আমাদের দেশের কিছু ধর্মীয় আলেম, নিজেদের সুন্নি দাবী করে এবং ঠিক আজানের আগে দরুদ-সালাম প্রচার করে, তারপরই আজান দেয়। দৃশ্যত মনে হয়, আজানের আগে দরুদ সালাম পড়াটা আজানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ। এটা নিয়ে চট্টগ্রামে নানা বিবাদ লেগে আছে দীর্ঘ বছর ধরে। যারা বাধা দেয়, তাদের দাবী হল এটা বেদায়াত। আজানের আগে দরুদ পড়ার কথা কোরআন-হাদিসের কোথাও নেই। এমন কি সাহাবী, তাবেয়ীরাও কখনও কোনদিন এসব করেন নি। তাই এটা পড়া সুস্পষ্ট বেদায়াত তথা নিজেদের মর্জিমত আবিষ্কার। আর স্থানীয় সুন্নি দাবীদার ভাইয়েরা, নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠা কল্পে দু’ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করে।
প্রথমত, এটা তো নবীর প্রতি দরুদ! সুতরাং যে ব্যক্তি এমন কাজে বাধা দেয় সে নবীর দুষমন আর ওয়াবী ছাড়া আর কেউ নয়! সাধারণ মানুষ এই কথায় যুক্তি খুঁজে পায়।
দ্বিতীয়ত, পীর-আউলিয়াদের নামে আহরিত কিছু কথাকে দলিল হিসেবে তারা উপস্থাপন করে। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ পীর-আউলিয়ার প্রতি হাজার বছর ধরেই হৃদয়ে চাপা ভালবাসা লুকিয়ে রাখে। তারা সাহাবী আর আউলিয়ার মাঝে আসমান-জমিন তফাৎ কতটুকু সেটা বুঝার জন্য গভীরে যেতে চায়না। ফলে তারা পীরের দলিলকেই গ্রহণ করে। এটাতে সুন্নিরা কিছু জন সমর্থন পায়!
মূলত বেদায়াত শব্দটি কোন গালি নয়। বেদায়াত শব্দের অর্থ নতুন উদ্ভাবন। পৃথিবীতে নিত্য নতুন কতকিছু উদ্ভাবন হচ্ছে এর সবই বেদায়াত। ইসলাম পরবর্তী জামানায় শত শত উত্তম বেদায়াত আবিষ্কৃত হয়েছে যার অনেকগুলো সমাজে দৃঢ় ভিত্তিমূল কায়েম করেছে। যেমন বহুতল মসজিদ, মাদ্রাসা, ইসলামী ব্যাংক ইত্যাদি। রাসুল (সা) ও সাহাবীর যুগে এসব ছিলনা, পরবর্তীতে সমাজের চাহিদার প্রয়োজনে (ইসলামের প্রয়োজনে নয়) ব্যাংক, মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তাই এসবই বেদায়াত এগুলো সমাজের জন্য ক্ষতিকর হয়নি।
এখন যদি বলা হয়, ঐ নির্দিষ্ট মাদ্রাসায় না পড়লে আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন, জাহান্নামে যেতে হবে। তাহলে এ জাতীয় কথার স্বপক্ষে কোরআন-হাদিসের দলীল দরকার হবে। কেননা ব্যাপারটি এবাদতের সাথে সম্পর্কিত হয়ে গেছে। এবাদত নিজের ইচ্ছেমত, মর্জিমত করা যায় না। এবাদত অবশ্যই রাসুল (সা) এর দেখানো ফরমেটে করতে হয়। কেননা রাসুল (সা) বলেছেন, “কেউ আমাদের এ শরী‘আতে নাই এমন কিছুর অনুপ্রবেশ ঘটালে তা প্রত্যাখ্যাত” বোখারী-২৬৯৭।
ধরুন কারো মামা কলেজের প্রিন্সিপ্যাল, তার ভাগিনা গরীব এবং একই কলেজেরই একজন মেধাবী ছাত্র। এই ছাত্র বিনা-বেতনে পড়ার জন্য একটি দরখাস্ত করতে চায়। এখন ভাগিনা ছাত্র যদি শ্রদ্ধেয় মামা উল্লেখ করে দরখাস্ত দেয়। তাহলে কলেজ কর্তৃপক্ষ তার এই দরখাস্ত গ্রহণ করতে পারে না। ছাত্র যতই মেধাবী হউক এবং দরখাস্তের ভাষা যতই আবেদন-ময়ী হউক না কেন, তার পত্র কখনও গ্রহণযোগ্য হবে না। তার পত্র গ্রহণ যোগ্য হতে হলে অবশ্যই তা প্রিন্সিপ্যালের বরাবরে লিখতে হবে এবং কলেজের নিজস্ব Format তথা পদ্ধতিতে করতে হবে।
