অষ্টাদশ শতকে মক্কা-মদিনা নামক প্রবন্ধের শুরুতে আমরা দেখতে পাব তুর্কি সুলতান সেলিম, শিয়া শাফাভি ইসমাইলের ফেতনার বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তকদির তাকে মক্কা-মদিনার খাদেম বানিয়েছিল কিন্তু তুর্কি সেলিমের অধঃস্থন বংশধরেরা মক্কা-মদিনাকে মনগড়া এবাদতের কেন্দ্র বানিয়েছিল! সারা মক্কা-মদিনায় বেদায়াত আর অনাচার এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, যা রুখে দেয়া কিংবা উৎখাত করাটা শক্তিশালী সম্রাটের পক্ষেও দূরহ ছিল।
দীর্ঘ বছর ধরে হাজিরা মক্কা-মদিনায় এসে, সেখানকার মানুষদের বেদায়াতে ভরপুর এবাদত, সংস্কৃতি দেখে শিখে নিয়েছে যে, এটাই প্রকৃত এবাদত! হাজিদের অনেকই নিজ দেশে ফিরে গিয়ে সেভাবেই এবাদতে মগ্ন হয়েছে, যেভাবে মক্কা-মদিনায় হতে দেখত! মানুষের জীবনে, কেউ একবার বেদায়াতে অভ্যস্ত হলে, পরবর্তী সময়ে কোরআন-হাদিস চোখের সামনে মেলে ধরেও, বুঝানো যায় না যে এটা কোরআন-বিরোধী। দাঁড়িয়ে সুর করে রাসুল (সা) এর প্রতি সালাত-সালাম পেশ করাও একটা বেদায়াত এবং গুনাহ। বস্তুত তারা অন্যের কথা কেন বিশ্বাস করবে? যেখানে তাদের প্রিয় জনেরা হজে গিয়েই নিজ চোখে এসব এবাদত হতে দেখেছে! সেখানে তো এভাবেই রাসুল (সা) কে সালাম দেওয়া হয়! যা বর্তমানে আমাদের দেশেও দেখে থাকি। মূলত আমাদের দেশের এসব মানুষকে দোষ দিয়ে লাভ কি? তাদের কাছে সালাম দেওয়ার এই ধারাতো এসেছে ইসলামের জন্মস্থান, পবিত্র ভূমি মক্কা-মদিনা থেকেই! সকল হাজিরা বেদায়াতি ছিলনা কিন্তু যারা সত্য পথের পথিক ছিল, বেদায়াত মুক্ত জীবন যাপন দৃঢ় ছিল, তারা সেখানে কোন পৃষ্ঠপোষকতা পেত না। সঠিক পথের অনুসারীদের জন্য পুরো জনপদের দৃশ্য এমন হয়েছিল যার পরিবর্তন কেবল একজন শক্তিশালী সম্রাটের পক্ষেই সম্ভবপর ছিল। পরবর্তী পর্বে সে সবের আলোচনা হবে। অষ্টাদশ শতকে মক্কা-মদিনা
আরো পড়ুন…
তুর্কির পেটে যেভাবে আধুনিক সৌদি আরবের গোড়াপত্তন
বেদায়াতের প্রসারে অনেকগুলো সমস্যা সৃষ্টি হয়:
– বেদায়াত দ্বারা একথা প্রমাণিত হয় যে, কুরআনের নির্দেশনা পর্যাপ্ত নয়।
– রাসুল (সা) কিছু ভাল জিনিস বুঝেন নি, যা বেদায়াতিরা বুঝেছে!
