মানব জীবনে কোরআন হাদিসের প্রভাব অচিন্তনীয়। ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ছাড়াও যদি এগুলোর মর্মার্থ পড়া হয় মানুষের চরিত্রে পরিবর্তন আসে। স্রোতাকে বুঝিয়ে একবার যদি গভীর মনোনিবেশ সহকারে এর বাণী শোনাতে পারে মন বিগলিত হবেই। পবিত্র কোরআন নিজেই দাবী করেছে যে, কোরআন হল ‘শেফা’ তথা রোগ মুক্তির সোপান। এই গ্রন্থ মানুষকে এতটুকু শান্তি ও সান্ত্বনা দেয় যে, দুনিয়াতে যার সবই নিঃশেষ হয়ে যায়, সেও আলহামদুলিল্লাহ বলতে পারে। দুনিয়াতে রাস্তার কাঙ্গাল মানুষ পর্যন্ত পর-কালীন সুসংবাদের কথা শুনে চিল্লায়ে বলতে পারে আল্লাহু আকবর। যে ব্যক্তির মনে মানসিক রোগ থাকেনা, তার দেহও সতেজ থাকে। মানসিক সুস্থ মানুষকে রোগ-শোকে আক্রান্ত করেনা। কোরআন এই কাজটিই মুমিনের জীবনে করে থাকে। এর পক্ষে অগণিত নজির তুলে আনা যাবে। আজকের বিষয় এটা নয়। আরবের মানুষেরা কোরআনের প্রভাব দেখে দিশেহারা হয়ে বলতে থাকত এত এক বিরাট যাদু। এই গ্রন্থের কথা শুনলেও মানুষ মোহাবিষ্ট হয়ে পড়ে। মানুষ সেটাকেই যাদুকরি প্রভাব মনে করত আর মোহাম্মাদ (সা) কে যাদুকর হিসেবে ভৎসনা করত। আবু লাহাব নিজের পকেটের অর্থ খরচ করে সারাদিন মাঠে ময়দানে কোরআনের বিরোধিতা করত। রাতের আধারে প্রতিবেশী রাসুল (সা) ঘরের দেওয়ালে কান পেতে থাকত, কি বলে শুনি। শুনতে গেলে শোনার সময় দীর্ঘ হয়ে যেত। পরে নিয়ত করল নাহ! এভাবে শুনতে থাকলে নিজের অজান্তে সেও এক সময় মোহাবিষ্ট হয়ে যাবে! এই হল কোরআনের আকর্ষণ।
আমাদের দেশের ওয়াজ মাহফিল গুলোর চিত্র খুবই বিচিত্র। কোথাও কিসসা-কাহিনী। কোথাও ওলী-আউলিয়াদের বয়ান, কোথাও গরু-মহিষ জবাইয়ের পালা। খুব কম সংখ্যক মাহফিল হয়, যে গুলোতে সরাসরি কোরআনের তাফসির করা হয়। তাফসিরের সাথে সাথে হাদিস শাস্ত্রের গভীর জ্ঞান থাকা জরুরী। এসব বক্তাকে অনেক অধ্যবসায়ী ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী হতে হয়। সে ব্যক্তি যে চিন্তা মতাদর্শেরই হউক না কেন, যতক্ষণ পর্যন্ত কোরআন-হাদিস কেন্দ্রিক তাদের আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকে, ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের আলোচনা সমাদৃত হয়, গ্রহণযোগ্যতা থাকে। যখনই তাঁরা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণে যায়, তখনই ঘটে বিপত্তি। সঙ্গত কারণেই যে কোন ব্যাখ্যাতেই নিজের চিন্তা-আদর্শের প্রতিফলন ঘটে। এই চিন্তার সাথে কেউ না কেউ দ্বিমত পোষণ করা আবার অনেকেই একাত্ম বোধ করে না।
শুরু হয়ে যায় সমালোচনা। যখন আলেমগন সমালোচনায় অংশ গ্রহণ করে, তখন অনুসারী গন গলাবাজি শুরু করে। উত্তেজিত অনুসারীদের কেউ কেউ আবার গালাগালির পর্যায়েও চলে যায়। একে অপরের ভুল ধরতে গিয়ে গীবত, অপবাদের সীমা অতিক্রম করে ব্যক্তিগত আক্রমণে চলে যায়। অথচ এ সকল আলেমগন আলোকিত হয়েছে কোরআনের কারণে, যে সব মানুষ তাদের সমাবেশে হাজির হয় সেটাও কোরআনের আকর্ষণে। কিন্তু তারা স্বয়ং কোরআনের প্রতি জুলুম করে। নিরেট কোরআন প্রচার বাদ দিয়ে বিচার-বিশ্লেষণে ঢুকে গিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি, জামা ছেঁড়াছেড়ি সবই করে থাকে। একটি নিয়ম হল, সে সব কথা-বার্তায় ফেতনা সৃষ্টি হয়, সেটা উত্তম কথা হলেও, কিছু সময়ের জন্য বন্ধ রাখা।
তাই তিনটি বছর যদি, সকল আলেমেরা শুধু কোরআন ও হাদিস প্রচার করে তাহলে মানুষের মধ্যে চেতনা ফিরে আসবে। মানুষ তো কোরআনের বাণী শুনতে চায়, এটাই তো যথেষ্ট। সারা জাতির বৃহৎ অংশ মাদক, পর্ণ, অশ্লীলতা, বেহায়াপনাতে আকণ্ঠ ঢুবে আছে। এদের কানে কোরআনের বাণী শোনাতে পারলে, তারা প্রভাবিত হবেই। কে তবলীগ, কে জামায়াত, কে আহলে হাদিস আর কে সালাফী এর পিছনে সময় না দিয়ে আমরা সবাই মুসলিম এই মন্ত্রে এগিয়ে গেলে তিনটি বছরই যথেষ্ট, জাতির একটি বৃহৎ অংশকে ঘন অন্ধকার থেকে ফিরানো সম্ভব হবে। আলেম-ওলামাগন একমাত্র, শুধুমাত্র কোরআনের আয়াত প্রচার করলেও যথেষ্ট হবে। কোরআন তো নিজেই দাবী করেছে, একটি আয়াত হলেও তুমি মানুষের কাছে পৌছাও। বাকি কাজ আল্লাহ তার কুদরতি হাতে করবেন।

Discussion about this post