পাঠক হয়ত ভাববেন, নতুন ফেতনার জন্ম হল নাকি! জীবন ভর পড়ে গেলাম, কোরআনের কোথাও তো অংকের কথা পড়িনি! জ্বি, ঠিকই ধরেছেন, কোরআনে অংকের কথা না থাকলেও কোরআন ঠিকই মুসলমানদের অংক শিখতে বাধ্য করেছে। আজকে আমার প্রতিপাদ্য বিষয় এটিই।
– কথায় আছে, কর্ম নষ্ট গরলে, অংক নষ্ট সরলে।
– তাই শিক্ষকেরা পরীক্ষার শুরুতে সরল অংক কষতে মানা করেন।
– এই অংকে মগজে একবার গ্যাঞ্জাম লাগলে বাকি অংক মাথা থেকে উদাও হয়।
– গভীর অধ্যবসায়ী, ধৈর্যশীল, শান্ত ও কঠোর চিত্তের অধিকারীরা অংকে ওস্তাদ হয়।
– পুরাণ আরবি প্রবাদ আছে, ‘অংক হল সকল জ্ঞানের অর্ধেক’!
– আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান একথা শিক্ষা দেয়, ‘অংকে যে সেরা, সে সকল বিষয়ে সেরা’।
লক্ষণীয় বিষয় হল, এই বিষয়টিতে মুসলমানেরা প্রাথমিক যুগ থেকেই সেরা ছিল। পরবর্তীতে তাদের হাতে অংকের বহু সমীকরণ, সূত্র সৃষ্টি হয়। এলজেব্রা তথা বীজগণিত তো মুসলমানদেরই কৃতিত্বের সাক্ষী। মুসা আল খাওয়ারিজমকে বীজগণিতের জনক বলা হয়। সেভাবে জ্যামিতি-ত্রিকোণমিতিতে আছে বিরাট অবদান। মহাকাশ গবেষণা, নিউক্লিয়ার গবেষণা থেকে শুরু করে যত জটিল গবেষণা আছে সব জায়গাতে গণিত হল মূল উপাদান। গণিতে মুসলমানদের অবদান অতুলনীয়।
পবিত্র কোরআনের ভাষায়, মিরাস তথা উত্তরাধিকারীদের হাতে যথাযথ সম্পদ বণ্টন ফরজ। সেটা কিভাবে বণ্টন করতে হবে তা পবিত্র কোরআনে পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখ আছে। সমস্যা হল বণ্টন ও ভাগ তো মানুষকেই করতে হয়। সেই ভাগ করতে গিয়ে মানুষদের প্রতিনিয়ত নতুন নতুন সমস্যায় পড়তে হত। দুনিয়াতে কোটি কোটি মুসলমান মারা গেলেও এই বণ্টন ভাগের হিস্যার পরিমাণ একজনের সাথে অন্যজনের কখনও মিলে না! ভিন্ন ব্যক্তির বহুবিধ হিসেবে ভজগট বাধায়। সে জন্য ভাগ করার একটি স্থায়ী পদ্ধতি দরকার হয়ে পড়ে। ধৈর্যশীল জ্ঞানীরা বহু চিন্তা গবেষণা করে সরল অংকের মাধ্যমে এই হিসাব টিকে সহজ করেছে। এখনও যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়, আচ্ছা সরল অংক আমরা কেন শিখি? এর ব্যবহার কোথায়? সদুত্তর পেতে কষ্ট হবে! এই অংকটি মূলত সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রেই বেশী ব্যবহৃত হয় এবং এটার জন্ম হয়েছে এই উপলক্ষেই। যদিও বর্তমানে সরল অংককে আমরা বহু কাজে ব্যবহার করি, সেটা ভিন্ন কথা।
সম্পদের কে কত অংশ পাবে সেটা সরলের মাধ্যমে সমাধান হল বটে। তবে স্থাবর অস্থাবর সম্পদ ভাগ করতে গিয়ে নতুন সমস্যায় পড়তে হত। জমির ক্ষেত্রফল নির্ণয়ের পদ্ধতি আগেই বের হয়েছিল কিন্তু তিন কোনা জায়গা কিংবা ট্রাপিজিয়াম আকৃতির স্থানের পরিমাপ করাটা দূরহ ছিল। ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল কত? কোন ছাত্রকে প্রশ্ন করলে সে হয়ত মুহূর্তেই সূত্র বলে দিবে। কিন্তু এটা বের করতে মানব সম্প্রদায়কে শত শত বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল! জায়গা সম্পত্তি সঠিক ভাবে ভাগ করে দিতে গিয়ে জ্যামিতি ও ত্রিকোণমিতি চর্চা করাটা মুসলমানদের জন্য অবধারিত হয়ে পড়েছিল।
