আমরা গ্রামীণ জীবনে হাস-মুরগী দেখেছি। চিন্তাশীল মানুষ দেখে থাকবে, মুরগী কদাচিৎ তার একটি পা এবং একই দিকের একটি পাখা সটান করে পিছনের দিকে ঠেলে ধরছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে মুরগীর ছানাও তাই করছে। সে শিশু হলেও এই কাজের গুরুত্ব ঠিকই বুঝে। দৃশ্যত এটা পাখিদের আলসে ছড়ানোর প্রবণতা কিন্তু কথাটি পুরোপুরি ঠিক নয়। তারা মেরুদণ্ডের গিরাগুলোকে যতটুকু সম্ভব ঠেলে ধরে শরীর টাকে যুতসই করিয়ে নেয়। সকল পাখিরাই এটা করে থাকে এবং দৈনিক বহুবার। খাদ্যের অভাবে পেটে খিদে নিয়ে দিন পার করলেও, এই ব্যায়াম তারা করতেই থাকে। এটাতে তারা রোগমুক্ত, সুস্থ ও সবল থাকে। আমরা সবাই স্পঞ্জের সাথে পরিচিত। সাধারণ অবস্থায় এটা ফুলে থাকে। তার বয়স যতই হউক না কেন, তা কোনদিন চ্যাপ্টা হয়না। সেটাতে সাবান মাখিয়ে, মুঠের মধ্যে চেপে ধরে, আকৃতি ছোট করে থালা-বাটি ধোওয়া যায়। ছেড়ে দেওয়া মাত্র সেটি পূর্বের অবস্থায় ফিরে যায়। কিন্তু স্পঞ্জের উপরে যদি দশ দিন ইট চাপা দেওয়া হয় তাহলে সেটা চ্যাপ্টা হয়ে যায়! আকৃতির পরিবর্তন হয়। পাখিদের ঐ ব্যায়ামে শরীরের অভ্যন্তরে হাড়ের সংযোগ স্থল গুলো ঠিক উপরে বর্ণনা দেওয়া স্পঞ্জের মত কাজ করে।
মানুষের সৃষ্টি বৈশিষ্ট্য দুনিয়ার অন্য সকল প্রাণীদের চেয়ে আলাদা। প্রাণীদের কেউ বুকে ভর দিয়ে, কেউ চার পায়ে, কেউ সাঁতরায়ে চলে কিন্তু মানুষ দু’পায়ের উপর ভর দিয়ে খাড়া লাটির মত চলতে পারে! গতিশীল প্রাণীর মত ধাবিত হতে পারে! সৃষ্টিকুলের কোন প্রাণী মাটিতে কপাল ঠেকাতে পারেনা কিন্তু এই সুযোগ আল্লাহ শুধুমাত্র মানুষকেই দিয়েছে! মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে, ভিন্ন কোন উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে। মানুষ দু’পায়ে ভর করে চলে, যেভাবে সমতা রক্ষা করে, হেলে-দুলে হাটতে-দৌড়াতে পারে। এই ধরনের আশ্চর্য সক্ষমতা দুনিয়ার অন্য কোন প্রাণীকে দেয়নি! মানুষের এই বাহাদূরী, এই ক্ষমতা, সাহস, কার্যাবলী তার স্পেশাল মেরুদণ্ডের কারণেই সম্ভব হয়। এটাতে বহু মেকানিজম লুকিয়ে আছে। বিজ্ঞানীরা মানুষের মেরুদণ্ড গবেষণা করে দেখেছে যে, মানুষের শরীরের এই গঠন কাজের জন্য বানানো হয়নি, বরং তা কেবল শুয়ে-বসে, আরাম উপভোগ করার জন্যই বানানো! তাই এই জিনিষকে যথাযথ ব্যবহার করতে না জানলে দুনিয়াতে দুর্ভোগ-যন্ত্রণার পাহাড় বইতে হয়।
মানুষের মেরুদণ্ডের হাড়ের গিরাগুলোর মাঝখানে ‘ইন্টারভার্টিব্রাল ডিস্ক’ নামে নরম মাংসের প্যাড থাকে। এগুলোর কাজ অবিকল উপরে বর্ণিত স্পঞ্জের মত। দীর্ঘসময় বসার কাজ, চেয়ারে উপবেশন, সোফাতে বসে টিভি দেখা সহ নাড়াচাড়া কম হয় এমন সকল কাজে মানুষের মেরুদণ্ডের ডিস্ক গুলো ক্ষয় হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কখনও চ্যাপ্টা হয়ে ছিঁড়ে যায়। কখনও উপরের হাড় স্থানটিকে চেপে ধরে। মোটামুটি ছিঁড়ে যাওয়া, চেপে ধরা, যাই হউক না কেন। এই সমস্যা একবার দেখা দিলে সিংহ পুরুষ পালোয়ান পর্যন্ত অসহায় হয়ে পড়ে। বাহিরে দেখতে সুঠাম-সুস্থ কিন্তু হাটতে অক্ষম হয়ে যায়। দু’চার কেজি মাল-পত্র বহন করাও কষ্টকর হয়ে যায়। কিন্তু পরিশ্রমী ও ভারবহন কারী মানুষের জয়েন্টগুলো সোচ্চার ও সতেজ থাকে। ভার বহনের সময়ও তাদের একটি ছন্দ থাকে। মেরুদণ্ড মানব জীবনে সবচেয়ে বড় উপকারী বস্তু। এই মেরুদণ্ডের কারণেই আদম সন্তানকে মানুষ হিসেবে মাথা তুলে দাড়াতে সহযোগিতা করে। রাসুল (সা) বলেছেন, মেরুদণ্ডের শেষের মাথার হাড় থেকে মানুষকে বানানো হয়েছে, আবার তাকে সেখান থেকেই পূর্ণগঠন করা হবে। এ থেকে বুঝা যায়, মেরুদণ্ড কত স্পর্শকাতর অঙ্গ।
