কর্কের সাথে কমবেশি সবাই পরিচিত আছে। যাদের প্রিয় খেলা ব্যাডমিন্টন, তাদের কাছে শাটল কর্ক হল খুবই পরিচিত একটি জিনিষ। এটি দুটো বস্তুর সমন্বয়ে তৈরি, এক অংশ হল পাখির পালক, অন্যটি হল কর্ক। কয়েকজন কৌশলী খেলোয়াড়ের বেদম পিটুনির কারণে এর পালক ছিঁড়ে গেলেও, সারাদিন পিটালেও কর্কের কোন ক্ষতি হয়না! কেননা কর্ক ওজনে হালকা কিন্তু বেদম পিটুনিতেই সহ্য-শীল! তাই কর্ক শিল্প হিসেবে বর্তমানে সমাদৃত হয়েছে। হোমিও প্যাথির বোতলের ছিপি হিসেবে আমরা কর্কের ব্যবহার দেখে থাকি। প্রাচীন কাল থেকেই বোতলের রক্ষিত জিনিষকে সঠিক মানে ধরে রাখতে বোতলের মুখে কর্কের ছিপি আটকানো হত। তাই আজো মদ শিল্পের বোতলে, এই কর্কের ব্যবহার প্রচুর। কিন্তু আমাদের অনেকেই জানেনা এই কর্ক কোত্থেকে আসে। কিভাবেই বা সৃষ্টি হয়!
কর্ক মূলত এক প্রকার গাছের বাকল। যাকে ইংরেজিতে Cork Oak বলা হয়। পর্তুগালে এই গাছ বেশী পরিমাণের হয়ে থাকে। তাছাড়া স্পেন, আলজেরিয়া, মরক্কো, ফ্রান্স, ইটালি এবং তিউনিসিয়াতেও এই গাছ জন্মে। তবে এটির ভাল ফলন হয় পর্তুগালে। তাই এই গাছ সেদেশের গুরুত্বপূর্ণ অর্থকড়ি সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। পর্তুগালে সরকারী অনুমতি ব্যতিরেকে কর্ক গাছ কাটতে পারে না। এই গাছ বেশ লম্বা ও বিস্তৃত হয়, তাই দূর থেকে কর্ক গাছ দেখতে অনেকটা গর্জন গাছের মত মনে হয়। গাছগুলো শীতল ছায়াদার এবং গাছের বিচি ফ্রাই করে খাওয়া যায়। ফলে এই বিচির লোভে কাঠবিড়ালি, ইঁদুরের উৎপাত আশে পাশে লেগেই থাকে। প্রাণীদের মধ্যে জলহস্তীর চামড়া যেভাবে পুরু, গাছের মধ্যে সেভাবে কর্ক গাছের চামড়াই বেশী পুরু। বয়স ৮-৯ বছর হলেই গাছ আর পুরু চামড়ার মধ্যে সম্পর্ক ঢিলে হয়ে যায়। তখন খুন্তি জাতিয় কিছু একটা দিয়ে গুঁতো দিলেই অনায়াসে চামড়া খসে পড়ে। চামড়া খুলে নিলে, দুনিয়ার তাবৎ গাছ মরে যায়, কেননা গাছ চামড়ার মাধ্যমেই খাদ্য সরবরাহ করে। কিন্তু কর্ক গাছের গোরা থেকে সমুদয় চামড়া খসিয়ে একেবারে নেংটা করা ফেললেও সে দিব্যি বেঁচে থাকে!
