হঠাৎ এই ধরনের প্রশ্নে অনেকে থতমত খেয়ে যাবে। একটু ধাতস্থ হয়ে বলবে, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার অথবা সেই রকম! অনেক শিক্ষিত পিতা-মাতাও হঠাৎ এই প্রশ্নে কি উত্তর দেওয়া উত্তম হতে পারে চিন্তা করার সুযোগ নিবে। আবার অশিক্ষিত গ্রাম্য পিতা-মাতা হলে অকপটে বলেও দিতে পারে আমি চাই এমন ছেলে, যে বড় হয়ে আমার কাছে থাকবে। সন্তান মানুষ করার ক্ষেত্রে গ্রামের মানুষের যত ধারণা শহুরে মানুষের ধারণা আরো ব্যাপক। কেননা তারা আশ-পাশের খ্যাতিমানদের জীবন দেখে থাকেন। তাই সন্তানের ধারণা পরিবেশের সাথে সাথে বদলাতে থাকে।
কেমন সন্তান চাই, এই সিদ্ধান্ত বেশীর ভাগ মানুষ নিয়ে থাকে তাদের আশে পাশের সচ্ছল, ধনী, ক্ষমতাবান মানুষদের দামী জীবন দেখেই। গাড়ী, বাড়ী, রাষ্ট্রীয় সুবিধাদি, ক্ষমতার প্রয়োগ ও চাকর-নওকরের পর্যাপ্ততা এনে দিবে যে জীবন, সে জীবনের রঙ্গের সাথে মিলিয়ে নিজেদের সন্তানের ভবিষ্যৎ আশা করে।
বর্তমান যুগে ডাক্তারেরা প্রায় সচ্ছল ও সুবিধাজনক জীবন যাপন করতে পারে। তারপরে আসে প্রকৌশলীদের কথা। ভাল চাকুরী কিংবা অঢেল আয়ের সুবিধা এখানেও কম নয়। ক্ষমতার প্রয়োগ, সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিসিএস ক্যাডারদের অবস্থান ঈর্ষণীয়। সরকারী প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হতে পারাও এখন সৌভাগ্যের ব্যাপার। বলতে গেলে এই ক্ষেত্রে পুরো জাতি এখন দৌড়ের উপর আছে। বর্তমান সময়ের পিতা-মাতা তাদের সন্তানদের জন্য উল্লেখিত সকল পদের মধ্যে ঢেলে সাজাতে চায়।
আজকের চেয়ে একশত বছর আগে অভিভাবকেরা কল্পনার চোখে একজন ব্যরীষ্টার কিংবা আইনজীবী সন্তানের ছবি আঁকতেন। ফজলুল হক, সহরোওয়ার্দী, জিন্নাহ, নেহেরু, গান্ধি সহ বহু খ্যাতিমান মানুষের দৃষ্টান্ত দেওয়া যাবে। যারা আইন পেশায় সেরা হয়েছিলেন এবং দেশ কাঁপিয়েছেন। তদানীন্তন সমাজে একজন আইনজীবীর সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশী ছিল।
আরো আগে গেলে যোদ্ধা, বীর, বাহাদুর, তীরন্দাজ সহ নানাবিধ যোগ্যতার মানুষকে পিতা-মাতা আদর্শ মনে করতেন। বীরত্বপূর্ণ সন্তানের মা হবেন এই আশায় নিজ সন্তানকে ছোট কাল থেকেই কষ্ট দিয়ে মানুষ করতেন! অপ্রয়োজনে সন্তানকে মারতেন! আরবের ইতিহাসে যুদ্ধ-বিগ্রহ সর্বদা লেগে থাকত। তাই রাসূলের (সা) এর অন্যতম সেরা সাহাবী জোবায়ের ইবনে আওয়াম কে তাঁর মা ও দাদী শিশুকালে কষ্টকর কাজ করাতেন, মাংসপেশি শক্ত ও সহ্য ক্ষমতা বাড়ার জন্য অমূলক মারতেন। যাতে করে বড় হয়ে বিপদের দিনে পুরো গোত্রের নেতৃত্ব দিতে পারে। পরবর্তীতে তিনি তা পেরেছেনও। কেমন সন্তান চাই এই প্রশ্নের উত্তর, যুগের চাহিদার সাথে সাথে পরিবর্তন হয়ে যায়।
