হোটেল ম্যানেজারকে প্রশ্ন করলাম, ইংরেজি বুঝে এমন কোন নাপিতের খবর আছে কিনা? তিনি আঁকা-বাঁকা পথের একটি সেলুনের সন্ধান দিয় বললেন, সে পথে আড়াই কিলোমিটার পর্যন্ত গেলে; চলন সই ইংরেজি জানে এমন একজন নাপিতের দেখা মিলবে! হাতে মেলা সময়, তাই ঐ অবস্থাতেই নাপিতের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। চলার পথে বারে বারে পিছনের দিকে ফিরে দেখি, সে অবস্থায় রাস্তাটা কেমন দেখায়! কেননা ফিরতি পথে আমাকে এই রাস্তা ধরেই ফিরে আসতে হবে। অচেনা-অজানা শহরে ঘুরার জন্য এটি একটি যুতসই পদ্ধতি। সাইন বোর্ডের লেখা পড়তে না পারার ব্যর্থতার ফলে, অতীতের তিক্ততা থেকেই এমন অভ্যাস রপ্ত করেছি। শহরের রাস্তায় একবার হারিয়ে গেলে না পাব পথের দিশা, আর না কাউকে জানাতে পারব আমি হারিয়ে গিয়ে ওখানে থমকে আছি। রবী ঠাকুরের নাপিত বন্ধুর খপ্পরে
আরো পড়তে পারেন…
অনেক কষ্টে নাপিতের কাছে পৌঁছলাম। ভদ্রলোককে দেখে, চক্ষু যেন চড়ক গাছের মত একশত আশি ডিগ্রী ঘুরে গেল! চুল-দাড়ি তো নাপিতেরাই কাটে কিন্তু এমন নাপিতের মুখোমুখি হব ভাবিনি! ইতিমধ্যেই যার হাতের চামড়া কুঁচকে কিসমিসের মত হয়ে গেছে। সোজা বাংলায় যাকে বলা চলে বৃদ্ধ ব্যক্তি! তবে সটান হাঁটার ভঙ্গি, চেহারায় উৎফুল্লতা আছে। যদিও এমন কর্মক্ষম ব্যক্তি এদেশে আরো বহু দেখেছি। তবুও সেলুন কর্মী হিসেবে আমাদের দেশে এই কাজটায় বয়স বাছে। অনেকেই বয়সে তরুণ নাপিতের সন্ধানে দোকান বদলাতে থাকেন।
পৌনে দু’বছরের শিশুকে নিয়ে একদা সেলুন বিভ্রাটে পড়েছিলাম। আমার পরিচিত সেলুনে সে ঢুকবে না। এছাড়াও যে সেলুনে ঢুকি, সেটা তার পছন্দ না। জোড় করলে কান্না করে। অবশেষে সুন্দর পরিপাটি দোকানের ইয়াং সেলুন কর্মীর কাছে গেলে সে তাতে খুশী হয়। তখন বুঝলাম, শিশুরা মনের ভাব প্রকাশ করতে না পারলেও, সুন্দর ও রুচি বোধের তফাৎ ঠিকই বুঝে।
শুধু শিশু কেন বর্তমান ইয়াং জেনারেশনও শিশুদের মত ইয়াং সেলুন কর্মীকে পছন্দ করে। একই সমাজের মানুষ বলে, তলে তলে আমিও তরুণ নাপিতের প্রতি দুর্বল ছিলাম। তাই হয়ত এমন বুড়ো ব্যক্তিকে নাপিত হিসেবে প্রথম দেখাতে কিছুটা হতচকিত হয়েছিলাম।
নাপিত কর্ম কোন অবহেলার পেশা নয়। এটা মানব জাতির আদি পেশার একটি। নাপিতের সুন্দর বাংলা নাম ‘নরসুন্দর’। পুরুষেরা সেলুনে ঢুকে উস্কু-খুস্কু চেহারায়; আর বেরুয় প্রিন্সের মত হয়ে। হয়তবা এ কারণেই নরসুন্দর শব্দটির জন্ম। মিশরের ফারাওদের সময়ে এটাই ছিল সর্বোৎকৃষ্ট পেশা। পরবর্তীতে বহু শতাব্দী পর্যন্ত এটা সেরা পেশা হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছিল। অধিক বেতন ও রাজ কর্মচারী হবার দৌড়ে এরাই অগ্রণী থাকত। মানব দেহ কাটা, ছেড়া, সেলাই করা সহ যাবতীয় ডাক্তারি কাজের সহায়ক ছিলেন নাপিতেরা। যা’হোক কথার মধ্যে কথা ঢুকে ভিন্ন দিকে চলে গিয়েছিলাম, আমরা বলছিলাম সেই বুড়ো নাপিতের কথা।
হোটেল ম্যানেজার থেকে আগেই ধারণা নিয়েছিলাম চুল কাটায় মোটামুটি খরচ কত আসবে। কিন্তু এখানে বুড়ো হাঁকালেন তার প্রায় দ্বিগুণ! তাজ্জব হয়ে বললাম, হোটেল ম্যানেজার বলল এর চেয়ে বেশী হবে না কিন্তু আপনি তো অধিক হাঁকালেন। তিনি মুচকি হেঁসে বললেন, ওটা তো মেইন রাস্তার ওদিকের সেলুনে পাওয়া যায়! আমার এখানে নয়!