মেরুদণ্ডের সংযোগ স্থলের সমস্যার কারণে, কোমর ও পায়ের ব্যথার প্রকোপ বাড়ে। এই অশান্তিতে দুনিয়ার সবচেয়ে সুখী মানুষটিও অতিষ্ঠ হয়ে উঠে। ডাক্তার অপারেশন করে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেয় কিন্তু কোনদিন এই রোগ ভাল হয় না। দুনিয়ার সকল মানুষকে কম বেশী এই রোগের মোকাবেলা করতে হয়। পাখিরা এই সমস্যা থেকে মুক্ত থাকতেই উপরের ব্যায়ামটি করে থাকে। টিকটিকি প্রজাতির প্রাণীরা সামনের একটি হাত এবং পিছনের ঠিক উল্টো দিকের একটি পা সামনে পিছনে সটান করে টান দেয়। মানুষের মেরুদণ্ডের জন্য এই ব্যায়াম যথেষ্ট উপকারী। মানুষ বৈশিষ্ট্য-গত ভাবে অলস, আরামপ্রিয়, ভোজনবিলাসী হবার কারণে নিজের অজান্তেই দেহের ভিতরে মেরুদণ্ডের এই ক্ষতির কাজ করে। তারা প্রাণীদের মত অত সতর্ক এবং যত্নশীলও নয়। হাশরের ময়দানে যেদিন হিসেব নিকেশের পালা চুকানো হবে, সেদিন নেয়ামতের কৃতজ্ঞতার বেলায়, প্রথম প্রশ্ন ছুড়ে দেওয়া হবে, সুন্দর দেহকে কিভাবে, কোন কাজে লাগিয়েছ? দুনিয়ার জীবনে শারীরিক সুস্থতা মানুষের জন্য অন্যতম এবং প্রধানতম নেয়ামত।
মানুষকে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন, ফলে তিনি মানুষের চরিত্র সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। দুনিয়াবি জীবনে মানুষকে সুস্থ, সবল ও কর্মক্ষম রাখতে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত/নামাজ কে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। সালাতের ধাপ গুলো এমনভাবে সাজানো, যাতে করে কোন ব্যক্তি যথাযথ ভাবে সালাত আদায় করলে, শরীরের প্রতিটি অঙ্গই নড়-চড় হবে। হাদিস শরীফে এসেছে, সালাতের মাধ্যমে মানব দেহের প্রতিটি হাঁড় এবাদতে অংশগ্রহণ করে। বাহ্যিক ভাবেও দেখা যায় হাঁটুর ব্যায়াম, গোড়ালি, পায়ের পাতা, কনুই, ঘাড়, পিট, আঙ্গুল, মাথা সহ সব অঙ্গই সালাতে অংশ গ্রহণ করে অর্থাৎ নড়াচড়া করে। সালাত হল অন্যতম শারীরিক এবাদত। মেরুদণ্ডের হাড়ের উপরেই, সালাতের প্রভাব সবচেয়ে বেশী। রুকু, সেজদা ও তাশাহুদের সময় বেশীমাত্রায় উপকৃত হয়, মানুষের মেরুদণ্ড। উপরে নিচে নড়াচড়া, সামনে পিছনে টান খাওয়া সহ নানাবিধ কার্যাবলীতে অংশ নেয়। এই উপকারের কারণে, নামাজি মানুষ অশীতিপর বৃদ্ধ হলেও নামাজের পর্বগুলো ঠিকই পালন করতে পারে। নামাজ মানুষের ব্রেন কোষকেও সচল রাখে। নামাজ পড়তে গিয়ে অনবরত কোরআনের মুখস্থ আয়াত গুলো উচ্চারণ করতে হয়, ফলে সর্বদা মাথার নিউরন সেল গুলো সচল ও ব্যস্ত থাকে। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ স্মৃতি ভ্রমে আক্রান্ত হয় কিন্তু নামাজি মানুষ হয় না! যার কারণে নামাজি মানুষ বৃদ্ধ বয়সে কিছু করতে না পারলেও শিক্ষাদানে কর্মক্ষম থাকে।
তাই আসুন শরীরের যত্ন নেই। অন্তত আমাদের দেখা নগণ্য প্রাণীগুলোর মত হলেও। নামাজ পড়ি। যথাযথ পদ্ধতিতে। নামাজে মন-মগজ, দেহ-আত্মা পরিপুষ্ট হয়। যতদিন বেঁচে থাকব, ততদিন যেন সুস্থভাবে বেচে থাকি। কেননা স্বাস্থ্যই হল সকল সুখের মুল।


Discussion about this post