মানব জীবনে উদাসীনতা একটি অতীব খারাপ স্বভাব। উদাসীন ব্যক্তি না নিজের গুরুত্ব বুঝে না অন্যকে মূল্যায়ন করতে জানে। উদাসীনতাকে আরবিতে বলা হয় ‘গাফেল’। পবিত্র কোরআনে গাফেল প্রকৃতির লোক নিয়ে অগণিত কথা রয়েছে। পৃথিবীতে যত আসমানি কিতাব এসেছে, যত নবী এসেছে, তাদের সকলের লক্ষ্যই ছিল গাফেল মানুষ। তাহলে বুঝাই যায় এটা কত মারাত্মক ক্ষতিকর স্বভাব। ব্যক্তিজীবনে উদাসীনতার চরম কুফল
উদাসীনতার অর্থই হল, অনুপ্রেরণা আর উৎসাহের অভাব। এ দুটি উপাদান মানুষের শান্তি ও শক্তিকে ক্ষয় করে। উদাসীনতা মানেই অলসতা ও নিষ্ক্রিয়তা। যা মানুষের একগুঁয়েমি বৃদ্ধি ও আকাঙ্ক্ষাকে হ্রাস করে। পরিশেষে মানুষকে হতাশা আর উদ্বেগের মধ্যে নিমজ্জিত রাখে। উদাসীন মানুষ উপকার স্বীকার করতে জানেনা। কিংবা উপকার স্বীকার করার গরজও বোধ করেনা। ফলে এরা সহজেই উপেক্ষার পাত্রে পরিণত হয়। তাদের বিপদ-আপদে যেমন অন্যরা দৌড়ে আসেনা; তার একগুঁয়ে স্বভাবের কারণেও কারো কাছে সে সমাদৃত হয়না। উদাসীনতার স্বভাব, মানব জীবনে এমন নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে, যদ্বারা মানুষ কৃতজ্ঞতা ও বদান্যতার চরিত্র হারিয়ে ফেলে। উদাসীনতা দুনিয়াবি জীবনেও যেমন সর্বনাশী, আধ্যাত্মিকতার মধ্যেও ততোধিক ক্ষতিকর। এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে কঠোর ভাষায় ধমক দিয়েছেন। তিনি বলেছেন
“আর আমি জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি জিন ও মানুষ। তাদের অন্তর রয়েছে, তবে তা দ্বারা বিবেচনা করে না; তাদের চোখ রয়েছে, তা দ্বারা দেখে না; আর তাদের কান রয়েছে, তা দ্বারা শোনে না। তারা চতুষ্পদ জন্তুর মতো; বরং তাদের চেয়েও নিকৃষ্টতর। তারাই হলো গাফেল, শৈথিল্য-পরায়ণ।“ (সুরা আরাফ : ১৭৯)
পবিত্র কোরআনের এই ঘোষণা থেকেই বুঝা যায়, মানুষের জীবনে উদাসীনতার স্বভাব কত মারাত্মক হতে পারে। আল্লাহ উদাসীন মানুষকে ইতর প্রাণীর চেয়েও ঘৃণিত বলেছেন। কেননা তাদের উপলব্ধি বোধ নেই। তারা তাদের মন-মগজকে কাজে লাগায় না। যার কাছে উপলব্ধি বোধ থাকেনা তাকেই চরম অজ্ঞ ও মূর্খ বলা হয়। এমন ব্যক্তিদের কেউ জ্ঞান দান করতে পারে না। ওরা নিজেরাই মূর্খ থাকার জন্য গোঁ-ধরে বসে থাকে। সকল প্রাণীদের কাছে মুখ, কান, চোখ আছে। তারা সেটাকে তাদের সাধ্যমত কাজে লাগায়। কিন্তু মানুষের দেহায়বে থাকা তেমন মুখ, কান, চোখ থাকলেও তারা ইতর প্রাণীর চেয়ে অধম। এসব যন্ত্রপাতি তারা কোন কাজে লাগায় না। ফলে আসমানি কিতাবের মূল্যবান কথা, তাদের কানে ঢোলের আওয়াজের মত আঘাত করলেও; তারা সতর্ক হবে! কৃতজ্ঞতা জানাবে? এসব দূরের কথা! বরং ওরা ওখানেও প্রাণহীন, নির্জীবের মত আচরণ করে। এরা পৃথিবীর জন্য একেবারেই বেদরকারি প্রাণী হিসেবে বিবেচিত হয়। তাইতো তাদেরকে দিয়ে জাহান্নাম ভরিয়ে তোলার ঘোষণা করা হয়েছে।
উদাসীন মানুষ কারো উপকারে আসেনা এমনকি নিজের প্রয়োজনেও না। সে অন্যের দুঃখে সমব্যথী হয়না। কারো মৃত্যু সংবাদে তার হৃদয়ে ভাবান্তর সৃষ্টি হয় না। কারো দুঃখ-বিপদে দৌড়ে এগিয়ে যাবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করে না। আবার নিজে কখনও কষ্টের মধ্যে পড়লে, প্রবাদ কথা উড়ায়। “কোথায় মানবতা! যা বইয়ে পড়েছিলাম! কোথায় সে মানব-দরদীরা? যারা ফেসবুকে পোষ্ট দিয়ে বেড়ায়!”।
উদাসীন মানুষ অন্যের সুখেও সুখানুভূতি প্রকাশ করেনা। পরিচিত বন্ধুদের কারো বিরাট সাফল্যের সংবাদকে খুবই হালকা ভাবে নেয়। প্রতিক্রিয়ায় প্রাণ থাকে না বরং উপেক্ষার ভাব ফুটে তুলে বলবে, “ও তাই”! একই ভাবে নিজের কৃতিত্বে কেউ অংশগ্রহণ না করলে, তাকে তুলোধোনা করবে। ফেসবুকের পোষ্টে নিজ বন্ধু ও আত্মীয়দের সমালোচনায় পঞ্চমুখ হয়ে উটে। চলমান ডিজিটাল যুগে এমন মানুষের সংখ্যা বাড়ছে গাণিতিক হারে। অনলাইনের আসক্তি পুরো জাতিকে জীবন্মৃত করে তুলেছে। তারা যেন এক বোধশোধ বিহীন এক সম্প্রদায়।


Discussion about this post