অবাক হবার বিষয়! জানি বুড়ো মানুষের দক্ষতা সব সময় বেশী থাকে। তাই বলে চুল কাটার দক্ষতার মধ্যে এমন কিছু নেই যে, যার জন্য বেশী অর্থ দাবী করা যায়। তবে সেলুন কর্মীরা ম্যাসাজে দক্ষ, এই সার্ভিসের একটি বাজার মূল্য আছে। এমন সার্ভিস একজন বুড়ো মানুষ থেকে নিতে অনেকেই আগ্রহী হবেন না। এমনিতেই সেলুন কর্মীরা যখন এমন সার্ভিস আমাকে দিতে চায়, তখনই আমার বিবেকে বাধে।
আমাদের দেশে মূল সড়কের পাশের সেলুনগুলোতে একটু ব্যয় বেশী, ভিতরের দিকে অনেকটা কম। এখানে বুড়োই দাবী করছে, মূল সড়কের সেলুনের খরচের চেয়ে, বুড়োর সেলুনে ব্যয় বেশী! এত ব্যতিক্রম দেখে মূল বিষয়-আশয় জানতে কৌতূহলটা একটু বেড়েই গেল। তাছাড়া এর চেয়ে বিকল্প ভাল কোন উপায়ও সামনে ছিলনা। বুড়ো ভাল ইংরেজি জানেন না, তবে যতটুকু জানে ওটা দিয়ে তার ব্যবসাটা চালাতে পারে। অগত্যা বলে বসলাম, ঠিক আছে আমি চুল ছাঁটতে রাজি; এই বলে চেয়ারে বসে গেলাম।
তিনি তর্জনী দুলিয়ে বলতে রইলেন; না, না, না, আজ হবেনা! ড্রয়ারের ভিতর থেকে রেজিস্ট্রি খাতাটি বের করে বললেন, আগামীকাল বিকেল চারটায়, শেষ কাস্টমর হিসেবে চাইলে আমি বুকিং নিতে পারি। বেকুবের মত তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ! চুল ছাটতেও বুঝি বুকিং দিতে হবে! বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, বুড়ো তুমি কোন মহারাজার নাপিত যে, তোমার প্রতিটি ঘণ্টা হিসেব কষে চলতে হয়! নিজেকে প্রবোধ দিলাম, অধৈর্য হলে চলবে না। সামনে কোন বিকল্প নেই, ফলে কষ্ট করে ব্যথা চেপে বললাম, এখন তো তুমি ফ্রি আছ, চুল কাটতে সমস্যা কোথায়?
