ওজনে কম দিলে, তার দ্বিগুণ গোশত কেটে নেওয়া হত শরীর থেকে। এই ধরনের কঠোর শাসন ছিল খিলজী আমলে। ফলে তার ভূখণ্ডে মানুষেরা সিদে হয়ে গিয়েছিল। শুনতে নিষ্ঠুর মনে হলেও পরে বুঝেছিলাম, কখনও নিষ্ঠুর আইন কেন বলবৎ করতে হয়।
ষষ্ট শ্রেণীতে পড়া অবস্থায়, মা আমাকে দুই সের গোশত আনার জন্য টাকা দিয়েছিল। আগে থেকেই জানতাম ওসব কসাই ওজনে কম দেয়, তাই আমি চোখ জোড়া খুব সতর্ক রেখেছিলাম, যাতে করে না ঠকাতে পারে। বারংবার ওজন কম না দেওয়ার তাগাদা দেয়াতে তিনি সবার সামনে পাল্লা উঁচিয়ে দেখালেন যে, দুই সেরের চেয়ে বেশী দিয়েছেন।
আরো দেখুন…
- রাষ্ট্রীয় সম্পদ মেরে ধনী হবার পরিণতি
- যে মুল্লুকে মানুষ খুন কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিলনা
- সিলগালার প্রচলন ও আমিরে মুয়াবিয়া (রাঃ) অবদান
ঘরে আসার পর মা পাল্লা দিয়ে মেপে দেখালেন, দেড় সের গোশত কিনে দুই সেরের টাকা দিয়ে এসেছি। চোখ ফেটে কান্না আসতে চাইল। কিশোর মনে প্রবল গোস্বা এসেছিল মনে। নিয়ত করেছিলাম বড় হলে এর শোধ নিব। একদা বাজারে সেই ব্যক্তিকে লাটি হাতে ভিক্ষা করতে দেখে, মনের দুঃখ মিটেছিল।
ওজনে কম দিয়ে সন্তান প্রতিপালন
মূলত, ওজনে কম দেওয়া একটি জঘন্যতম নৈতিক অপরাধ। ওজনে কম দিয়ে কেউ কখনও সম্পদশালী হতে পারে না। বরং ক্রেতাকে কম দিয়ে, অতিরিক্ত যা নিজের কাছে রেখে দেওয়া হয়, সে সব অতিরিক্ত জিনিষ দিয়ে পরিবার পরিজনকে খাওয়ালে কিংবা ব্যক্তিগত কাজে লাগালে, পরিবারের এই সদস্যদের হাতেই একদিন চরম অপদস্থ হতে হয়, আখেরাতে তারা সেই ব্যক্তিকে অপরাধী বানাবে।
দিনে দিনে ক্ষুদ্র কিংবা বড় ব্যবসায়ীরা এসব কাজে জড়িয়ে পড়লে, পুরো জাতির ঘাড়ে দুর্ভাগ্য নেমে আসে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙ্গে পড়ে এবং জন অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। পুরো জাতি অসৎ প্রবণতায় জড়িয়ে পড়ে। ওজনে কম দেওয়া জিনিষটি হয়ত সাধারণের দৃষ্টিতে খুবই তুচ্ছ মনে হতে পারে কিন্তু পবিত্র কোরআনে এটাকে বিপর্যয় সৃষ্টিকারী চরিত্র বলে ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেন,
“কাজেই ওজন ও পরিমাপ পুরাপুরি দাও, লোকদের পাওনা জিনিস কম করে দিয়ো না এবং পৃথিবী পরিশুদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর তার মধ্যে আর বিপর্যয় সৃষ্টি করো না এরই মধ্যে রয়েছে তোমাদের কল্যাণ, যদি তোমরা যথার্থ মুমিন হয়ে থাকো” আরাফ-৮৫
এই কথাগুলো মাদইয়ান বাসীকে লক্ষ্য করে আল্লাহ বলেছিলেন। কিন্তু তারা এই কাজ থেকে ফিরে নি। তাই আল্লাহ তাদের উপর গজব দিয়ে পুরো জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। কোরআনে কথাটি উদ্ধৃতি দিয়ে বুঝিয়েছে, এখন কেউ করলে পরিণতি তাদের মতই হবে।
