
ভারতের ওয়াহাবী মতবাদ ও আজাদী আন্দোলন সম্পর্কে বলতে যাবার আগে পাঠকের হয়ত মনে থাকবে, আমি মক্কা-মদিনার কথা লিখতে গিয়ে মোহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের কথা তুলেছিলাম। পৃথিবীর ইতিহাসে এটিই একমাত্র ঘটনা, যে ঘটনা নিয়ে লিখতে গেলে লেখককে সমালোচিত হতে হয়েছেই; আজো হতে হয়। কোন কালে কারো ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হয়নি। নিজেরাই নেট ঘেঁটে দেখুন পক্ষে-বিপক্ষে কত কাহিনী ছড়িয়ে আছে। মূলত এর পিছনে তুর্কী, পারস্য ও সৌদি আরবের মত তিনটি বৃহৎ শক্তির অনুঘটক আছে। আবার মাজার ভক্ত মুসলিম মিলে শিয়া, মধ্যপন্থি সুন্নি ও কঠোরপন্থি ওয়াহাবীর তিন মূখো ধর্মীয় টানাপড়েনের যোগ সূত্র আছে। তাই ছয় জাতিয় চিন্তার সবাইকে একটি ময়দানে এক চিন্তার মানুষ বানানো সহজ নয়। যার লিখা সৌদির পক্ষে যাবে তার যেমন বিপদ আছে তুর্কির পক্ষে গেলেও বিপদ আছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে ওয়াহাবীর প্রতি নমনীয় হলে, শিয়া ও মাজার পন্থি মুসলমানেরা মারমুখো হয়। আর মধ্যপন্থি যারা ছিল তাদের জন্য তখনও এখনও কোন স্থান বা সাহায্যকারী ছিল না। ফলে এই বিষাক্ত বিষয়ে হাতি দিয়ে গিয়ে আমিও আক্রান্ত হয়েছি! কেউ গালাগালি করেছে এখনও ম্যাসেজ অব্যাহত আছে! যাই হোক, এই ঝড় আমার প্রতি আসবে সেটা মাথায় নিয়েই মানসিক প্রস্তুতি রেখেছিলাম। আমি সৌদি, তুর্কি কিংবা ইরানীদের খুশী করার জন্য এটা লিখছি না। আবার ওয়াহাবীর পক্ষে গিয়ে, শিয়া নিন্দা করা কিংবা মাজার পন্থি সুন্নিদের জিহাদী জজবা তুলতে আগ্রহী নই। আমার লক্ষ্য ছিল, তথ্যগুলো হাজির করে যথাসম্ভব নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ করা এবং পাঠকদের সাথে তথ্য বিনিময় করা। সর্বোপরি বাংলাদেশে কিভাবে ইসলাম প্রবেশ করেছিল সেদিকে দৃষ্টিপাত করা। বাংলাদেশের পরিমণ্ডলে বর্তমানে বহু মতবাদ চালু থাকলেও ওয়াহাবী, সুন্নি মতবাদ দীর্ঘ বছর ধরে সমাজকে দুইভাগে ভাগ করে রেখেছিল। এটার উদ্ভব কিভাবে সেটার পিছনে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়েই আরবের ওয়াহাবী ও ভারতের ওয়াহাবী হয়ে বাংলাদেশ পর্যন্ত পৌছা এবং আরব ঘুরে মাজার পন্থি সুন্নিদের এবাদত বাংলাদেশে পৌঁছার যোগসূত্র পাওয়া গেছে সেটার ইতিবৃত্ত তুলে ধরা।
আরো পড়ুন…
অষ্টাদশ শতকে মক্কা-মদিনার অবস্থা
মোহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহহাবের দর্শন নিয়ে বিগত দু’শ বছর ধরে নানা চড়াই উৎরাই হয়েছে। তার দর্শনকে কেন্দ্র করে ধর্ম, রাষ্ট্র ও রাজনীতি পেঁচিয়ে গেছে এবং পরাশক্তিগুলো সুযোগ হাতিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ। ওয়াহাবী মতবাদ নামের ধারনাটি সৃষ্টি করেছিল ব্রিটিশেরা। ঘটনার বলী হয়েছে মুসলমান, বিদায় হয়েছে তুরস্ক আর সৌদি নামের একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছে। আজও সে আগুন নিভে নি। কথা যখন আরবদের পক্ষে যায় সে হয়ে যায় তুর্কির দুষমন আর কথা তুর্কির পক্ষে গেলে হয়ে পড়ে সৌদির দুষমন। তারমধ্যে আবার ফের্কার সমস্যা তো আছেই। ব্রিটিশেরা ওয়াহাবী নিয়ে আরবে খেলেছে একভাবে আর ভারতবর্ষে গুটি চালিয়েছে ভিন্নভাবে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব, ১৮৫৮ সালের গন গণ-অভ্যুত্থানের পিছনে যত মুসলমান জড়িত ছিল, তারা ওয়াহাবীদের ইন্ধনে বিদ্রোহী হয়েছে বলে চিহ্নিত করেছিল ব্রিটিশেরা। সৈয়দ আহমেদ খান, শাহ ইসমাইল, শহীদ তিতুমীর এদের সবার পিছনেই কিন্তু ওয়াহাবী খেতাব লাগিয়ে ষোলআনা ফায়দা লুটেছিল ইংরেজ। তিতুমীর আজো আমাদের কাছে বীর হিসেবে চিত্রিত আর ব্রিটিশের কাছে ডাকাত সর্দার। ওয়াহাবী মতবাদ ও আজাদী আন্দোলন
