এদের প্রায় সবাই জলদি বিয়ে-শাদী করে গৃহস্থ হয়ে যেতেন। ফলে এলাকায় অবিবাহিত মেয়েদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটত না। উচ্চ শিক্ষিতরা বিয়ে করত দেরীতে, তারা যখন এলাকায় আসতেন, তখন সমাজের সেই সব বন্ধুরা তাদের প্রীতিভাজন হয়ে উঠতেন। শিক্ষিতরা এলাকায় মূল্য পেত এদের কারণে; তারা গ্রামে আসার মধ্যেও একটা সুখানুভূতি পেতেন।
গ্রামীণ জনপদের উন্নতির জন্য এমন ধরণের কিছু ফেল করা শিক্ষিত মানুষের দরকার। যারা নিজেদের শিক্ষিত দাবী করে অহংকারের বশে কাজ বাছাই করতে পারে না। আবার অশিক্ষিতও নয় যে, তাদেরকে অবহেলা অবজ্ঞা করা যাবে।
তাদের ভূমিকা হয়ত বাহ্যিক চোখে দেখা যায় না কিন্তু বর্তমানে শিক্ষিতের সংখ্যা বাড়ার কারণে, বিষয়টি দিন দিন ব্যথা-দায়ক ক্ষতের মত হয়ে উঠছে। শিক্ষিতদের অনাগ্রহের কারণে, সে সব জায়গা তো আর খালি থাকছে না! সমাজের মূর্খ, ধূর্ত, অসৎ, প্রবঞ্চক মানুষগুলো সে স্থান পূরণ করতে এগিয়ে এসেছে।
বর্তমানে বেশীর ভাগ ছাত্র-ছাত্রীই এইচ, এস, সি পাশ। তাদের অনেকেই নিজেদের উচ্চ শিক্ষিত মনে করে। যদিও পাশ্চাত্যের মত দেশে এরা স্কুলের ছাত্র হিসেবেই বিবেচিত। আমেরিকায় সরকারী স্বীকৃত শিক্ষার যাত্রা শুরু হয় এই পর্যায় থেকে। কিন্তু আমাদের দেশের এমন পর্যায়ের ছাত্ররা নিজেদের উচ্চ শিক্ষিত মনে করে, আত্ম সম্মান হারানোর ভয়ে, গ্রামীণ জনপদের ছোট কাজে আর নিজেদের নিয়োজিত করতে পারে না।
রান্নার কাজ জানাটা ছেলে-মেয়ে সবার জন্য জরুরী। তবে মেয়েদের জন্য অবশ্যম্ভাবী, কেননা সংসারের সে অন্যতম চাবি-কাটি। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া এইচ, এস, সি লেভেলের অধিকাংশই ছাত্রীরাই রান্না-বান্নার কাজ জানেনা। শিক্ষা যেখানে বেকার তৈরির কারখানা
স্কুল জীবনের কোন এক বাঁকে, মেধাবীর দোহাই দিয়ে, মায়েরা কন্যাদের দিয়ে প্রয়োজনীয়ও কাজও করায় না। এমন মেয়েরা সংসারী হলে, শুরুর দিকে কিছুদিন হয়ত ঘোরের মধ্যে বিয়ের আনন্দে দিন কাটে কিন্তু ধীরে ধীরে ঘর সংসারের প্রতি বিতৃষ্ণা জমে উঠে, সংসার ভাঙ্গে।
মূলত আমাদের সমাজে কাজের অভাব নেই কিন্তু কাজের মানুষের অভাব বেশী। পুরো জাতিই যদি উচ্চ শিক্ষিত হয় তাহলে, শ্রমিকের কাজ করবে কে? সবার জন্য উচ্চশিক্ষা জরুরী নয় কিন্তু মেধাবী, অধ্যবসায়ী এবং গবেষকদের উচ্চ শিক্ষা দেওয়াটা রাষ্ট্রের জন্য জরুরী। এমন মানুষ ছেঁকে বের করার জন্য শিক্ষা ব্যবস্থাকে কিছুটা শক্ত করা জরুরী।


Discussion about this post