তিনি কাউকে গালি দিয়ে বললেন, সেই ব্যক্তি বুকিং দিয়েই আসে নাই। পরবর্তী বারে আসলে দ্বিগুণ আদায় করেই ক্ষতি পোষাবে। পরের কাস্টমর এখনই এসে যাবে। কায়দা করে ভিন্ন কাস্টমর সিরিয়ালে ঢুকানোর মানুষ তিনি নন। এমন ব্যবসা তিনি করেন না! মনে হল, সারা জীবনে এই প্রথম কোন হাই-ফাই সেলুন কর্মীর সাথে দেখা হয়েছে! কাস্টমর ধরে রাখার জন্য যে কাঁচুমাচু করার কথা। এখন কিনা সে বলছে কাস্টমরকে ভুল সুযোগ দেবার পাত্র তিনি নন। এমন এক মহা গুরুত্বপূর্ণ বৃদ্ধ নাপিতের অদ্ভুত চরিত্রে কেন জানি আমার কৌতূহলের পারদ উপরের দিকেই উঠছিল।
এই শহরের মানুষের রুচির মধ্যে এক অদ্ভুত বাতিক আছে। তারা নতুনত্বের চেয়ে পুরানো আদলকে ভালবাসে। নতুন ভবন বানিয়ে, বাহিরে এমন ডিজাইন করবে, যেন এটি দু’শ বছরের পুরানো ঘর। পুরানো বাঁশ কিংবা বয়স্ক গাছের ফালি দিয়ে সদর দরজা বানানো হয়। ঘষে-মেজে নতুন ইটকে পুরাতন চেহারা দেওয়া হয়! কোন এলাকা এমন আছে, রাস্তা দিয়ে চলার সময় মনে হবে যেন, সপ্তদশ শতাব্দীর কোন এক বিকেলে রাস্তায় চলছি।
আমি যে হোটেলে উঠেছি সেই ‘এথিনাইস’ হোটেল নাকি প্রায় চারশত বছরের পুরানো। এরা অতীত নিয়ে গর্ব করা জাতি। ভাবলাম নাপিত বুড়োর ক্ষেত্রেও একই সমীকরণ ঘটছে কিনা! নতুবা ইয়াং নাপিতের স্থলে বুড়ো নাপিতের কদর বাড়ার আর কোন যুক্তি তো মাথায় ঢুকছে না! ব্যক্তি হিসেবে আমি বরাবরই কৌতূহলী মানুষ। এর জন্য বহুবার ঠকেছি কিন্তু শিখেছি তার চেয়ে বেশী। তাই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম বুড়োর কাছেই চুল কাটব। তাই বুকিং পদ্ধতিতেই রাজি হলাম, আগামী কাল ঠিক চারটায় আমি পৌঁছে যাব। আমার হোটেলের নাম-ঠিকানা টুকে নিয়ে, শ্রদ্ধার সাথে আমাকে ধন্যবাদ জানালেন।
গ্রীসের রাজধানী এথেন্স শহরের সোফিয়াস এভিন্যুর দিকে আমার বাসা। এটি শহরের খুবই গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। পৃথিবীর বহু শক্তিশালী দেশের হাই-কমিশন-এমব্যাসি এখানে অবস্থিত। এই এলাকার দোকান, হোটেলের ভাড়া বেশী। বিদেশী চাকুরীজীবী, পর্যটক এই এলাকাতেই বেশী থাকে। এরা গ্রীক ভাষায় কথা বলে। গ্রীক একটি প্রাচীন সমৃদ্ধশালী ভাষা। এই অহংকারে তাদের পা মাটিতে লাগে না। এরা ইংরেজিকে ঘৃণা করে। তাদের দাবী ইংরেজি ভাষার সৃষ্টি হয়েছে গ্রীক ভাষা চোরাই করে! ইংরেজেরা ভাষা তো চোরাই করেছেই, মূর্খদের মত শব্দের উচ্চারণটাও নষ্ট করে ছেড়েছে! আবার এমন চোরাই ভাষার নাম দিয়েছে ‘ইংলিশ’! তার উপরে দাবী করে এটাই নাকি সেরা ভাষা! আজীবন এমন ঘৃণা-বোধের কারণে তারা ইংরেজি ভাষা শেখার গরজ বোধ করে না। শহরের সাইনবোর্ডগুলো গ্রীক অক্ষরে লিখা। কেউ পড়তে না পারলে এ শহরে চলতে পারবে না। আর ইংরেজিতে বলে সাহায্য চাইলে কেউ হাত বাড়াবে না! হোটেল ম্যানেজারেরা বহু ভাষায় দক্ষতা রাখে, নতুবা ব্যবসা টিকাতে পারবে না।