কাকতালীয় ভাবে তখনকার ভারতে মুসলমানদের সবচেয়ে প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা ছিলেন “সাইয়েদ আহমদ বেরলভী” (১৭৮৬–১৮৩১)। তিনি বাংলাসহ সমগ্র ভারত-বর্ষব্যাপী এক সুসংগঠিত স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্ম দিয়েছিলেন। একটি অঞ্চলে কিছুদিনের জন্য তিনি ইসলামী হুকুমত চালু করেছিলেন। যেটি ব্রিটিশ রাজের ভয়ঙ্কর মাথা ব্যথার কারণ ছিল। তিনি মক্কায় গিয়েছিলেন হজ করতে। সে সময় তিনি মোহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের অনুসারিদের হাতে আরবের এক ভিন্ন পরিবর্তন দেখতে পেয়েছিলেন। তিনি হজ থেকে ফিরে এসে ভারতীয় মুসলমানদেরকে একত্রিত করেন এবং তাদের দিয়ে আজাদী আন্দোলন তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের ডাক দিয়েছিলেন। তার বাহীনী ব্রিটিশের বিরুদ্ধে সফলতার দ্বার প্রান্তে পৌছেও পরাজিত হয়েছিলেন! সঙ্গত কারণে ব্রিটিশ ছিল তাদের ভিন্নভাবে মুসলমানদের প্রতিপক্ষ এবং তারা ওয়াহাবী বিদ্রোহী দমনের নামে অকাতরে মুসলমান হত্যা করেছিলেন।
আগেই বলেছি রাজনৈতিক বিষয় আমার লিখার বিষয় বস্তু নয় এবং ওয়াহাবী মতবাদের সাফাই গাওয়াও আমার লক্ষ্য নয়। তারপরও তদানীন্তন আরবের সামান্য ধারনা দরকার। তাই আমি পৃথিবীতে আলোচিত ঐতিহাসিক কিছু বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে ঘটনা শেষ করবো। স্যার উইলিয়াম উইলসন হান্টারকে (১৮৪০-১৯০০) ভারতে পাঠানো হয়েছিল ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হবে সে সম্পর্কে মূল্যায়ন করার জন্য। তিনি সেটা সফলতার সাথে করেছিলেন। সাথে সাথে ভারতের স্বাধীনতা পাগল মুসলমানদের দমিয়ে, সোজা বানিয়ে কিভাবে প্রভুভক্ত দাস বানানো যায়, সেটার জন্যও মূল্যায়ন পাঠিয়েছিলেন ব্রিটিশ রাজ দরবারে। এ সম্পর্কিত তার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ “দ্য ইন্ডিয়ান মুসলমান” এ বহু ঘটনা প্রকাশ হয়েছে। ভারতে তিনি সৈয়দ আহমদ খানকে সবচেয়ে বেশী বিপর্যয় সৃষ্টিকারী মানুষ হিসেবে পেয়েছিলেন এবং তিনি এর অন্যতম কারণ দেখেছিলেন আরবের ওয়াহীদের প্রভাব। এই চেতনাকে গোরা থেকে উৎপাটন করতে না পারলে ব্রিটিশকে আরো ভোগান্তিতে পড়তে হবে। তারই আলোকে তিনি মোহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব সম্পর্কে ব্রিটিশের কাছে লিখেন,
“প্রায় দেড়শ বছর আগে, ক্ষুদ্র রাজ্য নেজদ অধিপতির পুত্র আবদুল ওয়াহব নামে এক আরব তরুণ হজ্জ করতে গিয়েছিল। সেখানে তার সমসাময়িক হজ্জ-যাত্রিদের চরিত্রহীনতা এবং পবিত্র নগরীসমূহে প্রচলিত অনাচার দর্শনে গভীরভাবে মর্মাহত হয়েছিল আবদুল ওয়াহাব। দামেস্ক নগরের ইসলাম ধর্মের দুর্নীতি সম্পর্কে সে দীর্ঘ তিনি বছর যাবত গভীরভাবে চিন্তা-ভাবনা কররে এবং তারপর সে এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের উদ্যোগ গ্রহণ করে। তুরস্কের ধর্মীয় পণ্ডিতদের বিরুদ্ধে সে অভিযোগ করে যে, তার ঐতিহ্য বা সুন্নতের আতিশয্যের দ্বারা কোরআনের বাণীকে অকার্যকরী করছে। তুর্কি জাতি তাদের পাপাচারের দরুন কাফের অপেক্ষাও অধম হয়ে পড়েছে….” দ্য ইন্ডিয়ান মুসলমান-৪৩
Discussion about this post