পিছন থেকে গায়ের চাদরে জোড়ে টান দিয়ে বললেন, ভাই আমরা দলছুট হয়েছি। আমরা আপনার সাথে থাকব। মক্কায় এসেছি কিন্তু নিয়ম নীতির তো কিছুই জানিনা। একই গাড়ীতে এসেছি। ষাট জনের দলে এই দুজনকে নিয়ে গাড়ীতে বেজায় কথা বার্তা হয়েছিল। আমার পা ফুলে উঠেছিল, ব্যথার জ্বালায় হাটতে পারছিলাম না। খুড়িয়ে চলতে গিয়ে, সবার পিছনে পড়ে যাই। কিন্তু ওরা কেন দলছুট হল! সে প্রশ্ন করার সময় এটা নয়।
অন্তরে রাজ্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে মক্কায় হাজির হয়েছি কিছুক্ষণ আগেই। ছোট ফাঁক দিয়ে কাবা নজরে এসেছিল। হৃদয়ে তুমুল ঝড়, এখুনি হাজির হব তাওয়াফে। ঠিক সেই মুহূর্তে এই দুই ব্যক্তি আমাকে বানাল ঈমাম। বললাম, দেখুন পায়ের দশা কি, হাটতে পারছিনা, তাই আমার সাথেই আপনাদের তাল মিলাতে হবে। তারা বলল, ঠিক আছে ভাই, আপনার সাথেই থাকব। যেভাবেই হোক মক্কায় পৌঁছে গেছি কিন্তু দোয়া কালাম কিছুই জানিনা। আমাদের একটু সহযোগিতা দিবেন।
কাবা ঘর দেখার পরে, মাত্তাফে (কাবার চারিদিকে ঘুরার চক্ষর) দাড়িয়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জানালাম। তিনি আমাকে মৃত্যুর মুখ থেকে বাঁচিয়ে এখানে পৌঁছিয়েছেন। আমার তো এতটুকুই চাহিদা ছিল। আসার পথে কান্না করে আল্লাহর কাছে এটাই তো বলেছিলাম।
সাথে থাকা দু’জনের একজন বলল, বিটিভিতে বহুবার মানুষকে এভাবে চারিদিকে ঘুরতে দেখেছি! কি তাজ্জব ব্যাপার! আজকে আমিও সেই জায়গায় হাজির হয়েছি। আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছেনা। আচ্ছা ভাই উল্টো দিকে ঘুরলে কি কোন সমস্যা হবে?
ওমরার তাওয়াফ শুরুই করতে পারিনি। নিজে অসুস্থ। তার উপরে এই বিদঘুটে প্রশ্নে কি বলা যায়, ভাবছি। দু’জনেরই বহু প্রশ্ন। আপাতত একজনের প্রশ্নোত্তরই লিখি। বললাম, উল্টো ঘুরতে যাবেন কেন? সবাই যেভাবে ঘুরছে আমাদেরও সেভাবে ঘুরতে হবে। চলুন।
চলার সময দোয়াগুলো আস্তে পড়ছি, যাতে তারা শুনে আমার সাথে মুখে মুখে উচ্চারণ করতে পারে। একশত পদক্ষেপও আগাতে পারিনি, আবার প্রশ্ন,
ভাই, কাবা ঘরের ভিতরে কার কার কবর আছে?
ওখানে কারো কবর নেই। ভাই, কথা না বলে আমার সাথে দোয়া পড়তে থাকুন।
দোয়া ও পথচলা চলতে থাকল। আর তারা চারিদিকে তাকাচ্ছিল। নতুন হাজিদের জন্য কাবার প্রতিটি স্তম্ভই যে দৃশ্যনীয় জিনিষ। কয়েক কদম যাবার পরে আবারো জানতে চাইল,
ভাই, তাহলে আমাদের রাসুলের কবর কোন স্থানে? মানে কাবার কোন কর্নারে সেটা একটু জানান ভাই!
রাসুলের (সা) এর কবর মদিনায়! মদিনার দূরত্ব কয়েকশত মাইল। ভাই, বহু কষ্টে হজ্জে এসেছেন, দোয়া পড়ুন। আল্লাহর কাছে আপনাদের চাওয়া-পাওয়ার কথা বলুন। পরে আপনাদের সকল প্রশ্নর উত্তর দেওয়া হবে। এখন শুধু দোয়া পড়ুন।
আমার এহরামের কোনা ধরে তারা এগিয়ে চলছে। কিন্তু দোয়া পড়ছেন পাশে চলতে থাকা ইন্দোনেশিয়ান গ্রুপের মুখে মুখে। অর্থাৎ তারা বেজায় অন্য মনস্ক! এবার এক প্রকার আমাকে দাঁড় করানোর মত করে প্রশ্ন করল, “ভাই, রাসুলের (সা) কবর মদিনায়, কথাটা এখন মনে পড়ছে। তাহলে আমরা এখানে ঘুরছি কেন?”
