তিনি যেভাবে খ্যাতিমান, সেভাবে সম্পদশালী। দাপুটে সরকারী উচ্চ কর্মকর্তা। স্ত্রীও কম নন, তিনিও সরকারী কর্মকর্তা, সম্মানিত পেশা। সন্তানেরা সবাই ব্রিলিয়ান্ট, যে সন্তান যে প্রতিষ্ঠানে আছে, সে ঐ প্রতিষ্ঠানের সব চেয়ে সেরা ছাত্র। ইহজন্মেও কোনদিন সন্তানদের স্কুল খরচ বহন করতে হয়নি। সন্তানদের স্টাইপেন্ডের টাকায় বিদ্যা-শিক্ষা চলতে চলতে, পিতা-মাতা মনে করতে পারে না চলমান জীবনে স্কুল-কলেজের বেতন কত। গ্রামে-মফস্বলে বিঘা বিঘা জমি আছে, শহরে নিজের বাড়ী আছে কিন্তু থাকতে হয়েছে সরকারী সুবিধাদির ভিতরে। সরকারী বাড়ী, সরকারী গাড়ি, দারোয়ান, ড্রাইভার! নশ্বর পৃথিবীর একজন মহাসুখী মানুষের উদাহরণ দেবার জন্য আর কি উপকরণ বাকি থাকে?
দেশীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় গড়ে উঠা এমন সন্তানগুলো সবারই আদর্শ! শহরের শিক্ষিত কর্মকর্তারা স্বীয় সন্তানদের দেখিয়ে দিতেন, বাবা মানুষ হলে ওদের মত হবে। মেধা, মনন ও যোগ্যতার রাজ্যে ওই পরিবারের সাথেও কেউ কুলায়ে উঠতে পারেনা।
ক্ষুদ্র একটি সমস্যা ছিল, তারা কিছুটা অসামাজিক! সবার সাথে মিশত না! যদিও বর্তমান যুগে এটা কোন একটা বড় সমস্যা নয়। শহুরে মানুষ এমনিতেই সমাজের গুরুত্বকে মূল্যহীন মনে করে। ঈদে, কোরবানে বাড়ীতে গিয়ে, ভারিক্কি ব্যক্তিত্বে কিছু মানুষের সাথে দেখা দিয়ে আসলেই চলে। তারাই খ্যাতি প্রচার করে। মরার কালে শেষবারের মত একবার যেতে হয়। যিনি মারা যান, তার তো যাওয়ার দরকার পড়েনা। অন্যরা লাশ নিয়ে ছুটে। বাংলার সমাজ ব্যবস্থায় জীবিত মানুষকে ক্ষমা করার রীতি ব্যাপক না হলেও, লাশকে ক্ষমা করার দৃষ্টান্ত অগণিত। তাই শেষ বার ক্ষমা করে, আজীবনের জন্য ভুলে যেতে পারে, এটা আমাদের সমাজ ব্যবস্থার এক ভিন্ন রূপ।
দু’টি সন্তানই ইউনিভার্সিটির নিজ ডিপার্টমেন্টের শ্রেষ্ঠ ছাত্র বিবেচিত হয়ে বৃত্তির সুযোগ নিয়ে পাশ্চাত্যে পরি জমায়, যথারীতি সেরা ছাত্র হিসেবে সেখানেও সফলতা অর্জন করে। চাকুরী সেখানেই হয়ে যায়; দশ জনের মত তারাও জীবনের সচ্ছলতা ও সম্মানের মোহে সেখানেই আটকে পড়ে। ধন আর সম্মানীর জীবনের লোভ, গাড়ির দুটো চাকার মত দূরত্বে থাকে কিন্তু কখনও একসাথে হয়না। দেশে পিতার অঢেল সম্পদের চেয়েও তাদের কাছে পাশ্চাত্যের সম্মান আরও বড় বলে বিবেচিত হয়। দেশীয় বৃত্তি নিয়ে বিদেশে লেখাপড়া করে আর ফিরে না আসার প্রবণতা এখন আর দৃষ্টিকটু ব্যাপার নয়; এটা অতি বুদ্ধিমান নাগরিকের অধিকার হয়ে গিয়েছে! উল্টো ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. জামাল নাসের, ড. মোতাহার হোসেন, ড. হুমায়ূন আহমেদ সহ অগণিত ব্যক্তি যারা দেশ গঠনের জন্য ফিরে এসে গরীবি জীবনকে বরণ করেছিলেন তারা পড়ে গেছেন অবুঝ ব্যক্তির সাড়িতে।