এমন পরিস্থিতির ফলে শহরে ইংরেজি জানা নাপিতের অকাল পড়েছে, তাই বুড়োর কদর বেড়েছে! বিদেশীরাই ওর অন্যতম টার্গেট। হোটেল গুলোতে গিয়েই সে তার ঠিকানা রেখে আসে। এভাবে নিত্য নতুন কাস্টমর যোগাড় করে। দুই এক অক্ষর গ্রীক না শেখা অবধি বিদেশীরা তারই কাস্টমর হয়ে থাকে। নাপিত খুব চতুর প্রকৃতির মানুষ, দিনে মাত্র আট থেকে দশজন কাস্টমরের চুল কাটে। রবিবারে তার দোকান বন্ধ থাকে ও’দিন পর্যটকদের গাইড হিসেবে কাজ করে। সে জানে বিদেশীরা সময়ের প্রতি খুব সচেতন। সময়ের মূল্য বুঝে, যথাযথ সময় বুঝে সেবা দিতে পারলে, কাস্টমর টাকার দিকে তাকায় না। তাই সে নিজের মত করে বুকিং সিস্টেম বানিয়েছে। পরে বুঝেছি সে শুধু বয়সেই বুড়ো হয়নি, অভিজ্ঞতা আর চতুরতার মধ্যেও ঝুনা হয়েছে।
পরদিন যথারীতি চারটায় হাজির হলাম। চুল কাটার ফাঁকে সে নানা আলোচনায় মত্ত হল। বুঝলাম বেটা বেজায় মিশুক প্রকৃতির মানুষ। বিদেশীদেরকে তার দেশের সংস্কৃতি ও পর্যটন সম্পর্কে অবহিত করতে পারে। কোন পর্যটন এলাকা কি কারণে সেরা, এসব বুঝিয়ে গ্রাহকদের প্রলুব্ধ করে। এক পর্যায়ে জানতে চাইল আমি কোন দেশের অধিবাসী?
বাংলাদেশের নাম সে কখনও শুনে নি। উল্টো জানতে চাইল, আমার দেশটি আমেরিকার ওদিকে পশ্চিমে, নাকি জাপানের মত পূর্বে? উল্টো তাকে প্রশ্ন করলাম, কখনও ইন্ডিয়ার নাম শুনেছে কিনা? আমার মুখে ইন্ডিয়ার নাম শুনে তড়াৎ করে উঠল। কাজ বন্ধ করে, আমার বসা সেলুনের চেয়ারটাকে ঘুরিয়ে তার মুখোমুখি করল। এমন আচরণে কিছুটা হতবাক হলাম। সে প্রশ্ন করল, তুমি ইন্ডিয়ান? তুমি কি ‘ঠাগোর’ কে চিন?
না আমি কোন ঠাগোর চিনিনা। তাছাড়া ঠাগোর জিনিষটা কি সেটাই তো পরিষ্কার হলাম না! এটা কি জায়গার নাম, ব্যক্তির নাম? নাকি খাদ্যের নাম?
সে বলল, তাহলে তুমি ইন্ডিয়ান নও! মনে মনে ভাবছি, আমি কখন দাবী করলাম যে ‘আমি ইন্ডিয়ান’! কথা আগানোর আগেই সে আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়েছিল এবং ভেবে বসেছে আমি ইন্ডিয়ান। প্রশ্নের কোন উত্তর পেলাম না, তবে বিষয়টি ঠাগোর পর্যন্ত এসে থেমে গেছে। নাপিত কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত বলে মনে হল। অবশেষে বহুদিনের একটি অব্যবহৃত ইংরেজি শব্দের কথা মনে করতে পারল, তা হল Poet Tagore.
তখনই তাকে প্রশ্ন করলাম, তুমি কি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা বলছ? বৃদ্ধ উৎফুল্ল চিত্তে বসল! ইয়েস, আমি শুরু থেকেই নিশ্চিত ছিলাম তুমি ইন্ডিয়ান! কবি ঠাকুর আমাকে বন্ধু বলে আমাকে বন্ধু বলে ডাকতেন!