আজীবন মাথা ঠাণ্ডা রেখে চলার উপদেশ পেয়েছি। হজ্জে আসার সময় বারবার যে কথাগুলোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে, সেটা হল রাগ-গোস্বাকে চিরতরে বিদায় জানানো। কিন্তু এই ধরনের একটি সেনসিটিভ জায়গাতে এভাবে একত্রে দুই পাগলের পাল্লায় পড়ব। কল্পনাও করিনি। তাই যথাসম্ভব মেজাজ ঠাণ্ডা রেখে বললাম। ভাই, মুখ বন্ধ রেখে হয় আপনারা আমাকে অনুসরণ করুন, নতুবা এই মুহূর্তে ত্যাগ করুন। আমি আপনাদের দায়িত্বে নই, আপনারা মোয়াল্লেম কে খোঁজ করে তাদের সাথে ঢুকে পড়ুন। তাওয়াফ করার কথা আল্লাহ নিজেই বলেছেন। দূর দূরান্ত থেকে এই পবিত্র জায়গায় এসে, প্রথমেই তাওয়াফ করতে হয়। তাই প্রথমেই এই কাজ আমরাও শুরু করেছি। এটাতে আত্মা প্রশান্তি পায়।
ভাই, মোয়াল্লেম কে হারিয়ে ফেলেছি বলেই তো, আপনার সাথে এসেছি। তাছাড়া মোয়াল্লেম সাহেব তো গাড়িতেই বলেছেন, কোন প্রশ্ন থাকলে ওনার অবর্তমানে আপনার নিকট থেকে জেনে নিতে। আর আপনি বলছেন আপনাকে ছেড়ে চলে যেতে! এটা কেমন কথা? আমরা না জানলে তো প্রশ্ন করবই। আমাদের হজ্জ না হলে কিন্তু ভাই আপনিই দায়ী থাকবেন!
উফ! শিশুকাল থেকেই হজের স্বপ্ন দেখতাম। মায়ের কাছে দোয়া চাইতাম। স্কুল জীবনেই মক্কা-মদিনা ও হজের ইতিহাস পড়েছিলাম। সারা জীবন ভর এই স্বপ্ন বুকে লালায়িত করেছি। বহু ঝড়-ঝঞ্ঝাট মোকাবেলা করে কিছুক্ষণ আগেই কাবার চত্বরে প্রবেশ করেছি। বহু মানুষ এই খুশীতে চোখের জ্বলে নিজের বুক ভাসিয়ে দিচ্ছে। আর আমি অসুস্থ অবস্থায় এমন দু’জন হাজির খপ্পরে পড়েছি। যারা সাবধান বানী শোনাচ্ছেন, তাদের হজ কবুল না হলে নাকি আমি দায়ী থাকব। এদের কাছে হজ্জ, মক্কা-মদিনা সম্পর্কেও কোন জ্ঞান নেই। বিন্দু বিসর্গ কিছু না এরা জেনেই হজে চলে এসেছে। এরা কেমন মানুষ! একবার মাথায় আসল, এরা কোন বিধর্মী কিনা! আবার তওবা করলাম, আমি এমন করে কেন ভাবছি।
আবার অগ্রসর হলাম, দোয়া করতে থাকলাম। লাখ লাখ মানুষের ভিড়ে আগানো যাচ্ছেনা। গাড়িতে ষাট ঘণ্টার উপরে একাধিক্রমে বসে থাকার কারণে, পায়ে পানি জমে দুটো ফুলে উঠেছে। যার কারণে চলার গতি আরো মন্থর হল।
এক চক্কর শেষ করতে পারিনি। আবারো প্রশ্ন, ভাই তাহলে একবারের জন্য হলেও বলুন, তাহলে কাবা ঘরের ভিতরে আছেটা কি? মহা মুসিবত! একটা প্রশ্নের উত্তর দিলে নতুন প্রশ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। রাগ-গোস্বা কিছুই দেখানো যাচ্ছেনা আবার পরিত্যাগ ও করতে পারছিনা। একপাশে গিয়ে দাঁড়ালাম।
বললাম কি কি প্রশ্ন আছে বলুন? তার সম্যক সকল প্রশ্নের ছোট্ট উত্তর দিয়ে তাওয়াফে নামলাম। বললাম, আল্লাহর ওয়াস্তে আর কোন প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন সব মাথায় ঢুকিয়ে রাখুন, পরে সকল প্রশ্নের উত্তর দিব। চেহারা দেখে মনে হল, আমার ছোট্ট উত্তরে তার মন গলেনি। আরো জানা চাই…..