সে হিসেবে ডিগ্রী নিয়ে বর্তমানে যারা ফিরে আসেনা তাদেরকে লজ্জিত হতে হয়না অধিকন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকায় ডিগ্রী নিয়ে, ফেরত না আসার জন্য পালিয়ে থেকে, বেশী বেতনের চাকুরী করে, সেখানে উচ্চ জীবন চালিয়ে এবং সুযোগ বুঝে দেশের বড় দুর্দিনে নিজেই বড় কর্ণধার হয়ে যাবার মত কাহিনী আমাদের দেশেই তো অনেক রয়েছে। তাছাড়া পিছনের ব্যক্তিরা আগের বরণীয় ব্যক্তিদেরই অনুকরণ করে; তাই এসব এখন আর কোন খবর নয়।
আমরা যার কথা বলছিলাম, তারা অভাবী নয়, কারো কাছে দায়বদ্ধ বা দ্বারস্থ নয়। সবাই উচ্চ শিক্ষিত মানুষ, দুনিয়ার যে দিকেই তাকায় তাদের জন্য উচ্চ শিক্ষা পাওয়াটা কোন ব্যাপারই ছিলনা। তারা বিদেশে পাড়ি জমায়। ফলে অবসরপ্রাপ্ত পিতা-মাতার জন্য শহরের বাড়ী, গাড়ী, বিঘা বিঘা সম্পদ টুকুই রইল, যার কোন পাহারাদার থাকল না। যারা এর ভবিষ্যৎ মালিক হওয়ার, পাশ্চাত্যের সুবিধাভোগী জীবনের হাতছানি কারণে, এসবের জন্য ন্যূনতম আকর্ষণও রইল না।
পিতা মারা গেছেন! ব্যস্ত সন্তানদের জন্য এটা একটা বড় পেরেশানি মূলক সংবাদ ছিল! পিতৃবিয়োগের বেদনায় চেয়ে; প্লেন শিডিউল ম্যানেজ করা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠদানে জ্যাম হওয়া, নিজ সন্তানদের কয়েকদিন এতিমের মত করে রেখে যাওয়া, সর্বোপরি পাঁচ দিনের এক কঠিন যাত্রার দূরহ সময়গুলো পার করানো নিয়ে। সামর্থ্যবানদের লাশ ফ্রিজে রাখার আধুনিক সুবিধার কারণে তাদের মৃত পিতার মুখচ্ছবি দেখার সুযোগটি তারা ব্যবহার করল। সন্তানের উপস্থিতিতেই লাশ কবরস্ত করা হল।
তাদেরই সুহৃদ গ্রামের প্রতিবেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের অপর এক শিক্ষার্থী, সেদিনের প্রত্যক্ষ ঘটনার করুন কষ্টের কথা এভাবেই বলেছিলেন; সেটা মুখের ভাষাতেই শুনি,
‘আমি ছাত্র হিসেবে ভাল ছিলাম, গ্রামে থাকি এবং তাদের আত্মীয় হই। আশা করতাম যদি তাদের একটু পরামর্শ পাইতাম হয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার তথ্য সমৃদ্ধ হত। গৃহকর্তাকে একাকী পাবার আশায়, একদিন চুপি চুপি তাদের বাসায় উঠেছিলাম, এভাবেই উঠতে বলা হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শের জন্য কিছুক্ষণ তাঁর সান্নিধ্যে থেকেছিলাম। কিন্তু গৃহকর্তীর বাসায় আসার সময় সন্নিকট হচ্ছিল, তাই তাড়াতাড়ি স্থান ত্যাগ করেছিলাম। আত্মীয় হলেও গাঁও-গেরামের অরুচিকর মানুষদের সাথে তার সন্তানদের দেখা সাক্ষাৎ না হউক, এই ধারনায় তিনি কঠোর ছিলেন। আমার আফসোস ছিল, ভদ্রলোকের সাথে যদি কথা বলার আরেকটু সময় বেশী পেতাম, তাহলে ছাত্রজীবনের গুরুত্বপূর্ণ গাইডলাইন গুলো পেতাম’।
তিনি তার কথা অব্যাহত রাখলেন,