– বেদায়াত সুন্নাতের বিলুপ্তি ঘটায়, নতুন নিয়ম নীতির জন্ম দেয়।
– অজ্ঞ মানুষদের পরামর্শ দেবার সুযোগ ঘটে যায়।
– বিদায়াত মুসলমানদের মধ্যে বিভাজন ঘটায়।
– দলাদলি, নিত্য নতুন তরিকা ও পন্থার আবির্ভাব ঘটে।
– কোরআন হাদিসের প্রভাব কমে যায় কিংবা কথা বিশ্বাস হয়না।
– বেদায়াত প্রচারকারী দাম্ভিক আর অনুসারী অন্ধ হয়ে উঠে।
– ইহুদী খৃষ্টানেরা ধ্বংস হবার কারণ তারা বেদায়াত কেই ধর্মজ্ঞান করত।
চলুন তাহলে অষ্টাদশ শতাব্দীর মক্কা-মদিনার দৃশ্য মানসপটে আঁকি,
জান্নাতুল মুয়াল্লা মক্কার অদূরের একটি কবরস্থান। হিজরত করার আগে রাসুল (সা) এর স্ত্রী খাদিজা (রা) ইন্তেকাল করলে এই কবরস্থানেই তাঁকে দাফন করা হয়। তাছাড়া এই স্থানে রাসুল (সা) প্রথম সন্তানের কবরও রয়েছে। তাঁদের মৃত্যুর পরেও রাসুল (সা) আরো বহু বছর বেঁচেছিলেন কিন্তু তিনি সেখানে গিয়ে কবরকে আলাদা করে ভিন্ন কিছু করেন নি। রাসুল (সা) কে যারা ছায়ার মত অনুসরণ করত, এমন কোন সাথীরাও একাজ করেন নি। কিন্তু তুর্কি আমলের শেষ দিকে খাদিজা (রা) কবরের উপরে গড়ে উঠে বিরাট একটি রওজা। পরবর্তীতে হাজিদের কাছে এখানে এসে দোয়া করে কিছু চাওয়াটা, একটি রেওয়াজে পরিণত হয়। অষ্টাদশ শতকে মক্কা-মদিনা
আবু তালিব রাসুল (সা) এর চাচা। রাসুল (সা) ব্যাপক প্রচেষ্টার পরও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন নি! কিন্তু রাসুল (সা) কে তিনি পিতার মত নিরাপত্তা দিয়েছে। সে জন্য মুসলমানেরা তাঁকে খুব শ্রদ্ধা ও সম্মান করে। কিন্তু তার মান-সম্মান কখনও একজন সাহাবীর মত নয়! মূয়াল্লা কবরস্থানে তাঁর কবরের উপরেও আলীশান ঘর করা হয়েছে! এমনকি ইসলাম পূর্ব কোরাইশদের নেতাদের কবরও এখানে ছিল। যথারীতি এসব কবরও হাজিদের কাছে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠল। হাজিরা মক্কায় নতুন আগন্তুক, তারা চিনেনা কোনটা কার কবর। তাছাড়া হজে এসে মক্কার মুয়াল্লা কবরস্থানে যাওয়াটাও দরকার কিনা, সেটা ভাবা সেখানে অবান্তর। খাদিজা (রা) কবর সেখানে, আদালা একটা টান আছে। তাই নতুন হাজিরা দলবেঁধে সেখানে দেখতে যায়। কিছু হাজিরা বিভ্রান্তে পড়ে যায়, এত কষ্ট করে মক্কায় আসা হল, সবাই যেখানে যাচ্ছে, সেখানে না গেলে দীর্ঘ পথের কষ্টটাও বৃথা যাবে। সেখানে কোনটি মুসলমানের কবর আর কোনটি কাফের নেতাদের কবর, বুঝাই দায় হয়ে দাঁড়াত। তাছাড়া নিজেদের খেয়াল খুশিমতো, আরো ছোট-বড় অনেক কবর পাকা করার ফলে, মুমিন আর কাফেরের কবর, সবই একাকার হয়ে গিয়েছিল! এই গর্হিত কাজ, ইসলামের নামে রাসুল (সা) এর ইন্তেকালের এক হাজার বছর পরে শুরু হয়েছিল।