উল্লেখ্য উপরের সমূদয় গুনগুলো যে কোন মানুষ চেষ্টা করলে অর্জন করতে পারে। এটা প্রচেষ্টার সাথে সম্পর্কিত এবং দুনিয়াবি জীবনে ক্ষুন্নিবৃত্তি মেটানোর জন্য যথেষ্ট কাজ দেয়। কিন্তু এই বিদ্যাগুলো কখনও মানব সন্তানকে মানুষ হিসেবে তৈরি করেনা। মানুষের আরো কিছু যোগ্যতা আছে, যেগুলো সে জন্মগত ভাবে আল্লাহর পক্ষ হতে নিয়ে আসে। যে সব যোগ্যতার কথা পিতা-মাতা কোনদিন বিশ্লেষণ করেনা, প্রয়োজনও মনে করেনা। কিন্তু মানব সন্তানের মানুষ হবার জন্য এ সব যোগ্যতা অনেক ঘাটতি পূরণ করে।
আচ্ছা! কোন পিতা-মাতা কি কখনও বলে, আমার সন্তান হবে দার্শনিক, কবি কিংবা সাহিত্যিক? এমনটি কেউ চায়না! এই চাওয়ার মাঝে অর্থকড়ির জোগান নাই আবার কেননা ইচ্ছে করলেই কেউ কবি, দার্শনিক হতেও পারে না। মানব সন্তান জন্মের সাথেই কিছু মৌলিক বৈশিষ্ট্য নিয়েই দুনিয়াতে আসে। সে সব বৈশিষ্ট্যগুলো কি হতে পারে সেটা পিতা-মাতাই বিশ্লেষণ করতে পারে। কিছু শিশু দয়ালু, কিছু হিংসুক থাকে; সেভাবে কঠোর, রুষ্ট, মেজাজি আবার হাসি খুশীর সন্তান থাকে। এসব তাদের মৌলিক গুন। এই গুনের বিকাশ যথাযথ না হলে পরবর্তীতে লিখা পড়া শিখে সন্তান মস্ত-বড় কি হয়ে উঠল, তাতে কিছুই আসে যায় না। যে শিশুটি ছোটকালে বড় ভাই থেকে কেড়ে খায়, ছোট বোনকে দিতে হিংসা করে, পরিণত বয়সে সে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যরীষ্টার হলেও পিতা-মাতার জন্য কোন উপকারী সন্তান হবে না। তবে সন্তানদের এই চরিত্র অবশ্যই পরিবর্তন যোগ্য। যে পদ্ধতিতে এটা পরিবর্তন করতে হয় সেটার নামই প্রকৃত শিক্ষা।
আমরা কেমন সন্তান চাই? তার ধারণা আল্লাহ পবিত্র কোরআনে সুন্দর ভাবে শিখিয়ে দিয়েছেন। তিনি শিখিয়ে দিয়েছেন যে, ‘হে আল্লাহ আমাদেরকে নয়ন জুড়ানো সন্তান দান করুন এবং তাকে আল্লাহ ভীরু মানুষদের নেতা বানিয়ে দিন’।
মূলত মানব জীবনে আখাঙ্কিত সন্তানের এটাই একমাত্র মানদণ্ড। সন্তান দেশের কি পদ অলঙ্কৃত করল তাতে কোন প্রশ্ন আসার সুযোগ থাকেনা যদি সন্তান হয় পিতা মাতার নয়ন জুড়ানো তুল্য। সেটাই শ্রেষ্ঠ সন্তান। অনেক পিতা-মাতার জন্য উচ্চ শিক্ষিত সন্তান উপকারে না আসার চেয়ে অশিক্ষিত উপকারী সন্তান অনেক কল্যাণকর। যথাযথ পদ্ধতিতে সন্তান শিক্ষিত হলে, পিতা-মাতা বটেই পুরো সমাজ ও জাতি উপকৃত হবে। সে শিক্ষাটির নাম হল মৌলিক শিক্ষা।

Discussion about this post