ঠিক এই ব্যাপারটিও ইসলামের জন্য হুবহু খাটে। যে কোন এবাদত কবুল হবার অন্যতম, একমাত্র শর্ত হচ্ছে, সে এবাদত হুবহু রাসুল (সা) এর দেওয়া Format বা পদ্ধতিতে হতে হবে। নিজের ইচ্ছেমত ভাল কথা, সুন্দর বাক্য যোগ করে ইবাদতের মধ্যে যোগ করে দিলে, সে এবাদত গ্রহণ হবার কোন সম্ভাবনা থাকবে না। যদি না তা কোরআন-হাদিস থেকে সন্দেহাতীত ভাবে পরিষ্কার দলিল না থাকে। এসব সুন্দর বাক্য, ভাল কথা যতবড় পীর-আউলিয়াই বলে থাকুক না কেন, ইসলামে এসবের কোন গুরুত্ব নেই, ধুলোবালির মতও মূল্য নেই। সবই বেদায়াত হিসেবে গণ্য হবে। আল্লাহ এমন সং-মিশ্রিত আমল গ্রহণ করবেন না।
শিয়ারা আজানের মধ্য নতুন কয়েকটি লাইন যোগ করে, যেমন আশহাদু আন্না আলিউন অলিউল্লাহ, আশহাদি আন্না আলিউন হুজ্জাতুল্লাহ, হাইয়্যা আ’লা খাইরুল আ’মাল। এটাও চরম বেদায়াত, যা ইসলাম সমর্থিত নয়, রাসুল (সা) কর্তৃক অনুমোদিত নয়, সাহাবীরা এমনটি করে নি। তাই এটা পরিত্যক্ত এবং পরিষ্কার বেদায়াত। কথা হল যারা নিজেদের সুন্নি বলে দাবী করে, তারা কিভাবে শিয়াদের মত আজানের মধ্যে নতুন কথা যোগ করতে পারে? শিয়ারাও তো আজানে বলে থাকে যে, হাইয়্যা আ’লা খাইরুল আ’মাল অর্থাৎ ধেয়ে এসো সর্বোত্তম কাজের দিকে। এটি খুবই ভাল কথা হওয়া স্বত্বেও বাতিল, কেননা এটা রাসুল (সা) বলেন নি। প্রকৃত সুন্নি হবার জন্য মানা-না মানার মানদণ্ড এভাবেই হতে হবে।
সুন্নিয়ত দাবী করা এসব সুন্নিরা নিজের অজান্তে স্বয়ং রাসুল (সা) কমে বুঝার মানুষ হিসেবে গণ্য করে বসে। এটা তো রাসুল (সা) এর উপর চরম অবমাননা কর চিন্তা। তারা কি ভেবে দেখেনি আজান চালু হবার সে সময়ের ব্যাপারটি?
হিজরি ১ম সনে মানুষকে সালাতের জন্য আহবান করার পদ্ধতি কি হতে পারে সেটা নিয়ে সাহাবীদের মধ্যে কথাবার্তা চলছিল। এটা একদিনের ব্যাপার নয়, সকল সাহাবীরা ভেবে চিন্তে চারটি পরামর্শ নিয়ে আসে। ক. ঝাণ্ডা উড়ানো খ. আগুন প্রজ্বলন গ. শিঙ্গা বাজানো ঘ. ঢোল বাজানো। রাসুল (সা) এর উপস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ সাহাবীদের অংশগ্রহণে নানা বিশ্লেষণের মাধ্যমে চারটি পরামর্শই বাতিল হয়। আরো বহু লম্বা ঘটনা আছে, তবে একরাতে সাহাবী আবদুল্লাহ বিন জায়েদকে কেউ স্বপ্নের মাধ্যমে বর্তমানে উচ্চারিত আজানের কথাগুলো মনে করিয়ে দেন। তিনি সকালে কথাগুলো রাসুল (সা) বললে, সে কথাগুলো গৃহীত হয়। যা আজকের দিনে আজান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অন্য কথায় আজান আল্লাহ প্রদত্ত শিখিয়ে দেওয়া কথামালা। যা তিনি তার প্রিয় বান্দাদে স্বপ্নের মাধ্যমে অবহিত করেছেন।
বর্তমান বাংলাদেশের বেশী বুঝার সুন্নিরা কি মনে করে থাকে যে, সেদিন রাসুল (সা) আশে পাশে বর্তমানের মত জ্ঞানী মানুষ তখন ছিলনা! যারা আজানের আগে দরুদ পড়ার মত গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শটি রাসুল (সা) দিতে পারতেন! কিংবা আজানের আগে দরুদ পড়ার ব্যাপারটি, স্বয়ং রাসুল (সা) এর মাথায় ঢুকে নি, যা বাংলাদেশের এসব বেদায়াতী আলেমদের মাথায় ঢুকেছে। (নাউজুবিল্লাহ)। দরুদ পড়া অবশ্যই সওয়াবের কাজ, এ ব্যাপারে পবিত্র কোরআনে তাগিদ এসেছে, এটা আল্লাহর নির্দেশ। তবে তা কোথায় পড়তে হবে, কিভাবে পড়তে হবে, সেগুলোও বিস্তারিত রাসুল (সা) বলে গেছেন। তাঁর দেখানো পদ্ধতি মতেই পড়তে হবে। আজানের ঠিক আগের মুহূর্তে দরুদ পড়ার জন্য কোন দলীল কি তাদের কাছে আছে, না গোঁয়ার্তুমি করার জন্য এটা করে থাকে? যাদের হৃদয়ে তিল পরিমাণ হঠকারীতা গোঁয়ার্তুমি সে ব্যক্তি কখনও মুমিন হতে পারে না। তাই আসুন আমরা পরিপূর্ণ ইসলাম মেনে চলি, জ্ঞান অর্জন করি এবং বেদায়াত মুক্ত জীবন গড়ি।



Discussion about this post