দারুণ কৌতূহলের বিষয় ছিল ভিন্ন যায়গায়। যুক্তির খাতিরে ধরা গেল, মুসলমানেরা না হয়, খাদিজা (রা) কবর পাকা করে তার উপরে বিরাট ভবন বানিয়েছে! তাহলে অমুসলিম আবু তালেব ও কোরাইশ নেতাদের কবরে কারা ভবন বানালো? উত্তর একটাই, তুর্কিদের কাঁধের উপরে বসে শিয়ারাই বানিয়েছে। কেননা আবু তালিব শিয়াদের কাছে সম্মানের দিকে দিয়ে নবীর পরের মর্যাদার মানুষ। দিনে দিনে এখানে কবরের সংখ্যা বাড়তে থাকে এবং নিজেদের মর্জিমত এবাদত বানিয়ে পালনও হতে থাকে। এসবের সামনে ছিল তুর্কিদের সে সব সুফিরা যারা ধর্মীয় সংস্কৃতির প্রতি ছিল উদাসীন আর পিছনে শিয়ারা নিজেদের মত করে বানিয়ে চলেছিল স্থাপনা নির্ভর এবাদতের মহরত।
সাফা-মারওয়ার পাশেই ছিল, রাসুল (সা) ও তার আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি ঘর। সেখানে রাসুল (সা) এর একটি ঘর রয়েছে। যেখানে তিনি ও উম্মুল মুমিনিন খাদিজা (রা) কে নিয়ে থাকতেন। খুবই সাদা-মাটা ভাবে বানানো ঘরটি, বর্তমানে লাইব্রেরী হিসেবে ব্যবহার হয়। তুর্কি আমলে এই ঘরটি হারামের পাশেই আরেকটি তীর্থ ভূমির গুরুত্ব পেয়ে বসে! রাসুল (সা) এর প্রতি ভক্তির আতিশয্যে, হারামকে পিছন দিয়ে, ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে, মানুষেরা দলবদ্ধ হয়ে ইয়া নবী সালাম আলাইকা বলে সালাত সালাম পেশ করা সহ আরো বহু ধরনের এবাদতে সময় কাটাতেন! মীলাদুন্নবী পালন হতো আড়ম্বরের সহিত। এসব সঠিক ভাবে করানো, শিখানোর জন্য এক শ্রেণীর স্থানীয় মোল্লারা সেখানে উপস্থিত থাকতেন। যার পরিপূর্ণ সিলসিলা এখন আমাদের দেশেও ঝেঁকে বসেছে।
বাকিউল গারকাদ তথা ‘জান্নাতুল বাকি’ কবরস্থান মদিনার রাসুল (সা) এর কবরের অদূরেই অবস্থিত। এখানে প্রায় দশ হাজার সাহাবীর কবর রয়েছে। তাছাড়া এই কবরস্থানে ফাতিমা (রা) সহ উম্মুল মুমেনীন তথা রাসুল (সা) এর স্ত্রীদের কবর রয়েছে। এই কবরস্থানের দশা ছিল আরো মারাত্মক। এখানে ফাতিমা (রা) বিশালকায় রওজা গড়ে উঠেছিল, যা মক্কায় অবস্থিত তাঁর মা খাদিজা (রা) এর রওজার চেয়েও আকারে বৃহৎ। ফাতিমা (রা) এর সন্তান ও নাতীদের কবর বাছাই করে সেগুলোকেও পাকা করা হয়েছিল। দৃশ্যত জান্নাতুল বাকির একটা অংশ দেখতে রওজার শহর বলে মনে হত। এভাবে অন্য সাহাবীদের কবরের মাঝে বাছাই করে কিছু কবরকে আলাদা মর্যাদা দেবার কারণে হাজিরা এখানেও সমস্যায় পড়ত। কৌতূহলের ব্যাপার এখানেও ছিল, ফাতিমা (রা) কবরের তুলনায় উম্মুল মুমিনিনদের কবর বাছাই করাও দূরহ হয়ে যেত। মূলত দেশটি তুর্কিরা দেশটি শাসন করলেও, তারা ছিল ব্যবসা আর ক্ষমতার ধারক বাহক। তাদের নিকট থেকে ইসলামের মূল স্পিরিট উবে গিয়েছিল। সত্য-মিথ্যার তফাত করার জ্ঞান চলে গিয়েছিল। এই বিরাট শুন্যতার মধ্যে শিয়ারা নিজেদের চিন্তা আদর্শ ঢুকিয়ে দেবার কাজটি শতভাগ আন্তরিকতার সাথে করতে পেরেছিল। অষ্টাদশ শতকে মক্কা-মদিনা
