রেশমি সুতার পুরু রঙ্গিন সুতলি বেঁধে আমরা তরুণদের রাস্তায় চলতে দেখি। অনেক বাবা-মা অন্যদের দেখাদেখি বাজার থেকে কিনেও দেন। এটাকে রাখি বন্ধন বলা হয়। রাখি বন্ধনের অর্থ বন্ধুত্বের বন্ধন। ভারতের কোথাও এটাকে ‘মঙ্গল সূত্রও’ বলা হয়। হিন্দু সমাজে রাখি বন্ধনের কয়েকটি মত রয়েছে, সবগুলোই তাদের ধর্ম, কৃষ্টি, সংস্কৃতির সাথে জড়িত। হাল আমলে ইংরেজি প্রীতির কারণে রাখি বন্ধনকে ইংরেজিতে অনুবাদ করে বলা হয় ‘Friendship Day’. ভারতীয় সিরিয়াল, নাটক এবং ছবিতে কোন না কোন ভাবেই রাখি বন্ধনের একটি ঘটনা চাতুর্যতার সাথে উপস্থাপন করা হয়!
ইংরেজির এই কথাটির বাহ্যিক অর্থ সুন্দর হবার কারণে ইতিহাস ও ধর্মজ্ঞানে অজ্ঞ, কৃষ্টি ও সংস্কৃতিতে ধারনা-হীন তরুণ সমাজ নিজের পিতার পকেটের টাকা দিয়ে; বাজার থেকে একটি সুতা কিনে অন্যের ধর্ম ও কৃষ্টি চর্চার কাজটি আন্তরিকতা ও গৌরবের সাথে করে আসছে দীর্ঘ দিন ধরেই। বর্তমানে মুসলমান ছেলেরা নির্দ্বিধায় এই সুতা ব্যবহার করছে। অনেকেই রোজার দিনে রোখা রেখে মসজিদে যাচ্ছে। বিয়েতে গায়ে হলুদের দিন এখন নিত্য ব্যবহার্য আইটেমে পরিণত হয়েছে ভগবান শ্রী কৃষ্ণের এই নিদর্শন! কোন শিশু সন্তানের হাতে এই সূতা দেখলেই বুঝা যায় তাদের পরিবার ইতোমধ্যে হিন্দুয়ানী রীতিতে বুঁদ হয়েছে।
যাক, ‘রাখি বন্ধন’ তথা ‘মঙ্গল সূত্র’ তথা ‘Friendship Day’ সংক্ষিপ্ত কাহিনীটি জেনে নেই। রাখি বন্ধনের তিনটি কাহিনী নীচে লিখা হল; আর ঈমান বাঁচানোর দায়িত্বটা পাঠকদের নিজের।
১. ভগবান শ্রীকৃষ্ণ যুদ্ধে আঘাত প্রাপ্ত হয়ে তাঁর কব্জি কেটে ফেলেন। তাঁর আপন ছোট বোন সুভদ্রা হন্তদন্ত হয়ে ছুটেও রক্ত বন্ধ করার মত কাপড় পাচ্ছিলেন না। পাণ্ডবের স্ত্রী ‘দ্রৌপদি’ তাঁর রেশমি শাড়ীর আঁচল ছিঁড়ে কৃষ্ণের কব্জি বেঁধে দেন। প্রগাঢ় বন্ধুত্ব কখনও আপনজনের ইচ্ছাকে হার মানায়; আবার পরও আপন হতে পারে। এটাই সেই রাখি বন্ধনের মূল কাহিনী। তারই নিদর্শন হিসেবে, প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমার দিনটিকে রাখি বন্ধন তথা ‘Friendship Day’ হিসেবে পালন করা হয়।
২. বিঞ্চু দৈত্যরাজ বলির দেশ রক্ষা করতে গিয়ে সংসার ত্যাগ করে নিরুদ্দেশ হন। তাঁর স্ত্রী লক্ষ্মী সাধারণ নারীর বেশে বলির রাজ্যে গিয়ে আশ্রয় নেন। শ্রাবণ পূর্ণিমার দিনে লক্ষ্মী বলিকে ভাই বরে তার হাতে সূতা পরিয়ে দেন। বলি খুশী হয়ে কারণ জানতে চাইলে; লক্ষ্মী স্বামীর নিরুদ্দেশ হবার কাহিনী সবিস্তারে বলে, তাকে নিজ দেশে ফিরিয়ে আনেন। (উল্লেখ্য শ্রাবণ মাসের জন্ম হয়েছে সম্রাট আকবরের আমল থেকে)
৩. ১৯০৫ সালে সালে বঙ্গভঙ্গ ঘোষণা হলে বঙ্গীয় মুসলমানেরা স্বাধীনতা ও স্বাতন্ত্রতার কিঞ্চিত আলো দেখতে পায়। পশ্চিম বাংলার হিন্দুরা এর বিরুদ্ধে ক্ষেপে উঠে। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে একটি সংঘ প্রতিষ্ঠিত এবং হয় দুই পক্ষকে একটি বৃন্তের মাঝে আটকে রাখতে ১৯০৫ সালের ১৬ই অক্টোবর তথা ৩০শে আশ্বিন ‘বন্দে মাতরম’ ধ্বনির মাধ্যমে রাখি বন্ধনের আহবান করেন। তিনি বহু কবিতা লিখে এর পক্ষে প্রচারণা চালান। পরবর্তীতে এই সংঘ-শক্তি নিজেরাই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মূল হোতা পড়েন।
উপরের তিনটি কারণের সাথে মুসলিম, খ্রিষ্টান সহ কোন ধর্মের সংশ্রব নাই। মানুষ না জেনে এই রাখি বন্ধনকে সামাজিক অনেক অনুষ্ঠানের অংশ বানিয়ে নিচ্ছেন। যদি সচেতন না হোন, তাহলে বেশী দূরে নয় যেদিন ঈদ, মোহররমের দিনেও রাখি বন্ধনের নিয়ম চালু হয়ে যাবে।
রাসুল (সাঃ) বলেছেন, ‘কেয়ামতের আগে তোমরা তাদের কে হাতে হাতে, বিঘতে বিঘতে অনুসরণ করবে। তারা যদি গুই সাপের গর্তে ঢুকে বসে থাকে, তোমরাও তাই করবে’।


Discussion about this post