‘তাঁর মৃত্যু থেকে দাফন পর্যন্ত আমি সাথেই ছিলাম। মানুষ বলাবলি করছিল, কফিনের একপাশের ভার যেন সন্তান আলগিয়ে তুলে। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে সন্তান, পানির গ্লাস তোলার মত করে, যেভাবে খাটিয়ার হ্যান্ডল ধরেছিল সেটা দেখে গ্রামের মানুষ মুচকি হাসছিল। দৃশ্যটি আমার খুবই খারাপ লাগে। তার ছেলেকে পাশে নিয়ে, নিজের হাতেই কফিন তুলে কবর পর্যন্ত গেলাম। সন্তান তার শার্টে ময়লা লাগার ভয়ে অনেক কিছু এড়িয়ে চলছিল। কফিন টানার জন্য বহু মানুষ সাথে আছে কিন্তু সাধারণ মানুষের আগ্রহ তো এই নাদুস নুদুস সন্তানের দিকে। তার বাবার মৃত্যুতে সে কেমন করে, শত শত চোখ তাকেই স্ক্যান করে চলছিল। লাশ কবরের পাশে রাখা হল, সে লাশ কবরে নামানো হল, বাঁশের চাল বসানো হল এবং আস্তে আস্তে কবরে মাটি ঢালা শুরু হল। অনেক মানুষ ছোট টুকরার মাটি কবরে ঢালছিল; ইত্যবসরে খেয়াল করলাম ছেলেটি পেরেশান মনে দাড়িয়ে আছে। মনে হল জীবনে এই প্রথম কাউকে কবর দেবার দৃশ্য সে প্রত্যক্ষ করছে! বস্তুত তাই ছিল সত্যি। তার হাতে এক টুকরা মাটি দিয়ে বললাম, বাবার কবরে মাটির দেবার কাজ সন্তানদেরকেই আগে শুরু করতে হয়, তাই এই মাটি অন্যদের সাথে কবরে ঢালুন। নতুবা মানুষ আপনাদের তাচ্ছিল্য করবে, হাসাহাসি করবে। বেজায় অস্বস্তির সাথে তিনি মাটির একটি চাক পিতার কবরে রাখলেন।
ভদ্রলোক বলতে থাকলেন,
‘তিনি বারবার তাঁর হাতের ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছিলেন! পেরেশানিতে কপালের রগ মোটা হয়ে উঠেছিল। প্রশ্ন করলাম, নতুন কোন সমস্যা? তিনি প্রশ্ন করলেন, মানুষেরা কেন একটি করে মাটির ঢেলা কবরে রাখছে। কবরের এই গর্তটি ভরে ফেলতে কোদালের দশ কোপই তো যথেষ্ট! আমাকে সন্ধ্যার আগেই ঢাকা পৌছতে হবে এবং রাতেই যে ফ্লাই করতে হবে। আগামী পরশু ভার্সিটিতে আমার গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস রয়েছে! সেটা নিয়ে দুঃচিন্তায় আছি! আমার মাথা ঘুরচ্ছিল এই ভেবে যে, কাকে সহযোগিতার জন্য হাত বাড়িয়েছি! সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ছাত্র কবরে মাটি ভরতে কত কোপ লাগবে সেটা আলবৎ বুঝেছিলেন কিন্তু তার বিধবা মায়ের হৃদয়ের ক্ষত ভরতে কত মিলিয়ন কোপের দরকার হবে সমাজ বিজ্ঞানের সেই পরিসংখ্যান তার জানা ছলনা। কেননা তার পিতা-মাতা তাদেরকে সেদিকে কোন নিয়ে যায়নি। যাবার সময় বলে গেল, যেন তার মাকে সর্বদা একটু দেখে রাখি। অথচ এই মা আমরা গায়ের ছেলে বলে ঘৃণা দেখাত, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, হেয় করত। তারপরও আমার সাধ্য মত তার মাকে দেখে রেখেছিলাম কিন্তু তাঁকে জীবন সায়াহ্নে দেখেছি, আমাদের গরীবের ঘরে সাথে থাকার আবদার জানাতে। তাদের বাড়ী, গাড়ী, বিঘা বিঘা সম্পত্তির অহংকার, ভুতুড়ে বাড়ির ন্যায় নিস্তব্ধ হয়ে যায়। হৃদয়ের হাহাকার মহানগরের ব্যস্ত জীবনে চাপা পড়ে থাকে’।

Discussion about this post