মূলত সুন্নিরা ইসলামকে আঁকড়ে ধরে আবেগ আর অনুভূতি দিয়ে কিন্তু শিয়ারা বিশ্বাস করে তথ্য-যুক্তির মাধ্যমে। তারা আনন্দ পায় অনুষ্ঠান, ধর্মীয় শোভাযাত্রা প্রভৃতি ধর্মীয় বাহ্যিক আড়ম্বর পূর্ণ অনুষ্ঠান প্রদর্শনে। তীর্থ-পথে যাওয়া, মৃত ওলী-দরবেশের মাজার জিয়ারতে অশেষ পুণ্য অর্জন করা, শিয়া চিন্তাধারার প্রতিফলন। এ সবের সাথে ইসলামের কোন সম্পর্ক না থাকলেও, মুগল আমল পরবর্তী আমাদের দেশে শিয়াদের প্রভাবের কারণে, এ ধরণের বেদায়াতি এবাদত আমাদের দেশের অনেক মুসলমানেরা করে থাকে। শুধু তাই নয় তারা আবার এটাকে দাবী করে একনিষ্ঠ সুন্নিদের কার্যক্রম হিসেবে!
বিখ্যাত ভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ, ভ্রমণকারী, ঐতিহাসিক, সাংবাদিক অস্ট্রিয়ান বংশোদ্ভূত ইহুদি পণ্ডিত ‘লিওপল্ড’ উনবিংশ শতকের শুরুতে এসেছিলেন আরবে। তার লক্ষ্য ছিল আরব দেখা, বেদুইনদের সাথে থাকা, মুসলমানদের জীবন বিশ্লেষণ করা ও এসব তথ্য পত্রিকায় প্রকাশ করা। মুসলিম বিশ্বের গুরত্বপূর্ন বেশীরভাগ দেশ কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি তার ঐতিহাসিক বিখ্যাত ‘Road to Mecca’ তথা ‘মক্কার পথে’ গ্রন্থে আফসোসের সুরে বলেছেন, তিনি যে মুসলমান তখনকার দিনে দেখেছেন তাদের চরিত্রের সাথে কোরআন-হাদিসের কোন সামঞ্জস্যই ছিলনা। পরে তিনি আরবি শিখেছেন, কোরআন-হাদিস পড়েছেন এবং ‘মোহাম্মাদ আসাদ’ নাম নিয়ে মুসলমান হয়েছেন। সৌদি বাদশাহ ‘আবদুল আজিজ’ তাঁকে ছেলে বলে পরিচিতি দিতেন! বেদায়াতে ভরপুর সমাজে তিনি যদি বিপদগামী মুসলমান থেকে ইসলামের জ্ঞান নিতেন তাহলে তিনিও পথভ্রষ্ট হয়ে যেতেন! সরাসরি কোরআন-হাদিস থেকে জ্ঞান নেবার কারণে ইসলমাকে তিনি আরো গভীর ভাবে বুঝেছেন। এই অনুভূতি তাকে নাড়া নেয় ফলে, মুসলমানদেরকে সঠিক ইসলাম বুঝানোর জন্য তিনি নিজেই তাফসির গ্রন্থ রচনায় হাত দিয়েছিলেন। সারা দুনিয়ায় তাঁর বই সর্বোচ্চ আলোড়ন সৃষ্টিকারী বই হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কেননা ইসলাম বুঝার জন্য তিনি সঠিক রাস্তাটি ধরেছিলেন। স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা) সে পথের পরিচিতি এভাবে দিয়ে বলেছেন, “আমি তোমাদের কাছে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা সে দু’টি জিনিস আঁকড়ে থাকবে, ততক্ষণ পথভ্রষ্ট হবে না। আল্লাহর কিতাব ও আমার সুন্নাহ।” (মুয়াত্তা ইমাম মালেক – ৩৩৩৮)।
