শিশুরা জন্মগত পাপী ও প্রকৃতিগত বদমায়েশ হিসেবে দুনিয়াতে আসেনা। বরং তারা মাসুম তথা নিষ্পাপ জীবনের নিশ্চয়তা পায় সাত বছর বয়স পর্যন্ত। নিষ্কুলষতা দিয়েই তার পথচলা শুরু হয়। পরবর্তীতে তারা পরিবেশ, সমাজ এবং পিতা-মাতার জোগাড় করে দেওয়া উপাদান ব্যবহার করেই কেউ চরম অধঃপতনে যায়, কেউ কল্যাণের শিখরে পৌঁছে। শিশুর-স্বভাব-প্রকৃতি
আল্লাহ প্রতিটি শিশুকে এমন ভাবে সৃষ্টি করেছেন, যাতে করে তারা সহজে তার প্রকৃত স্রষ্টাকে চিনতে পারে। স্রষ্টাকে চেনার সমুদয় উপাদান তার দেহেই মজুত থাকে। প্রতিটি মানব শিশুকে এমন একটি দেহ দান করেছে, যা তার সুডৌল গঠনাকৃতি, হাত-পা ও মস্তিষ্ক সংযোজনের দিক থেকে মানবিক জীবন যাপন করার জন্য সবচেয়ে উপযোগী। তাকে দেখার, শুনার, স্পর্শ করার, স্বাদ গ্রহণ করা ও ঘ্রাণ নেবার জন্য এমন ইন্দ্রিয় দান করেছে; যা তার বৈশিষ্ট্য ও আনুপাতিক কর্মক্ষমতার দিক দিয়ে উপযোগী।
প্রতিটি মানব শিশুকে চিন্তা, বুদ্ধি শক্তি, যুক্তি উপস্থাপন, প্রমাণ পেশ করার শক্তি দেওয়া হয়েছে। সাথে সাথে কল্পনা শক্তি, স্মৃতি শক্তি, পার্থক্য করার শক্তি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার শক্তি, সংকল্প করার শক্তি সহ অনেক মানসিক শক্তি দান করেছে। যার ফলে সে এই দুনিয়ায় একজন মানুষের মতো কাজ করার যোগ্যতা অর্জন করে। কিন্তু তাকে যে শিক্ষা প্রদান করা হয় কিংবা যে পরিবেশ রাখা হয়, তার প্রভাবেই সে মূল রাস্তা থেকে বিচ্যুত হয়। শিশুর-স্বভাব-প্রকৃতি
আল্লাহ মানব শিশুর গঠনাকৃতিতে এমন ধরনের কোন বক্রতা রেখে দেননি যা তাকে সোজা পথ অবলম্বন করতে চাইলে তা বাধা হিসেবে দেখা দিবে। প্রয়োজন ও চাহিদা মাফিক তার গঠনাকৃতি এবং মানসিক সক্ষমতা মাধ্যমেই তার নিকট থেকে পরীক্ষা আদায় করা হয়। সকল প্রাণ আল্লাহর কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে; তা প্রকাশের ধরণ প্রাণী ভেদে ভিন্ন। যেমন, কোন প্রাণীকে মানুষের মত করে মাটিতে কপাল লাগিয়ে সেজদা দিতে হয়না। এটা তার কাছে চাওয়া হয়নি, তাদের পক্ষে এ কাজ করাও সম্ভব হত না। আর যদি চাওয়া হত তাহলেই সে স্বভাব-প্রকৃতির ব্যতিক্রম হত। কিন্তু মানুষ সেজদা দেওয়ায় পরিপূর্ণ সক্ষম, তাকে সে ধরণের উপযোগী করেই বানানো হয়েছে এবং তার ইচ্ছা ও আগ্রহ চাওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে পরিষ্কার ঘোষণা আছে যে, “মানুষের নফসের ও সেই সত্তার কসম যিনি তাকে ঠিকভাবে গঠন করেছেন” আশ-শামছ-৭
এখন সে যদি তা না করে তাহলে সেটা তার ইচ্ছা শক্তির দ্রোহ। তার পিতা-মাতা এটা তাকে পাইয়ে দেয়নি কিংবা সমাজ ছিল এ ধারার বিপরীত মুখী। যার প্রভাব তার জীবনে পড়েছে। দুনিয়াতে আসার পরে বংশগত পরিবেশের প্রভাবে তার স্বভাব বদলিয়েছে। কিন্তু একজন মহান ব্যক্তি হবার জন্য তাকে প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়েই সৃষ্টি করা হয়েছিল। যখন সে খারাবীর অতলে নিমজ্জিত, তখনও তার কাছে বিদ্যমান থাকে মহামানব হবার সমুদয় উপাদান।
