ঝগড়া মানবজীবনের এমন এক দক্ষতা যা কোনদিন শিখতে হয়না। তাই ঝগড়া করেনা কিংবা অনর্থক ঝগড়ায় জড়ায় নি এমন মানুষ দুনিয়াতে খুবই অপ্রতুল। তবে নবী-রাসুল গনের জীবনে কখনও ঝগড়ার ঘটনা পাওয়া যায়নি। কেননা যে কারণে মানুষ ঝগড়ায় মেতে উঠে, সে কারণটাই মিটিয়ে দিতে নবী-রাসুল গন দুনিয়াতে আসেন। ঝগড়া ঝাটির লাভ ক্ষতি
ঝগড়ার মঙ্গল-অমঙ্গল
ঝগড়ার মাধ্যমে মানুষ কোন মঙ্গল বয়ে আনতে পারেনা। এটাতে শুধু অকল্যাণ আর ক্ষতিই লুকিয়ে থাকে। ঝগড়াটে মানুষের সাথে কারো বন্ধুত্ব স্থায়ী হয়না। তাদের সাথে কেউ আত্মীয়তা করতে চায় না। পারত পক্ষে তাদের এড়িয়ে চলতে চায়। এদের কোন সম্ভ্রম-সম্মান থাকে না। এরা সম্মানী আর অসম্মানী মানুষ তফাত করতে পারেনা। স্বার্থে ঘা লাগা মাত্রই ঝগড়ায় মেতে উঠে। ” মূলত মানুষ কেউ কাউকে অপমানিত করতে পারেনা, মানুষ নিজেই অপমানিত হবার কারণগুলো যোগাড় করে ইচ্ছে করে কিংবা নির্বুদ্ধিতার কারণে “। ঝগড়া শুধু নিজের অকল্যাণ ডেকে আনে না। পরিবেশ ও সমাজের অকল্যাণও বয়ে আনে।
আরো পড়ুন…
- মানুষ কেন গালি দেয়
- সুখী হতে গিয়ে, যেখানে ভুল হয়
- ওয়ায়েজিনদের বয়স কেমন হওয়া উচিত
নিচের উদাহরণটি থেকে বুঝা যাবে, ঝগড়াঝাটি কত বাজে জিনিষ এবং যারা করে তারাও কত নিচু প্রকৃতির মানুষ হতে পারে। মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে পবিত্র সম্মানী রাতটির নাম লাইলাতুল কদর। যার প্রকৃত তারিখ সম্পর্কে কেউ জানেনা। এক সময় এটার সুনির্দিষ্ট তারিখ কিংবা সময় রাসুল (সাঃ) জানতেন কিন্তু অন্য মানুষের ঝগড়ার কারণেই আল্লাহ সেটা রাসুলের জ্ঞান থেকে তুলে নিয়েছেন। হাদিস থেকেই ঘটনাটি শোনা যাক,
ঝগড়ায় যে ক্ষতি হল
“রাসুল (সাঃ) লাইলাতুল কদর সম্বন্ধে মানুষকে অবহিত করার জন্য বেরুলেন। পথিমধ্যে দু’জন মুসলমান ঝগড়ায় লিপ্ত হলেন। (মুসলমানের ঝগড়ায় নবী চিন্তায় পড়েন) এর কারণে তার ইলম তথা জ্ঞান থেকে সে তথ্য তুলে নেওয়া হয়েছে”। বোখারী-৬০৪৯। এর দ্বারা বুঝা যায় এটা একটি সামাজিক ব্যাধিও বটে। এর মাধ্যমে প্রতিবেশী ও আশেপাশের মানুষ অশান্তিতে থাকে। ঝগড়া ঝাটির লাভ ক্ষতি