আমাদের দেশে ওজনে কম দেবার প্রবণতা
আজকে বাংলাদেশে পুরো জাতিই ওজনে কম দেবার জন্য তাড়াহুড়ো করে। যারা সরকারী বস্তা পাহারা দেবার দায়িত্বে, তারাও নিজ উদ্যোগে বস্তার ওজন কমাতে থাকে। শুধু তাই নয় সেখানে ভেজাল মিশিয়ে ভাল খাদ্যকেও বিষাক্ত করে।
ওজনে কম দেওয়া এখন জাতিগত ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এভাবে চুরি করে, শঠতা করে বাড়ি বানিয়ে, গাড়ি কিনে চক্ষু-লজ্জার মাথা খেয়ে, জনগণের নেতা সেজে, মানুষকে উপদেশ দেয়। এভাবে চুরি করে ধনী হওয়াটা আমাদের সমাজে এখন মোটেও লজ্জার কথা নয়।
এই কাজে গরীব, অসহায়, ভদ্র ও সম্ভ্রান্ত মানুষগুলো প্রতিনিয়ত ঠকে। তাদের কথা শোনার কেউ থাকেনা। তারা ঝগড়া করে স্বার্থ হাসিলও করতে পারে না। কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে এক সময় আল্লাহ, সে জাতিকে ভয়ানক ভাবে পাকড়াও করে। হাদিস শরীফে আমরা তার ভাষ্য পাই। হাদিসে বলা হয়েছে,
“যে জাতি ওজনে কম দেবে, সে জাতিই দুর্ভিক্ষ, কঠিন খাদ্য-সংকট এবং শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচারের শিকার হবে।” ইবনে মাজাহ-৪০১৯
ওজনে কম দেওয়াটা ব্যক্তি কেন্দ্রিক দোষ। এটিই একমাত্র ব্যক্তিগত পর্যায়ের বদগুণ, যা প্রচারণা ব্যতীত, সকল ব্যবসায়ীর চরিত্রে ভাইরাসের মত ছড়িয়ে পড়ে। শয়তান শঠ ও প্রতারক ব্যবসায়ীদের কাছে এই কাজটিকে খুব লোভনীয় ভাবে তুলে ধরে।
ওজনে কম, খাদ্যে ভেজাল সংক্রান্ত কাজে সরকারী ব্যবস্থাপনা দুর্বল হলে, পুরো জাতি বিপর্যয়ের শিকারে পরিণত হয়। যা বর্তমানে আমরা আমাদের দেশে প্রতিনিয়ত দেখে যাচ্ছি।
ওজনে কম ও দিল্লীর শাসন
মধ্যযুগদের সুলতানি আমলেও সুলতান-গন এই সমস্যায় ভুগত। বাদশাহদের জন্য রাজ্য জয় করা যত সহজ হত, বাজার নিয়ন্ত্রণ করা ততোধিক কঠিন ছিল। ঐতিহাসিক জিয়াউদ্দিন বারানী (১২৮৫-১৩৫৮) তারিখে ফিরোজ-শাহী গ্রন্থে বলেছেন,
“ভিতরের জঙ্গল পরিষ্কার করা ও বাজারী-দিগকে অনুগত করা অপেক্ষা বাহিরের জঙ্গল পরিষ্কার ও দূরবর্তী অবাধ্য-দিগকে বাধ্য করা অনেক সহজ”। পৃ: ২৬২ (লেখক জঙ্গল বলতে বিদ্রোহী, আভ্যন্তরীণ শত্রুকে বুঝিয়েছেন)
লেখক আরো বলেছেন, “বাজারের নিয়ন্ত্রণকারী লোকেরা সাধারণত নির্লজ্জ, বেপরোয়া, মিথ্যুক, মূর্খ ও নীচ প্রকৃতির হত”। মূলত এ ধরণের ব্যক্তিবর্গ আমাদের বর্তমান সমাজেও দেখা যায়। তাদের কব্জাতেই দেশের বাজার ব্যবস্থার চাবিকাঠি।