আমার চেয়ার খানা যথারীতি ঘুরিয়ে আবারো চুল ছাটা শুরু করল।
রবীন্দ্রনাথ শব্দটি সে উচ্চারণ করতে পারে না। তার ভাষায় তিনি ‘কবি ঠাগোর’, অতএব ঠাগোর কে নিয়ে তিনি নানা কথা শুরু করলেন। কবি ঠাগোর এক সময় এথেন্সে এসেছিল। তখন সে বয়সে তরুণ। তার বাবাও নাপিত ছিল। এমন নানা আলোচনার মধ্য দিয়ে মাথার চুল ছাটা শেষ হল।
ইতিমধ্যে মুখে ক্রিম মাখা শুরু হয়েছে। তিনি বলতে রইলেন, তার বাবার দোকানে নিয়মিত আসে এমন এক পর্যটক কাস্টমরের মাধ্যমে কিছু ইংরেজি কথাবার্তা শিখতে পেরেছিল। তখন বাবা বলেছিল, তাকে আর নাপিত গিরি করতে হবেনা। যতটুকু ইংরেজি শিখেছে, এটা দিয়ে পর্যটন কেন্দ্রগুলোর সামনের দাড়িয়ে, নানা জিনিষের হকারী করো। এতে ভাল আয় হবে; কারণ গ্রীক-ভাষী ইংরেজি জানা হকার সেখানে তেমন একটা নেই।
কাস্টমর হিসেবে আমাকে পেয়ে বুড়ো অতীতের দিকে ফিরে গেলেন। যত্নের সহিত আস্তে আস্তে সময় নিয়ে, মুখমণ্ডলের উপরে ‘ফেনার এভারেস্ট’ বানিয়ে ফেললেন। বলতে থাকলেন, নোবেল পুরষ্কার প্রাপ্ত এক কবি ‘এক্রোপলিস প্রাসাদ’ দেখতে এলেন। এটি আড়াই হাজার বছরের পুরানো কীর্তি। এদেশে যারা আসে তারা এটা দেখেই। সেটা দেখতেই কবি ঠাগোর এসেছিলেন গ্রীসে। কবিকে দেখতে অনেকেই এসেছিল। আমিও তাকে দেখতে চাইলাম। সুযোগ পেয়ে তার সামনে দাড়িয়ে আমার মালামাল দেখাতে রইলাম। ভাবলাম তিনি হয়ত কিছু জিনিষ কিনবে।
বুড়ো নাপিত ততক্ষণে রেজর হাতে নিয়ে, গালের এক পাশ থেকে শেভ করা শুরু করে করলেন। তিনি বলতে থাকলেন, কবি ঠাগোর আমার থেকে কিছু কিনলেন না বটে; আমার সাথে কথা বলে তিনি আমার পানের তাকিয়ে বললেন, তিনি যে কয়দিন এথেন্সে থাকবে, সে কয়দিন তাকে সঙ্গ দিতে পারব কি না?
আমি চাইতাম সবার কাছে পরিচিত গ্রহণীয় হয়ে উঠতে। তাই এটা ছিল আমার জন্য এক সুবর্ণ সুযোগ। মুহূর্তেই রাজি হয়ে গেলাম। সে সময় কবি ঠাগোরের সাথে আমি একটি ছবি তুলেছিলাম। তিনি বললেন, এখন থেকে তুমি আমার বন্ধু।
শেভ কর্মের মাঝ পথে কাজ থামিয়ে আমাকে প্রশ্ন করলেন, আচ্ছা, তুমি কি আমাদের সেই ঐতিহাসিক ছবিটি দেখতে চাও? যা এখনও আমি যতন করে রেখে দিয়েছি!
সারা গালে ফেনা ভর্তি, আড়াই পোঁচের মত শেভ সারা হয়েছে মাত্র। রবীন্দ্রনাথের ছবি হাজারো বার দেখা হয়েছে। এই বুড়ো এখনও সামনে দাড়িয়ে, শুধু তার জোয়ানকি খুইয়েছে। নির্ঘাত জানি, সেই ছবিতে আহামরি এমন কোন বিশেষত্ব থাকার কথার নয়। তবে এমন আন্তরিক প্রশ্নে একজন চরম অভদ্র মানুষও বলবে, দেখাও দেখি তোমাদের সেই ঐতিহাসিক যুগল ছবি। বুড়োর আগ্রহকে সম্মান দেখাতে, আমিও সেদিন তাকে না করতে পারিনি। কিন্তু এটার মধ্যে যে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতি লুকিয়ে থাকবে তা কোনমতেই ভাবতে পারিনি!