কোথাও ঝগড়া বিবাদ লেগে গেলে, কিছু মানুষ তামাশা দেখার জন্য সেখানে হাজির হয়। তাদের অনেকেই আবার ঘটনার সাক্ষী সাজে, কেউ ঘটনাকে আরো উসকিয়ে দেন। কেউ ঝগড়ার বিষয়ের উপর মনোনিবেশ করেন। কেননা, ঝগড়ার সময় মানুষের নিজের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে থাকেনা। সেই পরিবেশ তখন শয়তান দখল করে। ঝগড়ায় প্রতিপক্ষ একে অপরের উপরের কড়া গলায় কথা বলতে থাকে এবং নিজেদের গোপন কথাগুলো ফাঁস করে দেয়। এভাবে গোপন কথাগুলো, উপস্থিত মানুষকে সাক্ষী বানিয়ে, অনুপস্থিত মানুষের কানে পৌঁছে দেয়। দুর্মতি মানুষের জন্য এটা একটা বিরাট সুযোগ। শুধু তাই নয়, কোন ব্যক্তি যদি কখনও কোন ভাল কাজ করে থাকে। কাউকে সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে থাকে। শয়তান সে সব কথা তখন মনে করিয়ে দিতে থাকে। ফলে ঝগড়াটে মানুষ উন্মাদের মত, ঝগড়ার সময় সে সব উপকারের কথা খোটা-টিপ্পনী মেরে দেখিয়ে দিতে থাকে। এতে করে তাদের দুনিয়াতে অর্জিত সৎ আমলগুলো বরবাদ হয়ে যায়। আখেরাতে এসব ব্যক্তি একেবারে শূন্য অবস্থায় হাশরে হাজির হবে। তাইতো রাসুল (সাঃ) বলেছেন,
“আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে ঘৃণিত, যে ঝগড়াটে”। বোখারী-২৪৫৭
কাছের মানুষের সাথে ঝগড়া
মূলত সকল প্রকারের ঝগড়ার সূত্রপাত হয় ব্যক্তি স্বার্থের কারণে। দূরের মানুষের সাথে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট ব্যাপার খুব কমই থাকে। তাই ওদের সাথে কারো ঝগড়া হয়না। তাদের সাথে সর্বদা ভাল থাকা যায়। ভাই-বোন, বন্ধু-সহকর্মী, চাচা-মামা, আত্মীয়-প্রতিবেশীদের সাথেই অন্তরের সম্পর্কের সাথে সাথে, স্বার্থের সম্পর্কও জড়িয়ে থাকে। তাই ঝগড়া-ঝাটিও তাদের সাথে বেশী হয়ে থাকে। বেশীর ভাগ ঝগড়ার মূল উপাদান থাকে জায়গা-সম্পত্তি সম্পর্কিত। মামলা-মোকদ্দমা, খুনা-খুনি সবই এটাকে ঘিরেই হয়ে থাকে। আর তা ঘটে থাকে একেবারে নিকটাত্মীয়দের সাথে। তাইতো জায়গা সম্পদ বণ্টনের ব্যাপারে ইসলাম বড় কঠোর। এক্ষেত্রে ঝগড়া এড়িয়ে চলার কথা বলা হয়েছে। প্রয়োজনে নিজের থেকে সামান্য ছাড় দিয়ে হলেও। হাদিস শরীফে আছে,
“যদি অন্যায়ভাবে অন্যের এক বিগত জায়গা নিজের দখলে থাকে, তাহলে হাশরের ময়দানে তার গলায় সাত তবক জমিকে গলায় হার বানিয়ে ঝুলিয়ে দেয়া হবে।” বোখারী- ৩১৯৫
ঝগড়া কখনও একপক্ষীয় হয়না। দুই পক্ষের অংশগ্রহণের প্রয়োজন হয়। আমরা কখনও দেখি, বস তার অধীনস্থদের সজোরে বকতে থাকেন। সেখানে উচ্চমাত্রার বাজে শব্দের ব্যবহার থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত বস একাকী অধীনস্থকে শাসন করতে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত এটা বকাবকির পর্যায়ে থাকে এবং যখনই দ্বিতীয় পক্ষ বাজে ভাবে প্রতি উত্তর দিয়ে উঠে, তখনই