খলিফা হারুনুর রশিদের সময় বিশাল ভূ-খন্ডে ইসলাম ছড়িয়ে পড়ে। জায়গার পরিমাণ বেড়ে যায়। ফায় ও খারেজ সম্পদের দালিলিক হিসেব দরকার হয়ে পড়ে। মুসা আল খাওয়ারিজমি হারুনুর রশিদের সন্তানের আমলে এ সম্পর্কিত সরকারী চাকুরী নেন। তিনি বীজগণিতের সূত্র সৃষ্টি ও প্রয়োগের মাধ্যমে বিশাল বিশাল স্থানের পরিমাপ, ক্ষেত্রফল, বর্গক্ষেত্র মুহূর্তেই সমাধা করতে পারলেন। তাঁর হাত ধরে যে বীজগণিতের সৃষ্টি হল এবং জগতের লাখো সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখল, সেই বীজ গণিত আজো দুনিয়াকে দায়বদ্ধ করে রেখেছে। পৃথিবীতে যত ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী তৈরি হচ্ছে তারা খাওয়ারিজমীর নাম না জানলেও তার কাছে চির ঋণীই থেকে যাচ্ছে।
এর পরে সম্পদের পরিমাণ বণ্টন করতে গিয়ে আরেক সমস্যা। ওয়ারিশদের মাঝে একশত মন শস্যের কে কত পরিমাণ পাবে সেটা নির্ণয় করাটা আরেকটি নূতন ঝামেলা পোহাতে হত। সে জন্য সৃষ্টি হল পাটিগণিতের অনুপাত ও সমানুপাত অংক। এই অংকও আমাদের দেশে ছাত্ররা করে কিন্তু শুরুতে তারা প্রয়োগ ক্ষেত্র জানেনা। পরীক্ষা পদ্ধতিতে এখন সৃজনশীলতার যুগ। বাস্তবের সাথে সম্পর্কিত এসব বিষয় অংকের মাঝে ঢুকালে ছাত্ররা বুঝত সহজে। আরও বুঝত আমরা অংক কেন করি, সে কথার গুরুত্ব।
বৈষয়িক সমস্যা সমাধানে কোরআনের একটি বিষয়কে বাস্তবে রূপ দিতে গিয়ে গণিতের একটি বিশাল বিষয় সৃষ্টি হয়েছে, আমরা কিন্তু সেটা জানিনা, ভেবেও দেখিনা! ফলে গৌরব করার মাঠও হাতছাড়া হয়ে যায়। আগেকার যুগে আলেম, শায়খ, কাজি, হাকিম সবাইকে অংকে পারদর্শী হতে হত। না হলে যুগ জিজ্ঞাসার উত্তর দিতে ব্যর্থ হত। বেজায় কৌতূহলের ব্যাপার হল, মাজহাবের যতজন ইমাম আছে তারা সবাই কমবেশি অংকে পারদর্শী ছিল! তাঁরা অনেক মাসয়ালা দিয়েছেন যেগুলো সমাধানে অংকের আশ্রয় নিতে হয়েছে! ভূমি ভাগ করতে গিয়ে অংকের মাঝে কোন ভাগশেষ রাখা যাবেনা। এ জাতীয় সুন্দর অংক সৃষ্টি করেছেন ইমাম গন।
বড় পরিতাপের বিষয় হল, কোরআন মানব সভ্যতা বিনির্মাণে মুসলমানদের জন্য যে গণিতকে উপহার হিসেবে দিয়েছে, সেই গণিত মাদ্রাসা গুলোতে পড়ানো হয়না। মাদ্রাসার ছাত্ররা ফরায়েজ পড়ে; ফরায়েজ অর্থ অংক। তারা শুধুমাত্র জায়গা সম্পত্তি ভাগ করার অংকটুকু জানাকেই ফরায়েজ মনে করে। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব কত, তার মাঝে খালি জায়গার পরিমাপ কত এই ফরায়েজ তাদের শিখানো হয় না। পৃথিবীর মোট আয়তন কত এগুলো মুসলিম মনীষীরা সৃষ্টি করেছেন কিন্তু অধ্যয়ন করা হয়না। আমরা বহু সময় নষ্ট করেছি এসব জানতে, এখনও সময় আছে এগুলো নিয়ে ভাবার। তাই মুসলমানদের বুৎপত্তি অর্জনের প্রথম ও প্রধান হাতিয়ার হল অংকে বুৎপত্তি অর্জন।
ইহুদি নারীরা পেটে বাচ্চা আসলে, অংক নিয়ে অধ্যয়ন শুরু করে। যাতে করে পেটের বাচ্চা বুদ্ধিমান হয়, কাবিল হয়। লেখক নিজেই দেখেছে, বাচ্চা পেটে পৌঢ়া মহিলাকে শিক্ষকের কাছে গিয়ে অংক শিখতে! যেই অংকের এত গুরুত্ব, যে অংকে মুসলমানদের অবদান পরতে পরতে, সেই অংকে আজ মুসলমানের শায়খেরা নেই! এটা ভাবতে কষ্ট লাগে!
একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে শেষ করব। মৃত্যু কালে এক ব্যক্তি উইল করে যায়, বড় ছেলে দুই ভাগের এক ভাগ, মেঝ ছেলে ছয় ভাগের এক ভাগ, ছোট ছেলে নয় ভাগের এক ভাগ সম্পদ পাবে। সবকিছু ঠিকঠাক বণ্টন হয়েছে কিন্তু ১৭ টি উট কিভাবে ভাগ করবে সেটা নিয়ে মুসিবতে পরে সন্তানেরা। ১৭ টি উটের মধ্যে বড় ছেলে পায় ৮.৫ অংশ। সে কম নেবে না আবার উট জবাইও করতে দিবে না। মেজ ছেলে পায় ৫.৬৬ অংশ এবং ছোট ছেলের ভাগে পড়ে ১.৮৮ অংশ। কেউ কম নিবে না আবার উট জবাইও করবে না। এই জটিল বিচার গিয়ে পড়ে বাগদাদের কাজির উপরে।
ছেলেরা ১৭ টি উট নিয়ে আদালতে হাজির, বিচারক নিজের উটটি তাদের উটের পাশে বাঁধলেন এতে উটের সংখ্যা দাঁড়াল ১৮। বড় ছেলেকে ১৮ টি উটের নয় ভাগের এক ভাগ তথা ৯ টি উট দিয়ে বিদায় করলেন যদিও তার প্রাপ্য ছিল ৮.৫ অংশ। মেঝ ছেলে ১৮ টি উটের তিন ভাগের এক ভাগে ৬ টি দিলেন যদিও তার প্রাপ্য ছিল ৫.৬৬ অংশ। আর ছোট ছেলের প্রাপ্য ১.৮৮ অংশের জায়গায় পুরো ২ টি উট দিয়ে দিলেন। অবশিষ্ট একটি উট বিচারকের জন্য রয়ে গেল, এটি প্রকৃতই বিচারকরে উট। অংকটা ছিল এভাবে ৯ + ৬ + ২ = ১৭। এই হিসাব বুঝে আসছে না বলেই বিচারক নিজের উট যোগ করেছিলেন অংক বুঝানোর জন্য। বিচারক এই কাজটি সহজে করতে পেরেছিলেন কারণ তিনি সরল অংক জানতেন এবং লসাগু হিসেব করে সহজে সমাধান করেছিলেন। ব্যক্তি শরীয়তের জ্ঞানে যতই পণ্ডিত হউক, অংকে যদি পাণ্ডিত্য না থাকে তাহলে এ জাতীয় সমস্যা সমাধান তিনি করতে পারবেন না। অথচ নিত্য-নৈমত্তিক এসব ঝামেলা তদানিন্তন কাজিদের কে পোহাতে হত।
বর্তমানে এসব হিসেব আর আলেমদের করারও সুযোগ নাই। এসব সমাধান করে উকিলেরা। ওকালতি পড়ার সময় এই বিষয়টি তাদের পড়ানো হয়। তারা মৃত মানুষের সম্পত্তি ভাগ করে দেয় আর আলেমেরা সেখানে থাকে দোয়া পড়ার জন্য। তারা ইহজন্মে জানতে পারবে না। অংক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার একটি বড় অংশ মুসলমানেরা সৃষ্টি করেছিল। যা সৃষ্টি হয়েছিল কোরআনের নির্দেশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে এবং দুনিয়ায় নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব সৃষ্টিতে অংকের মত গুরত্বপূর্ন বিষয় আর দ্বিতীয়টি নেই।

Discussion about this post