ছবি দেখায় আমার আগ্রহের কথা শুনে বুড়ো আবেগে আপ্লুত হয়ে গেল। সে বলল, ওই যুগল ছবিখানা ফ্রেম বন্ধী করে এই দোকানের দেওয়ালে ত্রিশ বছর ঝুলিয়ে রেখেছিলাম। একজনও প্রশ্ন করেনি ওই ছবির ব্যক্তিটি কে? এক ঘূর্ণিঝড়ে দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হল, ছবির ফ্রেমটাও ভেঙ্গে গেল। অতঃপর ড্রয়ারে ঢুকিয়ে রেখেছি।
সমস্যা নাই আমাকে দেখাও। তিনি ততোধিক খুশী হলেন। তার চেহারা দেখে বুঝা যাচ্ছিল জীবনের শেষ বয়সে এসে বুঝি ওনাকে যথাযথ মূল্য দেবার মানুষটি তার দোকানে বসে আছে। আমাকে ভাঙ্গা ইংরেজিতে আরো কি যেন বললেন এবং ড্রয়ার থেকে চাবিটা হাতে নিয়ে বের হয়ে গেলেন!
দোকানের ওপাশে খালি জায়গায় রক্ষিত লক্কড়-ঝক্কর মার্কার গাড়িটি তার। ছয়-সাত বারের চেষ্টায় গাড়ী স্টার্ট নিল অতঃপর তাতে চড়ে তিনি বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের ছবি আনার জন্য হাওয়া হয়ে গেলেন!
এদিকে সারা গালের ফেনার বুদবুদ গুলো মুড়ির মত ফুটতে শুরু করেছে। আধা ঘণ্টা যায়। ফের ঘড়ির দিকে তাকালাম। পৌনে এক ঘণ্টা যায়! কয়েকজন আগন্তুক কোন কারণে দোকানে এসে ঘুরে গেল, নাপিতকে না পেয়ে চলেও গেল। এটা ওদের কাছে নিত্য পরিচিত দৃশ্যই হবে হয়ত। ওদিকে গালের উপরে লাগানো শেভ ক্রিম শুকাতে শুরু করেছে। এতে করে এক ধরণের কাতুকুতু-সুড়সুড়ির মত অনুভূতি লাগছিল।
কেউ একজন দোকানে এসে কিছু জিজ্ঞাসিল, ইংরেজিতে আমার সমস্যার কথা তুলে ধরলাম। সে ব্যক্তি থেকেও কোন উত্তর পেলাম না। ভাষা না জানার কারণে না নিজের সমস্যার কথা জানাতে পারলাম। না নাপিতের বাসাটা কোথায় তা জানতে পারলাম। না সে কি কারণে এসেছিল, তা বুঝতে পারলাম!
আয়নার দিকে তাকালাম। মুখে এখন আর ফেনার পাহাড় নেই! স্থানে স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ফেনার বুদবুদ ফুটে মুখটা বিতিকিচ্ছরী ধরনের হয়ে আছে। ঘণ্টা পার হয়, আমার অপেক্ষার প্রহর আর পার হয় না! এক ঘণ্টা বিশ মিনিট পরে আয়নায় তাকালাম। এখন নিজেকেই একজন বৃদ্ধের মত লাগছিল। অনেকটা রবী ঠাকুরের মত। সারা গালে সাদা দাড়ি কিন্তু মুখের অবস্থান কোথায় বুঝা যাচ্ছে না!