সেটা ঝগড়া হয়ে যায়। এভাবে এক পক্ষীয় বকা শুনে ধৈর্য ধরে অফিসের কাজ করাটা কঠিন কাজ হলেও, পৃথিবীতে বহু মানুষ এভাবে সহ্য করে, ধৈর্য ধরে কাজ করে যাচ্ছে। এভাবেই মানিয়ে নিয়ে দুনিয়ার অফিস আদালত চলছে। কিন্তু স্বভাবে ঝগড়াটে মানুষগুলো এসব পরিস্থিতিতে নিজেকে ধৈর্যের মধ্যে আটকিয়ে রাখতে পারে না। কথার উত্তর দিয়ে ফেলে, যে বসের মুখে কথার উত্তর দেয়, তার চাকুরী থাকেনা, কষ্টে পড়ে। তাই আমরা বহু মানুষকে বারে বারে চাকুরী হারাতে দেখি। কেউ চাকুরীতে প্রমোশন পায়না। তার পিছনে কাজ করে মানুষের এই চরিত্র।
পরিবারে ঝগড়া
স্বামী-স্ত্রীর ঝগড়া হল সবচেয়ে বেশী বিপর্যয় কর। শয়তান প্রতিদিন তার কাজের খতিয়ান তাদের সর্দারের কাছে উপস্থাপন করে। যে শয়তান দাবী করে যে, সে তার দায়িত্বে থাকা পরিবারের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া বাধিয়ে দিয়েছে। শয়তান প্রধান খুশী হয়ে তাকে সম্ভাষণ জানায়। ঝগড়ার অন্যতম উপাদান উচ্চবাচ্যে কথা বলা। তাই এটা স্বামী-স্ত্রী রাগা-রাগিতেও হয়ে থাকে। উভয়েই গলার স্বর অতিক্রমের চেষ্টা করে। কেন এমন হয়? কারণ তাদের মন ও হৃদয়ের দূরত্ব বেড়ে চলেছে। দূরত্ব যত বাড়ছে, গলার স্বরও তত বড় হচ্ছে। শারীরিক ভাবে দুজন কাছে থাকলেও, মনের মধ্যে তাদের অবস্থান বহু শত মাইল। ফলে এভাবে চিল্লায়ে নিজের কথা পৌছাতে চেষ্টা করে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বহু-ধরনের স্বার্থ জড়িয়ে থাকে। তবে এটা আত্মীয়দের সাথে সম্পদ নিয়ে কাড়াকাড়ি-মারামারির মত নয়। অনেকটা অফিসের সেই বসের মত। একপক্ষ কষ্ট করে চুপ থাকলে এবং কথার পিটে কথা না বললে, বসের মাথা যেভাবে এক সময় ঠাণ্ডা হয়ে যায়, সেভাবে নির্ঘাত স্বামী কিংবা স্ত্রীর মাথাও ঠাণ্ডা হবে। ঝগড়া ঝাটির লাভ ক্ষতি
স্বামী বা স্ত্রী শুধু বকেই যাচ্ছে, একজন সর্বদা বোবার মত চুপ থাকার নীতি অবলম্বন করে। এটাতে ঝগড়াঝাঁটি বন্ধ হয় না। মন দিয়ে কথাগুলো শুনে, কোন এক সুন্দর দিনে, ঠাণ্ডা মাথায় একে অপরকে নিজের সক্ষমতা, অক্ষমতা, নৈতিকতার মানদণ্ডে করনীয় কি বুঝাতে হবে। যখন দেখতে পাবে, ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করা হয়েছে, তাহলে স্বামী-স্ত্রীর রাগ কমে যাবে। যদি বাগাড়ম্বতা বাড়াতেই থাকে, তার জন্য জাহান্নম অবধারিত। রাসুল (সাঃ) বলেছেন,
“জাহান্নামের অধিবাসী হবে, অবাধ্য, ঝগড়াটে আর অহংকারীরা” – বোখারী-৬৬৫৭


Discussion about this post