পাকিস্তান আমলে বাংলাদেশের তৈরি গাড়ী জাহাজে তোলা হচ্ছে। ১৫০০সিসি এই গাড়ীর ব্র্যান্ডের নাম ‘ভিভা’ এবং তখনকার বাজারে এর মূল্য ছিল ১৯,৯৮০ টাকা!
ছবিটি জানুয়ারি ১৯৭১ সালে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম থেকে তোলা। এই গাড়িটি তৈরি হয়েছিল চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থানার বাড়ব-কুণ্ডের কারখানায়। আর এই কোম্পানির নাম ছিল ‘গান্দারা’।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের কিছুকাল পরেই ১৯৫৩ সালে এই কোম্পানির যাত্রা শুরু হয়। ফলে এই কোম্পানিটি স্বাধীনতা প্রাপ্ত একটি নতুন দেশের জাতীয় স্বনির্ভরতা, জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠে।
উপরন্তু ভারতীয় কোম্পানি টাটা, অশোক লি-ল্যান্ড, হিন্দুস্তান মোটরস এর বাজারে অপ্রতিরোধ্য প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়!
স্বাধীনতা সংগ্রামের পরেই পাকিস্তানী মালিক পক্ষ এই প্রতিষ্ঠানের কিছুই নষ্ট না করে হুবহু যেটা যে অবস্থায় ছিল, সেটাকে সে অবস্থায় রেখেই চলে যায়! ফলে পুরো কোম্পানির বাজার ও কারিগরি সক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকে।
স্বাধিন দেশের দক্ষ কাউকে দিয়ে কিংবা দেশীয় কোন প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারে জড়িত করে এই কোম্পানী সহজে চালানো যেত এবং বৈদেশীক আয়ের ধারা অব্যাহত রাখা যেত!
যুদ্ধের পরে ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশে কিছুকাল থেকে যায় এবং দেশের পাটকল, বস্ত্র-কল, রেয়নমিল, রেলওয়ে, বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাকানিক্যাল যন্ত্রাংশ সহ নানা প্রতিষ্ঠানের বহনযোগ্য যন্ত্রাংশ চুরি করে গাড়ি ভরে ভারতে নিয়ে যেতে থাকে!
অন্যের দেশ লুটপাটের সে মহা-সুযোগে গান্দারা ইন্ডাস্ট্রির গাড়িতে চড়িয়ে গাড়ী ও মালামাল সহ ভারতে পাচার করতে থাকে। উপকারের নামে এদেশে আসা, ভারতীয় চৌর্যবৃত্তি ও সম্পদ ডাকাতির বিরুদ্ধে প্রবল আপত্তি ও গন প্রতিরোধ গড়ে তুলেন মুক্তিযুদ্ধের ৯নং সেক্টরের অধিনায়ক মেজর আবদুল জলিল! ভারতীয় বাহিনীর এসব চৌর্যবৃত্তিকে তথ্য ও সহযোগিতা দিতে থাকে ভারতের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুজিব বাহিনী!
মেজর আবদুল জলিল বাধা হয়ে দাঁড়ালে ১৯৭১ সালের ৩১ শে ডিসেম্বর তথা স্বাধীনতার মাত্র ১৫ দিন পরেই তাকে গ্রেফতার করে জেলে প্রেরণ করা হয়! সে হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের তিনিই প্রথম বন্ধী এবং প্রথম রাজবন্দী।
দেশের সম্পদ রক্ষা করা এবং ভারতীয় বাহিনীকে গনচোর হিসেবে অভিধায় করাই ছিল তার অন্যতম অপরাধ! তার লিখিত “অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা” গ্রন্থে তিনি তদানীন্তন সময়ের ভারতীয় চুরি-ডাকাতির বর্ণনা সবিস্তারে লিখে গেছেন!
বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় বাহিনী চলে যাবার পরে, যা কিছু অবশিষ্ট ছিল সেটাকে কেন্দ্র করেই ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সরকার কল-কারখানা গুলোকে জাতীয়করণ করে নেয় এবং এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড”। যা বর্তমানে বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল কর্পোরেশনের একটি প্রতিষ্ঠান।
শেখ মুজিব আজীবন গণতন্ত্রের জন্যে লড়াই-সংগ্রাম করলেও, দেশের উন্নয়নের জন্যে পরামর্শ নিতে থাকেন বুর্জোয়া বামপন্থিদের থেকে! যারা দাবী করে সবকিছুই রাষ্ট্রের, আর জনগন হবে তার চাকর। ফলে আদমজী জুটমিলের মত বিশ্বখ্যাত মিলের ভাগ্যও বামপন্থি পরামর্শে এভাবে ধ্বংস করা হয়!
শেখ মুজিবের এই সিদ্ধান্ত জাতীয় অর্থনীতির বারোটা বাজিয়ে দেয়। এসব কল-কারখানা সরকারের অধীনে নিলেও, সরকারের কাছে এগুলো চালানোর মত সুদক্ষ পরিচালক ছিল না! সরকারের ভিতরে থাকা চাকরিজীবী মনোবৃত্তির মানুষ দিয়ে কখনও শিল্প-প্রতিষ্ঠানের উন্নতি ঘটানো সম্ভব হয় না! ফলে সকল চালু প্রতিষ্ঠান মুখ থুবড়ে পড়ে! ব্যবসা উঠে লাটে এবং কোম্পানী হয় দেউলিয়া।
গান্দারা এখনও পশ্চিম পাকিস্তানের সেরা অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে জীবিত আছে। এখনও তাদের শেয়ার দর অনেক উঁচুতে। বাংলাদেশের গান্দারা থেকে প্রগতি অতঃপর দুর্গতির কল্যাণে বাংলাদেশের বাজার ভারতের ‘টাটা’ কোম্পানির ডাম্পিং দেশে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রগতি কিছুই করতে পারে না।
কি দুর্ভাগা জাতি আমরা। এদেশের ইঞ্জিনিয়ারেরা কাজ এবং চাকরীর জন্যে রাস্তায় লড়াই সংগ্রাম করে, নচেৎ বিদেশে পাড়ি জমায়। যোগ্য মানুষ পদ পায়না, অযোগ্যরা রাজনৈতিক পরিচয়ে পদ দখলে নেয়। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা এখনও কোমর সোজা করে দাঁড়াবার সুযোগ পাইনি। একটি বিরাট রাজনৈতিক ঝাঁকি ও পট পরিবর্তন ছাড়া এই জাতির ভাগ্য আশু পরিবর্তনের কোন সম্ভাবনা নেই।


Discussion about this post