ভিতরে ভিতরে ঘেমে যাচ্ছি। ভাবলাম বাকি শেভের কাজটা নিজেই করে ফেলি। ক্ষুরটা হাতে নিলাম। এটা নূতন কিছু নয়। বহুবার ক্ষুর দেখেছি বটে কিন্তু আজকের মত পরখ করে কখনও ধার দেখা হয়নি! বেকার সময়ে বসে থাকলে বহু অজানা কথা মনে আসে।
মনে নানা প্রশ্নের উদয় হকে থাকে। নাপিত মানুষকে শেভ করায়, তাহলে নাপিতকে কে শেভ করে দেয়! আমাদের বাজারে মিলন আর তার বাবা সেলুন চালায়! মিলনকে তো সর্বদা ক্লিন শেভ দেখি। তাহলে কি তার বাবা তাকে শেভ করে দেয়! মুসিবত থেকে উদ্ধারে কত আবোল-তাবোল ভাবনা জড়ো হচ্ছে। আবার ভাবি, তা না হলে তারা শেভ করে কিভাবে? কখনও তো তাদের নিজে নিজে শেভ করতে দেখেনি। ভাবলাম আমিই করে দেখি। ক্ষুরখানা হাতে নিয়ে দেখি, সাহস হলো না! কিঞ্চিত ভুলে মারাত্মক বিপদ ঘটে যেতে পারে।
সময় যায়, পেরেশান বাড়ে। একবার ভাবলাম, যে অবস্থাতে আছি, সেভাবেই হোটেলে ফিরে যাব কিনা। হাস্যাস্পদ হবার সম্ভাবনা নির্ঘাত শতভাগ। ক্ষুরের পিট দিয়ে কিছুটা ফেনা সরিয়ে দেখা হলো। আরো বিশ্রী লাগে। একদিকে তেলতেলে মসৃণ চামড়া, অন্যদিকে দাড়ির গোরা সদৃশ মুখমণ্ডল। নিজের কাছেই ভাল ঠেকল না। পথে আবার চোর বলে সন্দেহ করবে না তো! আমাদের দেশে তো এমনটিই হয়। এমন অসুন্দর ভাবনা বাদ দিলাম কিন্তু কতক্ষণ! বুড়ো গেল কোথায়? ভাবনার নানা ডালপালা গজায়। আমি সর্বশেষ কাস্টমর। আগামী কাল দোকান বন্ধ থাকবে। সে যদি আর নাই আসে, তাহলে হবে টা কি! দুঃচিন্তা ঘিরেই ধরেছে।
দেড় ঘণ্টা পার হল। কি করা যায় ভাবছি ভাবছি। কোন কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না। ততক্ষণে মুখে লাগানো ক্রিম গুলো শক্ত সাবানের আকার ধারণ করে দাড়ির গোরার সাথে শক্তভাবে এঁটে যাচ্ছিল। সময় এখন পৌনে ছ’টা। কোন অলুক্ষণে রবী ঠাকুরের ছবি দেখতে চেয়েছিলাম! নিজেকে ভৎসনা করলাম। এমন ভুল জীবনেও দ্বিতীয়বার করবা না বলে, নিজে নিজেকে শাসালাম। আবার মনে মনে হাসলাম, এ ধরণের ভুল তো প্রতি এক কোটি মানুষের মধ্যে একজনেরও হয় কিনা সন্দেহ আছে। দ্বিতীয়বার ভুল করার সুযোগই হয়ত সারাজীবনে দ্বিতীয়বার আসবে না!
এতক্ষণ গালের মধ্যে যে কাতুকুতু-সুড়সুড়ি অনুভব করেছিলাম; এখন তা চুলকানি-খাউজানির আকার ধারণ করেছে। ভাবছি কি উপায় করা যায়। এমন চরম চুলকানি নিয়ে আর কতক্ষণ ধৈর্য ধরে বসা যায়। দোকানে পানির ব্যবস্থা নেই যে, ধুয়ে নিব। বুড়ো বাহির থেকে মগে করে পানি এনেই শেভ কর্ম শুরু করেছিলেন। বেরুবোর সময় সেটা দিয়েই হাত ধুয়ে শেষ করে দেয়। তাছাড়া আমিতো কাউকে আমার সমস্যার কথাটা বুঝাতে পারব না যে, ভাই আমাকে এক মগ পানি সাহায্য করুন। ঘড়ির কাঁটা দুই ঘণ্টার ঘরে ছুঁই ছুঁই করছে, তখনিই সেই লক্কড়-ঝক্কর গাড়ীর সেই আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমার মনে হল, এই আওয়াজ কতই না সুমধুর। এ ধরণের আওয়াজের জন্যই না, কতকাল ধরে মুখে সাবান মেখে বসে আছি।
উদ্বিগ্ন গতি, হাস্যোজ্বল চেহারায় বুড়ো, বীরের বেশে দোকানে ঢুকলেন। আমাকে রীতিমত চরম ভাগ্যবান বলে স্বীকৃতি দিয়ে বললেন, ফাইনালি তিনি ছবিটা উদ্ধার করতে পেরেছেন!