রাসুল (সা) বলেছেন, “এমন কোন শিশু নেই যে প্রকৃতি ছাড়া অন্যকিছুর ওপর সৃষ্টি হয়। তারপর মা- বাপ তাকে ইহুদি, খৃষ্টান বা অগ্নি উপাসক বানায়। এটা তেমনি, যেমন পশুর পেট থেকে সুস্থ, সবল ও পূর্ণ অবয়ব বিশিষ্ট বাচ্চা পয়দা হয়। তোমরা কি তাদের কাউকে কানকাটা পেয়েছ” (বুখারী ও মুসলিম) অর্থাৎ সৃষ্ট সকল জীবের ক্ষেত্রে আল্লাহর এটাই নিয়ম। গৃহ পালিত প্রাণীকে আমরাই দাগান্বিত করি কিন্তু সে জন্ম নিয়েছে প্রকৃত স্বভাব ও অবয়ব নিয়েই। চরিত্রগত প্রাণীরা স্বভাব-প্রকৃতি অনুযায়ীই বেড়ে উঠে ও জীবন ধারণ করে কিন্তু মানুষ বদলে যায়। কেননা পিতা-মাতা, সমাজ, পরিবেশ মানুষের স্বভাবকে বদলে দেয়। শিশুর-স্বভাব-প্রকৃতি
হাদিস শরীফে অন্যত্র বলা হয়েছে, “আমার রব বলেন, আমার সকল বান্দাকে আমি হানীফ (সঠিক প্রকৃতির উপর) সৃষ্টি করেছি। তারপর শয়তানেরা তাদেরকে দ্বীন (অর্থাৎ তাদের প্রাকৃতিক দ্বীন) থেকে সরিয়ে দিয়েছে….” মুসনাদে আহমদ। অর্থাৎ মানুষ কখনও নিজের প্রকৃত স্বভাব অনুযায়ী চলে না। এই না চলার প্রবণতাটি জোড় জবরদস্তির মাধ্যমে হয়না, এটা তার পরিপূর্ণ ইচ্ছাধীন। সে প্রভাবিত হয়ে স্বেচ্ছায় পথ-পরিক্রমা বদলে নেয়। কোরআনে বলা হয়েছে, “আর আমি ভালো ও মন্দ উভয় পথ তার জন্য সুস্পষ্ট করে রেখে দিয়েছি” বালাদ-১০। ফলে মানব শিশুকে যে সত্য-মিথ্যা, সঠিক-বেঠিকের জ্ঞান দেওয়া হয়েছিল, এক্ষেত্রে সে তার জ্ঞানকে যথাযথ কাজে লাগায় নি। এজন্য মানুষ নিজের কাজের জন্য নিজে দায়ী। কোন বাহানা চলবে না।
তাই বলা হয়েছে, “আল্লাহ, মানুষকে যে প্রকৃতির ওপর সৃষ্টি করেছে তাঁর ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাও। আল্লাহর তৈরি সৃষ্টি কাঠামো পরিবর্তন করা যেতে পারে না। এটিই পুরোপুরি সঠিক ও যথার্থ”। রূম-৩০
এ ধরনের দ্ব্যর্থ-হীন, পরিষ্কার নির্দেশনা মানুষ কোনদিন দিতে পারে না। এ জাতীয় কথা একমাত্র স্রষ্টার জন্যই শোভনীয়। মানব শিশুকে, জীবনের প্রারম্ভে যারা সঠিক রাস্তা দেখিয়ে দেবার ভূমিকা রাখে তারা হল তার পিতা-মাতা। শিশুরা জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় পর্যন্ত পিতা-মাতাকে অন্ধ অনুসরণ করে। সে কারণে পিতা-মাতা ভুল পথে থাকলে সন্তানও সে পথে পা বাড়ায়। সে হিসেবে পিতা-মাতা দোষী। আবার পরিণত বয়সে মানুষ সত্য-মিথ্যার তফাৎ বুঝতে পারে। বিশ্লেষণ করতে পারে। তখন সে যদি নিজের জ্ঞান ব্যবহার করে না শোধরায় সেই খারাপ পরিণতির জন্য নিজেই দায়ী। কিন্তু মানব সভ্যতায়, মানুষ জ্ঞান দ্বারা তেমন একটা প্রভাবিত হয়না, যতটুকু প্রভাবিত হয়, তাদের পিতৃ প্রদত্ত রসম-রেওয়াজ দ্বারা।
পরিশেষে সেই প্রথম বাক্যে ফিরে যেতে হয়, মানব শিশুকে কল্যাণের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। দুনিয়ার জীবনটা সে নিষ্পাপ অবস্থায় শুরু করেছিল। সারাজীবন নিষ্পাপ থাকাই তার দায়িত্ব ও কর্তব্য। এভাবে জীবন ধারণ করার ইচ্ছা করলে, যে কোন ব্যক্তিই সে লক্ষ্যে পৌছাতে পারে। এটাই হল, মানুষের আসল প্রকৃতি ও স্বভাব। আর সে যদি খারাবীর গহ্বরে পড়ে যায়, সেটা হবে তার প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজ।
পরিশেষে সেই প্রথম বাক্যে ফিরে যেতে হয়, মানব শিশুকে কল্যাণের জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। দুনিয়ার জীবনটা সে নিষ্পাপ অবস্থায় শুরু করেছিল। সারাজীবন নিষ্পাপ থাকাই তার দায়িত্ব ও কর্তব্য। এভাবে জীবন ধারণ করার ইচ্ছা করলে, যে কোন ব্যক্তিই সে লক্ষ্যে পৌছাতে পারে। এটাই হল, মানুষের আসল প্রকৃতি ও স্বভাব। আর সে যদি খারাবীর গহ্বরে পড়ে যায়, সেটা হবে তার প্রকৃতি বিরুদ্ধ কাজ।


Discussion about this post