কর্ক গাছের চামড়া পানি ও বায়ু প্রতিরোধক। বহুদিন পানিতে চুবিয়ে রাখলেও তার ভেতরে সহজে পানি ঢুকে না! তাই এটা পানীয় বোতলের মুখের ছিপি হিসেবে সবচেয়ে বেশী কার্যকরী। পর্তুগীজেরা সারা বিশ্বের দেশে দেশে, সামুদ্রিক অভিযান চালিয়ে দস্যুবৃত্তি করত। সমুদ্রের বুক ছিঁড়ে বহু দূরের মুল্লুকে এরা পৌঁছে যেত! এ লক্ষ্যে তারা দীর্ঘদিন সমুদ্রে ভেসে থাকত। তাদের এই দক্ষতার পিছনে যার অন্যতম অবদান ছিল, তা ছিল এই কর্ক গাছের বাকল। পানিতে ভেসে থাকার জন্য বিশেষ কায়দায় শোলা বানিয়ে তা জাহাজের সাথে বেঁধে দিত, এতে জাহাজ টেকসই হত বেশীদিন। লক্ষ মাইল সামুদ্রিক দূরত্ব অতিক্রম করে পর্তুগিজেরা একদা চট্টগ্রাম শহর দখল করে এবং বহুবছর এখানে রাজত্ব করে। চট্টগ্রাম শহরের বহু বহু রাস্তা-ঘাট, ভবন আজো পর্তুগীজদের সদম্ভ উপস্থিতির কথা মনের করিয়ে দেয়। যাই হোক বলছিলাম কর্ক গাছের ইতিবৃত্ত নিয়ে।
আরো পড়ুন…
- আমলকী একটি শক্তিশালী ভিটামিনের গোল্লা
- স্ন্যাক লিলি Snake lily দেখতে অপূর্ব
- জীবন্ত কবর; অতি-প্রাকৃতিক ভীতিকর গল্প
ওজনে হালকা, ইচ্ছামত ডিজাইন করার সুবিধা, ছুরি দিয়ে কেটে আকৃতি দিতে সহজ ও পানি প্রতিরোধী হওয়ায়, বর্তমান সময়ে কর্কের ব্যবহার আরো বেড়েছে। কাঁচের সামগ্রী রক্ষায় দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ জিনিস হল কর্ক। তাই গৃহস্থালি সামগ্রীতে কর্কের ব্যবহার সকল যুগের চেয়ে এখন বেশী। গরম পাতিল রাখার পাটাতন, মাদুর, গ্লাস, থালা, গ্লাস, ওভেনের কভার, সাউন্ড বক্সের আবরণ, গাড়ীর ডিজাইন, খেলনা সামগ্রী সহ বহু কাজে ব্যবহার হচ্ছে কর্ক। ফলে এটি কুটির শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বস্তুতে পরিণত হয়েছে। তাছাড়া গবেষকেরা চিন্তাভাবনা করে দিন দিন নিত্য নতুন আইটেমে কর্কের ব্যবহারকে সমৃদ্ধ করছে।
কর্কের সাথে কিছুটা তুলনা করা যায় আমাদের দেশের পাটখড়ির সাথে। পাটখড়ি দেখতে চিকন হলেও এর চরিত্র কিন্তু কর্কের মতই! কোন ভাবে জমাট বাধানো গেলে কর্কের মতই ব্যবহার করা যাবে। পাটখড়িকে কিভাবে কাজে লাগানো যায়, সেটা নিয়ে চিন্তা ভাবনা আমাদের দেশে খুবই কম। যেহেতু আমাদের দেশে গবেষণার পিছনে উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠপোষকতা নাই। তাই চিন্তাশীল শিক্ষার্থীরা বিদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়। একটু চিন্তা ভাবনা করলে পাটখড়ি দিয়েও আমরা ব্যতিক্রম কিছু সৃষ্টি করতে পারি। এতে আমাদের নতুন শিল্প গড়ে উঠার পথ যেভাবে সৃষ্টি হবে, চাষিরা উপকৃত হবে এবং দেশীর কুটির শিল্পের উন্নতি হবে। যার জন্য শুধু দরকার কোন কৌতূহলী মানুষের সুদৃষ্টি ও কারো পৃষ্ঠপোষকতা।
Discussion about this post