ভাবছিলাম, এভাবে আমাকে বসিয়ে রেখে বিরক্ত করার জন্য, অনুশোচনা করবে। সেটার কোন বালাই নেই। উল্টো বলছেন আমি নাকি চরম ভাগ্যবান! আমার সেই মহা-ভাগ্যের ফলেই, তিনি যথাসময়ে মহামূল্যবান ছবিটি অবশেষে উদ্ধার করতে পেরেছেন!
গোস্বায় মাথার চাঁদি পর্যন্ত তেতে উঠেছিল, কোন লাভ নেই ভেবে থামলাম। তাই অন্তত শুনে যাই; কি হয়েছিল, কি ঘটেছিল তার জীবনে। যা আমার চরম ভাগ্যের জোড়েই সফল হয়েছিল।
বুড়ো খুশিতে বলতেই রইল। ঘূর্ণিঝড়ে ফ্রেম ভেঙ্গে যাবার কারণে, ছবিটি সুটকেসেই রেখেছিলেন। সুটকেস খুলে দেখলেন, সেখানে সেটা নেই! কোথায় থাকতে পারে? সম্ভাব্য সকল জায়গায় গুঁতোগুঁতি করেও তা পাওয়া গেল না। সোফাসেট উল্টিয়ে সযত্নে রক্ষিত সেই ব্যাগ বের করলেন; যেটা তার মৃত স্ত্রীর। নাহ, সেখানেও পাওয়া গেল না। তবে নিশ্চিত যে, ছবিটি বহুবার বুড়ির হাতে দেখেছিল। ফলে বুড়ির স্মৃত জড়িত সবগুলো জিনিষ খুলে-মেলে দেখার পর নিশ্চিত হলেন যে, ফাইনালি ছবিটা হারানোই গিয়েছে।
ফিরে আসার পথে মনে পড়ল, চৌকির বিছানাটা তো দেখা হয় নাই। সেখানে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তবুও সব জায়গায় দেখা হল কিন্তু ওখানেই দেখা হয় নি! ফিরে গিয়ে যেই মাত্র বেডিং উল্টায়ে ফেলল, তার নীচেই সাদা কাগজের ভাঁজে ছবিটি লুকিয়ে। নিজের এমন বোকামির জন্য নিজেই অট্টহাসি দিলেন। মনে হল বেআকল থেকে শিষ্টাচার শিখছি। বিরক্তিকর বর্ণনা, ওদিকে মুখের চুলকানি সহ্য ক্ষমতা অতিক্রম করার শেষপ্রান্তে দাড়িয়ে। ফলে বুড়োর খুশীর হাসিটাও কদর্য লাগছিল।
সুটকেসের ভিতরে নানা জিনিষের চাপে ছবিটায় ভাঁজ পড়েছিল। সেটা ঠিক করতেই, বিছানার নীচে চাপ দিয়েছিলেন। সেটাও বহুদিন আগের কথা। ছবি তোলার সঠিক সময় মনে করতে পারছিল না। তবে তা প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ের দিকে। তার ধারণা এটি হয়ত ১৯২৬ সালের দিকে হবে। আর ১৯৯৬ সালে বুড়োর দোকানে বসে শেভ করতে গিয়ে মুসিবতে পড়েছি! সে হিসেবে ছবির বয়সই হল ৭০ বছর! ছবিটি যদি ১৯৩৬ এ তোলা হয়, তাহলে ছবির বয়স ৬০ এ। তাহলে বুড়োর বয়স কত তা আন্দাজ করা যায়। তবে খুশীর খবর যে, বুড়ো সেদিন আমাকে ৫০% ছাড় দিয়ে মহাসড়কের পাশে অবস্থিত সেলুনের মূল্যে কাজটি করে দিয়েছিলেন।


Discussion about this post