পরে জানতে চেয়েছিলাম, তোমার হজে আসার কাহিনী টা কি আমাকে জানাবে? সে বলল,
তার ইচ্ছা ছিল আজমির যাবে। যেখানে গেলে মানুষের মনের আশা, নিয়ত পূরণ হয়। এক বিল্ডিংয়ের নীচে এমন এক ব্যক্তির দোকান আছে, যিনি মানুষদের জেয়ারতের লক্ষ্যে আজমির, দিল্লি পাঠানোর ব্যবস্থা করে। ব্যবসায়ের পাশাপাশি তিনি পীর, মাজার, রওযা, ওরস এসবের নানা দায়িত্ব পালন করে। একই ভবনের অপরদিকে ছিল আরেকজন আলেমের দোকান। তিনি হজ ও ওমরায় মানুষ পাঠান। আমাদের এই বন্ধুটি, তথ্য জানার জন্য ভুল করে উল্টো দোকানে ঢুকেছিল। তিনি তাকে এই কথা বুঝাতে সক্ষম হয়েছিল যে, মক্কায় পৌঁছে যা চাইবে, তাই পাবে। তখন হজে মৌসুম চলমান থাকাতে তার নামটিও সেখানে ঢুকিয়ে দেন।
আল্লাহ কাকে, কিভাবে, কার কল্যাণ সাধন করে থাকে। মানুষ কোনদিন তার হিসেব করতে পারে না। পরবর্তী আট দিনে এই বন্ধুটিতে ইসলামের মৌলিক বিধান বুঝালাম এবং নিশ্চিত করলাম যে, সকল দোয়া এখানেই কবুল হয়। যেহেতু তোমাকে কোন ভাবে আল্লাহ এই জায়গায় হাজির করেছে, তাহলে এখনই তুমি পরিবর্তন হও। নিশ্চয়ই তোমার জন্য বিরাট কল্যাণ লুকিয়ে আছে। এতদিন এই ব্যক্তি শুধু অর্থের পিছনে ঘুরেছিল অথচ সে মক্কায় বসেই বহু বই জোগাড় করে পড়তে শুরু করেছিল।
অন্যের টাকায় বদলি হজ করতে এসে মসজিদে হারামেই নামাজ পড়েনা এমন বহু ব্যক্তিকে দেখেছি। আমাদের সাথে হজ করতে এসে, প্রথমে কাবায় না গিয়ে আগে পীর সাহেবের সাথে দেখা করতে গিয়েছিল, এমন মুরিদও দেখেছি। হারামের বিশাল নামাজের জামাত চলছে, মাইকে তেলাওয়াত শোনা গুনাহ ভেবে অনেকেই জামায়াতে শরীক হয়নি, এমন কথাও শুনেছি। কোটি টাকার মালিক হলেও কখন নিজের পকেটের টাকায় হজ করত কিনা প্রশ্ন থাকে, এমন ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের ফ্রি টাকার শ্রাদ্ধ করতে হজে গিয়ে হাজির হতেও দেখেছি।
মূলত সকল কল্যাণ আল্লাহর হাতেই নিহিত। কেউ অন্তর্দৃষ্টি-দূরদৃষ্টি দিয়ে তা দেখতে পায় আর কেউ দেখে মৃত্যুর বিছানায় ছটফট করা অবস্থায়।
দুনিয়াতে প্রতিদিন আল্লাহর পক্ষ হতে একশত টি রহম নাজিল হয়। যার নিরানব্বইটি মক্কায় নাজিল হয়। বাকি একটিকে সারা বিশ্বে বণ্টন করা হয়। এই হল মসজিদুল হারাম তথা মক্কার গুরুত্ব। সেখানে তওবাকারী, পরিষ্কার অন্তর নিয়ে যে পৌছে, সেই কল্যানের অধিকারী হয়।


Discussion about this post