সুলতান আলাউদ্দিন মুহম্মদ শাহ খিলজীর শাসনামলে (১২৯৬-১৩১৬) বাজার ব্যবস্থার উপর কঠোর ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত কার্যকর করেন। ফলে তার শাসনামলে রাজ্যের কোথাও ফরিয়াদের দুই নম্বরি করার সুযোগ ছিলনা। তিনি ছিলেন অশিক্ষিত ব্যক্তি কিন্তু পুরো শাসনামলে পণ্য সাপ্লাই ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে এমন ভূমিকা রাখেন যা তার সময়কে ইতিহাসে স্মরণীয় করে রাখে। উচ্চ মানের খাদ্য সামগ্রী তো বটেই, নিত্য ব্যবহার্য সুই, সুতা, দা, বটির মূল্য পর্যন্ত সরকারী নজরদারীতে থাকত। দেশের জ্ঞানী মানুষ থেকে বুদ্ধি নিয়েই এসব কার্যকর করেছিলেন। এসব বুদ্ধি গুলো ছিল অদ্ভুত ও শাসনে ছিল কঠোর।
আলাউদ্দিন খিলজী বাজার নিয়ন্ত্রণে অভিজ্ঞ, কঠোর, কৃপণ ও নির্দয় প্রকৃতির একজন সর্দারের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেন। একজনকে পেয়েও যান, তার নাম ‘ইয়াকুব নাজির’। প্রথমেই শুরু করলেন ওজনে কম-দাতারের বিরুদ্ধে অভিযান। ব্যাপারটি অত সোজা ছিলনা। পুরো দেশই শঠ ব্যবসায়ীতে ঠাসা, আবার তারা সরকারের বিভিন্ন পদের কর্মকর্তাদের, মোটা দাগে মাসেহারা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখেন।
তাই তিনি ঘোষণা দিলেন ওজন যত কম দেওয়া হবে, তার দ্বিগুণ পরিমাণ গোশত দেহ থেকে কেটে রাখা হবে। কয়েক জনের দেহ থেকে গোশত কাটার দরুন সারা মুল্লুকে দুই নম্বরি ব্যবসায়ীদের বুক কেপে উঠে। বাজার নিয়ন্ত্রণে আসে। তারপরও কিছু ঘাটতি থেকে যায়। অল্পবয়স্ক ও অনভিজ্ঞ মানুষদের সাথে প্রতারণা চলতে থাকে। এই সমস্যা মিটিয়েও সরকার শতভাগ পরিপূর্ণ সফলতা চায়।
আলাউদ্দিন খিলজী নিজেই এক বুদ্ধি বের করেন। তিনি সরকারী কোষাগারের টাকা ধরিয়ে দিয়ে নির্ধারিত কিছু কিশোরদের বাজারে পাঠাতেন। তারা বাজার করে আনার পর দেখা যেত, সেখানে যথারীতি ওজনে কম। এসব ব্যবসায়ীদের বাছাই করে যখন শরীরের গোশত কাটা শুরু হল, তখন পুরো জাতিই ভদ্র হয়ে গেল। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল, ব্যবসায়ীরা গায়ে পড়েই ক্রেতাকে সর্বদা ওজনে বাড়িয়ে দিতেন। (তথ্য সুত্র তারিখে ফিরোজশাহী-২৬৩)।
তিনি শুধু ক্রেতা স্বার্থ দেখতেন এমন নয়, বিক্রেতাদের স্বার্থও শতভাগ দেখতেন। ফলে তার শাসনামলে, দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবার পরও, কোন জিনিষের দাম বাড়েনি। এই পলিসির কারণেই একজন অশিক্ষিত শাসক হয়েও তিনি জনপ্রিয় হয়ে উঠেন।
ইতিহাসে এ ধরনের শাসনের ফলে, এর প্রভাব সুদূর দিল্লী থেকে আজকের বাংলা পর্যন্ত প্রভাব পড়েছিল। আজকে আমরা পুরো জাতি খোদায়ী গজবে হাবুডুবু খাচ্ছি। এ সবই আমাদের হাতের কামাই। দেশের এই ভয়ানক অবস্থা পরিবর্তন করতে হলে একজন সৎ, নির্ভীক, কঠোর শাসকের দরকার। নতুবা চূড়ান্ত ধ্বংসের জন্য অপেক্ষা করা ব্যতীত কোন গত্যন্তর নেই।


Discussion about this post